রূপকথা ১২

পরের দিন সকাল সাড়া নটায় আরসালান আয়েশার বাসায় যায়। আয়েশা রাতে ছোট খালার সাথে শুয়েছে। বিবাহিত জীবন ভাবতে ভাবতে তেমন ঘুম হয়নি। আরসালানকে দেখে ফারজানা তাড়াতাড়ি রুম ছেড়ে দেয়। যাও বাবা আয়েশার রুমে যাও। কথা বলো। আয়েশা আরসুকে নিয়ে নাশতার টেবিলে যায়। আগে কিছু খেয়ে নাও ব্রেকফাস্ট করেছো কি ? না তোমার এখানে করবো। ঠিক আছে আমি বুয়াকে বলছি। শোনো বিন্দু, তোমাকে আবার পুরাণো রুটিনে ফিরে যেতে হবে। কাল থেকে ক্রস সাহেবের কাছে যাওয়া শুরু করো। নাশতা নিয়ে এতো ভাববার কি আছে। যা আছে তাই দাও। তুমি খেয়েছো ? না আমার মনে হয়েছে তুমি আসবে। মনে রেখো, এখন কিন্তু আমাকে ছুঁতে পারবেনা। আইন হয়েছে। আইন মোতাবেক তুমি আমার স্বামী। কিন্তু আইনেরপ্রয়োগ এখন শুরু হয়নি। এসব বিষয় কি আমি তুলেছি। তুমি তুলছো কেন ? তোমার এখন চোর চোর ভাব। আমি এসেছি শুধু তোমাকে দেখে যাওয়ার জন্যে। না হয় বলবো, নতুন বউকে ফেলে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুমি এখন আমার রুমে যেতে পারবেনা। সবাই সন্দেহ করবে। বলবে জামাইর তর সইছেনা। এমন সময় খান সাহেব ও তাঁর বিবি ডাইনিং টেবিলে আসেন। কি খবর বাবা আরসালান। তুমি এসেছো আমরা খুব খুশী। কিরে বিন্দু নাশতার ব্যবস্থা করেছিস। কি আর করবো। যা আছে তাই। বাবা আমরা একটু আগে নাশতা শেষ করেছি। বিন্দুর মা, তুমি একটু ভাল করে দেখ। সবাইকে ডাকো। এখনও ঘুমাচ্ছে নাকি।

দেখো বাবা, আমরা শহরমুখি কখনই ছিলাম না। তাই রাজধানীতে বাড়িঘর করিনি। আমার মেয়ে বিন্দু ঢাকায় আসার পর আমরা ঢাকা মুখি হয়েছি। এখন দেখছি একটা বাড়ি করা উচিত ছিলো। এ ফ্ল্যাট বাড়িতে তোমার খেদমত হবেনা। কি যে বলেন বাবা। আমরা ঠিক করেছি আমাদের বাড়িটা আয়েশার নামে লিখে দেবো। আমার নিজে থেকে বলেছেন। আয়েশা যদি আমেরিকা যায় তাহলে আমিও যাবো। আরেকটা পিএইচডি করবো। বিন্দু হার্ভার্ডে পড়বে। এটা আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। বাবা, আমরা এসব কম বুঝি। পড়ালেখার দিকে আমাদের আগ্রহ তেমন বেশী ছিলনা। তবে সবাই গ্রাজুয়েশন করেছে। তোমার শ্বশুড়ীও সেই জামানায় কলেজে পড়েছেন। আমার শ্বশুর সাহেব একজন শিক্ষক ছিলেন। আয়েশার মামারা সবাই উচ্চ শিক্ষিত। আমরা তেমন সংস্কৃতিমনা মানুষও নই। বাবা, এখন থেকে সব হবে। বাড়িতে পাঠাগার থাকবে। সবাই এ দিকে নজর দিবে। তোমরা নিজেরা এ বিয়ে ঠিক করেছো বলে সম্ভব হয়েছে। তা না হলে আমিতো কল্পনাও করতে পারতামনা। তোমরা কত বড় পরিবার। কুলসুম বেগম আরসালানের মাথাটা বুকের ভিতর টেনে নিয়ে আদর করতে থাকেন। বলেন, আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে এ রাজপুত্র পাঠিয়েছেন। মা, আমি খুবই আনন্দিত আপনাদের সাথে আমাদের আত্মীয়তা হয়েছে। এখানে আমাদের আত্মীয় না বললেই চলে। ওয়ালিমার সময় সব আত্মীয়দের সাথে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিবো। বিন্দু বললো, বাবা আমরা প্রতিদিনই আত্মীয়দের এক পরিবার করে দাওয়াত করতে পারি। প্রথমে মামাদের সবাইকে ডাকি। এভাবে পঁচিশর আগেই আরসালানের সবার পরিচয় হয়ে যাবে। এরপরে ছোট খালার শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে। কি বলো বাবা। আমার আইডিয়াটা কেমন। খুব ভাল আইডিয়া। আমি কি মা অতদিন এখানে থাকতে পারবো। এখনতো তোমার গাড়ি আছে। যখনি দরকার হবে জামালপুর ঘুরে আসবে। ভাইয়ারা জামালপুর ফিরে যাক। তুমি যদি পারো এই ফ্ল্যাটটা কিনে ফেলো। সে নিয়ে তুই ভাবিস না। আমি বারিধারায় জমি কিনবো,যত টাকাই লাগুক।