দশকন্যা ( উপন্যাস)

নাসরিন চৌধুরী
___________________

আসল নাম কেউ জানেনা। সে কখনও বলেনা। ঢাকায় তৃতীয় লিংগের আখড়ায় বা বস্তিতে থাকে। সামাজিক পরিচয় হিজড়া। পড়ালেখাও আছে কিছুটা। মেয়েলী স্বভাব। নিজেই নিজের নাম রেখেছে চুমকি। বয়স তেমন বেশী নয়। তেরো কি চৌদ্দ। আমি হাতে পাঁচশ টাকার একটি নোট গুজে দিয়ে বললাম, তোমার সাথে কথা আছে। আমি একজন লেখক। চলো একটা চায়ের দোকানে বসে কথা বলি। চুমকি বললো শুধু কথা বলার জন্যে পাঁচশ টাকা। না, বিশ্বাস হয়না। সোজাসুজি বলেন আর কিছু করবেন কিনা। আর কিছু মানে? আপনি শিশু নাকি? বুঝেননা। বুঝাইয়া কও। হেই কাম করবেন নাকি? করলে চলেন। না না ওসব কিছুনা। আরে চলেননা। শরমের কি আছে? আগে কোনদিন করেন নাই? বিয়া করছেন নাহি? করেছি। বউতে মন বসেনা?
এসব কথা ছাড়াে। কাজের কথায় আসো। আমি তোমাকে নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখবো। একটা বই লিখবো। তাহলে চুমকি নাম দিবেননা। ছবিও দিবার পারেবেননা। নাম দেন পার্বতী। এতো হিন্দু দেবীর নাম। তয় কি হইছে। আমার কোন অসুবিধা নাই। আমারে একটা বই দিয়েন। কাছে আইসা বসেন, একটা সেলফি তুলি। সমস্যা আছে নাকি?
না, সমস্যা কিসের। একটা কেন, দশটা তোল। আমি লেখক মানুষ। কত জায়গায় যেতে হয়। কত ছবি তুলতে হয়। মাগিগো লইয়া কিছু লিখছন? লিখেছি। অনেক আগে। এখন কিছু লিখবেন? যদি লেখেন, আমি সাহায্য করতে পারমু। এক হাজার টাকা দিবেন। সব কাজ করতে পারবেন। জোয়ান কালে নিশ্চয়ই খাইছেন। এবার তোমার জীবনের কথা বলো।
দু:খের গল্প আর কত কমু। অনেকবার অনেক খানে কইছি। আমি এক নাম করা মানুষের সন্তান। তাঁরা রাজধানীতেই থাকেন। আমিও সেখানে বড় হইছি। তারপর একদিন মা বাপকে ছাইড়া এগো দলে ভিড়া গেছি। বছর পাঁচেক হইলো এদের লগে আছি। ওদের মতো মতো কথা কই, ওদের মতো চলি।
ওরা কি তোমাকে বের করে দিয়েছে? না, বের করেনি। আমাকে লইয়া পরিবারের ভিতর নানা ফাছাদ লাইগা থাকতো । বাপজান আমাকে দেখতে পারতোনা। তিনি সব সময় আমাকে বের করে দিতে চাইতেন। আমাকে খুব ভালবাসতেন। তিনি চাইতেন আমাকে পড়ালেখা করাতে। ভাইয়েরাও চাইতো। হিজড়া সমাজকে কয়েকবার খবর দিয়েছেন। আমার মা বাধা দিয়েছেন। ভাইয়েরাও সাপোর্ট দিয়েছে মাকে। ছাত্রী হিসাবে আমি খুব ভালো
ছিলাম। বাবা কিছুতেই রাখবেন না। শেষ পর্যন্ত আমার ভাগ্য হিজড়া সমাজে। মায়ের সাথে এখনও দেখা হয়। টাকা দিয়ে যান। ওই টাকা দিয়ে আমার বেশ চলে। কিন্তু রাস্তায় বের হতে হয় হিজড়া সমাজের কারণে। মা আমার জন্যে খুব কান্নাকাটি করে। মার সাথে আমার নিয়মিত দেখা হয়। একটা ভাল রেস্টুরেন্টে দেখা হয়। মা চিন্তা করছেন আমাকে পড়ালেখা করাবেন। কোন একটা হোস্টেলে ব্যবস্থা করবেন। আমিও চিন্তা করছি পড়াশোনা করবো। সরাসরি এসএসসি পরীক্ষা দেবো। যদিও আমি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। মা বলেছে, সরাসরি এসএসসি পরীক্ষা দিবো। আমি ইংরেজী বাংলা পড়তে পারি। পড়ালেখা করে আমি তৃতীয় লিংগ নিয়ে কাজ করবো। এর একটা স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
এদের ইতিহাস পড়বো। এটাতো একটা দেহগত সমস্যা। কিন্তু এরাতো মানুষ। চিকিত্‍সা বিজ্ঞানে এর সমাধান নিশ্চয়ই আছে। না থাকলেও তারা মানুষের পূর্ণাংগ অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে। তোমার সাথে কথা বলে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি তোমাকে সব ধরণের সাপোর্ট দেবো।
আমার আর্থিক সাপোর্টের প্রয়োজন নেই। আপনি নৈতিক সাপোর্ট দিলেই চলবে। আমি কদিনের মধ্যেই একটা হোস্টেলে উঠে যাবো। মা সব ব্যবস্থা করছেন। ভাইয়েরাও মাকে সাপোর্ট দিচ্ছে। আপনার নাম্বারটা রেখে যান। আমি যোগাযোগ রাখবো।
হিজড়ারা তোমাকে সহযোগিতা করবে?
