১৬ ডিসেম্বরের পর

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জেনারেল নিয়াজীর নেতৃত্বে হিন্দুস্তানের ইস্টার্ণ কমান্ডের জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পন করেন বিকেল চারটায় রমনার ময়দানে। সারেন্ডারের দলিল জাতিসংঘে তৈরি হয়েছে। দিল্লী আর ইসলামাবাদ জানে দলিলে কি আছে। শুধু জানতোনা জেনারেল নিয়াজী। ইতোমধ্যেই দলিলটি দিল্লী কোলকাতা হয়ে ঢাকা এসে পৌছেছে কন্টিনেন্টালের রেডক্রসের কাছে।পাকিস্তান সরকার জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক চাপে সারেন্ডার করতে রাজী হয়। কিন্তু জেনারেল নিয়াজী এ বিষয়ে কিছুই জানতোনা এবং প্রথমে সারেন্ডার করতে রাজী হয়নি। পরে কেন্দ্রের চাপে সারেন্ডার করতে রাজী হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় পাঁচ হাজার বর্গমাইল এলাকা ভারত দখল করে নিয়েছিল বলে শুনেছি।

২৫শে মার্চের পর

২৫শে মার্চ রাত এগারটা পর্যন্ত আমি আর মানু মুন্সী হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের লবিতে ছিলাম। পরিবেশ ছিল খুবই থমথমে। গুজব রটেছে আলোচনা ভেংগে গেছে। ইয়াহিয়া পাকিস্তান ফিরে গেছেন। ভুট্টো তখনও কন্টিনেন্টালে। যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা আশা করে বসে আছি ভুট্টোর সাথে দেখা হবে। কিন্তু দেখা হয়নি। একজন বাংগালী গোয়েন্দা এসে আমাদের ঈশারায় বললো চলে যাওয়ার জন্যে। না হয় বিপদ হতে পারে। মানু মুন্সীর হোন্ডা করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় লোকজন নেই। দূর থেকে জয়বাংলা শ্লোগাণ শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই জনতা রাস্তায় বেরিক্যাড দিতে শুরু করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে অবজারভার হাউজের দিকে রওয়ানা দিলাম। অবজারভারে যখন পৌঁছি তখন  বারোটা ছুঁই ছুঁই।

সবাই জানতে চাইলো এত তাতে কোত্থেকে এলাম।  মিয়া ভাই মানে এহতেশাম হায়দার চৌধুরী জানতে চাইলেন কন্টিনেন্টালের অবস্থা কি? বললাম ওখানে বিদেশী আর গোয়েন্দা ছাড়া তেমন আর কেউ নেই। আশা ছিল ভুট্টোর সাথে দেখা হবে। কিছুক্ষণ পরেই তিনি ঢাকা ছেড়ে যাবেন।  বাংগালী গোয়েন্দা ভদ্রলোকের অনুরোধে হোটেল ছেড়ে চলে এলাম। এতক্ষণে কারফিউর খবর জানাজানি হয়ে গেছে। পরদিন মানে ২৬শে মার্চ কাগজ বের হবেনা। ২৬শে মার্চ হরতাল ঘোষণা করেছিলেন বংগবন্ধু। ইতোমধ্যে বংগবন্ধু জানতে পেরেছেন আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। আলোচনার সফলতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ও ভুট্টো। আমরা শুনেছি ছয় দফার চার দফা জেনারেল ইয়াহিয়া মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ভুট্টো সামরিক জান্তার সাথে  ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল। নিরররস্র জনগণের উপর হঠাত্ আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল ভুট্টোর। রাত বারোটার কিছুক্ষণ পরেই ট্যান্ক নিয়ে হাজির হলো সাঁজোয়া বাহিনী। সম্ভবত মানু মুন্সী ছাদের উপর থেকে ছবি তোলার চেস্টা করেছিল। ফলে অবজারভার হাউজের দিকে গুলি ছুড়লো সৈনিকরা। আমরা সবাই  টেবিলের নীচে ঢুকে পড়লাম। বোকামীর জন্যে মানু মুন্সীকে গালাগাল করতে শুরু করলেন। ২৫শে মার্চ থেকে ২৭শে মার্চ সকাল ৭টা পর্যন্ত আমরা অবজারভার হাউজেই আটকা ছিলাম। ৭টা থেকে ৯টা ফর্যন্ত দুই ঘন্টার জন্যে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তখন আমার বাসা ছিল শান্তি নগরে ,রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের উল্টো দিকে। বাসায় ছিলেন আমার স্ত্রী নাজিয়া আখতার ও বড় ছেলে নওশাদ। তারা খাটের নীচে লুকিয়ে ছিল।

স্মৃতিকথা ২

আমার বাবা

আমার বাবার নাম আবদুল আজিজ মজুমদার। বাবার দাদা ও পীরদাদার বাড়ি ছিল ফেণীর শহরের উত্তরে পেঁচিবাড়িয়া গ্রামের ননু মজুমদার বাড়ি। আমার দাদার নাম ইয়াকুব আলী মজুমদার। বাবার দাদার নাম ছিল মনসুর আলী মজুমদার ও পিজা বা পীরদাদার নাম ছিল আতা আলী মজুমদার। গ্রামটি এখন আনন্দপুর ইউনিয়নে। বাবার জন্ম ফেণী শহরেই। বাড়ির সামনের স্কুলেই বাবা লেখাপড়া করেছেন। বাবা খুবই দয়ালু ও নরম হৃদয়ের মানুস ছিলেন। আত্মীয় স্বজনকে খুবই সাহায্য করতেন। খরচের ব্যাপারেও বাবা ছিলেন দরাজদিল। ফেণী শহরে বাবার বহু নামীদামী বন্ধু ছিলো। শহরে সবাই তাঁকে এক ডাকে চিনতো। অল্প বয়সেই বাবা পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। প্রথমে ফেণীতে ও পরে রেংগুন যান ব্যবসার জন্যে। সেখানে পরিবারের ধানের ব্যবসা ছিল। রেংগুন থেকে বাবা নাকি কয়েকবার থাইল্যান্ডেও গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর রেংগুনে ভারতীয় খেদাও আন্দোলন শুরু হলে হাজার হাজার মানুষের সাথে বাবাও রেংগুন ত্যাগ করেন পায়ে হেটে। দুর্গম পথ অতিক্রম করতে গিয়ে অনেক মানুষ মারা গিয়েছেন। শুনেছি বাবার সাথে তখন খাতির ছিল চট্টগ্রামের বিখ্যাত শিপিং ব্যবসায়ী আবদুল বারী চৌধুরী সাহেবের। বাবা তাঁকে মুরুব্বী হিসাবে সম্মান করতেন। বারী চৌধুরী সাহেব ছিলেন একজন নামজাদা ধনী মানুষ। বাংগালীদের ভিতর তিনিই নাকি প্রথম শিপিং ব্যবসা শুরু করেছিলেন। রেংগুন ছেড়ে  চট্টগ্রাম এসে তিনি  নিজের ব্যবসা শুরু করেন।চট্টগ্রামের রিয়াজুদ্দিন বাজারে  ব্যবসা শুরু করার জন্যে বারী চৌধুরী সাহায্য করেছিলেন। বারী চৌধুরী সাহেব ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পপতি ও পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী একে খান সাহেব। শ্বশুরের আহ্বানেই একে খান সাহেব তখনকার দিনের খুবই মর্যাদাশীল চাকুরী মুন্সেফের চাকুরী ছেড়ে ব্যবসায় এসেছিলেন। একে খান সাহেবের বাবা  আবদুল লতিফ খান সাহেব ছিলেন সাব রেজিস্ট্টার।

শুনেছি, পশ্চিম বাংলার মেদিণীপুরে এ্যারোড্রাম নির্মানের কাজে বাবা একজন সাব কন্ট্রাক্টর ছিলেন। তখনকার দিনের আরও সাত জন নামকরা মানুষ সাব কন্ট্রাকটর ছিলেন। মূল ঠিকাদার ছিলেন ফরিদপুরের ওয়াহিদুজ্জামান ও কুমিল্লার চিওড়া কাজী বাড়ির কেজি আহমদ।  সাব কন্ট্রাকটর বা সহকারী ঠকাদার হিসাবে বাবা নাকি বিল না পেয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে ৪৫ সালের দিকে ফেণীতে ফিরে আসেন।এর আগে তিনি চট্টগ্রামের ব্যবসা গুটিয়ে সে টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন মেদিনীপুরের কাজে। ফেণীতে এসে তিনি গোবিন্দপুরের কাজী আবদুল আলীর সাথে যৌথ ব্যবসা শুরু করেন। শুরু করেছিলেন আবদুল গফুর উকিল সাহেবের বাড়ির সামনের একটি ঘরে। তখন আমার বয়স ৫ বছর। ওই বছরই আমি বাড়িতে লেখাপড়া শুরু করি।

আমার সাইকেল

ershadmz June 30th, 2009

ক্লাশ সিক্স পাশ করলে ফেণী মডেল স্কুল আমাকে ছেড়ে যেতে হবে। কারন ওখানে ক্লাশ সেভেন নেই। মা আমার জন্যে একটা বাইশ ইণ্চি সাইকেল কেনার কথা বললো বাবাকে। বাবা বলেছিলেন আজিজ কাকাকে। আজিজ কাকার সাইকেলের দোকান ছিল। সাইকেলের দাম মনে হয় ৫০ টাকা ছিল। আমাদের বাড়ি থেকে ফেণী হাইস্কুল একটু দূরে ছিল। মা ভেবেছিলো অতদূর পথ হেটে যাওয়া ঠিক হবেনা। হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্যে মা শার্ট ও হাফ পেন্টের অর্ডারও দিয়েছিলো। সেই সাইকেল আর কেনা হয়নি। মা ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসেই আমাদের চলে গিয়েছিল। মা’র টাইফয়েড ও নিউমুনিয়া হয়েছিল। বহু চেস্টা তদবীর হয়েছিল। তখন ওসব রোগের কোন চিকিত্‍সা হতোনা।