দেখুন বাবা আপনারাতো আমার মায়ের কথা এক বিন্দুও ভাবছেন না। আমরা চলে যাবার পর মাকে কে দেখবে। ছোট খালু আর খালা স্থায়ী ভাবে এ বাড়িতে থাকেন। জমি কিনে রাখুন। ফ্ল্যাটও কিনে রাখুন। ভাইয়ারা ঢাকা আসলে নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকতে পারবেন। তাও লাগবে বলে আমি মনে করিনা। আমাদর বাড়িটা এখন আপনাদের। দেখো বাবা আরসু, তোমার মা একজন নবাবের মেয়ে। তাঁর আদব কায়দা কি আমরা সবাই বুঝি। আমরা মার্চে আমেরিকা যাবো। বেশী সময় নেই। এর মাঝে বলুন আমাদের বাসায় উঠে যেতে। কি হলো বিন্দু তুমি চুপ করে আছো। কিছু বলো। আমি কি বলবো। তুমি মা’র সাথে আলাপ করে এসব বলছোতো। হ্যাঁ মায়ের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তিনিই প্রস্তাব দিয়েছেন। তুমি নিজেই একটু ভেবে দেখো, মা একলা অত বড় বাড়িতে কেমন করে থাকবেন। বাবা আপনি ভেবে একটা সিদ্ধানত দেন। দেখো বাবা আরসু, বিষয়টা জটিল। বেয়াইন সাহেবার খেদমত করা খুবই জরুরী। সেটা কি আমরা পারবো। মারতো দশ বারো জন স্টাফ আছে। ওরাতো হুকুম পালনের জন্যে। ছোট খালা থাকবেন সাথী হিসাবে, বেয়াইন হিসাবে।আমি কি সেটা পারবো বাবা? এখান পারার কি আছে ? এখনতো আপনারাই সব আমার। আপনারাই আমাদের শক্তি। আপনাদের সাথে আত্মীয়তা করে আমার মা খুবই খুশি। বাড়িটা বিন্দুর বিয়ের গিফট। ঠিক আছে বাবা। এ ব্যাপারে বিন্দু আর ওর শ্বাশুড়ী সিদ্ধান্ত নিবে। আমরা মাথা ঘামাবোনা। তুমিও কিছু বলোনা। দুপুরে এখানে খাবে ফারজানা তুমি বুয়াকে বলে দাও জামাইর খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। জ্বী দুলা ভাই। কোন চিন্তা করবেনা। আরশু যাও তুমি তোমাদের রুমে। ওখানে বিন্দুর সাথে কথা বলো। লাঞ্চের সময় হলে আমরা ডেকে নেবো। ছোট খালা আমার কি ওই রুমে থাকার দরকার আছে। বিন্দু তুই কি শিশু? শিশুর মতো কথা বলিস। যা জামাইকে নিয়ে রুমে যা।

রুমে ঢুকেই আরসু দরজায় খিল দেয়। কি হলো দরজায় খিল দিচ্ছো কেন। এখানে এখন কেউ আসবেনা। তবুও। তোমার মতলবটা কি। ছোট খালাতো ঠিকই বলেছেন। তুমি শিশু নাকি। আমি শিশু না। এখন কি করবে? দেখো আরসু বউ তুলে নেয়ার একটা বিষয় আছে। বউতো তুলে নিইনি। বউতো বাপের বাড়িতেই আছে। আমি তোমার সাথে কিছুই করবোনা। কিছু মানে কি? কিছু মানে কিছু। এদিকে আসো। আরও কাছে। একটা চুমো দাও। কাছে আসো। বিন্দু আরসুর কপালে চুমো দেয়। কিন্তু ইতোমধ্যে আরসু বিন্দুকে জড়িয়ে ধরে। দেখো আমি মাকে ডাকবো। তুমিইতো বললে এখন এদিকে কেউ আসবেনা। ছাড়োনা না, এভাবে শক্ত করে ধরলে আমিতো কষ্ট পাবো। তুমিইতো আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছো। আরসু জোর করেই বিন্দুর ঠোঁটা চুষতে শুরু করে। বিন্দুও আরসু পিঠে হাত রেখে চেপে ধরে। আরও শক্ত করে ধরো। চুমো খেতে খেতে আরসু আয়েশাকে বিছানায় শুইয়ে ফেলে বুকের উপর উঠে। বিন্দু চোখ বন্দ করে রাখে। আরসু আর ঠোঁট ছাড়েনা। দেখো আরসু, তুমিতো আমার ঠোঁট ছিড়ে ফেলবে। এবার ছাড়ো। ছাড়বো, কিন্তু তুমি আরও কিছুক্ষণ আমার বুকে থাকো। বিন্দু আরও বেশি করে আরসু বুকে মুখ রাখে। দেখো আমি তোমাকে আর কিছু করতে দেবোনা। তাহলে বুক চুষতে দাও। বিন্দু ব্লাউজ ও ব্রা সরিয়ে নেয়। নাও মুখে নাও। ফরমাল বাসর রাতের আগে তোমার এসব করা উচিত না। মা তো বলেছেন আমাদের বাসর রাত