করবে। ওরা আমার ভালো চায়। ওদের আমি সব বলেছি। ওরা সামাজিক মর্যাদা চায়। আমি তাদের সেই মর্যাদায় সম্মানিত করবো।
এদের কি কোন ধর্ম আছে?
এরা সবাই মুসলমান ঘরের মেয়ে। কিন্তু হিন্দু নাম নিয়ে চলে। অনেকেই বাসায় বা ডেরায় নামাজ রোজা করে। অনেকের সাথে গোপনে মা বাবার যোগাযোগ আছে। এরা ভিক্ষা করে জীবীকা নির্বাহ করে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই জোর করে টাকা আদায় করে। রাস্তাঘাটে পথচারীদের অপদস্ত করে। অফিস আদালত থেকে মাসোহারা আদায় করে। অনেকেই যৌন জীবন কাটায়। যেসব পুরুষ তাদের কাছে যায় তাদের নানা ভাবে তুষ্ট করে।
তুমি কি কখনও এসব কাজ করেছো?
একেবারে করিনি তা বলবোনা। বাধ্য হয়ে করেছি। কেঁদেছি। মার কথা মনে পড়েছে। বাপকে অভিশাপ দিয়েছি। আমিতো একটা ভদ্র পরিবারের মেয়ে। আমি মেয়ের মতো জীবন যাপন করি। আমার বুক বড় হচ্ছে। মুখে কোন দাঁড়ি মোচ নেই। আমার ঠোঁট খুবই নরম। আমার উরু মেয়েদের মতোই। আমার শুধু লিংগ নেই। আমার মেয়ে হতে খুব ইচ্ছে করে। মা চেয়েছিলেন গাইনী ডাক্তারের সাথে আলাপ করতে। বাবার বাধার কারণে পারেননি। বাবা কিছুতেই আমাকে রাখতে চাননি। আপনি একবার গভীর ভাবে ভাবুন। আমার কি অপরাধ। খোদা আমাকে সৃষ্টি করেছেন। এটাতো খোদার কাজ।
মা একদিন এসে আমাকে নিয়ে গেলেন এক হোস্টেলে। সেখানকার তত্বাবধায়ক ম্যাডাম আমাকে অনেক আদর করলেন। বললেন, কোন চিন্তা করোনা, আমি ব্যক্তিগত ভাবে তোমার দেখাশোনা করবো। তো
মার সামান্যতম অসুবিধা হবেনা। তুমি হোস্টেলে থেকেই পড়ালেখা করবে। কেউ তোমাকে বিরক্ত করবেনা। তোমার জন্যে আমি কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ করবো। তাঁরা তোমাকে ইংরেজী ও অংক পড়াবেন।তোমার মা এসএসসির সব বই কিনে আনবেন।
এবার তোমার কথা বলো। আমি ম্যাডাম খুবই খুশী হয়েছি। আমি সম্মানিত বোধ করছি। ম্যাডাম হোস্টেলের কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে।
না, কেউ তোমাকে ডিস্টার্ব করবেনা। সে ব্যবস্থা করেছি। তুমি খুব সিরিয়াসলি পড়ালেখা করো। দুই বছরের মধ্যেই তোমাকে পরীক্ষা দিতে হবে। তুমি প্রাইভেট পরীক্ষা দিবে। আমি সার্টিফাই করবো। তুমি আমার জন্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।তোমাকে শিক্ষিত করে তোলা আজ থেকে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। তুমি সাধনা করবে।আমি নিশ্চিত তুমি বিজয়ী হবে। হোস্টেল থেকে খুব কম বের হবে। যখন বের হবে তখন আমাকে জানাবে। আমি সব ব্যবস্থা করবো। এখন থেকে তোমার্ ড্রেস হবে ঢোলা শার্ট, জিন্সের প্যান্ট আর হিজাব। থেতোমাকে খুবই স্মার্ট হতে হবে। পুরাণো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করবেনা, রাখবেনা। ওরা করতে চাইলে আমার নাম্বার দিও। আমি ওদের বুঝিয়ে বলবো।
