যেভাবে দেখেছি বংগবন্ধুকে

বংগবন্ধুকে যেভাবে দেখেছি / এরশাদ মজুমদার

বাংলাদেশে সমালোচনাকে বিরোধীতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সমালোচনা প্রায়ই দেখা যায়না। এ ছাড়া সমাজ এখন একেবারেই দ্বিধা বিভক্ত। আপনি আমার পক্ষে থাকলে দেশ প্রেমিক,না থাকলে নন। বুদ্ধিজীবী কবি সাহিত্যিক শিল্পী ও দার্শনিকগণ একেবারেই দ্বিধা বিভক্ত। দেশের প্রশ্নে এখন কোথাও একমত নেই। পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের ব্যাপারে ১৯৭০ বাংলাদেশের সব মানুষ একাট্টা ছিলো। ফলে ৭০ সালের নির্বাচনে সব মানুষ নৌকায় ভোট দিয়েছিল। নৌকা ছিল তখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের একমাত্র প্রতীক। আমি নিজেও ইকনমিক ডিসপ্যারিটির উপরে নিয়মিত লিখতাম। এটাই ছিল আমার মূল পেশা ও নেশা। সরকারী কর্তারাও আমাদের সমর্থন ও সাহায্য করতেন। ৭০ সালেই বংগবন্ধু এ অঞ্চলের একচ্ছত্র অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। পাকিস্তান অবজারভার ও পূর্বদেশ ছিল বংগবন্ধুর বক্তৃতার প্রধান তথ্য সরবরাহকারী সংবাদপত্র। এ দুটি কাগজই ছিল তখনকার দিনে ডিসপ্যারিটি বা পূর্ব পশ্চিমের অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রধান মুখপাত্র। পূর্বদেশের সম্পাদক মাহবুবুল হক ছিলেন জাতীয় সংসদে প্রধান বক্তা। ডিসপ্যারিটির ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর দলমত নির্বিশেষে কোন দ্বিমত ছিলনা। একটি বিষয় সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল যে পশ্চিমারা পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে শোষণ করতো। শুরুতেই গোলমাল ছিল ভাষা নিয়ে। এ ব্যাপারে উভয় অঞ্চলের কিছু প্রভাবশালী নেতার ভ্রান্ত চেতনা ছিল। তারা মনে করতেন মুসলমানদের ভাষা উর্দু হওয়া উচিত। পাকিস্তান ভাংগণের যাত্রা তখনি শুরু হয়েছিল। এ ভ্রাননি।ন্ত চিন্তাকে শোধরাণোর কোন চেষ্টাই নেতারা করেননি। ৭০ সালে এসে শোষিত পূর্ব পাকিস্তানী বাংগালীদের ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটে নির্বাচনের মাধ্যমে। বংগবন্ধু হয়ে গেলেন সারা পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচিত নেতা।
আমার সাথে দেখা হলেই বংগবন্ধু বলতেন আরও বেশী বেশী করে ডিসপ্যারিটির কথা লেখ। তিনি মাঝে মাঝে আমাকে কিছু তথ্যও দিতেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ অনেক বেড়ে যায়। দেশের প্রধাননেতা, প্রধানমন্ত্রী ও রাস্ট্রপতি হওয়ার পরও তাঁর সিকিউরিটি ও প্রটোকল তেমন কঠোর ছিলনা। পরিচিত জনের সাথে খুব সহজেই দেখা করতেন। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্যে তাঁর দুয়ার সব সময় খোলা ছিল।সবচেয়ে বেশী ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল মুসা ভাই, ফয়েজ ভাই, মুকুল ভাই ও গাফফার ভাই। এদেরকে তিনি আপদ বিপদ মসিবত বলতেন। স্বাধীনতার পর এই তিনজনকে তিনি বড় বড় চাকুরী দিয়েছেন। গাফফার ভাই যখন বিদেশে যান তখন বংগবন্ধু পুরো টাকা দিয়েছিলেন। এই টাকা যোগাড়ের জন্যে জন্য ব্যান্কের কাছে গিয়েছিলাম আমি। তখন জনতা ব্যান্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন খায়রুল কবির ভাই। তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের বন্ধু ও মুরুব্বী। এক সময় সাংবাদিক ছিলেন। খুবই নামকরা পরিবারের সন্তান। সাংবাদিকদের উপকার করাই ছিল তাঁর কাজ। কবির ভাইয়ের সাথে বংগবন্ধুরও খাতির ছিল। লন্ডনে জনতা ব্যান্কের শাখায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক জন সংযোগ কর্তার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। গাফফার ভাই সেই যে লন্ডন গেলেন আর ফিরে আসেননি। মূলত তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীর চিকিত্‍সার জন্যে।