হবে ওয়েস্টিনে। বসর তাতে কিন্তু প্রথম আনন্দ পাবেনা। আমি কনডমটা পরে নি। তানা হলে কাপড় নষ্ট হবে। ওকে পরো। আমি তোমার টা টিপে দিচ্ছি। তুমি আমার এখানে শক্ত করে টিপো। এবার চোষো ভাল করে। ঢুকাতে চাইলে ঢুকাতে পারো। আমি না করবো না। সত্যিই আরসু তোমার প্রশংসা না করে পারছিনা। আসার সময় কিং নিয়ে এসেছো। তা না হলেতো ঝামেলা হয়ে যেতো। যাও, এবার বাথরুম সেরে আসো। তুমি আসলে আমি যাবো। বিন্দু পুরো কাপড় ছেড়ে বাথ রুমে ঢুকে। গরম পানি আছে, ইচ্ছে করলে দুজন একসাথে গোসল করে নিতে পারি। আসো, আরেক দফা তোমার ইচ্ছা পূরণ করি।এরপর আর একদিনও চাইতে পারবে না। পঁচিশে ফেব্রুয়ারী রাতে ফুলশয্যা হবে। আসো ভিতরে আসো,দেখো আমাকে কাপড় ছাড়া কেমন লাগে। এতোদিন আমি মোটেই বুঝতে পারিনি তুমি যে এতো পাগল। পাগলামির কি হলো, হালাল জিনিষ হালাল করলাম। তোমাকে দেখে তেমন মনে হয়না। খুবই শান্ত শিষ্ট ভদ্র নম্র। স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে ভদ্রতার কি আছে। একটু আগে আর পরে। ভাবীরা দেখলে বুঝে যাবেনা আমরা গোসল করেছি। তা বুঝুক। আমরাতো হালাল গোসল করলাম। হালাল কাজের রাত আর দিন কি

তোমার শরম লাগলে পরে এসো। আমি ডেকে নেবো। আমি রুম থেকে বের হচ্ছি। বলবো তুমি ঘুমাচ্ছো। মাথার চুল গুলো দেখোতো পুরো শুকনা আছে কিনা। আমিতো চুল ভিজাইনি। ভাল করে ব্রাশ করে নাও। শুধু বড় ভাবীই একটু ঠাট্টা করতে পারেন। আচ্ছা আমেরিকার বিষয়ে কথা চলছেতো। ডক্টর ক্রস যোগাযোগ রাখছেন। আমিতো সিওর তিনি খুব ভাল ব্যবস্থা করতে পারবেন। তুমি যদি ওখানে ডিবেটে একটু ভাল করতে পারো তাহলে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার নাম ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং ভর্তি আর স্কলারশীপের কোন অসুবিধা হবেনা। তাছাড়া ডিবেটের রেজাল্টের উপর নির্ভর করে তুমি ভাল নগদ টাকা পাবে। আবার আন্ডারগ্রেডে ভর্তি হতে হবে। পড়ালেখা শেষ করতে অনেক সময় লেগে যাবে। কাল সকালে চলো ভার্সিটি যাই। একই গাড়িতে যাবো। তুমি গাড়ি নিওনা। বাসায় গাড়ি লাগতে পারে। আমি তোমাকে তুলে নিবো। তুমি ক্রস সাহেবের সাথে দেখা করো। আমি ক্লাস নেবো। আমি ক্লাশ শেষে ক্রস সাহেবের অফিসে আসবো। সেখান থেকে আমরা বাসায় ফিরবো। বিকেলের চা আমাদের বাসায় খেয়ে তোমাদের বাসায় ফিরে যেও। লাঞ্চ আমাদের এখানে শেষ করে যাও। লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে।

বড়ভাবী এগিয়ে এসে বললো, এই বিন্দু তোদের জন্যেই অপেক্ষা করছি। এখনি লাঞ্চ করবি। না, সবাই এক সাথে করবো। ছোট খালাকে ডাকো। তিনি এসে বাবা মাকে ডাকবেন। বাবা রুম থেকে বেরিয়ে বললেন আমি ঘুমাইনি। জামালপুরে ফোন সবার কাছে ফোন করছি। ব্যান্ক ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম। আমাদের অফিস ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম। এর আগে রাজধানীতে এসে এতোদিন এক সাথে থাকিনি। সকালে এসে বিকেলে ফিরে গেছি। অথবা এক রাত হোটেলে কাটিয়েছি। মর্যাদা বা স্ট্যাটাসের কথা তেমন ভাবিনি। যে কোন ধরনের একটা হোটেলে কোন রকমে রাত কাটিয়ে সকালে বাস ধরে জামালপুর ফিরে যেতাম। এখনতো আর সে রকম করতে পারবেনা। নিজের ফ্ল্যাটে এসে থাকবে। বড় ভাইকে লাঞ্চের পর জামালপুর পাঠিয়ে দাও। ভাবী আরও কয়েকদিন এখানে থাক। আপু, দুলাভাই কি চলে যাবে? জিগ্যেস করিনি। গেলেতো আমাকে বলবে। দেখা যাক কাল সকাল পর্যন্ত। তাহলে বড় ভাই