ম্যাডাম, ওদের ক্ষ্যাপানো যাবেনা। আদর করলে ওরা পোষ মানে। একটু যত্ন করতে হবে। অনাদরে অবহেলায় ওরা একটু বেয়াড়া হয়ে গেছে। ওরা চায় আমি পড়ালেখা করি।ম্যাডাম, বলতে ভুলে গেছি। আমার নাম কি লিখলেন? সব কিছু তোমার মা ঠিক করেছেন। তোমার নাম নাসরিন চৌধুরী। বয়স তেরো। তোমার মা বলেছেন,তুমি বাইরে যেতে চাইলে উনি গাড়ি নিয়ে আসবেন।
মায়ের ঋণ আমি কখনই শোধ করতে পারবোনা।
মায়ের ঋণ কখনো শোধ করা যায় এ জীবনে। পিতা বীজদাতা। বাকী সব মায়ের অবদান। দেখোনা, অনেক সময় পিতা সন্তানকে ত্যাগ করে। মা কখনও পারেনা। ইসলামে মায়ের মর্যাদা খোদার পরেই। নবীজী নিজেই বলেছেন, জগতে মা হলো সন্তানের খেদমত পাওয়ার প্রধান হকদার। মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। বাংলাদেশে নারীরা সবচেয়ে বেশী অবহেলিত ও নির্যাতিত। পুরুষেরা মনে করে তারা সংসারের কর্তা। বিয়ের সময় মেয়েরা কাবিনের শর্তগুলো ভাল করে পড়েনা। এখানে মোহরের লেনদেন অবহেলিত। পুরুষ মনে করে বাসর রাতে মোহর মাফ চেয়ে নিলেই হয়। কিছু মনে করোনা, প্রসংগক্রমে এসব কথা বললাম। আমাদের মেয়েরা এখনও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অসচেতন। তাই তারা নির্যাতিত। বাংলাদেশে নারীর মর্যাদার ধারণা এসেছে সনাতন ধর্ম থেকে। এটা এসেছে তিন চার হাজার বছরের পুরাণো ধ্যান ধারণা থেকে। সনাতন ধর্মে নারীরা ছিল অর্ধমানব। কোরআন নারীকে অধিকার দিয়েছে সে সম্পর্কে শিক্ষিত নারীরাও অজ্ঞ। আমি চাই তুমি পড়ালেখা করে অনেক বড় হও। শোন, মোবাইলে কল ছাড়া সকল অপশান বন্ধ রাখবে। শুধু মায়ের সাথে কথা বলবে।
একদিন সকালে কাউকে না জানিয়ে হুট করে একদল তৃতীয়লিংগের লোক এসে হাজির হলো নাসরিনের হোস্টলে। প্রায় আট নজনের একটা দল। দারোয়ান ওদের আটকাতে পারেনি। তারপর অস্ত্রধারী নিরাপত্তা কর্মীরা ওদের আটকালো। জানতে চাইলো কার সাথে দেখা করবে।
ওরা বললো চুমকি। নিরাপত্তা কর্মীরা জানালো ওই নামে কেউ এখানে থাকেনা। না, আমরা বিশ্বাস করিনা। আপনারা সবাই মিলে আমাদের সাথে মিথ্যা বলছেন। দেখুন, কতদিন গোপন রাখবেন। আমরা জানতে পারবো একদিন। এমন সময় পুলিশ এসে হাজির।
সালাম স্যার,আমাদের একটা মেয়েকে এই হোস্টেলে লুকিয়ে রেখেছে। আমরা ওর সাথে দেখা করতে এসেছি। আমরা কোন ধরনের বেয়াদপি করিনি।
সাব ইন্সপেক্টর আশরাফ বললেন, আমি জানি তোমরা কিছুই করোনি। বলো,তোমরা টাকা চাও। জ্বীনা স্যার, আমরা টাকার জন্যে আসিনি। চুমকির সাথে এক নজর দেখা করেই চলে যাবো। না, এখানে কোন চুমকি থাকেনা। ঝামেলা না করে চলে যাও। না হয় থানায় চালান করে দেবা। ভেবে দেখো। কি করবে। ধরো, টাকাটা নাও। ওরা টাকা নিয়ে শাসিয়ে গেলো। বলে গেলো আবার আসবে।
মাস খানেক পেরিয়ে গেলো নাসরিসনের মা হোস্টেলে আসেননি।হোস্টেল সুপার দিলারা ম্যাডাম নাসরিনের মাকে ফোন করলেন। কি হলো,আমাদের ভুলে গেছেন?