আমার ফেণীর দিনগুলি

ershadmz June 21st, 2009

আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন ১৯৬৪ সালের অগাস্টের দিকে। আমি তখন সংবাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।অবজারভার ছেড়ে সংবাদের এসেছিলাম রাজনৈতিক কারনে।তখন সংবাদের এডিটর ছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী। শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন নির্বাহী সম্পাদক।ওই ৬৪ সালের শেষের দিকেই আমি সংবাদ ছেড়ে ফেণী ফিরে গেলাম । ঢাকা এসেছিলাম পড়ালেখা করার জন্যে ১৯৫৮ সালে। শিশুকাল থেকেই ফেণীতে ছিলাম।ফেণী মডেল স্কুল, ফেণী হাই স্কুল ও ফেণী কলেজে পড়েছি।লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় থেকে গেলাম কাজ শুরু করি প্রথমে অবজারভারে ও পরে সংবাদে। ১৯৬৯ সালের শেষদিকে আবার ফিরে আসি ঢাকায়। সেই থেকে এখনও ঢাকায় আছি। এই লেখায় আমি শুধু ৬৪ থেকে ৬৯ এর কথা বলবো।ছাত্র জীবনের কথা বাদ দিলে আমার পূর্ণাংগ রাজনীতির জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। আমি ন্যাপ ও ন্যাপ সমর্থক কৃষক সমিতির সাথে জড়িত হই। ভাবলাম বাড়ীতে থাকলে বাবার দেখাশুনা হবে,রাজনীতিও হবে।আমি বড়ছেলে। সংসারের দায়িত্ব আমারই নেয়া উচিত ছিল। সত্যিকার অর্থে আমি তা পারিনি। আমার ছোটভাই ইসহাকই সংসারের সব কাজ দেখা শুনা করতো। ও তখন কুঠিরহাট বিষ্ণুপুর হাইস্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষকতা করতো। তেমন বেতন ছিলনা। হয়ত একশো দেড়শো হবে। আরও কমও হতে পারে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তালেব আলী সাহেব।পরে তালেব সাহেব আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছিলেন। তিনি একজন সত্‍মানুষের প্রতীক।তখন পর্যন্ত রাজনীতিতে সত্‍ মানুষের প্রয়োজন ছিল। আদর্শের প্রয়োজন ছিল। এখন আর প্রয়োজন নেই। এখন রাজনীতি পুরোদমে একটা ব্যবসা। যে কোন দলের ওয়ার্ড সভাপতি হতে পারলেই টাকা পয়সা আসতে শুরু করে।ফেণীতে গিয়ে প্রথমে একটি সাপ্তাহিক কাগজের ডিক্লারেশনের জন্য দরখাস্ত করি।নোয়াখালীর ডিসি ছিলেন আমিনুল হক সাহেব। আমার কাছে মনে হতো তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। ডিক্লারেশনের ব্যাপারে প্রশাসনের সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এসবি’র অফিসার আমাকে বলেছিলেন, আপনার নামে দরখাস্ত করবেন না। তাই আমি দরখাস্ত করেছিলাম আমার জেঠাত ভাই নুরুল ইসলাম সাহেবের নামে। ট্রান্ক রোডে আমার জেঠার একটি বিল্ডিং ছিলো। সেই বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে আমি অফিস করেছিলাম। কাগজের নাম প্রথমে দিয়েছিলাম স্বদেশ। বলা হলো সেই নামে কাগজ আছে। পরে নাম ফসল। এ নাম দেয়ার পেছনে একটা কারণ ছিলো। সেটা হলো পাঠকরা সহজে যেন পত্রিকার নাম উচ্চারন করতে পারে। সাপ্তাহিক ফসলের প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৭ই মার্চ বুধবার। প্রতি কপির দাম ছিলো ১২ পয়সা। সেই সময়ে ফসলের সার্কুলেশন ছিল সবচে বেশী। কাগজের সম্পাদনা ছিলো স্থানীয় অন্য কাগজের তুলনায় অনেক উন্নত। কাগজের সার্কুলেশন ও রিপোর্টিংয়ের ব্যাপারে আমাকে নিয়মিত সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের কর্মীরা। আমার ভাই সালু নুরু ছাড়াও কাগজে নিয়মিত কাজ করতো বাদল নাগ ও হুমায়ুন কবির সেলিম।আরও অনেকেই আমাকে সহযোগিতা করেছেন যাদের নাম এখন আমার মনে নেই। তখনকার বার লাইব্রেরীতে আমার অনেক বন্ধু ছিলো। সবচে প্রিয় বন্ধু ছিলো রফিকুজ্জামান ভুঁইয়া। আসলে ভুঁইয়া ছিলো ওর ডাক নাম। ওর বাবা ওয়াহিদুজ্জামান রফিককে আদর করে ভুঁইয়া ডাকতো। রফিক ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। ফেণী কলেজে পড়ার সময় সে কলেজ মজলিশেরও জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিত হয়েছিল। রফিক আমার প্রিয়তম বন্ধু ছিল।ওর মতো ভাল মানুষ এখন রাজনীতিতে দেখতে পাওয়া যায়না। শুধু ওর কথা বলতে গেলেও আমি একটি পূর্ণাংগ বই লিখতে পারবো।আমার আরেকজন প্রিয় মানুষ ছিলেন কাদের নেতা।এ রকম ভালো মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি। তিনি ছিলেন চিরকুমার। ছাত্র বয়স থেকেই তিনি আমাকে নানা ভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁকে সবাই কাদের নেতা বলেই জানতো।ফেণীর রাজনৈতিক জীবনে আমাকে সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা করেছেন ওয়াদুদ ভাই। তিনি এখন ফেণীর পথ পত্রিকার সম্পাদক। আরেক জনের কথা উল্লেখ না করলে মন মানছেনা। তিনি হচ্ছেন মাওলানা ওয়ায়েজ উদ্দিন। তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা।মাদ্রাসার লেখাপড়া শেষ করে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন। তিনি জীবিত থাকলে এদেশের প্রথম কাতারের একজন সত্‍ রাজনীতিক হতেন। ৬৯ সালে সারা পূর্ব বাংলার রাজনীতি ছিল সমুদ্রের উত্তাল তরংগের মতো।এই তরংগের ঢেউ ফেণীতেও পৌঁছে যায়।ওই আন্দোলনের ফলেই ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া ভোট পায়।রাজনীতিতে আমাকে বাম চিন্তাধারার লোক মনে করা হতো। আমি মাওলানা ভাসানীর মতো ধর্মে বিশ্বাস করতাম। আমি ইসলামকেই রেডিকেল ধর্ম মনে করি।ভাসানী সাহেব বলতেন ইসলামী সমাজতন্ত্র। সোজা কথায় বলা যেতে পারে আমি একজন মানবতাবাদী ছিলাম এবং এখনও আছি। ওই সময়ে আমি সারা নোয়াখালী জেলায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছি। ফেণীর বহু অনুস্ঠানে প্রধান অতিথি হয়েছি।ফেণীতে থাকার সময়ে আমার প্রধানতম অর্জন ছিল ফেণী প্রেসক্লাব প্রতিস্ঠা করা। এই ব্যাপারে আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন এসডিপিআরও রশীদ খান ও এসডিও আনিসুজ্জামান খান।ক্লাবের প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন আনিসুজ্জামান খান বা সাইফুদ্দিন আহমদ। সেক্রেটারী ছিলেন রশীদ খান। অবজারভারের সংবাদ দাতা নুরুল ইসলাম সাহেব ছিলেন সহ সভাপতি। আমি ছিলাম সহকারী সেক্রেটারী। আমরা এই ব্যবস্থা নিয়েছিলাম ক্লাবের জায়গা পাওয়ার জন্যে। বর্তমান ভবনটি লীজ পাওয়ার জন্যে সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা করেছেন মহকুমা হাকিম সাইফুদ্দিন সাহেব।লীজের টাকা দিয়েছিলেন কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের সত্যবাবু। টাকার জন্যে আমি কুণ্ডেশ্বরীর হেড অফিস চট্টগ্রামের গহিরা গিয়েছিলাম। দ্বিতীয় অর্জন ছিলো সৃজনী সংসদ প্রতিস্ঠা করা। ফেণী ক্লাব ছিল সরকারী অফিসার ও ফেণীর এলিটদের ক্লাব।যে কেউ ইচ্ছা করলেই এই ক্লাবের মেম্বার হতে পারতোনা।তরুন শিক্ষিত ব্যবসায়ী, উকিল,শিক্ষক, শিল্পীদের নিয়ে আমি সৃজনী সংসদ প্রতিস্ঠা করি। এখন এই সংসদ নাই। আমি ফেনী থাকলে এটাকে বাঁচিয়ে রাখতাম।কেন যে বন্ধুরা এটা টিকাতে পারলোনা তা বুঝতে পারলাম না।সত্যি কথা বলতে কি সংগঠন করতে হলে অন্তরের একটা টান থাকতে হয়। ভাবতে হয় সংগঠনটা আমি।এবার সাংবাদিকতা জীবনের কিছু কথা বলে এই নিবন্ধ শেষ করতে চাই। রাজনীতির কথা বলতে গেলে অনেক বেশী কথা বলতে হবে। এই ফাঁকে আমার বাবার কথা কিছু বলতে চাই। তিনি ছিলেন চৌকষ ও সখিন মানুস।ফেণীতে তাঁর প্রচুর বন্ধু ছিল। তাঁদের সবার নাম এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। বাবার প্রিয় মানুসের ভিতর ছিলেন নরেন ডাক্তার কাকা, আজিজ কাকা, সতীশ বর্ধন কাকা, সিনেমা হলের আফজাল কাকা। অনেক সরকারী অফিসারও তাঁর বন্ধু ছিলেন। অনুশীলন আন্দোলনের বাঘা মজুমদারের সাথেও তাঁর খাতির ছিলো। বাবার দিলটা ছিলো খুবই বড়। যেকোন সময়ে যেকোন লোকের সাহায্যে এগিয়ে যেতেন। আগেই বলেছি তিনি ১৯৬৪ সালে  সারকোমায় (বোন ক্যান্সার) আক্রান্ত হন।চিকিত্‍সা চলে দীর্ঘ চার বছর। এ সময়ে নরেন কাকা আমাদের সীমাহীন সাহায্য করেছেন।বাবা মারা যান ১৯৬৮ সালের ৫ই মার্চ। টাইফয়েড ও নিওমুনিয়ায় আমার মা মারা যান ১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে।তখন আমি ক্লাশ সিক্সে পড়ি।ঢাকায় সাংবাদিকতা করার কারণে স্থানীয় প্রশাসন আমাকে কিছুটা সম্মান করতো। কিন্তু স্থানীয় উকিল ও ব্যবসায়ীরা আমাকে সহযোগিতা করতে চাইতোনা।এটা হয়তো আমার স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্যে। তখন আমি কাউকে তোয়াজ করতামনা। বয়সের কারণে এখন অনেকটা নরম হয়ে গেছি। অনেক বেশী সমঝোতায় বিশ্বাস করি। তাছাড়া সমাজ এখন আগের চেয়ে অনেক খারাপ হয়ে গেছে। সমাজের উচু তলায় এখন মন্দলোকের সংখ্যা ৯০ ভাগের বেশী। নিচু তলায়ও মন্দ লোকের সংখ্যা ৩০ ভাগের কম নয়। মনটা আগের মতো থাকলেও দেহটা পোষ মেনে নিয়েছে। তখন আমি ছিলাম ২৫ বছরের যুবক। এখন বৃদ্ধ।বাবা ভেবেছিলেন বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেলে আমার রাজনীতি ও বিপ্লবী মনোভাব পোষ মানবে। ৬৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ে করিয়ে দিয়েছিলেন।কিন্তু মন পোষ মানেনি। ৬৯ সাল পর্যন্ত আমি ফেণীতে রাজনীতি করি। তারপর ৬৯ এর শেষের দিকে ঢাকা চলে আসি। তখন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ দৈনিকে রূপান্তরিত হয়েছে। মাহবুব ভাইকে বলার সাথে সাথেই তিনি রাজী হয়ে গেলেন। পূর্বদেশের একজন সিনিয়র অর্থনৈতিক রিপোর্টারের প্রয়োজন ছিল। আমাকে নেয়ার ব্যাপারে বার্তা সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী মিয়া ভাইয়ের আগ্রহ ছিল খুব বেশী। সেই যে আমি ঢাকায় এসেছি আর ফিরে যাইনি। অনেক ঘটনার মাঝে ফেণীর সাংবাদিকতা জীবনের দুটো ঘটনা বলেই এই স্মৃতিচারণ এখানেই শেষ করতে চাই।একটি হলো মহকুমা হাসপাতালের ডাক্তার আবুল কাশেম সাহেবের মামলা। দ্বিতীয়টি হলো মহকুমা হাকিমের পেশকার সফিক চৌধুরীর মানহানির মামলা। দুটোতেই আমি জিতেছিলাম। আবুল কাশেম সাহেব ছিলেন ফেণীর এলিট শ্রেণীর কাছে খুবই জনপ্রিয় ডাক্তার। কাশেম সাহেব মানুষটি ছিলেন খুবই অনৈতিক। যেকোন অন্যায় কাজ করতে তাঁর বুক কাঁপতোনা। সাপ্তাহিক ফসল এ প্রায়ই নিয়মিত তাঁর অনৈতিক কাজের খবর ছাপা হতো। কোন ধরণের হুমকি ধামকি বা চাপ আমাকে নোয়াতে পারেনি। একদিন আমাদের পাশের বাড়ির কে যেন মারামারি করে আহত হয় এবং খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমি তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। আমি ভাবি নাই যে, কাশেম সাহেব আমার উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে প্রচন্ড রেগে ছিলেন। যদি বুঝতে পারতাম তাহলে হয়ত আমি হাসপাতালে যেতাম না। তিনি আমার সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করেছেন। সময়টা ছিল সকাল এগারটার দিকে। বিকেলে জানতে পারলাম আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। মামলাটি ছিল সরকারী কর্মচারীর কর্তব্য পালে বাধা দান করা ও প্রাণ নাশের হুমকি দেয়া। বড়ই মারাত্মক মামলা। জামিন পেয়েছিলাম। আমার গ্রেফতারের কথা ঢাকার কাগজে ছাপা হয়েছে। মর্ণিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তানে ঘটনার নিন্দা করে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। তত্‍কালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী জনাব ফজলুল বারী চৌধুরী আমাকে কাশেম সাহেব সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, তিনি একজন ভাল ডাক্তার। কিন্তু মানুস হিসাবে পশুর চেয়ে অধম। মন্ত্রী সাহেব আরও জানতে চাইলেন, আমি কি চাই? আমি বলেছিলাম, অবিলম্বে ডাক্তারের বদলী চাই। মন্ত্রী সাহেব কাশেম ডাক্তারকে চট্টগ্রাম বদলী করে দিয়েছিলেন। মামলা চালাবার জন্যে প্রথম দিকে ফেণীতে আমি কোন উকিল পাইনি। সব উকিল ছিল কাশেম সাহেবের পাশে। বাধ্য হয়ে আমি মাইজদী থেকে প্রখ্যাত আইনজীবী রায় সাহেব নগেন শূরকে অনুরাধ করলাম আমার মামলা চালাবার জন্যে। তিনি রাজীও হলেন। কাশেম সাহেব বদলী হয়ে যাওয়াতে তাঁর পক্ষের সাক্ষীরা কেউ আর সাক্ষী দিতে রাজী হলোনা। তাছাড়া চট্টগ্রাম থেকে মামলা চালানো কাশেম সাহেবের জন্যে কস্টকর হয়ে পড়েছিল।শেষ পর্যন্ত দূর্ণীতির অন্য মামলায় কাশেম সাহেবের চাকুরী চলে গিয়েছিল। তিনি বেশ কিছুদিন জেলও খেটেছিলেন। তাঁর ছেলে জিয়াউদ্দিন বাবলু এরশাদ সাহেবের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর কাশেম সাহেব চাকুরী ফিরে পেয়েছিলেন এবং পেনশনও পেয়েছিলেন।সফিক পেশকার সাহেবের মামলাটি ছিলো মানহানির মামলা। তিনি ঘুষ খান এই মর্মে ফসল এর চিঠিপত্র কলামে একটি ছাপা হয়েছিল। ওই খবরের বিরুদ্ধে সফিক সাহেব মামলা করেছিলে। এক্ষেত্রেও ফেণীর উকিলরা আমার পক্ষে লড়তে রাজী হননি। আমি রায় সাহেবকেই আমার উকিল ঠিক করেছিলাম। এই মামলা পরে সফিক সাহেব প্রত্যাহার করেছিলেন।আরেকটি মামলার কথাও উল্লেখ করতে চাই। সেটা ছিল আদালত অবমাননার মামলা। এটা ছিল একটু টেকনিকেল মামলা। অজ্ঞতার কারণেই এই মামলা হয়েছিল।ফেণী কলেজের ছাত্র জয়নাল হাজারীকে প্রিন্সিপাল সফিক সাহেব থার্ড থেকে ফোর্থ ইয়ারে প্রমোশন দেওয়ায় হাজারী মামলা করেছিলো। মামলার রায় প্রকাশ করতে গিয়ে আমি ভুল করেছিল। রায় যখন ঘোষণা করা হয় তখন হাজারী ফোর্থ ইয়ারে পড়ে। কিন্তু রায়ের কোথাও ফোর্থ ইয়ার লেখা ছিলনা। লেখা ছিল থার্ড ইয়ার। মামলাটি হয়েছিল সোয়োমটো। হাইকোর্টে আমার পক্ষে মামলা পরিচালনা করেছিলেনব্যারিস্টার মওদুদ। আমি ক্ষমা প্রার্থনা করে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলাম।  