আর দুলা ভাই এক সাথেই যাক। গাড়িও নিয়ে যাক। ছোট খালা তুমি এখানেই থেকে যাও। তুমিতো আমাদের পরিচালক। তুমি ছাড়া সব অচল। নারে ,তোর খালুর কথাতো ভাবতে হবে। ওরতো অসুবিধা হচ্ছে। এক কাজ করো, রাতে শ্যামলীর বাসায় থাকো। ব্র্যাকফাস্টের পর তুমি এখানে চলে এসো। খালু বিকেলে এখানে এসে নাশতা করবেন। রাতে খেয়ে ওই বাসায় চলে যাও। কাজের মেয়েটা আছেতো। কিন্তু ওকে ওখানে একলা রাখাটা নিরাপদ না। দেখছিস না,দেশের কি অবস্থা। পাঁচ বরের মেয়েও ধর্ষণ থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। তারপরে গলাটিপে মারছে। বুঝতে পারছিনা দেশটা এমন হয়ে গেলো কেন।মাছের মাথায় আগে পচন ধরে। বাংলাদেশের অবস্থাও এখন তেমন। মাথা পঁচে গেছে। কোথাও কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সরকারের কাছে এসব কিছুই না। তাদের কাছে মুখ্য বিষয় হলো সকল বিরোধী মতকে চিরতরে স্তব্দ করে দেওয়া। ক্রিতদাস বা দলদাস মিডিয়া রাখা। নির্বাচন না করেও গণতন্ত্র রক্ষা করা। একেবারে সালাজারের পর্তুগালের মতো। রাখোতো খালা এসব কথা। বাংগালীরা কথায় কথায় রাজনীতিতে চলে আসে। আমি বিদেশে গিয়ে রাজনীতি ও সরকার বিষয়ে পিএইচডি করবো। তারপর আইন বিষয়ে পড়ে ওবামার জুনিয়ার হওয়ার ইচ্ছা আছে। বিশ্ব রাজনীতিতে ভুমিকা রাখতে চাই। বাংলাদেশে থেকে তা সম্ভব নয়। কারণ এখানে এখন রাজনীতিতে আদর্শ নেই। দেশ নয়, ক্ষমতা বড়। আপাতত বাংলাদেশের রাজনীতির কোন ভবিষ্যত নেই। আমার স্বপ্ন আছে বাংলাদেশে লী কুয়াংয়ের মতো একজন নেতা ও রাষ্ট্র নায়ক পাওয়া। জানিনা এমন নায়ক বাংলাদেশে কখনও পাওয়া যাবে কিনা। দুটি রাজনৈতিক দলের কোথাও আদর্শ নেই। একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ খুবই আগ্রাসী। লক্ষ্য হাসিলে আওয়ামী লীগের কোন তুলনা হয়না। দলের কর্মীরা একটি গোত্রের মতো। নীতি হলো এই দলের উপর আর কোন দল নেই। জন্ম লগ্ন থেকেই এই দলের মূল প্রতিষ্ঠাতারা কেউ দলে থাকতে পারেনি। সম্প্রতি সাবেক সাংসদ ফজলুর রহমান বলেছেন আওয়ামী লীগ একটি অভিশপ্ত রাজনৈতিক দল। রোহিংগা ইস্যুতে প্রমানিত হয়েছে বাংলাদেশের কোন বন্ধু নেই। মিয়ানমারের মতো একটা দেশ আজ আমাদের চোখ রাংগায়। আমাদের অতি প্রিয় বন্ধু ভারত আমাদের সমর্থন করেনি। বাংলাদেশের বিদেশনীতিতে কেউই সন্তুষ্ট নয়। অথবা কেউ আমাদের পাত্তা দেয়না। মিয়ানমারকে চীন রাশিয়া ও ভারত সমর্থন করে। সকল স্তরে ঘুষ দিয়ে চীন বাংলাদেশে প্রচুর ব্যবসা করে। চীনারা এখন একটা বেনে জাতিতে পরিণত হয়েছে। চীন অন্ধের মতো উত্তর কোরিয়ার সাথে আছে। তাই উত্তর কোরিয়া আমেরিকাকে ধমক দেয়। আমাদের বিদেশনীতি হলো শুধু ভারতকে খুশি করা। দেখ বিন্দু আমাকে থামিয়ে দিয়ে তুই এখন লম্বা লেকচার দিতে শুরু করেছিস। কেউ তোর কথা শুনলে মনে করবে তুই লীগ বিরোধী। এদেশে এখন মন খুলে কথা বলেনা।

কি খবর আয়িশা, কেমন আছো। জ্বী স্যার ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? আমিও ভাল । তোমার নতুন জীবন কেমন। নতুন জীবন এখনও ভালো করে শুরু হয়নি। বিয়ের লিগ্যাল ডকুমেন্টেশহয়নি হয়েছে। রিচ্যুয়ালস শেষ হয়নি। পঁচিশে ফেবূব্রুয়ারী রাতে আমি আরসালানের বাড়িতে যাবো নতুন বউ হিসাবে। সেটাই হবে আমাদের বিয়ের প্রথম রাত। এখন আমরা এক সাথে রাত কাটাতে পারবোনা। তোমার আর আরসালানের বিয়ে হওয়াতে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। তোমার বাবাকে