না,ভুলিনি। ঝামেলায় আছি। আমার সাহেব ঝামেলা করছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন আমি এতটাকা কি করছি। এ নিয়ে ঝামেলা চলছে। এসব আমার ব্যক্তিগত টাকা। মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি। বরং তুমি মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছো। আমার টাকার হিসাব তোমাকে দিবো কেন? এ নিয়ে ঝামেলা করোনা। ছেলেরা আমাকে সাপোর্ট করে বলে সাহেব চুপ করে যান।
এক কাজ করুন। আপনি মেয়ের নামে একটি একাউন্ট খুলুন। আপনি মাসে একদিন এসে মেয়েকে বেড়াতে নিয়ে যাবেন।
হোস্টেলের কাছে যে ব্যান্ক আছে। সেখানেই একাউন্ট খুলবো।
এখানে সাউথইস্ট আছে।
তাহলে খুব ভালো। সহজ হয়ে যাবে। আমার একাউন্ট ধানমন্ডীতে। খুব সহজে টাকা ট্রান্সফার করা যাবে। ঠিক আছে আমি একটু পরেই আসছি। আপনি মেয়েকে নিয়ে ব্যান্কে আসুন। আমি আমার যাবতীয় কাগজ নিয়ে আসছি। নাসরিনের ছবি ওর কাছে ।বার্থ সার্টিফিকেট আমার কাছে আছে। আপনি হোস্টেলের কাগজও সাথে রাখবেন।
দিলারা বেগম যথা সময়ে ব্যান্কে পৌঁছে গেলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে ম্যানেজার সাহেবের চেম্বারে বসলেন। কয়েক মিনিট পরেই হোস্টেল সুপার ও নাসরিন আসলো।
ম্যানেজার সাহেব এইযে আমার মেয়ে নাসরিন। ওর নামে একাউন্ট খুলতে চাই।
ওর বয়স কতো?
তেরো হবে।
এ বয়সেতো একাউন্ট খোলা যাবেনা।
তাহলে কি করা যায়।
এখানে আপনার নামে একটা খুলুন। আপনার মেয়েকে অপারেটর করুন। আপাতত ওই একাউন্টে এক লাখ টাকা জমা দেন। কত টাকা তুলতে পারবে তার একটা লিমিট করে দেন।
সুপার ম্যাডাম সার্টিফাই করে একজন বেয়ারা দিয়ে চেক পাঠেলেই চলবে। মেয়েকে আসতে হবেনা। চেকে সাইন করলেই চলবে।
ধন্যবাদ ম্যানেজার সাহেব। আমার চিন্তা দূর করে দিলেন।
এখন আর কোন চিন্তা নাই। এবার কফি খান। একাউন্ট এখনি খোলা হয়ে যাবে। আপনি প্রয়োজনীয় কাগজ দেন। ইনি একাউন্ট খোলার দায়িত্বে আছেন। আপনার মেয়ের তিনটা ছবি দেন। ছবি গুলো এটেস্ট করবেন সুপার ম্যাডাম। দেখুন, ম্যাডাম আপনার মেয়ে খুবই সুন্দরী। ওকে ভাল করে দেখে রাখবেন। কারো নজর লেগে যেতে পারে। আমাদের সমাজ দিন দিন কোন পথে যাচ্ছে তা আপনারা আমার চেয়ে ভাল জানেন। সুপার ম্যাডাম আপনি ওকে একলা বের হতে দেবেন না। প্রয়োজনে আমার অফিসার টাকা দিয়ে আসবে আর চেক নিয়ে আসবে। সুপার ম্যাডাম ফোন করলেই হবে।
ম্যাডাম, শুনেছি কদিন আগে তৃতীয় লিংগের লোকেরা আপনার হোস্টেলে এসে ঝামেলা করেছে।
ম্যানেজার সাহেব, এ বিষয়ে পরে ফোনে কথা বলবো।
দু:খিত ম্যাডাম। কিছু মনে করবেন না।
না না, মনে করবো কেন। আপনিতো আমাদের আপন মানুষ।
হোস্টেলের অন্যান্য মেয়েরা বেশীর ভাগ কর্মজীবী। নাসরিনের তুলনায় ওদের বয়স অনেক বেশী। নাসরিন হলো হোস্টেলের সবচেয়ে কম বয়সী মেয়ে। তার থাকার ব্যবস্থা একশ ভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই হোস্টলটি কর্মজীবী মহিলাদের জন্যে। বিশেষ ব্যবস্থায় নাসরিনকে রাখা হয়েছে। তাই এতো নিরাপত্তা। সুপার ম্যাডামই নাসরিনের গার্ডিয়ান।
সবার মনেই প্রশ্ন নাসরিন এই হোস্টলে কেন? সে কি করে? সারাদিনতো হোস্টলেই থাকে। নাসরিনের সাথে সবাই কথা বলতে আগ্রহী। সুপারকেও কিছু জিজ্ঞাসা করতে কেউ সাহস পায়না। হোস্টেলে দশ বারো জন মেয়ে আছে যারা ডিভোর্সি। বয়স তিরিশের মতো। এরা নাকি আর বিয়ে করবেনা। এদের কয়েকজন সমকামিতায় এডিক্ট হয়ে গেছে বলে সুপার ম্যাডাম জানতে পেরেছেন। কিন্তু লিখিত কোন অভিযোগ নেই। এরা নাকি নানা রকম সেক্স ডিভাইস ব্যবহার করে। এদের ভিতর কয়েকজন আছেন বড় চাকুরী করেন। অনেকের গাড়ী আছে।