আমার প্রেম

ershadmz June 12th, 2009

ছেলেবেলা থেকেই আমার ভিতর মুরুব্বীয়ানার একটা ভাব ছিলো। স্কুলেই আমি নেতা ছিলাম। ম্যাগাজিন প্রকাশ করা, নাটক করা, সাংস্কৃতিক অনুস্ঠান করা, নানা ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করা ও অর্গেনাইজ করা ছিল আমার কাজ। শিক্ষকদের সাথে ছিল ঘনিস্ট যোগাযোগ। আমি যখন ফেণী মডেল স্কুলে পড়ি তখন আমার সাথে চার/পাঁচটা মেয়ে পড়তো। তাদের সবার নাম এখন তেমন মনে নেই। যাদের মনে আছে তাদের নাম উল্লেখ করছি। কিরণ, শেলি, রোকেয়া। কিরণ কাজী গোলাম রহমানের( মিয়া) বোন। শেলি ডাঃ ফজলুল করিমের মেয়ে। রোকেয়া রামপুর সওদাগর বাড়ির মেয়ে। গোলাম রহমানের সাথে আমার ছিল গভীর বন্ধুত্ব। ফলে তাদের বাসায় আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। ওর অনেক বোন ছিল। অনেকে মনে করতো মিয়ার বোনদের কারো কারো সাথে আমার প্রেম ছিল। আসলে তা ছিলনা। মিয়ার মা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।

যখন আমি ক্লাশ নাইনে পড়ি তখন উত্তরা গুহ ছিলেন আমার প্রাইভেট টিউটর। তিনি ছিলেন আমার পাশের বাসার বাসিন্দা। তাঁর ছিল এক অপরুপ সুন্দরী মেয়ে। নাম পুর্ণিমা। সে পড়তো ক্লাশ সিক্সে। পুর্ণিমাকে আমার খুবই ভাল লাগতো। প্রেম কিনা জানিনা। পুর্ণিমাও বুঝতো তাকে আমি খুবই পছন্দ করি। মিয়ার বোন আয়েশা বিষয়টা জানতো। আয়েশা মাঝে ঠাট্টা করতো। বিষয়টা জানতে পেরে উত্তরা বাবু পুর্ণিমাকে কোলকাতা পাঠিয়ে দেন। তখন আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র।

অবজারভারে আমার দিনগুলি

ershadmz June 11th, 2009

স্মৃতিকথা কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা বলা সত্যিই কঠিন।
তবুও স্মৃতিকথা বলতে খুবই ভাল লাগে। এখন যা বলছি তাকে
স্মৃতিকথা বলা যাবে কিনা আমার প্রশ্ন আছে।
১৯৬১ সালে আমি পাকিস্তান অবজারভারে জয়েন করি। পদবী ছিল
নবীশ বানিজ্যিক রিপোর্টার। বানিজ্যিক পাতার জন্যে রিপোর্ট করা।
ওই পাতার দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষাবিদ শামসুল হুদা সাহেব। আমি তাঁকে
স্যার বলে সম্বোধন করতাম। কারণ তিনি পেশাগত ভাবে একজন শিক্ষক
ছিলেন।এখনও তাঁকে শিক্ষক বলেই মনে করি।
অবজাভারের নিউজ এডিটর মুসা সাহেব তখন লন্ডনে প্রশিক্ষন লাভ
লাভ করছিলেন। মাহবুব জামাল জাহেদী সাহেব নিউজ এডিরের দায়িত্ব
পালন করছিলেন। অবজারের সবাই আমাকে আদর করতো। আমি
লেখাপড়া কম জানতাম বলে সবার কথা শুনতাম।সবার কাছ থেকে
শিখার চেস্টা করতাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আমি সবার প্রিয় হয়ে
গেলাম। হুদা সাহেব আমাকে আশাতীত আদর করতেন। তিনি খুব নরম
মানুষ বলেই তাঁর কাছে কাজ শিখতে পেরেছিলাম।
তখন চীফ রিপোর্টার ছিলেন শহীদুল হক সাহেব। যিনি পরে বাংলাদেশ
টাইমসের সম্পাদক হয়েছিলেন। এছাড়াও অনেক ডাকসাইটে রিপোর্টার
অবজারভারে কাজ করতেন। ওদের সাথে কাজ করতে পেরেছি বলে
আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।
তখন অবজারভারের সম্পাদক ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যাক্তি
আবদুস সালাম। মোয়াজ্জেম হোসেন বুলুর জেঠা বলে আমিও তাঁকে জেঠা
বলে ডাকতাম।অনেক রাত্রে তাঁর বাসায় ছিলামও। তখন বাসা ছিল পুরণো
নাসির উদ্দিন রোডে। আর অবজারভার অফিস ছিলো খুব কাছেই। জনসন
রোডে,বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুলের লাগোয়া।
আমার নবীশী কাটার আগেই দুবার শাস্তি হয়ে গেলো। একবার ক্যামিস্ট্রি
বানান ভুল লোখার জন্যে,আরেকবার চল্লিশ পয়সার জায়গায় চল্লিশ টাকা
লিখার জন্যে। প্রথমবার একটাকা যা বেতন থেকে কাটা হয়নি। দ্বিতীয়বার
পাঁচ টাকা। শেষ জরিমানাটা বেতন থেকে কাটা হয়েছিল। চাকরী প্রায়
যায় যায়।
এসময়ে অবজারভারের ম্যানেজিং এডিটর ছিলেন আবদুল গণি হাজারী
সাহেব। তিনি খুব মিষ্টি মানুষ ছিলেন।তাঁর কারনেই আমার চাকরীটা
যায়নি। ডাকসাইটে শ্রমিকনেতা মাহবুবুল হক প্রথমে ফেণীতে পল্লীবার্তা
প্রকাশ করেন।পরে অবজারভার গ্রুপে জয়েন করেন কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসাবে।
তিনিই আমাকে নবীশ হওয়ার সুযোগ করে
দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আমার আপন বড় ভাইয়ের মতো। তাঁর স্নেহ
মমতা ভালবাসার কথা এ জীবনে ভুলতে পারবোনা। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি
অবজারভার গ্রুপের ম্যানেজিং এডিটর ও দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক
হয়েছিলেন। পল্লীবার্তাই পূর্বদেশে রূপান্তরিত হয়।তিনি পাকিস্তান পার্লামেন্টেরও বাঘা মেম্বার ছিলেন।
ইতোমধ্যে নিউজ এডিটর মুসা সাহেব লন্ডন থেকে ফিরে এলেন।
জাহেদী সাহেব এডিটোরিয়ালে ফিরে গেলেন। নবীশ সাংবাদিক এরশাদ
মজুমদারের ত্রাহি অবস্থা। মনে হলো চাকরীটা আর থাকবেনা। বুলু
বললো এত ভয় পাওয়ার কি আছে? আমি আছি না। অবশ্য এরপরে
অবজারভারে বেশীদিন চাকরী করিনি।
এখনকার পত্রিকায় রংচং বেড়েছে, পৃষ্ঠাও বেড়েছে। মান বেড়েছে কিনা
এ ব্যাপারে আমার ভিন্নমত আছে। পত্রিকাগুলো এখন রাজনীতির মাপকাঠিতে
পরিচালিত হয়। এখন কাজ জানাটা বড় কথা নয়। কে কোন দল করে
সেটাই যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি। ৫০/৬০ সালের দিকে এ অবস্থা ছিলনা।
কাজ জানাটাই ছিল প্রধান মাপকাঠি। বামপন্থী বলে পরিচিত জাহেদী,কে জি মোস্তফা,
ওয়াহিদুল হক, জাহিদুল হক আরও অনেকে অবজারভারে কাজ
করতেন। এ ব্যাপারে মালিকের কোন মাথা ব্যথা ছিলনা। সোজা কথা হলো কাজ
জানো কিনা। এখন দলবাজী করলেই কাজ হবেনা। গ্রুপবাজীও করতে হবে।
১৯৬৯ সালের শেষের দিকে আবার অবজারভার গ্রুপে ফিরে আসি।এবার
সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে পূর্বদেশে কাজ শুরু করি। মাহবুব ভাই তখন
পূর্বদেশের সম্পাদক। মিয়া ভাই মানে এহতেশাম হায়দার চৌধুরী নিউজ
এডিটর ছিলেন। বাংলা কগজের ভিতর পূর্বদেশ তখন বহুল প্রচারিত ও
নামডাকে ভরা। এছাড়া আমি বানিজ্য পাতার দায়িত্বেও ছিলাম। পূর্বদেশে
কাজ শুরু করার ব্যাপারে একটা কাহিনী আছে বেতন নির্ধারণ নিয়ে। আমার
কাছে এটা একটা মজার গল্প মনে হয়।
নিয়োগপত্র ইস্যু করার আগে আমি চুক্তিভিত্তিক কাজ শুরু করলাম। চুক্তিটাও
ছিল মজার। চুক্তিটা আমি নিজেই ঠিক করেছিলাম। বেতন নির্ধারনের জন্যেই
এ পথ বেছে নিয়েছিলাম। ঠিক হলো ফার্স্টলিড ৫০ টাকা,সেকেন্ড লিড বা
তত্সম রিপোর্টের জন্যে ৩০ টাকা, থার্ড লিডের জন্যে ১০ টাকা। সিংগেল
কলাম হেডিং স্টোরি ফ্রি। বুদ্ধিটা ছিল মিয়া ভাইয়ের।তিনি আমাকে নিতেই চান।
এভাবে ২/৩ মাস চললো। প্রতি মাসেই আমি
খুব আরামে ১৩/১৪শ টাকা ড্র করতে শুরু করলাম। এর উপরে ছিল বাণিজ্য
পাতার জন্যে ২শ টাকা। এসব কান্ডকারখানা দেখে চৌধুরী সাহেবের চোখ
ছানাবড়া। ব্যাপারটা কি? এ কোন রিপোর্টার যে বিল করে মাসে ১৩/১৪শ
টাকা নিয়ে যায়। আবার বাণিজ্য পাতার জন্যে ২শ টাকা।
রিপোর্টারটা কে তাকে একবার দেখা দরকার। তার আগে মাহবুব ভাইয়ের
ইন্টারভিউ। সরাসরি প্রশ্ন- তুমি কত টাকা বেতন চাও।আগেই বলেছি তিনি
ছিলেন আমার আপন বড় ভাইয়ের মতো। তাই মনের ভিতর তেমন ডর ভয়
ছিলনা। বললাম দুটি ইনক্রিমেন্ট সহ সহকারী সম্পাদকের স্কেল দিতে হবে।
এরপরে চৌধুরী সাহেবের সাথে সাক্ষাতকার। ভয়ে বুক কাঁপছিলো। মাহবুব
বললেন ভয়ের কিছু নেই। সব ঠিকঠাক আছে।
নির্ধারিত তারিখে চৌধুরী সাহেবের  চেম্বারে গেলাম। সাথে মাহবুব ভাইও ছিলেন।
কোম্পানীর চেয়ারম্যান ও ডাকসাইটে আইনজীবি হামিদুল হক চৌধুরী
বাংলায় কথা বললে নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলতেন। শুদ্ধ বাংলা বলতেন না
বা বলতে পারতেন না। প্রথমে প্রশ্ন করলেন, এত বেতন দিয়া কি করবা?
বিয়েশাদী করছো নাকি? বাড়ী কোথায়? মাহবুব মিয়া বা মুসার আত্মীয়
হও নাকি?আমি কোন উত্তর দিইনি। চৌধুরী সাহেবও উত্তরের অপেক্ষায়
ছিলেন না। শেষ প্রশ্ন করেছিলেন এপয়েন্টমেন্ট পেলে এত কাজ করতে
পারবা নাকি, না সবার মতো ঢিলা দিয়া দিবা। ইন্টারভিউ শেষ, চলে
আসবো এমন সময় প্রশ্ন করলেন- ক্রেডিট বাজেটিং বোঝ। এবিষয়ে একটা
রিপোর্টিং কর। পরে বুঝতে পেরেছিলাম কেন তিনি ঐ রিপোর্টটি কেন
করতে বলেছিলেন।

আমাদের সময়ে ভুত

ershadmz June 11th, 2009

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন প্রায়ই ভুতের গল্প শুনতাম। ছোটদের জন্যে ভুতের গল্পের বই প্রায় সব বইয়ের দোকানে পাওয়া যতো। আমি তখন প্রায় নিয়মিত ভুতের গল্পের বই কিনতাম। বইয়ের দাম ছিল দুই আনা থেকে আট আনা। যাক এসবতো বইয়ের ভুতের গল্প। এবার আমি নিজের জীবনের ভুতড়ে কিছু গল্পের কথা বলছি।