দেখলাম। তাঁকে দেখে আমার মনে হয়েছে তিনি একজন পুরোনো খানদানী মানুষ। তিনি স্যার, ল্যান্ডেড এরিস্টোক্রেচীতে বিশ্বাস করেন। শিক্ষার দিকে বা আরবান লাইফে বিশ্বাস করতেন না। এক সময় ইংল্যান্ডে এ অবস্থা ছিল। ধনীরা শুধু জমি আর দাস কিনতো। দাস ব্যবসাটা খুবই লাভজনক ছিল। বিশেষ করে ভুমি মালিকরা দাস কিনতো। আফ্রিকা থেকে কালো মানুষদের বন্দী করে আনতো। শুধু দাস ব্যবসা করে বহু সাদা মানুষ লর্ড হয়েছে। এক সময় ইংল্যান্ড সারা পৃথিবী শাসন করতো গায়ের জোরে।

স্যার আর মাত্র কদিন আছে আমাদের আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটের। আপনার কি মনে হচ্ছে স্যার। আমি ভিসিদের আলাপ করেছি। সবাই বলছে তুমিই চ্যাম্পিয়ন হবে। তোমার নিজের কি ধারণা? আমিতো খুবই ভীত সন্ত্রস্ত আছি। বিষয়টার উপর তোমার লেখাটি কি রেডী করেছো। জ্বী স্যার। কখন কপি করবে। আপনার এখান থেকে করে নেবো। যেদিন তুমি ডিবেটে অংশ নিবে সেদিনই এটা পাবলিক করা হবে। ভিসি স্যার বলেছিলেন তাঁকে আগে একটি কপি দিতে। ফাইনালের দিন মানে একুশে ফেব্রুয়ারী রাস্ট্রপতি চীফগেস্ট থাকবেন। তুমি এখন কিভাবে প্রিপারেশন নিতে চাও। আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই হবে। তবুও বলো তোমার মনের কি ইচ্ছা। স্যার সব এ্যাম্বাসীর প্রতিনিধি বা এ্যাম্বাসেডরদের কি দাওয়ার করা যাবে? ফাইনালেতো তাঁরা আসবেন। আমি চাই স্যার ফাইনালের আগে একটা অনুষ্ঠান হোক। নিশচয়ই করা যাবে। স্যার, অনুষ্ঠানটা বৃটিশ কাউন্সিল অর্গরনাইজ করলে ভাল হবে। দেখি আমি কাউন্সিলের ডিরেক্টর মিস্টার ওয়ার্ডসওয়ার্থের সাথে আলা করে দেখি। তিনি যদি রাজী হন তাহলে এগিয়ে যেতে পারবো। উনি আমাকে সম্মান করেন। আশা করি তিনি রাজী হবেন। তবে বাজেটের প্রশ্ন উঠবে। তুমি চিন্তা করোনা। চোট খাঠ একটা প্রোগ্রাম করার চেষ্টা করবো। সব রাষ্ট্রদূতেরা আসবেন কিনা জানিনা। তারাতো ফাইনালে আসবেন। তবুও দেখা যাক। বই মেলার কারণে রাজধানী একটু ব্যস্ত থাকবে।

স্যার, প্রেস কি মিট করা যায়? নিশ্চয়ই করা যায়? কিন্তু ভিসি স্যারের অনুমতি লাগবে। আফটার অল তুমি ঢাবির ছাত্র। তবে আমার মত হলো মিট না করাই ভাল। বাংলাদেশের প্রেস নেগেটিভ। ভালো কোন কিছুকেই এপ্রিশিয়েট করেনা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি আর মনোজগতে নেতিবাচকতা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। পুরো জাতিই অসম্ভব ইমোশনাল। ক্ষ্যাপিয়ে দাও, দেখবে হিমালয়ের মাথা কেটে নিয়ে আসবে। কিন্তু কেন কাটছে, কি জন্যে কাটছে তা বলতে পারবেনা। এদেশের অতি সাধারন মানুষ ও দিন মুজুরেরাও সংবিধান চর্চা করে। এরা বংশী বাদকের গল্পের মতো।বাঁশীর সুরে নাচবে গাইবে আর সাগরে ঝাপ দিয়ে মরবে। কোন কিছু নিয়ে তেমন ভাবেনা। এরা উসকিয়ে দিলে ধ্বংসের দুয়ারে যেতে পারে। ভালো কাজে ঘুমিয়ে থাকে। বিনা কারণে প্রশংসা করলে খুব খুশী হয়। তারা ভাবে তারা জগতের শ্রেষ্ঠ ও এক নম্বর জাতি। রাজনীতিবিদেরা উপঢৌকন দিয়ে মিডিয়ার সাথে সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্ব রাখে।