যাহোক সেক্স দেহ বা মনের খাদ্য। এটা ছাড়া কোন প্রাণী বাঁচতে পারেনা। তবে মানুষের জন্যে বিধি বিধান আছে। মানুষ ইচ্ছা করলেই যখন তখন যেখানে সেখানে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে পারেনা। মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী। যৌনতায় সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি নিষেধ আছে। এসব মেনে চলতে হয়।মানব সভ্যতাকে রক্ষা করার জন্যই বিবাহ প্রথার মাধ্যমে পরিবার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এই পরিবার প্রথাই পিতা মাতা সৃষ্টি করেছে।তৃতীয় লিংগের মানুষ স্বাভাবিক লিংগধারী নয়। তারা পরিবার গড়ে তুলতে পারেনা। তবে আধুনিক চিকিত্‍সা বিজ্ঞান তৃতীয় লিংগের মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে লিংগ ছাড়া তারা অন্যান্য বিষয়ে স্বাভাবিক মানুষ। সমাজ ও রাস্ট্র তাদের অবহেলিত করে রেখেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তৃতীয়লিংগের মানুষেরা অনেক উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিদেশ ভারতে ওদের মর্যাদা বাংলাদেশের চেয়ে বেশী। তারা উচ্চ মর্যাদায় চাকুরী করে।বাংলাদেশে হিজড়া বা তৃতীয় লিংগের মানুষেরা খুবই অবহেলিত। ভালো পরিবারের সন্তানদেরও পিতামাতা ত্যাগ করে। এ এক নিষ্ঠুর ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী তৃতীয়লিংগের মানুষ নিয়ে আন্দোলন চলছে। সুখবর হলো বাংলাদেশেও তাদের সংগঠন হয়েছে। সরকার আস্তে আস্তে তাদের অধিকার মেনে নিচ্ছে। বেশ কিছু মেয়ে পড়ালেখা জানে। তারাই সংগঠণ চালায়। ইতোমধ্যেই তারা মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। হিজড়া শব্দটি উর্দু। মানে লিংগহীন মানুষ। তবে তাদের নারী পুরুষে রূপান্তর করা যায়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশেও গবেষণা হচ্ছে।
নাসরিনের মা ইতোমধ্যে দেশে বিদেশ যোগাযোগ করেছেন। ঢাকাতেও অপারেশন করা যাবে বলে অভিজ্ঞ গাইনীরা বলেছেন। তবে হিজড়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন সার্জেন তৌফিকা আজমী বলেছেন তিনি এর আগে দুইটা অপারেশন করেছেন। দুটোই সাকসেসফুল। ওরা এখন খুব ভালো আছে। তবে এখন নাসরিনের অপারেশন করার বয়স। আমি সাজেস্ট করি এখনি অপারেশনের করে ফেলুন। আমিও করতে পারবো। আমার উপর আস্থা থাকলে এখানে করাতে পারবেন। এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হবে। ওকে একদিন নিয়ে আসেন। আমি দেখি। নাসরিন কি আগ্রহী?
খুবই আগ্রহী। ও এখন এসএসসি পরীক্ষা দিবে। প্রস্তুতি নিচ্ছে। আশা করছি ভালো করবে।
ওতে কোনো অসুবিধা হবেনা। বরং ও শরীর মন অনে ভালো হয়ে যাবে। সে প্রফুল্ল থাকবে। এখন যেমন ওকে লুকিয়ে থাকতে হয় তা আর দরকার হবেনা। আপনার সাহেবও ওকে ঘৃণা করবেনা। উনি সামাজিক মর্যাদার ভয়ে কে সুস্মেয়েটাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। সবদিক থেকে পরিবারে শান্তি আসবে। আপনার মনের কষ্ট দূর হবে।
পরের সপ্তাহে দিলারা বেগম নাসরিনের সাথে দেখা করতে হোস্টেলে যান।
নাসরিন খুবই খুশী মাকে কাছে। তোমার কষ্ট দেখে আমি নিজেও খুবই ব্যথিত।
নারে মা, আমি এখন একেবারেই নিশ্চিন্ত। শুধু ভাবি তোকে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে হায়াতে কুলাবে কিনা।
ওসব অলুক্ষণে কথা বলবেনা মা। আমার জন্যে তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে।তুমি দেখবে মা, আমি একদিন অনেক বড় হবো। তোমাদের বংশের মুখ উজ্জল করবো।
তোর বাবাকে মাফ করে দে মা। উনি পুরাণো ধাঁচের মানুষ। সমাজকে বড় বেশী ভয় পান। তুই যখন স্বাভাবিক হয়ে যাবি আমি তোকে ঘরে নিয়ে যাবো।
স্বাভাবিক মানে?