১।   একবার মায়ের সাথে মামার বাড়ি গিয়েছিলাম আমি ও আমার ছোট ভাই ইসহাক। সে সময় আমার মা সুযোগ পেলেই বিকেল বেলা মামার বাড়ি যেতো। আবার সন্ধ্যার কিছু কাছাকাছি সময়ে ফিরে আসতো। মা ফিরে আসার আগেই আমি আর ইসহাক বাড়ির পথে রওয়ানা দিলাম। কিন্তু ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরতে পারলাম না। ওদিকে মাও বাড়ি ফিরে এসেছে। আমি অনেক চেস্টা করেও ইসহাককে খুঁজে পেলাম না। মা মনে করেছেন আমি ইসহাকের সাথে মারামারি করেছি। বাবা থখনও বাড়ি ফিরেননি। বাবা এলে রাত ন’টা পর্যন্ত ইসহাককে খুঁজে পাওয়া গেলো বড় মসজিদের ভিতর। সে খুব আরাম করে খুব আরাম করে ঘুমাচ্ছিল। অনেক ডকে তাকে ঘুম থেকে তোলা হলো। কেন সে মসজিদে গেলো সে ব্যাপারে কিছুই বলতে পারলোনা।

২।  আমি তখন ক্লাশ নাইনে পড়ি। থাকতাম বারির কাচারি ঘরে। স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করার জন্যেই এই ব্যবস্থা করেছিলাম। এ সময়ে আমি নিয়মিত ছবি আঁকতাম। বিশেষ করে রবীন্দ্র নাথ, নজরুল, শরত্চন্দ্র ও বিদ্যাসাগরের ছবি আঁকতে ভালবাসতাম। শরত্চন্দ্রের একটি খুব ভাল ছবি এঁকে বাঁধাই করে রেখেছিলাম। ছবিটা আমার পড়ার টেবিলের পাশে দেয়ালে টাংগানো থাকতো। হঠাত্ একদিন দেখি বাইরে থেকে দেয়ালে কে যেন তালি বাজানোর মতো আওয়াজ করছে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গিয়ে তাকে ধরতে গেলাম। দেখি কেউ নেই। এ রকম বেশ ক’দিন হওয়ার পর সবাইকে বিষয়টা জানালাম। কেউ বিশ্বাস করলোনা। রাত ন’টা দশটার দিকে এ ঘটনা ঘটতো। একদিন সবাই পাহারা দিতে লাগলো। অন্ধকার রাত। ঠিক দশটার দিকে দেয়ালে টর্চের আলো ফেলে সবাই দূরে অপেক্ষা করতে লাগলো। ঠিক সময়ে আওয়াজ হলো , কিন্তু কিছুই দেখা গেলনা। ওই আওয়াজে ঘরের ভিতরে টাংগানো শরত্চন্দ্রের ছবিটা পড়ে গেলো। আমার মেজো জেঠিমা বললেন, ছবিটার দোষ। মুসলমানের ঘরে এ রকম ছবি থাকা ভালো না। অগত্যা আমার হাতে আঁকা প্রিয় ছবিটা পানিতে ফেলে দিলাম। ঘটনাটার আজও কোন সুরাহা হয়নি।

৩।

এটা ১৯৬০ সালের ঘটনা। শিক্ষা সপ্তাহের নাটক করে আমি বাসায় ফিরছিলা। হোস্টেল ছেড়ে বাসায় কেন উঠেছিলাম তা আজ আর মনে নেই। ঢাকা কলেজ অডিটরিয়ামে নাটক মন্চস্থ হয়েছিল। অভিনয় করেছিল বুলবুল, ইকবাল বাহার চৌধুরী, কেরামত মওলা, নুরুল হক বাচ্চু সহ আরও অনেকে। আমি ছাড়া বাকীরা সবাই  সিনেমা নেমেছে। নাটক শেষে আমি নিউ মার্কেট হয়ে ইউনিভার্সিটির ভিতর দিয়ে  এসে হাইকোর্টের কাছে পড়লাম। হঠাত্‍ মনে হোল সাদা কাপড় পরা কতগুলো মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত তালি দিলাম। গাণ গাইলাম। কিছুতেই সাদা কাপড় পরা মানুষ গুলো নড়ছেনা। আমি ছিলা একেবারেই একলা। চিন্তা করছি কি করবো। সাহস করে সামনে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম সাদা মানুষ গুলো হচ্ছে হাইকোর্ট বাউন্ডারীর সাদা পিলার।

আমার ছেলেবেলা

ershadmz June 10th, 2009

১।

সব কথা এখন আর মনে নাই। এটা বোধ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা। মা আমাদের পুকুরের ঘাটলায় গিয়েছিলেন কি যেন কাজে। হঠাত্‍ আকাশে যুদ্ধ জাহাজ দেখা গেলো। মা তাড়াতাড়ি করে আমায় তার শাড়ির আঁচলে ঢেকে দীড়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। এটা ৪৩-৪৪ সালের ঘটনা হবে। আকাশে যুদ্ধ জাহাজ দেখলেই তখন সবাই পালিয়ে ঘরে অথবা গর্তে প্রবেশ করতো। জাপানীরা তখন ভারতের এ অণ্চলে আক্রমন চালাতো। যদিও পরে এ যুদ্ধে জাপানী হেরে গিয়েছিল। সেই সময়েই মার্কিনীরা হিরোশিমা নাগাসাকিতে আনবিক বোমা ফেলেছিল। ওই সময়ে বৃটিশদের সেনা ক্যাম্প ছিল সেন্ট্রাল হাই স্কুলে।

২।

সময়টা আমার স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে। ফেণী মডেল স্কুলে একজন নামজাদা শিক্ষক ছিলেন । তাঁর নাম শ্রীনাথ বাবু। খুব গুরু গম্ভীর মানুষ ছিলেন। আমাকে স্কুলে পাঠাবার আগে মা শ্রীনাথ বাবুকে আমার প্রাইভেট টিউটর ঠিক করেছিলেন। তখন আমি বছর চার হবে। যেদিন শ্রীনাথ বাবু প্রথম এলেন মা পর্দার ভিতর থেকে বললো, বাবু ছেলেটাকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। গোস্ত আপনার,হাড্ডি আমার। শুরু হলো আমার লেখাপড়া। হাতে তুলে নিলাম রামচন্দ্র বসাকের বাল্যশিক্ষা। শ্রীনাথ বাবু ছিলেন খুবই অমায়িক মানুষ। আমাকে কখনও মারেন নি। খুবই আদর করতেন। বাল্যশিক্ষার শেষ পাতায় ছিলো বিজ্ঞানী জগদীশ বাবুর গল্প আর মহারাণী ভিক্টোরিয়ার জীবনী। শ্রীনাথ বললেন তুমি যদি এই বইটা এই বছরেই শেষ করতে পারো তাহলে তোমার সাথে মহারাণীর বিয়ে হবে। বাল্যশিক্ষা শেষ করার আগেই আমি স্কুলে ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম।

৩।

১৯৪৬ সাল। এ বছরই আমি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার জেঠাত ভাই রফিক সাহেব আমাকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন ভর্তি করার জন্যে। তখন আমার বয়স ছয় হবে। স্কুলের অফিস ঘরে ভর্তির ফর্মালিটিজ শেষ করে আমাকে প্রথম শ্রেণির ক্লাশ রুমে নিয়ে গেলেন। ক্লাশ টিচার ছিলেন এক লম্বা হুজুর। মাথায় রুমীর টুপি। মুখে বেশ লম্বা দাঁড়ি। নাম মনে নেই। হুজুর ছিলে মহা কঠিন শিক্ষক। নিয়ম ছিলো যে পড়া পরেনা সে আগেই বেণ্চির উপর দাঁড়িয়ে থাকবে। ক্লাশ শেষ হলে নামবে। স্কুলের নাম ছিল ফেণী মডেল স্কুল। শ্রীনাথ বাবু এখানেই শিক্ষক ছিলেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বারক মিয়া সাহেব। তিনি অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। নিজের টাকায় স্কুল প্রতিস্ঠা করেছিলেন। সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন কাজী আবদুল গফুর। গোবিন্দপুর কাজীবাড়ির মানুষ। বারিক মিয়া সাহেবের আত্মীয়। তিনিই স্কুল চালাতেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। এই স্কুলে আমি ক্লাশ সিক্স পর্যন্ত ছিলাম। ৫২ সালে ফেণী হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম।

৪।

১৯৪৮ সালের কথা। আমি তখন ক্লাশ ফোরে পড়ি। দিনটি ছিল পাকিস্তান দিবস। মানে ১৪ই আগস্ট। ওইদিন ছাত্রদের জন্যে ট্রেন ভ্রমণ ছিল ফ্রি। কিছু না জেনেই আমি ট্রেনে উঠে পড়ে ছিলাম। সাথে কেউ ছিলনা। এখন ভাবলে মনে হয় কি দুর্দান্ত সাহস ছিল আমার। আমার এই আনন্দ ভ্রমণ ছিল বাড়িতে কাটকে না বলে। ট্রেনের শেষ স্টেশন ছিল চট্টগ্রাম। আমি নেমে পড়লাম। কিন্তু কোথায় যাব? আমার কাছে কারো কোন ঠকানা ছিলনা। বাড়ি ফিরবো কেমন তাও ভেবে পাচ্ছিলাম না। বেশ কিছুক্ষণ স্টেশনের প্লাটফরমে হাটাহাটি করলাম। তারপর কান্না। কান্না আর থামায় কে? এমন সময় স্টেশনের এক কর্মকর্তা এসে জিগ্যেস করলেন‘ খোকা তুমি কোথায় যাবে? বাড়ি যাবো। বাড়ি কোথায়? ফেণী। এখানে কেন এসেছো? জানিনা। চাঁটগাঁয়ে তোমার কে আছে? আমার জেঠা আছেন। তিনি কোথায় থাকেন? টেলিগ্রাফ অফিস। ঠিক আছে চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। আমি ভেবেছিলাম লোকটা ছেলেধরা। তাই আরও জোরে কাঁদতে লাগলাম। লোকটা জগ্যেস করলো, কাঁদছো কেন? আমি তোমাকে তোমার জেঠার কাছে পৌঁছে দেবো। আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম তুমি ছেলেধরা নাকি? লোকটা বললো, না না আমি তোমার আত্মীয় হই। সেই দয়ালু ভদ্রলোক আমাকে জেঠার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরে জানতে পেরেছিলাম উনি আমার জেঠা ফজলে আলী সাহেবের বন্ধু ছিলেন।

৫।

১৯৫০ সালের দিকের কথা। সে বছর ফেণীতে দাংগা হয়েছিল। দিন তারিক বা মাসের কথা মনে নেই। মনে হয় বছরের শেষের দিকে। তখন আমি বাবার পকেট থেকে পয়সা চুরি করতাম। সিকি আধুলী বা তার চেয়েও কম। বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা,দলবেঁধে খাওয়ার অভ্যাস আমার তখনও ছিল। তখন এক আনা খরচ করাও অনেক বড় ব্যাপার ছিল। বাবার পকেট থেকে বড় ধরণের টাকা চুরি হয়েছিল। মা আমাকে সন্দেহ করেছিলো। সত্যিই সেদিন আমি চুরি করিনি। মা বিশ্বাস করেনি। মা এসব ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন। আমাকে বেদম মার দিয়েছিলো। চুরি না করেও আমি মার খেলাম। মনে হলো এ জগতে আমার কেউ নেই। বিকেল বেলা হাঁটতে হাঁটতে  উদাস মনে দাউদপুলের দিকে গেলাম। কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। ঠক বাড়ি আর ফিরে যাবোনা। রাস্তার পাশেই দেখি এক ধুতরা গাছ। শুনেছি ধুতরা খেলে মানুষ মরে যায়। গাছ থেকে ধুতরা পাড়লাম। সেটা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আকারে ইংগিতে মাকে ধুতরা দেখাবার চেস্টা করলাম। কিন্তু মার রাগ তখনও কমেনি। তাই আমার দিকে তআর কোন নজর নেই। টগুলো কাজের লোক কেউ আমার দিকে নজর দিচ্ছেনা।

ভাবলাম, সত্যিই এবার মরে যাবো। ধুতরা ফলটাকে ছেঁচে পানিতে মিশাতে লাগলাম।মনে করেছিলাম শেষ পর্যন্ত কেউ আমাকে বাধা দিবে। কিন্তু কারো দৃষ্টি আকর্যন করতে পারলাম না। অগত্যা ধুতরার পানি আমি খেয়েই ফেললাম। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ধুতরার ক্রিয়া শুরু হলো। আমি কাপড় চোপড় খুলে লেংটা হয়ে গেলাম। হাবিজাবি বকতে লাগলাম। এক সময় হুঁশ হারিয়ে ফেললাম। পরে শুনেছি সারা রাত আমার চিকিত্‍সা চলেছে। ডাঃ সিরাজ কাকা সারা রাত আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। বেশ কয়েকদিন আমি বাড়ি থেকে বের হতে পারিনি। পরের বছর মা’তো মরেই গেলো।