তুমি প্রেসকে মিট করতে গেলে ওরা বিনা কারণে নাস্তানাবুদ করবে। বিষয়টা গুরুত্ব বুঝবেনা। তুমি যদি বিদেশে সম্মানিত হও তাহলে দেখবে মাথায় তুলে নাচবে। ডক্টর ইউনুসের অবস্থা দেখো। এইদেশে তার কোন সম্মান নেই। দেশের রাজনীতি নিয়ে ভাল মানুষেরা কথা বলতে পারবেনা। পুরো জাতি ভাবনার জগতে দ্বিখন্ডিত। জাতির নিজস্ব কোন আদর্শ নেই। দলের আদর্শই জাতির আদর্শ। রাজনীতিবিদেরা না বুঝেই ভারত ভাগ করেছে। বৃটিশরা তাতে উসকানি দিয়েছে। সাতচল্লিশের ভারত বিভাগই এই উপমহাদেশকে নানা সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। তুমি জানতে চাও কেন ভারত ভাগ করেছেন? দেখবে কোন উত্তর নেই। নেতারা একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে। হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার কথা বলবে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা একটা বড় ব্যবসা। এ বিষয়ে হাজার হাজার বই বের হচ্ছে, গবেষণা হচ্ছে। কেন ভারত ভাগ করা হয়েছে? এটা কি ভুল ছিল? এ বিষয়গুলো নিরসনের কোন ভাবনা কোন মহলেই নাই। সত্‍চিন্তার কোন উত্‍স নাই। আয়িশা আমি কি অপ্রাসংগিক কথাগুলো বলে ফেললাম। না স্যার, আপনিতো সত্য কথাগুলো বলেছেন। শান্ত ও ধীর স্থির মাথায় ভাবলে এটা একটা দিক নির্দেশনা। অনেকেই আপনাকে ভুল বুঝতে পারে। আজে বাজে মন্তব্য করতে পারে। বাংগালীরা মনে করে তারা যা ভাবে তাই জগতের শ্রেষ্ঠ ভাবনা। তাদের নেতার উপরে জগতে আর কোন বড় নেতা নেই। শোনো, ক’ তারিখ থেকে নর্থ সাউথের ক্যাম্পে উত্‍বে। তোমাকেতো একুশ তারিখ ফাইনালের দিন পর্যন্ত ও ক্যাম্পে থাকতে হবে। তাতে প্রিতিযোগীরা একে অপরকে ভাল করে চিনতে পারবে। চিন্তা ভাবনার বিনিময় হবে। তবে বিপদের বিষয় হলো কেউ তোমার ক্ষতিও করতে চাইতে পারে। এ ব্যাপারে আমি নর্থ সাউথের ভিসি সাহেবের কথা বলবো। তোমার ব্যাপারে বিশেষ কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। শুনেছি ভিসি সাহেবের নিজস্ব ব্যবহারের জন্যে একটি গেস্ট হাউজ আছে। তোমার জন্যে সেটা বরাদ্দ করা যায় কিনা। ঢাবির ভিসির জন্যে বরাদ্দ করে তোমার থাকার ব্যবস্থা করা যাবে। দেখা যাক কি করা যায়। আমি আশাবাদী। নর্থ সাউথের গেস্ট হাউজে আমি একলা থাকতে পারবো? কেন পারবেনা? ওটা একটা ভিআইপি গেস্ট হাউজ। তার পাশেই একটা এটেন্ডেন্ট রুম। একজন লেডিজ এটেন্ডেন্ট দিলেই হবে। দেখো আয়িশা, বাংগালী মেয়েদের এই একটা সমস্যা। তারা নিজেদের সব সময় নারী ভাবে। ফলে দূর্বল মনে করে। সব সময় সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের কথা ভেবেই ক্লান্ত থাকে। এখন ্যে সময় যাচ্ছে,তাতে মেয়েরা একটু নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আছে। পাঁচ বছরের শিশুরা ধর্ষিত হচ্ছে। শুনি পিতা মেয়েকে ধর্ষণ করছে। একটা সমাজ এভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে সরকার রাষ্ট্রের কোন মাথা ব্যথা নেই। শুধু ধর্ষন নয়। গলা টিপে হত্যা করছে। সারাদিন অন্য প্রতিযোগীদের সাথে দেখা সাক্ষাত হবে। এক সাথে খাওয়া দাওয়া করবে। আলোচনায় অংশ নিবে। তোমাদের গাইডেরা তোমাদের সাথে থাকবে। আমরা তোমার দুইজন গাইড। তোমার খাবার দাবার চেক করার জন্যে আমাদের বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। এসব নিয়ে তুমি একেবারেই চিন্তা করোনা। আয়িশা, ইন্টারন্যাশনাল ডিবেট কমিটির একজন প্রতিনিধি ফাইনালের দিন উপস্থিত থাকবেন। আমিই রিকোয়েস্ট করিয়ে আনিয়েছি। এদেশের জাজমেন্টে নানা রকমের নেপোটিজম থাকে। তাই এ ব্যবস্থা। বিদেশী প্রতিনিধির নাম ডক্টর টিলারসন। তিনি দেখবেন ল্যাংগুয়েজ, একসেন্ট, প্রোনান্সিয়েশন, প্রেজেন্টেশন, ওয়াকিং স্টাইল এ্যান্ড ড্রেস। বাংলাদেশের কমিটিতে আমি আছি। এছাড়া ভিসি স্যার ও পলসায়েন্সের চেয়ারম্যান আছেন। আমি বৃটিশ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে। কমিটিতে মোট এগারো জন সদস্য।