লিংগ রূপান্তরের জন্যে অপারেশন করাবো।
না মা আমি রাজী নই। তাহলে তোমরা জোর করে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। তখন বর আমাকে নানা কথা বলে খোটা দিবে।
ও রকম বরের কাছে বিয়েই দিবোনা।
শোনো মা আমি লন্ডন যাবো বার এট ল করার জন্যে। তখন অপারেশনটা করে নেবো। এর আগে নয়। তারপর ঢাকায় এসে বিয়ে করবো।
ঠিক আছে মা। তোর কথা মেনে নিলাম। তুই সিরিয়াসলি পড়ালেখা কর। তোর জন্যে আমি জীবন বাজি রেখেছি। তোকে বিজয়ী হতেই হবে। তুই আমার স্বপ্ন।
মা তুমি অত চিন্তা করোনা। আমিও স্বপ্ন দেখি আমার আগামী জীবন নিয়ে। যেদিন বাবা আমাকে হিজড়াদের হাতে তুলে দিয়েছে সেদিনের কথা ভাবো। আমার কান্না দেখে আশে পাশের মানুষ জমা হয়ে গিয়েছিল। কাছে হিজড়াদের ভয়ে কেউ কাছে আসেনি। বাবা ওদের হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়েছিল। মা বাপ ভাই বেরাদর আত্মীয় স্বজনহারা আমি চলে এলাম বস্তিতে। এখানে সবাই হিজড়া মানে তৃতীয় লিংগের মানুষ। এদের নব্বই ভাগ
নারীর মতো চলে। আমাকে যেখানে নিয়ে গেছে সেখানে একজন মাসিই কর্তা। তাঁর অংগুলি হেলনে সবকিছু চলে। টু শব্দ করার কোন উপায় নেই। মাসি আমায় কাছে টেনে নিয়ে তার বুক চুষতে বললেন। তারপর তার এক বন্ধুকে বললেন আমার পাছায় লিংগ ঢুকাতে। আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। মাসি বললেন ভয়ের নাই। এটা ট্রেনিং। শিখতেই হবে। প্রথম দিন আমার মুখে টেপ লাগিয়ে দিল। চিত্‍কারের আওয়াজ যেন বাইরে না যায়। বন্ধুটি প্রথমে ক্রীম লাগালে। এরপরে কাজ শুরু করলো।প্রথম এক সপ্তাহ এভাবেই চললো। আমিও অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আমার সব কিছু পরিবর্তন হতে লাগলো। আমার বুক বড় হলো। বুক চোষার লোক বাড়তে লাগলো।সালোয়ার কামিজ পরে দলে দলে বের হতে শুরু করলাম। ওরা আমাকে পাহারা দিতো। আমি পালিয়ে যাই কিনা।
আমার শুধু মায়ের কথা মনে পড়তো। পথে ঘাটে এদিক ওদিক তাকিয়ে থাকতাম। যদি মায়ের দেখা পাই। রাতে শুধুই কাঁদতাম। পাঁচ বছরে সব পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমার মনের অবস্থা এক বিন্দুও পরিবর্তন হয়নি। দিলারা বেগম মেয়ের কথা শুনে শুধু কাঁদছেন।
যাক মা, সেসব দিনের কথা ভুলে যা। আল্লাহ তোকাে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এখন আর কোন চিন্তা নাই। এখন থেকে তুই রাজকন্যা হয়ে বাঁচবি। তুই যেভাবে চাইবি সে ভাবেই সব কিছু হবে।
বাবা কিছু জানে মা
না। সরাসরি তেমন কিছু জানেনা। সেদিন তোর কথা জানতে চেয়েছিল। বললো, মেয়েটাকে একবার যদি দেখতাম।
আপনারতো জানার কথা। আপনিইতো ওদের লুকিয়ে টাকা দেন। নিশ্চয়ই সব কিছু জানেন। আপনিতো একটা পাষাণ মানুষ। আমার বুকের ধনকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। আপনি পুরুষ বলে জোর করে নিজের ইচ্ছা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। কেমন করে পারলেন? আল্লাহ আপনার বিচার করবেন।
দেখো নাসরিনের মা, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি।
তাহলে যান, ওদের কাছে যান। মেয়েকে নিয়ে আসুন। ওদের ফোন থাকলে কল করে বাসায় ডেকে আনুন। টাকা পয়সা দিয়ে মেয়েকে ছাড়িয়ে আনুন। ওরা আমার মেয়েকে বাজে কাজে ব্যবহার করছে। অত্যাচার করে।আমিই দশ মাস পেটে রেখে জন্ম দিয়েছি। আপনার কোন অনুভুতি নেই। বীজ দিয়েই খালাস। আল্লাহ তাকে লিংগহীন করেছে। ওর কি দোষ? দোষ যদি হয়ে থাকে তা আপনার। আপনার বীজের কারণেই এমন হয়েছে। খামাকা আপনি নামাজ রোজা করেন। খোদার উপর আপনার আস্থা নাই। যান এখন মেয়েকে নিয়ে এসে ঘরে শান্তি ফিরিয়ে আনুন। দেখি পারেন কিনা। আমার কলিজার ধনকে বাড়ি থেকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন কের উসকানিতে। কই আপনার ধার্মিক লোকেরা। যারা ইসলামের ই জানেনা তারা হলো আপনার পরামর্শক।আপনি মানবতা বিরোধী কাজ করেছেন। আপনি পরিবারের সবার উপর অত্যাচার করেছেন। আমি সেদিনই সংসার ছেড়ে চলে যেতে পারতাম। যাইনি আপনার সম্মানের চলে দিকে তাকিয়ে।
নাসরিনের পড়ালেখা খুব ভাল চলছে। তার শিক্ষকরা বলছেন ওর মেধা খুবই ভাল। আমাদের বিশ্বাস ও মেধা তালিকায় চলে আসতে পারে। ওর আদবও ভাল। ও আপনার পরিবারতের মুখ উজ্জল করবে। আমরা আশা করছি সে ইংরেজী বাংলা ও অংকে খুবই ভাল করবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এ বয়সে ওকে পরীক্ষা দিতে দিবে কিনা?