দশই জানুয়ারী যেদিন বংগবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন সেদিন আমি পূর্বদেশ পত্রিকার চীফ রিপোর্টার ছিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে তিনি সরাসরি জনসভার মঞ্চে এসে দাঁড়ান। তিনি ছিলেন খুবই আবেগাপ্লুত। এমনিতেই তিনি ছিলেন খুবই আবেগী। তাঁর হৃদয় ছিল সমুদ্রের মতো। এই আবেগের কারণে বড় শাসক হয়ে উঠতে পারেননি। তখনকার পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। অর্থনীতি ছিল ভংগুর। যাঁরা কাছে যেতে পারতেন তাঁরা সবাই ছিলেন নানা ধরণের প্রার্থী। বিশেষ করে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশী সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। আমাকে একদিন বললেন,তুই কোন দরখাস্ত আনিস নি। আসলে অভিমান করে বলেছেন। আমি খুব সাহস করে বলেছিলাম, এভাবে দিতে থাকলে রাস্ট্রের আর কিছুই থাকবেনা। তিনি বললেন, তুই বল আমি কি করবো। আমিতো না বলতে পারিনা। সবাই যেভাবে কান্নাকাটি করতো তাতে তিনি না করতে পারতেন না। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এদেশের কৃষক শ্রমিক ও ছাত্ররা। সুযোগ পেয়েছেন আমলা, রাজনীতিক ও নব্য ব্যবসায়ীরা।এমন কি যে সকল রাজনীতিকের বিরুদ্ধে নানা ধরণের অভিযোগ ছিল তাঁদেরকেও তিনি গোপনে সাহায্য করেছেন। সে সময়ের রাজনীতিকরা ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব দিতেন। নামজাদা রাজনীতিক সবুর খান সাহেব ও শাহ আজিজ সাহেবকে তিনি সাহায্য করেছেন বলে বহুল প্রচারিত।
একবার আতাউর রহমান সাহেবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম,আপনারা এতজন উকিল মোক্তার,ডাক্তার, জমিদার জোতদার রাজনীতিতে কেমন করে পিছিয়ে পড়লেন। কেমন করে সকলকে পিছনে শেখ সাহেব সামনে এগিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, তুমি খুব ভাল প্রশ্ন করেছো। দেখো, শেখ সাহেব ছিলেন একজন ফুলটাইম রাজজনীতিক। বড়দের চেয়ে তরুণ ও নিবেদিত প্রাণ। সাহসও ছিল আমাদের সবার চেয়ে বেশী। এ কারণে মাওলানা সাহেব তাঁকে খুবই পছন্দ করতেন। মাওলানা সাহেব বলতেন,শেখ মুজিব দলের শ্রেষ্ঠ সাধারন সম্পাদক। সকল অবস্থায় প্রস্তুত। আমরা আমাদের পেশার কারণে দলের জন্যে তেমন সময় দিতে পারতামনা। দলের কাজে তিনি সব সময় ভাসানী সাহেবের নির্দেশ মেনে চলতেন। যা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। সাহসের কারণে তিনি যেভাবে বলতে পারতেন তা আমরা পারতাম না। তাঁর ভাষাও ছিল জনগণের মনের ভাষা। তাঁর বলার ভংগী ছিল সমুদ্রের উত্তাল তরংগের মতো। সেই তরংগের তালে মানুষ দোলা খেতো। এভাবেই তিনি দলের কর্মীদের মন জয় করেছেন।