আমি সারা পৃথিবীর প্রতিযোগীদের খবর নিচ্ছি। আমেরিকার প্রতিযোগীর সংখ্যা বেশী। ইরাণের প্রতিযোগী খুবই মেধাবী। যা শুনেছি তাতে মনে হচ্ছে ইরাণী প্রতিযোগী শায়লা আব্বাসীর সাথে তোমার প্রতিদ্বন্ধীতার সম্ভাবনার বেশী। তার বয়স একটু বেশী। সে মাস্টার্সের ছাত্র। এ বিষয় গুলো আমি কমিটির কাছে উত্থাপন করেছি। আমারতো মনে হয়, তুমিই ইয়াংগেস্ট। ইটালী ও স্পেনের মেয়ে দুটোও বেশ এগিয়ে আছে। তোমার সিভি কেন্দ্রীয় কমিটির সবার কাছে পাঠিয়েছি। তাদের প্রশ্ন গুলোরও আমি নিয়মিত উত্তর দিচ্ছি। বিভিন্ন দেশের দূতেরাও তোমার ব্যাপারে নিজদেশের কাছে ভালো রিপোর্ট পাঠিয়েছে। আগামীকাল সকাল এগারটায় আসো। আমি দুইজন মেহমানকে ডেকেছি। তুমি ওদের সাথে মত বিনিময় করবে। ওরা জানতে চাইবে তুমি উত্তর দিবে। ঠিক এগারোটায় চলে আসবে। মেহমানদের রিসিভ করবে। তাঁদের ভাল ভাবে বসতে দিবে। কফি সার্ভ করতে বলবে। আমি লাঞ্চে জয়েন করবো। পুরো সময়টা তুমি একলাই দেখবে। আমি আর আরসালান পাশের রুমে থাকবো। পারবেতো? যদি না পারো তাহলে বুদ্ধি করে আমাকে ডেকে নিও। চিন্তা করবেন না পারবো। প্রোগ্রামটাকে এভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে। আমরা দেখবো তুমি একা একটা প্রোগ্রাম কিভাবে হ্যান্ডেল করো। এই আন্তর্জাতিক ডিবেটের একটা ওয়েব সাইট আছে। তুমি ব্রাউজ করে দেখো। সব জানতে পারবে। দেখো আয়িশা, তুমি যে রকম সুবিধা বা ফ্যাসিলিটিজ পাচ্ছো তা আর কেউ পাচ্ছে কি না আমার সন্দেহ আছে। ঢাবির জীবনে এর আগে এমনটি আর হয়নি। তোমার সৌভাগ্য যে বৃটিশ কাউন্সিল এ প্রোগ্রামের একজন পার্টনার। তাহলে এখন আমি আসি স্যার। কাল এমন সময়ে থাকবো। ওকে নো প্রবলেম। স্ট্যা, হ্যাপী। তখন তিনটা বাজে। আরসালান বিন্দুকে নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা হয়। রাস্তায় মনে হলো তেমন জ্যাম নেই কোথাও।

শোন আরসু, কদিন নাকি নর্থ সাউথের ক্যাম্পে থাকতে হবে। সেভাবেই নাকি ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি বলেছি, খোলা মেলা হোস্টেলে আমি থাকতে পারবোনা। রাতে আড্ডা মারার জন্যে ছেলে মেয়েরা চলে আসতে পারে। কেউ জেলাশ হলে আমার ক্ষতি করে দিতে পারে। তোমার কি ধারণা? হতে পারে। সাবধান থাকা দরকার। তাই ভিসির গেস্ট হাউজে আমার থাকার ব্যবস্থা করার জন্যে অনুরোধ করেছি। ভালো কাজ করেছো। আমিও ক্রস সাহেবকে অনুরোধ করবো। এ নিয়ে বেশী চিন্তা করোনা। তুমি ঢাবি চ্যাম্পিয়ন,তোমার জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা হতেই পারে। তুমি কি কিছু খেয়েছো? লাঞ্চের ব্যবস্থা ছিল। এসব বৃটিশ কাউন্সিলের ব্যাপার সেপার। সব কিছু ছিম ছাম। একেবারে ঠিক সময়ে খাবার টেবিলে এসে হাজির। আমি টোষ্ট আর কলা খেয়েছি। তুমি কিছু খেয়েছো? না। এখন বাসায় গিয়ে খাবো। একটা আগে এখানে চলে আসতে পারতে। এক সাথে লাঞ্চ করতাম। এ রকম আর কখনও করবেনা।

তোমার দিশা

আমার কোন কিছুই আমার অধীনে বা
নিয়ন্ত্রণে নেই
আমি আমার নিয়ন্ত্রক নই
যার অধীনে আমি
তিনিই সব করেন ও দেখেন
আমি সীমাবদ্ধ
অসীমে হারিয়ে গেছি।
আমার ভাগ্য আমাকে
নিয়ে এসেছে অজানা ঠিকানায়
সেই থেকে আছি এখানে
কখন ফিরে যাবো তাও জানা নেই
হে বন্ধু প্রিয়তম
আমাকে এখানে একা ফেলে
কোথায় গেলে চলে।
আমি কি তোমার দিশা পাবো?