ওই চিন্তা আমার উপর ছেড়ে দেন। শিক্ষা সচিব আমার ভাই। ওর রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে একটি ভাল স্কুল থেকে। আমি আমার ভাইকে বলে দিচ্ছি। সে সব ব্যবস্থা করবে। আমি চাই নাসরিন এবারই পরীক্ষা দিক। আমরা একশ ভাগ চেস্টা করবো ওর প্রস্তুতির জন্যে।
কি বলো নাসরিন,তুমি পারবেতো?
আপনারা আমার জন্যে দোয়া করেন। আমি নিশ্চয়ই পারবো।

দিলারা বেগম বললেন। মা তুই কিছুই ভাবিস না। সব হবে। তুই দেশের মুখ উজ্জল করবি। আমি তোর বাপের মুখে চুনকালি মাখতে চাই। সমাজ আর কুসংস্কারের কারণে তিনি আমার বুকের টুকরাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। এখন বলে আমি অনুতপ্ত। তোর বাপ তোর পড়ালেখা সম্পর্কে কিছুই জানেনা। আমি জানাতে চাইনা। তোর রেজাল্ট বেরিয়ে গেলে জানাবার কথা ভাবছি।
না মা, এখন জানাবার দরকার নাই। এইচএসসি পর জানান দিও।
আমি চাই। কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্টের পর জানাজানি হয়ে যাবে। তখন লুকানো যাবেনা। তোমার রেজাল্ট ভালো হলে মিডিয়া আসবে। বিভিন্ন পত্রিকা তোমার ইন্টারভিউ করবে। তখন এড়ানো যাবেনা।
রেজিস্ট্রেশন ফরমে শুধু তোমার নাম থাকবে। বলবো বাবা নেই। বাবার পরিচয় দেবোনা।
সেটা কি সম্ভব হবে?
বাবার বাসায় আমি যাবোনা। বাবাকে স্বীকৃতি দেবোনা। হিজড়া বস্তিতে আমার পাঁচ বছর কি বাবা ফিরিয়ে দিতে পারবে ? ওই পাঁচ বছরে আমার উপর যে অত্যাচার হয়েছে তা কোন ভাষায় বর্ণনা করা যাবেনা।
মা, আমি তোর বাবার হয়ে ক্ষমা চাইছি। এখন ওসব দিনের কথা ভুলে যা। আগামী দিনের দিনের কথা ভাব। তোর জিদ আছে। তুই পারবি। তুই অনেক বড় হবি। আমি মন প্রাণ দিয়ে তোর জন্যে দোয়া করি।
মা তুমি আছো বলেই আমি জীবন ফিরে পেয়েছি। বাবাতো আমাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। তোমরা কি ছোট বেলাতেই বুঝতে পেরেছিলে আমার লিংগের অবস্থা।
না, আমরা এ ব্যাপারে তেমন সজাগ ছিলাম না। জানার পর বিষয়টা লুকাবার চেষ্টা করেছে তোর বাবা। তিনিই পরিস্থিতি জটিল করেছেন। তিনি ভাবতেন এটা পাপের ফসল। এটা তাঁর কুসংস্কার ছিল। মসজিদের কিছু মুর্খলোক তাঁর বন্ধু ছিল। এখন আর চিন্তা নাই। তুই যে, এতো মেধাবী আমরা বুঝতে পারিনি। আমার জন্যে তুই আল্লাহর দান।
দেখো মা তোমরা যদি আমাকে মানুষ ভাবতে তাহলে সমস্যা এতো প্রকট হতোনা। লিংগতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। প্রজনন ছাড়া এর আর কি কাজ। বিয়ের জন্যে লিংগের প্রয়োজন আছে। পুরুষরা লিংগের ব্যবহারের জন্যে উন্মাদ থাকে। তারা যেখানে সেখানে এর ব্যবহার করে। তারা বিপরীত লিংগ মানে নারীকে দূর্বল মনে করে। তাদের দমিয়ে রাখতে চায়। যেমন তুমি বাবার ভয়ে চুপ করে থাক। তোর বাবা একটু গোঁয়ার প্রকৃতির মানুষ। শান্তির জন্যে আমি চুপ থাকি। আমি সব জানি তবুও। আমার পরিবারের ঐতিহ্য অনেক বড়। সে সময়ে বিয়েতে মেয়েদের তেমন মত নেয়া হতোনা। সব সিদ্ধান্ত মুরুব্বীদের। তোর বাবার পরিবারও নাম করা। তাই হয়ত সবাই রাজী হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত নাসরিন চৌদ্দ বছর বয়সে রেকর্ড ব্রেক করে এসএসসিতে সারা দেশকে অবাক করে প্রথম স্থান দখল করেছে। ভিকারুন নেসা থেকে পরীক্ষা দিলেও তাকে সবাই চিনেনা। তবুও স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নুসরাত আলী সাংবাদিকদের বলেছেন,নাসরিন প্রাইভেট পরীক্ষার্থী। সে শিক্ষা সচিবের ভাগনে। তিনিই সব করেছেন। এতো অল্প বয়সে এর আগে কেউ পরীক্ষা দেয়নি। আইনও নেই। বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষা দিয়েছে।