আইউব খান যখন দলীয় রাজনীতির উপর থেকে বিধি নিষেধ তুলে নিলেন তখন দল রিভাইব করা নিয়ে দ্বিমতের জন্ম হলো। শেখ সাহেব আওয়ামী লীগকে রিভাইব করলেন। সে সময়ে অনেকেই তা করেন নি। ।রাজনীতির মাঠে তিনি হয়ে উঠলেন প্রধান চরিত্র। অন্যদের দল করতে বিলম্ব হয়ে গেলো। শেখ সাহেব একাই দলকে নিয়ে মাঠে নামলেন এবং এগিয়ে গেলেন। সে সময়ে অনেক নেতা দল রিভাইব করতে রাজী হয়নি। তখন আমি অবজারভারে নবীশ হিসাবে কাজ করছি। চিন্তার জগতে আমি আমেরিকার রাজনীতি বিরোধী ছিলাম। দল হিসাবে মাওলানা ভাসানী সাহেবের দল ন্যাপকে সমর্থন করতাম। পরে প্রমানিত হয়েছে বংগবন্ধুর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দল পরে কার্যক্রম শুরু করে। ইতোমধ্যে সারাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিস্তৃতি লাভ করে। আওয়ামী লীগ পূর্বপাকিস্তান ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে।
এরপরে শেখ সাহেব পূর্বপাকিস্তানের স্বার্থ সমর্থন করে ছয় দফা কর্মসূচী প্রকাশ করেন। চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। বাম চিন্তা ধারার লোকেরা প্রচার করতে লাগলো ছয় ধফা সিআইয়ের তৈরি করা কর্মসূচী। তখন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র রাজনীতিতে বাম চিন্তার প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল। আজকের মন্ত্রী মতিয়া মেনন ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা। চীন ও রাশিয়া পন্থী অনেক ছাত্রনেতা বর্তমান কেবিনেটে আছেন। হয়ত তাদের দৃষ্টিতে আ
ওয়ামী লীগ একটি মধ্যপন্থী প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল।
সকল বাধা বিপত্তির মুখেও শেখ সাহেব পিছপা হননি। পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি পুঁজির মালিকেরা শেখ সাহেবকে সমর্থন দিতে লাগলো। বাংগালী বেশ কিছু আমলা শেখ সাহেবের চিন্তাকে সমর্থন দিতে থাকলো। এই সময়েই বাংগালী জাতিস্বত্তার বিকাশ শুরু হয়েছে। পাকিস্তান নামক রাস্ট্রের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য খুবই স্পস্ট হয়ে উঠেছিল। পূর্ব পাকিস্তান সকল ক্ষেত্রেই শোষিত হচ্ছে এটি স্বীকৃতি লাভ করলেও ইসলামাবাদ তেমন কোন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়নি। ৪৭ সালে ছিল অখন্ড ভারতের মুসলমানদের জন্যে আন্দোলন ছিল অধিকার আদায়ের। মুসলমানরা ছিল সবচেয়ে বেশী শোষিত। ভারত বিভক্তির মূল কারণ ছিল মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। তখন সংখ্যাত্বত্তের ভিত্তিতে কোন সমাধান মুসলমানরা রাজী হয়নি। কিন্তু কংগ্রেস কিছুতেই রাজী হয়নি। মোগল আমলে যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল তাও যদি কংগ্রেস মানতো তাহলে ভারত অখন্ডই থাকতো। একই ভাবে ইসলামাবাদ পূর্বপাকিস্তানের জনগণের ন্যায্য দাবী না মানার ফলে পাকিস্তান ভেংগে গেলো। এমন কি শেখ সাহেব জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা মানলেও পাকিস্তান ভাংতো না। উল্টো পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংগালীদের উপর সামরিক অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে ও বাড়িগর জ্বালিয়ে দেয় । ফলে বাধ্য হয়ে বাংগালীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়। অপরদিকে বংগবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে রাস্ট্রদ্রোহিতার মামলা চালু করে। এর আগেও আইউব খান তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা যড়্যন্ত্র নামে একটি রাস্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিল। যা উনসত্তুরের উত্তাল গণ আন্দোলনের সময় সরকার প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এমন কি সে আদালতও বন্ধ হয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু কালক্রমে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতায় পরিণত হন। যদিও বিষয়টা ছিল সকল প্রকারের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছিল এটা বাংগালীদের উপর শোষণ। এদিক থেকে বিশ্লেষণ করলে বাংগালীদের অবিসম্বাদিত নেতা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ফলে একাত্তুরের যুদ্ধ বাংগালী অবাংগালীর যুদ্ধে পরিণত হয়। প্রতিবেশী ভারত বাংগালীদের এ যুদ্ধে আর্থিক সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন এগিয়ে দিয়েছে। ভারত ৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান ধ্বংসের জন্যে কাজ করে যাচ্ছিল। সে ইচ্ছা তাদের পূর্ণ হয়েছে ৭১ সালে বাংলাদেশ নামক রাস্ট্রের বিকাশের মাধ্যমে। উপমহদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যের ও পরিবর্তন হলো। পাকিস্তান ভাংগার রাজনীতিতে ভূট্টো প্রধান ভুমিকা পালন করেছে। তাকে সমর্থন দিয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী,পাকিস্তান সেনাবাহিনী। যে বাংগালী মুসলমান মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছে আর পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেছে সেই বাংগালী মুসলমানদের পাকিস্তানীরা দেশদ্রোহী বানিয়েছে। পাকিস্তান ভাংগার ষোলয়ানা দায়িত্ব ভুট্টো ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর।
জনগণের প্রিয়নেতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি কোলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং দলের জন্যে কাজ শুরু করেন। কিন্তু তত্‍কালীন মুসলীম লীগ নেতারা তাঁদের কায়েমী স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখনও ঢাকায় ফিরে আসেননি। আসাম মুসলীম লীগের সভাপতি মাওলানা ভাসানী ঢাকায় ফিরে এসে দলের সাথে সহযোগিতা করতে চাইলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে মাওলানা ভাসানী মুসলীম লীগের আসল কর্মীদের নিয়ে দলকে সংগঠিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। শেখ সাহেব তখন মাওলানা সাহেবের নেতৃত্বে রাজনীতির মাঠে নামলেন। পুরো ৪৮ সাল মাওলানা সাহেব ও শেখ সাহেব সারা পূর্ব পাকিস্তান চষে বেড়ালেন। জনসাধারনকে উজ্জীবিত করলেন গণ মানুষের দাবী আদায়ের ব্যাপারে। শেষ পর্যন্ত ৪৯ সালের ২৩শে জুন পুরাণো ঢাকার রোজ গার্ডেনে গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন ডেকে আওয়ামী মুসলীম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।
সারা দেশে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের ভিতর নতুন দলের সাড়া পড়ে গেল। সরকার পন্থী মুসলীম লীগ নেতারা যাদের বেশীর ভাগই ছিলেন কর্মী বিবর্জিত তারা কোন ধরনের সমঝোতা না করে নিপীড়নের পথ বেছে নিলেন।শুরু হলো জেল জুলুম অত্যাচার। কর্মী বিহীন রাজধানী ভিত্তিক সরকারী লীগের মাওলানা ভাসানীকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা ছিলনা। খুব অল্প সময়ে আওয়ামী মুসলীম লীগ জনগণের দলে পরিণত হলো। সেই দলই ৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রণ্ট গঠন করে মুসলীম লীগকে চিরতরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিদায় করে দিল।