আমার মা

ershadmz June 5th, 2009

মায়ের কথা বলতে আমি খুব ভালবাসি। হয়ত মাকে ছোট বেলায় হারিয়েছি তাই। মায়ের উপর লেখা আমার অনেক কবিতা আছে। আমার প্রথম বইয়ের নাম মায়ের চিঠি। এতে প্রায় ৭০টি কাল্পনিক চিঠি আছে।মা জীবিত থাকলে কি রকম চিঠি লিখতেন তারই একটি রূপ। আমার মা রামপুর পাটোয়ারী বাড়ির মেয়ে। নাম আশরাফ উন নেসা। বাবার নাম কলিমুদ্দিন পাটোয়ারী। মা’র নাম সৈয়দা নওয়াব জান বিবি। মার নানার বাড়ি আর আমার নানার বাড়ি পাশাপাশি। একটা সৈয়দ বাড়ি আরেকটা পাটোয়ারী বাড়ি। দুটোই ফেণী শহরের বিখ্যাত বাড়ি। আমার মামারা দুই জন। মকবুল আহমদ ও আজিজুল হক। খালারা পাঁচ জন। বাবার সাথে মায়ের বিয়ে হয় ১৯৩৫ সালে।বাবা তখন রেংগুন থাকতো। আমার জন্ম ১৯৪০ সালের ৮ই মার্চ( ২৪শে ফালগুন ১৩৪৬ সাল )।

মা ছিলেন বেশ লম্বা। গায়ের রং ফর্সা। লেখাপড়া কিছু জানতো। স্কুলে যাওয়ার আগে মা আমাকে বাড়িতে অংক করাতো। মা হিসাব নিকাশও ভাল জানতেন। মা খুব কড়া ছিলেন। মার মারের দাগ এখনও আমার শরীরে আছে। ১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে নিউমুনিয়া ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মা মারা যায়। তখন আমি সিক্সে পড়ি।

কি করে সাংবাদিকতায় এলাম

ershadmz May 19th, 2009

পাকিস্তান অবজারভারে নবিশ থাকার সময় জীবনে প্রথম আমি এয়েরপোর্ট
কভার করতে যাই। কেন্দ্রীয় বানিজ্যমন্ত্রী হাফিজুর রহমান সাহেব ঢাকা সফরে
আসছেন।এয়ারপোর্টে সিনিয়র সাংবাদিকরা যাচ্ছেন তাঁর সাথে কথা বলার জন্য।
আমাকে এসাইনমেন্ট দেয়া হলো। সম্ভবত এটা ছিল আমার পরীক্ষা।আমার বুক
কাঁপছিলো। কিভাবে প্রশ্ন করতে হয় আমি তাও জানিনা।সাথে রয়েছে সিনিয়র
জাঁদরেল সাংবাদিকরা।দুজনের কথা মনে আছে।একজন মর্নিং নিউজের আজাদ,
আরেকজন আজাদের চীফ রিপোরটার আশরাফ ভাই।প্রায় সবাই ইংরেজীতে প্রশ্ন
করছিলেন। আমাকে আমার চীফ রিপোরটার শহিদুল হক সাহেব অনেক পড়িয়ে
লিখিয়ে রিহারসেল দিয়েছিলেন।আমার নিজের উপর আস্থা ছিলনা। বুক বেশী বেশী
কাঁপাছিলো।আমার ভাগ্য ভালো বয়স কম হওয়ার কারনে আমি হাফিজুর
রহমান সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষন করেতে পেরেছিলাম। আমি কোন প্রশ্ন করি নাই
বলে তিনি জানতে চাইলেন কোন কাগজ থেকে গিয়েছি। বললাম অবজারভার।
তুমি কিছু বলছোনা কেন?অতদূরে কেন,কাছে এসে বস। এ গুরুত্বটা ছিল
অবজারভারের কারনে। অবজারভার তখন সারা পাকিস্তানের সেরা কাগজ।
শহীদুল হক সাহেবের রিহারসাল আমি ভুলে গিয়েছিলাম।ফলে তা কোন কাজে
লাগেনি। তখন আমার প্রিয় বিষয় ছিলো রফতানি বানিজ্যের বোনাস ভাউচার।
বিষয়টা ছিল খুবই জটিল।তাই হাফিজুর রহমান সাহেব খুবই অবাক হয়েছিলেন
প্রশ্ন শুনে। পাকিস্তান আমলে রফতানি বৃদ্ধির জন্যে ইনসেনটিভ হিসাবে ১০/১৫
পারসেন্ট হারে বোনাস ভাউচার দেয়া হতো।এই ভাউচার শেয়ার বাজারে
বেচাকেনা হতো।আমার প্রশ্ন শুনে হাফিজ সাহেব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। পাল্টা
প্রশ্ন করলেন বোনাস ভাউচার কি তুমি জানকি?আমি মাথা নেড়ে না উত্তর
দিলাম।মনে হলো আমার উত্তরে তিনি খুব মজা পেয়েছেন।সাংবাদিকদের সাথে
কথা বলা শেষ হলে তিনি আমাকে তাঁর গাড়ীতে তুলে নিয়ে সোজা সেগুন
বাগিচার বাসায় গেলেন। সিনিয়র রিপোর্টাররা অবাক হয়ে দেখলেন। আসলে তিনি
অবজারভারের সাথে কিছু এক্সক্লুসিব কথা বলতে চেয়েছিলেন।তিনি আমার জন্যে
চা দিতে বলে ভিতরে গেলেন।চা আসতে আসতে তিনিও ভিতর থেকে বারান্দায়
আসলেন।অতি আদরে অন্তরঙ কিছু কথা বললেন। বললেন লেখাটা তৈরি করে
আমাকে দেখিয়ে নিও।বিকেল চারটায় এসো। ঠিক চারটায় আমি তাঁর বাসায়
গেলাম।তিনি বিশাল বারান্দায় বসে কিছু সরকারি কর্মচারীর সাথে কথা
বলছিলেন। তখন কেন্দ্রীয় বানিজ্য সচিব ছিলেন সম্ভবত গোলাম ইসহাক খান।
আমি একশ ভাগ সিওর নই।ইনিই নাকি পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
হাফিজ সাহেব আমাকে দেখে দরাজ গলায় ডাকলেন-আসো আসো ,জাঁদরেল
কাগজের কিড রিপোর্টার। তিনি রিপোর্টটি দেখে দিলেন। মুসা ভাই রিপোর্টটি
নিজের মতো করে এডিট করলেন কাগজের পলিসি অনুযায়ী।পরেরদিন তা লীড
স্টোরি হিসাবে ছাপা হয়েছে। সাথে আমার নামও ছিল।এটাই আমার জীবনের প্রথম
লীড।প্রথম রিপোর্ট নামসহ।এরপরে হাফিজুর রহমান সাহেব ঢাকা আসলেই
আমাকে খবর দিতেন। ৬২ সালের শেষের দিকে আমি সংবাদে চলে যাই।
অবজারভার থেকে সাধারনত কেউ সহজে অন্য কাগজে যেতোনা।আমি গিয়েছিলাম
রাজনৈতিক কারনে।মাসখানেক ঢাকা থাকার পর আমাকে চট্টগ্রাম পোস্টিং দেয়া
হয়েছিলো। তখন সংবাদের সম্পাদক ছিলেন সারা পাকিস্তানের ডাকসাইটে
সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী।কি করে সাংবাদিকতায় এলাম তা একটু না
বললে আমার এ লেখাটা অসম্পুর্ন থেকে যায়।লেখালেখি ছিলো আমার রক্তে।
বাল্যকাল থেকেই আমি লিখতে ও বলতে ভালবাসতাম
সম্পাদনা প্রকাশনা ও মুদ্রণের সাথে আমার ছাত্র বয়সেই পরিচয়,
যখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিন ও দেয়াল পত্রিকা
সম্পাদনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমার গুরুজনরা। সেই থেকেই ছাপা জিনিসের
প্রতি আমার আগ্রহ। কলেজে এসেও সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়েছিলাম।
পত্রিকায় নাম ছাপানো ছিলো আমার নেশা। প্রথমে নিজের মহকুমা শহরে,
তারপরে রাজধানী ঢাকায় পত্রিকা অফিসে নিয়মিত ঘুরঘুর করা। পত্রিকায়
প্রথম কবিতা ছাপা হয় ৫৩ সালে। তখন আমি অস্টম শ্রেণীর ছাত্র।
মুকুলের মাহফিলের সদস্য হয়েছি ওই একই সালে। তারপরে খেলাঘরের সদস্য।
সাহিত্যের জন্য পত্রিকার সাথে জড়িত হওয়ার আগ্রহ আমার সব সময় ছিলো।
কিন্তু বাবার ইচ্ছা ছিলো আমি বাণিজ্য পড়ি। কেন তা জানিনা। তাই হলো।
ঢাকা এসেও বাণিজ্য পড়লাম। বাবা বললেন-চার্টার্ড একাউন্টটেন্ট হও।
কিন্তু আমি গিয়ে ঢুকলাম পত্রিকা অফিসে। পাকিস্তান অবজারভারে। ১৯৬১
অক্টোবরে। আমার পরম প্রিয় শ্রদ্ধেয় মাহবুবু ভাই বললেন পত্রিকায় কাজ
কর। কোন পত্রিকায়? কেন, অবজারভারে। আমার বুকটা কেঁপে উঠলো।
ইংরেজী কাগজ! দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে রাজী হয়ে গেলাম। সেই থেকে
এখনও পত্রিকার সাথে জড়িত আছি।
বাণিজ্য বিষয়ের লেখাপড়া কাজে লাগাবার সুযোগ পেলাম। বাণিজ্য পাতার
জন্য একজন রিপোর্টার প্রয়োজন। বাণিজ্য পাতার সম্পাদক ছিলেন তুলারাম
কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল শামসুল হুদা সাহেব। তিনি রোজ বিকেলে এসে
সম্পাদনার কাজ করতেন। টেলিফোনে খবর সংগ্রহ করে লিখতেন। তিনিই
একজন সহকারী চেয়েছিলেন। মর্নিং নিউজে তখন ফুলটাইম বানিজ্য সম্পাদক
ও রিপোর্টার ছিলো। হুদা সাহেব ছিলেন খুবই মিস্টি মানুষ । এতো ভদ্রলোক
আমাদের সমাজে এখন খুবই কম। ওই রকম মানুষের না থাকলে আমার
কাজ শিখা হতোনা এবং সাংবাদিকতায় থাকতে পারতামনা।