ঠিক এমন সময়ে নাসরিন ও হোস্টেল সুপার স্কুলে এসেছেন। হোস্টেল সুপার ম্যাডাম নাসরিনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর তিনি বললেন, নাসরিন নিজেই নিজের সম্পর্কে বিস্তারিত বললো। দেখুন, আমার জীবন দু:খ ও বেদনায় ভরা। মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। সবাই আমাকে ত্যাগ করেছে। কারণ আমি তৃতীয় লিংগের মানুষ। যাকে সমাজ হিজড়া বলে। এরপর আমার হোস্টেলের ম্যাডাম আমার দ্বিতীয় মা। এই ম্যাডাম আমাকে পথ দেখিয়েছেন। আদর যত্ন দিয়েছেন। আ মার আজকের নাসরিন হয়ে উঠা তাঁদের দান। আমার বাবা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজন আমাকে অবহেলা ও ঘৃণা করেছে।কারণ আমি তৃতীয় লিংগের মানুষ। এরা নিজেদের মুসলমান দাবী করে। কিন্তু তৃতীয় লিংগের ব্যাপারে কোরাণ হাদিস কি বলে তাও জানেনা। আফটার অল তারা মানুষ। আল্লাহ তাদের ভালবাসেন সাধারন লিংগবানদের মতোই। তাহলে পিতামাতা সমাজ তাদের অবহেলা করবে কেন?
এরপর এইচএসসিতেও নাসরিন ফার্স্ট হয়। এবার বিদেশী মিডিয়াতেও তার প্রচার হয়। নাসরিন আমেরিকা যেয়ে আইন পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দিলারা বেগম বলেছেন তিনি মেয়ের সাথে আমেরিকা যাবেন। তিনি নাসরিনকে একা ছাড়তে চাননা। নাসরিনের মামা সচিব সাহেব এখন লিংগহীন ভাগনের গুণে গৌরবান্বিত। তাই আগ বাড়িয়ে সব কাজ করে দিচ্ছেন। বিদায়ের আগে সচিব সাহেব ঢাকা ক্লাবে ভাগনের জন্যে একটি পার্টির ব্যবস্থা করেন। নাসরিনের বাবা পার্টিতে উপস্থিত থাকলেও দৃশ্যমান হতে চাননি। শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। হিজড়া ফেডারেশনের কয়েকজন নেতাও উপস্থিত হয়েছেন। নাসরিনের রেজাল্টের পর হিজড়াদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভংগী পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। উপস্থিত সবাই নাসরিনের কথা শুনতে চাইলো।
নাসরিন ইংরেজীতেই নিজের কথা শুরু করলো।
আসসালামু আলায়কুম। ওয়েলকাম এভরিবডী। লুক, আই এ্যাম জাস্ট এন অর্ডিনারী হিউম্যান বিং লাইক ইউ অল এজ ক্রিয়েটেড বাই গড উইথ নো সেক্স। ইট ইজ এ মিরাকল অব গড। আপনারা আপনাদের তৃতীয় সন্তানদের পড়ালেখা করান।তাদের কখননো অবহেলা করবেন না। আল্লাহর রহস্য বুঝার ক্ষমতা আমাদের নেই। সারা পৃথিবীতে তৃতীয় লিংগ আছে। আমার রেজাল্ট দেখে আপনারা বিস্মিত হয়েছেন। আমি কোথাও পরিচয় দিইনি। আমার এ সাফল্যের পেছনে আমার মায়ের অবদান এক হাজার ভাগ। মা আমার জন্যে সবচেয়ে বেশী কষ্ট করেছেন।
আমি কিছুদিনের মধ্যেই আমেরিকা চলে যাবো। সেখানে আইন নিয়ে পড়ালেখা করবো। আমি একটা ভালো স্কলারশীপ পেয়েছি। ভাবছি মাকেও নিয়ে যাবো।

  • দিনপন্জী

    • অক্টোবর 2018
      সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
      « সেপ্টে.    
      1234567
      891011121314
      15161718192021
      22232425262728
      293031  
  • খোঁজ করুন