সেই নির্বাচনে শেখ সাহেব ছিলেন মাওলানা ভাসানীর ছায়া সংগী। মাওলানা সাহেব নিজেই বলেছেন, আমার দলের সাধারন সম্পাদকদের ভিতর শেখ মুজিব ছিল সবচেয়ে সেরা। সে ছিল সবচেয়ে বেশী নিবেদিত।

রাজনৈতিক কারণে দুজনের পথ আলাদা হলেও অন্তরে দুজনেই এক ছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর শেখ সাহেব নিয়মিত মাওলানা সাহেবের খবর নিতেন। কাপড় চোপড় ও অষুধ পত্র পাঠাতেন। গোপনে দুজনের ভিতর আলোচনাও হতো। একবার তো সকল প্রটোকল ভেংগে কাউকে না বলে সন্তোষে চলে গিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে সে খবর বাংলাদেশ অবজারভারের রহিম ভাই প্রকাশ করে দিয়েছিলেন।বংগবন্ধুকে যারা নিয়মিত কাছে থেকে দেখেছেন তাঁরা সবাই জানেন তিনি খুবই আবেগী নরোম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি নিজেকে কখনই শাসক হিসাবে দেখেন নি বা ভাবেননি। ৭২ সালে তাঁর দুয়ার ছিল সবার জন্য খোলা। সে সুযোগ নিয়ে সবাই যেতো তাঁর দুয়ারে সাহায্য প্রার্থী হয়ে। নানাজনের আবদার, নানা বাহানা। সাংবাদিকেরা নিয়েছে সবচেয়ে বেশী সুযোগ সুবিধা। এখনও নিচ্ছে। তখন দলমত নির্বিশেষে সবাই সুযোগ নিতো। এখন শুধু দলীয় তালিকাভুক্তরা নেয়। এখনতো সবকিছুই বিভক্ত। আমি একবার তাঁকে বলেছিলাম, এভাবে যে বিলিয়ে দিচ্ছেন, এটাতো আপনার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। কেন এভাবে বিলিয়ে দিচ্ছেন। তিনি খুব আবেগ ভরা কণ্ঠেই বলেছিলেন, ওদের কান্নাকাটি দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনা। লোকজন ছিলো অত্যন্ত সুযোগ সন্ধানী। বংগবন্ধুর আবেগকে তারা কাজে লাগাতো।
যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন স্বাধীন দেশ। হাজারো সমস্যা। সে সময়ে সবদিক সামাল দেওয়া কঠিন ছিল। তবুও শেখ সাহেব নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী পরিস্থিতির মোকাবিলার চেষ্টা করেছেন। তখন তেমন কোন বিরোধী দল ছিলনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তাঁর নিজের ছেলেরা আলাদা হয়ে নতুন রাজননৈতিক দল গঠণ করে। যার নাম ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। সংক্ষেপে জাসদ। এই দলই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখনতো পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন রকম। চীন ও মস্কোপন্থীরা আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসাবে রাজনীতি করছেন। বংগবন্ধুর সময় নিয়ে অনেকেই সামালোচনা মূলক বই লিখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব তখন তুংগে ছিল। দলের লোকেরা তাঁর সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে। সমাজতন্ত্রের কথা বলা হলেও তাঁর কর্মীরা কেউই ওই দীক্ষায় দীক্ষিত ছিলেন না।(চলবে)

লেখক: কবি ও কলামিস্ট
ershadmz@gmail.com

  • দিনপন্জী

    • নভেম্বর 2018
      সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
      « অক্টো.    
       1234
      567891011
      12131415161718
      19202122232425
      2627282930  
  • খোঁজ করুন