সংবাদে আমার সময়

ershadmz May 19th, 2009


পাকিস্তান অবজারভার-এর চাকরি ছেড়ে ১৯৬২ সালের শেষের দিকে
আমি সংবাদ-এ চলে যাই। সংবাদ-এর সম্পাদক ছিলেন শ্রদ্ধেয়
জহুর ভাই। মানে জহুর হোসেন চৌধুরী। এ সময় যুগ্ম সম্পাদক
ছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সার। তোয়াব খান ছিলেন
বার্তা সম্পাদক আর ডিএ রশীদ ছিলেন চীফ রিপোর্টার।
সত্যেন সেন ও রণেশদা ছিলেন এডিটোরিয়ালে।
জহুর ভাই ও শহীদ ভাইয়ের বাড়ী ফেনী। একজন রামনগর চৌধুরী
বাড়ীর জজ্ সাহেব সাদত হোসেন চৌধুরীর বড়ছেলে। আরেকজন
ফেণী শহরের দক্ষিণে মুজুপুর চৌধুরীবাড়ীর মাওলানা হাবিবুল্লাহ সাহেবের
বড়ছেলে। বাপেরা ডান বা মধ্যপন্থী হলেও ছেলেরা ছিলেন বামপন্থী।
তখন পুর্বপাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজে বামপন্থীদের খুব কদর ছিলো।
ছাত্র বয়সে আমি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিলাম। এ কারণে
সংবাদ-এ চাকরী করার ব্যাপারে আমার সব সময় একটা আগ্রহ ছিলো।
আমি নিয়মিত জহুর ভাইয়ের আজিমপুরা এস্টেটের ৬৪/ই ফ্ল্যাটে আসা
যাওয়া করতাম। জহুর ভাই তাঁর স্ত্রীর নামে বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটে থাকতেন।
তত্কালীন সমাজের বহু রথী মহারথীর এখানে আড্ডা ছিলো।
জহুর ভাইয়ের উত্সাহে আমি অবজারভারের নিশ্চিত চাকরী ও
নিয়মিত বেতন ছেড়ে সংবাদ-এ চলে আসি। মুল কারণ ছিলো
ঝানু সমাজতন্ত্রীদের আরও গভীরভাবে পরিচিত হওয়া।
ঢাকায় ক’দিন কাজ করার পর আমাকে চট্টগ্রামে পোস্টিং দেয়া হলো।
চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা ছিলো আমার জীবনের সুবর্ন সময়। আমি
অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পেরেছি। প্রথমে ছিলাম ডবলমুরিং।
কাস্টমসের প্রিভেনটিভ অফিসার আমিন উল্লাহ সাহেবের বাসায়। পরে
চলে আসি নজির আহমদ চৌধুরী রোডে। এই এলাকাটি ছিলো
সংবাদপত্রের কেন্দ্র। এখানে আমি আর আতিকুল আলম সাহেব একই
বাড়ীতে থাকতাম। আলম সাহেব তখন পাকিস্তান টাইমসের প্রতিনিধি।
আমাদের পাশেই থাকতেন ইত্তেফাকের মঈনুল আলম। অল্প
কিছুদুরে লাভলেনে থাকতেন অবজারভারের ফজলুর রহমান। রহমান
সাহেব ছিলেন তখন চট্টগ্রামের সবচাইতে ক্ষমতাবান সাংবাদিক। আমি
ছিলাম তাঁর একনিস্ঠ ভক্ত। প্রায় সারাদিনই আমি তাঁর সাথে থাকতাম।
রহমান সাহেব ছিলেন ব্যাচেলর। অবজারভারের ম্যানেজিং এডিটর
আবদুল গনি হাজারী তাঁর মামা ছিলেন। রহমান সাহেব বাংলা পড়তে
পারতেন না। কোলকাতায় উর্দু মিডিয়ামে লেখা পড়া করেছেন।
পূর্ব ও পশ্চিমের ডিসপ্যারিটি সম্পর্কে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত রিপোর্টের
কথা আমি আজও ভুলতে পারিনা।
স্বাধীনতার পর রহমান সাহেব লন্ডন চলে যান। তিনি কিছুদিন আগে
মারা গেছেন। তাঁকে ইসলামাবাদে দাফন করা হয়েছে। শুনেছি, মঈনুল আলম
এখন কানাডার টরেন্টোতে থাকেন। চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক অনেকেই
বেঁচে নেই। এ সময় চট্টগ্রামের ডিসি ছিলেন কাজী জালাল আর এসপি
ছিলেন খালেক সাহেব। এ সময়েই জামাল খান রোডে প্রেসক্লাব
প্রতিস্ঠিত হয়। আমার যতদূর মনে পড়ে ১৯৬৪ সালের শেষের দিকে
ফিল্ডমার্শাল আইউব খান প্রেসক্লাব ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ভুল
হলে আগামীতে কেউ শুধরিয়ে দিলে বাধিত হবো। ভবন তৈরীর অর্থের জন্য
চট্টগ্রামের ধনীদের কাছে আমরা যেতাম এ কথা মনে আছে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইতিহাস রচিত হয়েছে কিনা জানিনা। প্রথম কমিটির
নাম বর্তমানের ক্লাব নেতাদের কাছে আছে কিনা তাও জানিনা।
প্রসংগত ফেনী প্রেসক্লাবের কথা উল্লেখ করার সুযোগ নিচ্ছি। আমি ছিলাম
এই প্রেসক্লাবের প্রতিস্ঠাতা সম্পাদক। আমাকে সাহায্য করেছিলেন
মহকুমা হাকিম সাইফ উদ্দিন আহমদ আর মহকুমা জনসংযোগ অফিসার
রশীদ সাহেব। প্রেসক্লাবের বর্তমান ভবনটি বন্দোবস্ত দিয়েছিলেন সাইফউদ্দিন
সাহেব। টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের
সত্যসিংহ। আমি নিশ্চিত এ তথ্যগুলো বর্তমান ক্লাব নেতাদের কাছে নেই।
তথ্য জানার আগ্রহও তাদের আছে বলে মনে হয়না।ভাগ্যভালো মুরুব্বীরা
পুর্বপাকিস্তান প্রেসক্লাবের প্রতিস্ঠা লগ্নের কথা লিখে রেখে
গিয়েছিলেন। আরও ভাগ্য ভালো লিখিত কাগজগুলো সহজে পাওয়া
গিয়েছিলো। তা না হলে কি যে কেলেংকারী হতো! বলা হতো অমুকনেতা
এটা প্রতিস্ঠা করেছেন। অমুক অমুকসাহেব সাক্ষী আছেন। তবে আনন্দের
খবর(!) এখন সারাদেশে তৃণমূল সাংবাদিক ও তৃণমূল প্রেসক্লাব প্রতিস্ঠিত
হচ্ছে। তৃণমূল সাংবাদিকতার বিকাশের জন্য আমাদের এনজিওরা জান
কোরবান করছেন। আশা করা যায় আগামী দশসালা পরিকল্পনায় দেশের
প্রতিটা ইউনিয়নে(৪৬০০) একটি করে প্রেসক্লাব প্রতিস্ঠিত হবে।
সাংবাদিকের পরিমাণ নিযুত পেরিয়ে যাবে।
চট্টগ্রামে আমার সাংবাদিকতা জীবনের কথা বলতে গিয়ে মূল বিষয়
দুরে সরে গিয়েছি।
চট্টগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক বন্দর নগরী। হাজার বছর ধরে এ বন্দরে
আসতো আরব বণিকেরা। পরে আসতে শুরু করেছে ইউরোপীয় বণিকরা।
প্রাচীন ভারতের উপকুলে বিদেশী বনিকদের বসতি শুরু হয়েছে
হাজার বছর আগে। বিশেষ করে আরব মুসলমানরা বসতি স্থাপন
করেছে বেশী। পাকিস্তান আমলেও এই বন্দরের অপরিসীম গুরুত্ব ছিলো।
বন্দর নগরীতে সাংবাদিকতা করে আমি অর্থনৈতিক সাংবাদিকতায়
বিশেষ ভাবে লাভবান হয়েছি। এ অভিজ্ঞতা আমার সারাজীবন কাজে
লেগেছে। আমি মুলত একজন ইকনমিক রিপোর্টার। সাংবাদিকতার শুরুই
করেছি ইকনমিক রিপোর্টার হিসাবে। তখন রিপোর্টিং বিট তেমন
শক্তিশালী ছিলনা। একজন রিপোর্টার বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করতো।
অবজারভারে ইকনমিক ও স্পোর্টস রিপোর্টিং ডেস্ক খুবই শক্তশালী ছিলো।
প্রথম দিকে আমি চাল ডাল তেল নুন ডিম ও কাঁচা বাজার নিয়ে রিপোর্ট
করতাম। প্রেসক্লাবে সবাই আমাকে চালডালের রিপোর্টার বলতো। রাজনীতি
আর স্পোর্টস রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব ছিলো খুব বেশী। সময়ের পরিবর্তনে
ইকনমিক রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। বলা যায় কিছুটা সীমার
বাইরে চলে গেছে বা চলে যাচ্ছে। এখন এক কোম্পানীর কাছে আরেক
কোম্পানী চিঠি লিখলে সেটাও খবর।
চট্টগ্রামে গিয়ে আমি বন্দর জাহাজ কাস্টমস ক্লিয়ারিং ফরওয়ার্ডিং
ইন্ডেন্টিং এলসি লিম ফরওয়ার্ড বায়িং এন্ড সেলিং শিপিং
স্টেভেডরিং আউটার এন্করেজ লাইটারেজ সহ আরও বহু বাণিজ্যিক বা
অর্থনৈতিক বিষয়ক শব্দ শিখেছি, যা আমার পেশার কাজে বিশেষ
উপকার করেছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার তখন ঢাকা চেম্বারের চেয়ে শক্তশালী ছিলো। করাচী চেম্বারের
সাথে টেক্কা দিয়ে চলতো। ৬২-৬৩ সালের দিকে চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতা�
ছিলেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ও হেদায়েত হোসেন চৌধুরী।৬৯-৭০ সালের�
দিকে ছিলেন ইদ্রিস সাহেব। আমি তখন ঢাকায় পুর্বদেশে কাজ করছি।
পুর্ব ও পশ্চিমের ইকনমিক ডিসপ্যারিটি নিয়ে পুর্বদেশ তখন সবচে বেশি
সোচ্চার ছিলো। বৈষম্য নিয়ে রিপোর্ট করা ছিলো আমার প্রধান কাজ।
বৈষম্য নিয়ে পাকিস্তান পার্লামেন্টে বাঘের গর্জন করতেন পুর্বদেশের
সম্পাদক মাহবুবুল হক। একবারতো ডাকসাইটে নেতা শেখ সাহেব চলে
গিয়েছিলেন এয়ারপোর্টে মাহবুবুল হককে সম্বর্ধনা দেয়ার জন্য। প্রসংগের
জন্য পূর্বদেশে চলে এসেছি। আমি সংবাদে ছিলাম ৬২ সালের শেষ থেকে
৬৪ সালের শেষ নাগাদ।
৬৩ সালের একটি মজার গল্প বলি। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গবর্ণর ছিলেন
আবদুল মোনেম খান। ৭১ সালে তিনি রাজনীতি থেকে নির্বাসিত অবস্থায়
স্বাধীনতা বিরোধী হিসাবে নিহত হন। ওই বছর দেশের দক্ষিণান্চলে
প্রচন্ড ঘুর্নিঝড় হয়। এতে কয়েক লাখ মানুষ মারা যায়। প্রতিদিন
খবরের কাগজে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধির খবর ছাপা হচ্ছে। অবজারভারে
ছাপা হচ্ছে আড়াই হাজার, ইত্তেফাকে পাঁচ হাজার, আমি নতুন মানুষ
কোন দিকে যাই? অগত্যা একদিন খবর পাঠালাম পন্চাশ হাজার
নিহত। গবর্ণর সাহেব চাটগাঁ এলেন। ডিসির মাধ্যমে খবর পাঠালেন
দেখা করার জন্য। সকালেই দেখা করতে গেলাম। গবর্ণর সাহেব
জিগ্যেস করলেন নাশতা করবেন না জলযোগ করবেন। উত্তর দেয়ার
আগেই জানতে চাইলেন বাড়ী কোথায়। বললাম নোয়াখালী। ওঃ তাহলেতো
নাশতা করতে পারেন। আপনাদের সম্পাদক সাহেবের বাড়ীতো
নোয়াখালী। তিনিতো আর নাশতা করেন না। শহীদুল্লাহ কায়সার
সাহেবের বাড়ীওতো নোয়াখালী। তিনিতো নামজাদা মাওলানা সাহেবের
ছেলে। আপনার আব্বাজান কি করেন । জ্বী,ব্যবসা। আমাকে তুমি বললে
খুশী হবো। কিন্তু গবর্ণর সাহেব তুমি বললেন না।
আপনি রিপোর্ট পাঠিয়েছেন জলোচ্ছাসে পন্চাশ হাজার লোক মারা গেছে।
নিশ্চই বেশীর ভাগই মুসলমান হবে। শরীয়ত মোতাবেক লাশগুলো দাফন
করতে হবে। কি বলেন?
জ্বী।
লাশের তালিকাতো নিশ্চই আপনার কাছে আছে।
আমি চুপ করে মাথা নীচু করে বসে আছি।
বললেন হেলিকপ্টারে করে ডিসি সাহেবকে নিয়ে আমি উপদ্রুত এলাকায়
যাবো,আপনিও সাথে চলুন।
আসলে আমার কাছে তেমন কোন তথ্য ছিলোনা। ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছে
পাঁচ হাজার,অবজারভারে আড়াই হাজার। আমি নতুন মানুষ,কোন
কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। তাই একটি হিসাব বানিয়ে খবর পাঠিয়ে
দিয়েছিলাম ‘পন্চাশ হাজার মৃত’।
মনে মনে ভাবলাম,দেখি এবার ফজলুর আর মঈনুল কি করেন।
শেষ পর্যন্ত ওদের কিছু হলোনা,আমি ফেঁসে গেলাম। ছোটলাট সাহেব
পন্চাশ হাজারের হিসাব চাইলেন।
মঈঁনুল আর ফজলুরের সাথে দেখা হলে ওরা হাসতেন।

স্মৃতিকথা

মুক্তিযুদ্ধ ২

৩০শে মার্চ  সদরঘাট  থেকে লঞ্চে আমরা ঢাকা ছাড়লাম। ভাল করে মনে নেই। মনে হচ্ছে পরদিন সকালের দিকে আমরা চাঁদপুরের মতলব গিয়ে পৌঁছালাম। হাটার পথে রণিকে জয়নাল বা পান্না কোলে নিয়েছে। মতলবের একজন বিখ্যাত মানুষের বাড়িতে আমরা আশ্রয় পেয়েছিলাম। মেজবানের নামটা এখন এই মূহুর্তে মনে পড়ছেনা। খুব খারাপ লাগছে। রাতে আমরা সেই বাড়িতে ছিলাম। সকালে নাশতা করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। রিকশা করে চাঁদপুর স্টেশনের দিকে গেলাম।যদি ট্রেন পাওয়া যায়। ভাগ্য ভাল ট্রেন পাওয়া গিয়েছিল। ওই ট্রেনে লাকসাম পৌঁছালাম। ওখানে গিয়ে আবার সবকিছু অনিশ্চিত পড়লো। ট্রেন ছাড়বে কি ছাড়বেনা তা কেউ বলতে পারছেনা। প্রায় সন্ধ্যার দিকে জানা গেল একটা ট্রেন ফেণী পর্যন্ত যাবে। সেই ট্রেনেই আমরা রওয়ানা দিলাম। ৩১ শে মার্চ আমরা ফেণী পৌঁছালাম। সকালে না বিকালে এখন ঠিক মনে নেই। সারা শহরে মানুষের ভিতর আতংক। খাজা সাহেব তখনও ফেণীতে। তারিখ মনে নেই। যতদূর মনে ৩রা এপ্রিল ফেণিতে পাক বাহিনী শেলিং করে। ওর পরেই মানুষ দলে দলে শহর ছাড়তে শুরু করে। আমরা সবাই আলাদা হয়ে গেলাম। চাচীআম্মা ও আমার বোনেরা সবাই পাঠান নগর চলে গেল। আমি শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও অন্যান্যদের নিয়ে প্রথমে রামপুর নানার বাড়ী গেলাম। নানার বাড়ি শহরের কাছে হওয়ায় আমরা দক্ষিণে মেজো খালার বাড়ী গেলাম। সেখানে এক রাত কাটাবার পর সকালবেলা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম কে কোথায় যাবো।

আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যরা আহমদ পুর চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা মানে আমি ইসহাক রণি ও আমার স্ত্রী কুঠিরর হাট বিষ্ণুপুর হাই স্কুলে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।বিষ্ণুপুর থাকার সময় কিছু যুবককে সাথে নিয়ে আমি নিয়মিত একটি হাতে লেখা বুলেটিন প্রকাশ করতাম।বিবিসি শুনে আমরা আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় কার্বণ কপি করে ওই বুলেটিন বিলি করতাম। ওই বুলেটিন আশে পাশের হাট বাজারে বিলি হতো। বেশ কিছুদিন থাকার পর খবর পেলাম ফেণীতে পাক বাহিনী ঢুকে পড়েছে। যেকোন সময়ে কুঠির হাট চলে আসতে পারে। কুঠিরহাট ছেড়ে দিয়ে আমরা আহমদপুর গেলাম। আরও অনেক পরিবার সে বাড়িতে ছিল। থাকার অসুবিধা থাকলেও খাওয়ার অসুবিধা ছিলনা। বেশ ভালই দিন কাটছিলো। হঠাত্‍ একদিন আমার চাচা শ্বশুর ও স্থানীয় নেতা বেলায়েত সাহেব জানালেন জামাইকে এখানে বেশীদিন রাখা যাবেনা। বাজারে নানা কানাঘুষা হচ্ছে। যেকোন সময় যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে।

সম্ভবত মে মাসের শুরুতে আমাকে আহমদ পুর ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হলো। আমার সাথী হলো আমার ছোট ভাই সালু। সব কথা এখন আর ভাল করে মনে নেই। যতদূর মনে পড়ছে, মুন্সীবাড়ি থেকে আমরা প্রথমে আমার খালতো বোন নুরজাহানের বাড়িতে গেলাম। নুরজাহানের স্মামী রাজ্জাক সাহেব খুবই ভাল মানুষ ছিলেন। সে বারিতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা আবার রওয়ানা দিলাম। বিকেলের দিকে কাতালিয়া ফকির হাটে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়েই মহা বিপদে পড়লাম। আমাদের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় আমাদের কাছে ডেকে নিলেন। আমরা আশা করেছিলাম তিনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। ভদ্রলোক পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিলেন। এক ধরণের গোঁড়া মানুষ। কিছু না বুঝেই, বিনা স্বার্থেই ওই কাজ করছিলেন। তিনি আমাদের ডেকে এক চা দোকানে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমাদের পরিচিত আরও অনেক লোক ছিলো। ওই লম্বা কোর্তা পরা ভদ্রলোক আমাদের ভারতের দালাল ও পাকিস্তানের শত্রু বলে গালাগাল করছিলেন। অন্যান্য আত্মীয়রা ওই ভদ্রলোককে অনুরোধ করলেন এই বিপদের সময় কোন ঝামেলা না করার জন্যে।

৬ দফার প্রেক্ষিত

ershadmz August 12th, 2009

১৯৬৬ সালে বংগবন্ধু শখ মুজিবুর রহমান অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্যে ৬ দফা পেশ করেন। ৬ দফা মুলত ছিল পাকিস্তানকে একটি কনফেডারেটিং রাস্ট্রে পরিণত করার প্রস্তাব ছিল। সেই ৬ দফা নিয়েই জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করেছেন ৭১ সালের ২৪শে মার্চ পর্যন্ত। বাংগালী পুঁজিপতি ও বাংগালী আমলারা ৬ দফা প্রস্তাব তৈরী করেছিলেন। একথা সত্যি যে পাকিস্তানের সর্বযক্ষেত্রে বাংগালীরা পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানীরা বিষয়টি বুঝতে চেস্টা করেনি। অথবা এ ব্যাপারে আদৌ তাদের আগ্রহ ছিলনা। ৬ দফার কারণেই আওয়ামী লীগ ৭০ সালের নির্বাচনে বাংগালীদের একক দলে পরিণত হয়। ওই নির্বাচনে জামাত ছাড়া অন্যান্য দল আংশ গ্রহণ করেনি। মাওলানা ভাসানী নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন। মাওলানা সাহেবের ন্যাপ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে কম পক্ষে ২০ টা সিট পেতেন।

২৫শে মার্চের আগে

ershadmz August 9th, 2009

পাকিস্তানের সামরিক সরকার যদি ২৫শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের উপর আক্রমন না চালাতো তাহলে আজ ইতিহাস অন্যভাবে লিখা হতো। জেনারেল ইয়াহিয়া ছিলেন পাকিস্তানের সবচে বড় মাতাল সামরিক শাসক। তাকে উসকে দিয়েছে জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচন অনুযায়ী জুলফি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ছিলেন সারা পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। সে হিসাবে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হওয়ার কথা শেখ সাহেবের। ইয়াহিয়া শেখ সাহেবকে প্রধান মন্ত্রী হিসাবে সম্বোধনও করেছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলেন জুলফি। তিনি বললেন একদেশ দুই প্রধান মন্ত্রী। জুলফির এই বক্তব্যের মাধ্যমেই পাকিস্তান ভেংগে যাওয়ার ইংগিত পাওয়া গেছে। ভুট্টো কি চায় তাও স্পস্ট হয়ে গেলো। ইয়াহিয়া ঢাকায় আসলেন বংগবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে আলাপ করার জন্যে। ইয়াহিয়া যখন ঢাকায় আসেন তখন সারা পূর্ব পাকিস্তানে আগুন জ্বলছে। ১লা মার্চ থেকেই শখ সাহেবের ডাকে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। শেখ সাহেব প্রতিদিন নতুন নতুন ফরমান জারী করছিলেন। সেই ভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের সরকার চলছিল। ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লাখো মানুসের জনসভায় ঘোষনা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২০শে মার্চ থেকে শেখ সাহেবের সাথে ইয়াহিয়ার যে আলোচনা শুরু হয়েছিল তার ফলাফল কি তা দেশবাসী কখনই জানতে পারেনি। শেখ সাহেব নিজেও তা কখনও দেশবাসিকে জানানো প্রয়োজন মনে করেননি। ২৫শে মার্চের সামরিক অভিযানের আগেই শেখ সাহেব পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কাছে ধরা দেন। কাউকে কিছু না জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে চলে গেলেন।পাকিস্তানীদের মহাভুল ছিল তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোভাব বা সেন্টিমেন্ট বুঝতে পারেনি। ফলে সামরিক অভিযানকে এই অঞ্চলের মানুষ একেবারেই সমর্থন করেনি। সামরিক অভিযানের পর ভারতের ভূমিকা কি হতে পারে সামরিক জান্তা মোটেই আঁচ করতে পারেনি। প্রায় কোটি লোক ভারতে চলে গিয়েছিল। ভারতের বিশ্বব্যাপী প্রচারের ফলে বিশ্ব জনমত ভারতের পক্ষে চলে গিয়েছিল। ১৬ই ডিসেম্বরের পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় পার্লামেন্টে বলেছিলেন,হাজার সালকা বদলা লিয়া। যারা ইতিহাস পড়েন বা এই উপমহাদেশর ইতিহাস জানেন তারা ইন্দিরা গান্ধীর ভাষনের সারমর্ম বুঝতে পেরেছেন। ওই ঐতিহাসিক ভাষনের মাধ্যমে মুসলমানদের ব্যাপারে ভারতের পররাস্ট্র নীতিরও প্রকাশ ঘটেছে। ভারতে মুসলমানদের প্রথম বিজয় ঘটেছে ৭১১ সালে মুহম্মদ বিন কাসেমের মাধ্যমে।

পরে হাজার সালের দিকে মুসলমানরা দিল্লীর ক্ষমতা লাভ করে। সেই শাসন ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত চলে। ১৮৫৮ সালে ইংরেজরা দিল্লীর ক্ষমতা দখল করে। এই দখলদারী ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলে। চতুর ধুর্ত ও শিয়াল প্রকৃতির ইংরেজরা ভারতীয় কংগ্রেসের সহযোগিতায় ভারতকে বিভক্ত করে দুটি দেশ গথণ করে। একটি মুসলমানদের জন্যে ও অপরটি হিন্দুদের জন্যে। মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দু টুকরা হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান শ্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তর হয়। এক হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন মুসলমান সেনাপতি হিন্দু সেনাপতির কাছে আত্মসমর্পন করে। ওই কারণেই ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন ‘হাজার সাল কা বদলা লিয়া’।

২।

এখন আবার ভারতের শাসকরা অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখছেন। তারা স্বপ্ন দেখছেন আফগানিস্তান থেকে কম্পুচিয়া পর্যন্ত প্রাচীন ভারতবর্ষ প্রতিস্ঠা করা যায় কিনা। এই উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিয়ে ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে মিডিয়ার ৮০ ভাগই ভারতের স্বার্থে কাজ করে। গুজব রয়েছে ভারত বাংলাদেশের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক জগতে মাসে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে। বেশীর ভাগ বুদ্ধিজীবী নিজেদের বাংলাদেশী মনে করেনা। ওদিকে ভারত শ্লোগান দিচ্ছে বিশ্ব বাংগালী এক হও। আবার সাবেক স্বাধীন সার্বভৌম বংগদেশ গঠণেও ভারতের আপত্তি আছে।

মুক্তিযুদ্ধ

ershadmz July 26th, 2009

৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে আমি অবজারভার ভবনে ছিলাম। তখন আমি পূর্বদেশের সিনিয়র রিপোর্টার। বিকেল বেলা বেরিয়েছিলাম মানু মুন্সির মটর সাইকেলে করে শহরের অবস্থা দেখার জন্যে। শহরের মুড ছিল খুবই মেঘলা। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড চলছে। হোটেল কন্টনেন্টালে গিয়েছিলাম অবস্থা বুঝার জন্যে। ওখানে গিয়ে শুনলাম জুলফিকার আলী ভুট্টো কিছুক্ষণ পরেই ঢাকা ছেড়ে যাবেন। তখন রাত এগারটা। হোটের লবিতে পরিচিত বাংগালী গোয়েন্দারা বললেন, এত রাতে এখানে কি করছেন? অবস্থা ভাল নয়। তাড়াতাড়ি চলে যান। হোটেল থেকে বেরিয়ে ইউনিভার্সিটির ভিতর দিয়ে আবদুল গণি রোড হয়ে অবজারভার ভবনে পৌঁছালাম। তখন সাড়ে এগার বা পৌনে বারটা বেজে গেছে। কারফিউ জারী হয়েছে সম্ভবত রাত বারটা থেকে।শেখ সাহেবের সাথে জেনারেল ইয়াহিয়ার আলোচনার কি হলো কেউ কিছু তা বুঝতে পারছেনা।  দিনের বেলায়ই মাহবুব ভাই বলেছিলেন, রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার জন্যে। মাহবুব ভাই বুঝতে পেরেছিলেন আলোচনা ভেংগে গেছে।

রাত বারোটার পর দৈনিক বাংলার( তখন দৈনিক পাকিস্তান) মোড়ে ট্যান্ক দেখা গেলো। যতদূর মনে পড়ে, ট্যানম্কের ছবি তোলার জন্যে মানু মুন্সী ক্যামেরা ক্লিক করেছিল। ফ্ল্যাসের আলো দেখেই সৈনিকরা অবজারভারকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে অবজারভারের জানালার কাঁচ ভেংগে পড়ে। সবাই ভয়ে এদিক ওদিক ছুটতে থাকে এবং টেবিলের নীচে মাথা লুকায়। মুসা সাহেব একচোট মানু মুন্সীকে গালিগালাজ করলেন। ওই তোলা ছবিই পরে টাইম ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল বলে শুনেছি। ২৫শে মার্চ থেকে ২৭শে মার্চ সকাল সাতটা পর্যন্ত কারফিউ জারী ছিল।আমরা অবজারভার অফিসেই আটকা ছিলাম। রাত হলে ছাদের উপর গিয়ে দেখতাম শহরের কোথায় কোথায় আগুন জ্বলছে। খবর পেলাম রাজারবাগে পুলিশ লাইনের আশে পাশে আগুন লেগেছে।

২৭ মার্চ সকালে কয়েক ঘন্টার জন্যে কারফিউ শিথিল করা হয়। আমরা সবাই অফিস থেকে বেরিয়ে নিজ নিজ বাসার দিকে রওনা দিলাম। আমি রিকসা না নিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম।মনে হলো দৌড়ালে রিকসার আগে বাসায় যেতে পারবো। বাসায় গিয়ে অনেক্ষণ দরজায় ধাক্কা দিলাম।অনেক্ষণ পর তোমার মা দরজা খুললো। তোমার মা মনে করেছিল আমি আর বেঁচে নেই।তাছাড়া আমার যা স্বভাব ছিল। আমার মনে হয়েছিল রাজারবাগের আগুনে আমাদের বাসাও পুড়ে গিয়েছে। তখন তোমার বয়স দুই বছরের মতো।রাজধানী কিছুটা নরমাল হলে দিনের বেলা কারফিউ বেশ কয়েক ঘন্টার জন্যে শিথিল করা হলো।

৩০শে মার্চ আমরা ঢাকা ছেড়ে ফেণীর জন্যে রওনা হলাম। আমাদের সাথে ছিলেন আবু জাফর পান্না ও জয়নাল কাকা। কিভাবে কেমন করে ফেণী পৌঁছাবো তার কিছুই ঠিক ছিলনা। ঢাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ পায়ে হেটে রিকসা করে গ্রামের দিকে ছুটে চলেছে। সবার মনে ভয়।পথে আর্মি থামায় কিনা। ধরে নিয়ে যায় কিনা।

তোমাদের মা

ershadmz July 11th, 2009

নাজিয়া আখতার। বাবার নাম শামসুল হুদা। মায়ের নাম খায়ের উন নেসা। দুজনই এখন আর জগতে নেই। দুজনেরই কবর সোনাগাজীর আমিরুদ্দিন মুন্সী বাড়ির কবরস্থানে। তোদের নানীর বাবার বাড়ি মাতুভুঁইয়া। আর নানার বাড়ি আমিরুদ্দিন মুন্সীবাড়ি। এই বাড়িটি ফেণী জেলার বিখ্যাত বাড়ি। তোমাদের মায়ের ফেণী শহরের বাড়ি মাস্টার পাড়ায়। যে বাড়িতে রণির জন্ম হয়েছে ১১ই সেপ্টেম্বর ভোর আজানের সময়।একজন পেশাদার নার্স এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তোমাদের মায়ের সাথে আমার বিয়ে হয় ১৯৬৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। সন্ধ্যা ৭টার সময় আমি বর সেজে একটি জীপে করে মাস্টারপাড়া যাই। তখন অঝোরে বৃস্টি হচ্ছিল। জীপটা ছিল ফেণীর প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য খায়েজ আহমদ সাহেবের।( খাজা আহমদ নয়)। তখন তিনি সবে বিএ পরীক্ষা দিয়েছেন। আমাদের বাসর রাত্রিটি তেমন আরাম দায়ক ছিলনা। আমাদের পুরাণো ঘরটার পেছনের বারান্দায় যে কামরাটি ছিল সেটি ছিল আমাদের বাসর ঘর। সে ঘরটি এখন আর নেই। বাংলা সন ১৩৪২ সালে বাবা এটি তৈরী করেছিলেন। ভিটি পাকা টিনের ঘরটি তখনকার দিনের আধুনিক ঘর ছিল। বাসর ঘরের কামরায় আমরা মাত্র একদিন ছিলাম। পরে বাইরের আলাদা ঘরে চলে এসেছিলাম। সাপ্তাহিক ফসলের প্রথম অফিস ছিল এখানেই।একটা ফোনও ছিল।নাম্বার ৯৯। যেখানে পরে তোমার মা পাকা ঘর তৈরী করেছিলেন। এটা এখন এল প্যাটার্ণের একটা বড় ঘর। আমি ফেণী থাকতেই তোমাদের মা কিছুদিন ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজে লেখাপড়া করেছিলেন। পরে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে চলে এসেছিলেন। আমিও ঢাকা চলে এসেছিলাম ৬৯ সালের শেষের দিকে। ফসল তখনও ফেণী থেকে প্রকাশিত হতো।আমি দৈনিক পুর্বদেশে সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে যোগ দেই। সেই থেকে ঢাকায় আছি। প্রথমে আমরা ছিলাম শান্তি নগরে তাজুল চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায়। উনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন।

আমার মা

ershadmz July 4th, 2009

আমার মায়ের নাম আশরাফ উন নেসা। মা ছিলো বাবার চেয়ে লম্বা ও ফর্সা। লেখাপড়া কিছু জানতেন বলে মনে হয়। মা আমাকে অন্ক করাতো। মনে আছে ক্লাশ ফোরে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় মা আমাকে অংক দেখিয়ে দিতো। পারিবারিক হিসাব নিকাশেও মা ছিলো খুবই পারদর্শী। সংসারের আয় কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে মা’র ভাবনার শেষ ছিলোনা। ৫১ সালে মা যখন দুনিয়া ছেড়ে চলে যায় তখন আমরা ভাইবোন ছিলাম ৫জন। সবার ছোট ছিলো মনি। ওর আসল নাম এখন আর মনে নেই। মা মারা যাওয়ার পর মনিকে আমরা কাতালিয়ার খালার বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। সেখানেই সে মারা যায় বছর খানেক পর। মা’র বাবার নাম কলিমুদ্দিন পাটোয়ারী। রামপুর পাটোয়ারী বাড়ি।নানা ছিলেন বেশ লম্বা। মামা খালারাও ছিলেন লম্বা। কিন্তু আমার নানী ছিলেন বেটে। নানীর ভাই সেকান্দর নানাও লম্বা ছিলেন। আমার দুই মামা ছিলেন। বড় মামার নাম মকবুল আহমদ ও ছোট মামার নাম আজিজুল হক। মা মারা যাওয়ার পর ছোট মামাই আমাদের খোঁজ খবর নিতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছোট মামা আমাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ছোট মামার ছেলে হারুন আমাদের খোঁজ খবর নেয়।

রাজনীতির হাতেখড়ি

ershadmz July 3rd, 2009

৫০ সালের দাংগার বেশ আগে আমি মাস্টারপাড়ার রবীন্দ্র পাঠাগারের সদস্য হয়েছিলাম। সেখানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আমির হোসেন কাকা। তিনি তখন মেট্রিক পরীশার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাঠাগারের পরিচালনায় ছিলে ফেণী কলেজ ও হাইস্কুলের বামপন্থী চিন্তাধারার শিক্ষকরা। ওই পাঠাগারেই আমি না বুঝেই বামপন্থী ধারার ছোটদের বই পড়তে শুরু করি। ওখানেই আমি পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকতে শিখি। হাজী মহসিনের ছবি এঁকে পুরস্কার পেয়েছিলাম। ৫১/৫২ সালের দিকে খাজা আহমদ সাহেব আমাকে ‘ছোটদের অর্থনীতি’ পড়তে দিয়েছিলেন। খাজা সাহেব তখন তাকিয়া বাড়ির একটা ঘরে থাকতেন। তখন তাঁর সংগ্রাম নামে একটা সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। তখনকার মুরুব্বীরা খাজা সাহেবের কাছে যাওয়া পছন্দ করতেন না।

৫৩/৫৪ সালের দিকে আমি ফেণী মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। ওই সালেই আমি বারিক মিয়া সাহেবের স্কুলে ধর্মঘট করানোর অভিযোগে গ্রেফতার হই। পরে আমার বাবা মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন।

১৯৫০ এর দাংগা

ershadmz July 3rd, 2009

১৯৫০ এ আমি ফেণী মডেল স্কুলে পড়ি। এর আগে স্কুলের কথা বলেছি। স্কুলটি বারিক মিয়া সাহেবের স্কুল বলে পরিচিত ছিল। এই দাংগায় আমাদের পাড়া উকিল পাড়ার বাসিন্দা হিন্দু উকিল ও শিক্ষকরা ভারতে চলে গিয়েছিলেন। আমাদের পড়া মোটামুটি খালি হয়ে গিয়েছিলো। আমদের পুকুরের পুব পাশের বাড়িটি ছিলো মহেশ উকিলের। দক্ষিণে ছিলো সতীশ মোক্তারের বাড়ি। উত্তরে ছিলো মাখন কাকাদের বাড়ি। মাখন কাকারা দাংগার পর উকিল পাড়া ছেড়ে ডাক্তার পাড়া চলে গিয়েছিলেন।

দাংগার সময় মাখন কাকারা সবাই আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শুনেছি দাংগায় অংশ নিয়েছিল রামপুর পাটোয়ারী বাড়ির লোকেরা। এর পেছনে নেতা ছিলেন প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা খাজা আহমদ সাহেব। কিন্তু দাংগার পর তিনিই প্রথম শান্তি কমিটি গঠণ করেন। দাংগার কারণে ফেণীর স্কুল কলেজ সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই দাংগায় ফেণীর বিখ্যাত উকিল গুরুদাস কর ও তাঁর ছেলে হরেন্দ্র কর মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের বাড়িঘরেও আগুন দেয়া হয়েছিল। ওই দাংগায় ফেণীর ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। এখন উকিল পাড়ায় কোন হিন্দু বাসিন্দা নেই। ওই দাংগার কারনেই ফেণী হাইস্কুলের হিন্দু শিক্ষকরা আস্তে আস্তে চলে গিয়েছিলেন।

পত্রিকা প্রতিস্ঠা

ershadmz July 1st, 2009

১।  সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম বেসরকারী কৃষি কাগজের আমিই প্রতিস্ঠাতা। পত্রিকার নাম ফসল। এটা প্রতিস্ঠা করি ১৯৬৫ সালের ১৭ই মার্চ। এর আগে আমি অবজারভার ও সংবাদে সাড়া চার বছর চাকুরী করি। ৭০ সাল পর্যন্ত ফসল ফেণী থেকে প্রকাশিত হয়। ৭২ সালে এটা ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ৭৫ সালে সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয় অন্যান্য সব কাগজের সাথে। আবার প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সহযোগিতায় ফসল সারা দেশ ছড়িয়ে পড়ে। পত্রিকাটি এখন দৈনিক। কিন্তু প্রকাশিত হয়না।

২। ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক রিপোর্টার প্রকাশ করি। এটি ছিল একটি নাগরিক কাগজ। ট্যাবলয়েড সাইজে আট পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হতো। সেই সময়ের খুবই পপুলার কাগজ ছিল সাপ্তাহিক রিপোরটার। এখন এ কাগজটিও বন্ধ।

৩। ১৯৮৪ সালে মুজিবুল হায়দার চৌধুরীর সহযোগিতায় ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলী নিউজ প্রকাশ করি। পত্রিকার এডিটর ছিলেন ওবায়দুল হক সাহেব। আমি ছিলাম ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ম্যানেজিং এডিটর। চৌধুরী সাহেব ছিলেন কোম্পানীর চেয়ারম্যান। কাগজটা বেশ কিছুদিন টিকে থাকলেও আমি মাত্র কয়েক মাস ছিলাম।

৪।১৯৯৬ সালে নিউনেশন ছেড়ে দিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাহাবুদ্দিন সাহেবের সহযোগিতায় দৈনিক রিপোর্টার প্রাকাশ করি। আমি ছিলাম সম্পাদক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর। এখানেও আমি বেশীদিন টিকতে পারিনি। কোম্পানী তিন মাস চালিয়ে কাগজটি বন্ধ করে দেয়। আমার ধারনা সাহাবুদ্দিন সাহেব এ কাজটি করেননি। আবুল হাসেম নামের তাঁর একজন কর্মচারী কাগজ দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন। এই আবুল হাসেমই কাগজ বন্ধের উসকানি দিয়েছিল। লোকটা যে ভাল নয় তা সাহাবুদ্দিন সাহেব বহুপরে জানতে পেরেছিলেন।

সংগঠণ

ershadmz June 30th, 2009

১।  সংগঠন করা আমার প্রিয় কাজ ছিল। বল্যকালেই আমি আমার এলাকা উকিল পাড়ায় পাঠাগার স্থাপন করি। নাম ছিল ‘শিল্প ও শ্যামলী’। আমিই পাঠাগারের প্রতিস্ঠাতা , আমিই প্রধান নির্বাহী। বন্ধুরা আমার চাপে পড়ে দুই একটা বই দিয়েছিল। পাঠাগারটি ছিল আমাদের কাচারী ঘরে। একটা ছোট আলমারি আর কিছু চেয়ার। এগুলো ঘর থেকে নিয়েছিলাম।পাঠাগারটি বেশীদিন চলেনি।

২।   ফেণী হাই স্কুলে গিয়ে দেয়াল পত্রিকা বের করার জন্যে স্যারদের উত্‍সাহিত করলাম। সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এলেন আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক রামপুরের আবদুস সাত্তার স্যার।আমাদের পত্রিকার নাম ছিল ‘আলো’। স্যার ছিলেন প্রকাশনা কমিটির সভাপতি। আমি ছিলাম সম্পাদক। পত্রিকাটি খুবই পপুলার ছিল।আমার বন্ধু কবি শামসুল ইসলাম ছিলো সহকারী সম্পাদক।

৩। এক সময়ের ফেণীর খ্যাতনামা সংগঠন সৃজনী সংসদের আমি ছিলাম প্রতিস্ঠাতা। এখন সংগঠণটি নেই। আমি ফেণী থাকলে এটা বন্ধ হতোনা। সৃজনী সংসদ ছিল ফেণীর শিক্ষিত মানুসের সংগঠণ। যারা ফেণী ক্লাবে যেতে চাইতোনা বা যেতে পারতোনা তাদের জন্যই ছিল সৃজনী সংসদ।

৪।    ফেণী প্রেসক্লাবেরও আমি প্রতিস্ঠাতা সম্পাদক ছিলাম। ফেণীর এসডিও আনিসুজ্জামান ও এসডিপিআরও রশীদ খানের আন্তরিক সহযোগিতায় এ ক্লাব প্রতিস্ঠিত হয়। ফেণীতে তখন বেশ কিছু সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। আমি ছিলাম সাপ্তাহিক ফসলের সম্পাদক। আমি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ও প্রতিস্ঠাতা সদস্য। এর মুল উদ্যোক্তা ছিলেন অবজারভারের ফজলুর রহমান, মর্ণিং নিউজের আবদুর রহমান, এপিপির নুরুল ইসলাম, ইত্তেফাকের মঈনুল আলম। তখন চট্টগ্রামের ডিসি ছিলেন কাজী জালাল ও এসপি ছিলেন খালেক সাহেব। আইউব খান ক্লাবের উদ্বোধন করেছিলেন।

৫। জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিদের সংগঠণ কবিতাপত্রেরও আমি প্রতিস্ঠাতা। এবার এই সংগঠনটি সাত বছরে পড়লো। ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক কবিতা পরিষদের পুরস্কার পাওয়ার পর দেশে ফিরে আমি এই প্রতিস্ঠান প্রতিস্ঠা করি। কবিতাপত্র এখন জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিদের প্রাণ। প্রতি মাসের শেষ তারিখে ক্লাবে কবিতা পাঠের নিয়মিত আসর অনুস্ঠিত হয়। এই তারিখে কবিতাপত্র নামে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয়। এতে প্রায় ৩০টি কবিতা ছাপা হয়। প্রখ্যাত গীতিকার কেজি মোস্তফা কবিতাপত্রের সম্পাদক।

  • দিনপন্জী

    • অগাষ্ট 2017
      সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
      « মে    
       123456
      78910111213
      14151617181920
      21222324252627
      28293031  
  • খোঁজ করুন