রূপকথা ১১

হ্যালো আয়েশা, আরসু বলছি। এখন কি করছো। কথা বলা যাবে? জানতে চাইছি তুমি খুব ব্যস্ত নাকি। সব ব্যস্ততা রেখেইতো তোমার সাথে কথা বলবো। তুমিতো প্রায়োরিটি নাম্বার। তোমারতো মর্জি ঠিক থাকেনা।সারা জীবন এমন বউয়ের সাথে কাটাতে হবে। এখনও সময় আছে। ভেবে নাও। আচ্ছা এখন এসব  ভুমিকা রেখে আসল কথা বলো। প্রেমের খতা বলতে হলে এখন সময় নাই। এমন করে বলোনা। একটু নরম করে বলো। নরম মানে কি। চুমো খাবো?  ঠিক আছে তোমাকে লম্বা করে একটা ফ্লায়িং কিস দিই। এবার নরম হয়েছে। তুমি পারোনা? নরম করে কিছু দিতে? আমি ফোনে পারিনা। পরে শিখিয়ে দিও। পরে আর কখন শিখবে।  তোমার বয়স এখন কতো? তেত্রিশ হবে। আর আমার মাত্র বাইশ। মেয়েরা অল্প বয়সে সব শিখে ফেলে। আমাদের কবি সাহেবতো শুনেছি বাসর রাতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। পরে তাঁর বিবি ঘুম থেকে তুলে জানালেন, বাসর রাতে ঘুমাতে নেই। কবি বললেন, যা করার পরে করবো। এখন ভালো করে একটা ঘুম দাও। ঠিক আছে বিয়ের আমি তোমার টিচার হবো। এবার বলো কি বলতে ফোন করেছো। মা বলেছেন আকদের দিন সকাল নটায় আমাদের বাসায় চলে আসতে। মার সাথে আমার কথা হয়েছে। তুমি কথা বলার জন্যে বাহানা পেয়েছো। সত্যিই বলছি আমি কোন বাহানা খুঁজছিনা। বাহানা করে ফোন করিনি।  চিন্তা করোনা। আমি সকাল নটার আগে এসে যাবো। আরসু,তুমি ভার্সিটির যাকে যাকে বলার দরকার তাদের বলে দিও। আমার কিছু বান্ধবী আছে তাদের বলবো ভাবছি। তুমি আমাকে ওদের নাম বলে দিও। এক কাজ করো, কাল তোমাদের বাসায় এসে মা সাথে কথা বলে ভার্সিটিতে যাবো ঘন্টা খানেকের জন্যে। তখন ওদের সবাইকে বলবো। কি বলো? ঠিক আছে। এখন ছাড়ি। আমার ভাইরা ও ওদের বউরা ঢাকা এসে একটু পরেই পৌঁছাবে। ওদের নিয়ে অনেক কাজ। তাহলে ছাড়ি। আরেকটা দাও না। তুমি দাও । আগেরটার উত্তর দাওনা। বলেছিতে ফোনে পারিনা। আয়েশার ভাই ভাবীরা বাচ্চাদের নিয়ে বারিধারা পৌঁছে বেলা বারোটার দিকে একট মাইক্রো নিয়ে। আয়েশা আর শরীফা নিচে নেমে আসে ওদের রিসিভ করার জন্যে। বউদের এতো খুশী আর কোনদিন দেখা যায়নি। এসো ভাবী। তোমাদের দুজনকেই খুব সুন্দর লাগছে। তোমাদের দেখে আমাদের খুব আনন্দ হচ্ছে। মা কেমন আছেন। মা বা দুনই খুব ভালো আছেন। তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। চলো উপরে চলো। ওই বিশাল বাড়ি বিশাল বিল্ডিং ফেলে এখন একটা খাঁচা ফ্ল্যাটে থাকতে হবে। লিফটে করে আয়েশা ওদের নিয়ে ফ্ল্যাটে যায়। লাগেজ গুলো সিকিউরিটি আর কেয়ার টেকার উপরে পৌঁছে দেয়। ওদের হাতে বকশীস দেয় আয়েশা। বউরা শ্বশুর শ্বাশুড়ীকে সালাম করে। তোমরা সবাই ভালো আছোতো। জ্বী আব্বা। মা বিন্দু,তুই ওদের রুম গুলো দেখিয়ে দে। যাও বউমা তোমরা হাত মুখ ধুয়ে নাও। নাতি দুইজন দাদার কোলে গিয়ে উঠে। কি খবর দাদু ভাই তোমরা কেমন আছো।  তুমি এতোদিন এখানে কি করো। আমাদের খুব কষ্ট। খেলার কেউ নাই। এতো ছোট বাড়িতে থাকো কেমন করে। দাদুভাই এখানে জমি পাওয়া যায়না। তাই ছোট ছোট ঘর আর রুম। বাড়ি যাবে কখন । বিন্দুর বিয়ে হয়ে গেলে আমরা বাড়ি যাবো। তাহলে আমরাও বিয়ে করবো। ঠিক আছে। আগে ফুফুর বিয়ে যাক। দাদু বিয়ে করতে হলে কি করতে হবে। কিছুই করতে হবে না। তোমরা পোষাক পরে বর সাজবে। তুমি বিয়ে করোনি দাদু। করেছিতো দাদু। আমরা দেখিনিতো। তাহলে আবার করবো। দাদু বিয়ে করলে কি হবে। বউ আসবে। আমাদেরও বউ আসবে। তোমারও বউ আসবে। একটা বউতো আছে। এই যে তোমাদের দাদীভাই। দাদী কেমন বউ হবে। দাদীতো বুড়া। আমাদের বউ কি বুড়া হবে? না দাদু,তোমাদের  বউ খুব সুন্দর হবে। লাল টুক টুকে। একদম পুতুলের মতো। ভাবীরা তোমরা রেডি হয়ে আসো। দুপুরের খাবার শেষ করে তোমাদের দুইজনকে নিয়ে বের হবো একটু শপিং করার জন্যে। আজ যাবো ফিউচার পার্কে। দুই জনেই প্রাণ ভরে নিজেদের পছন্দ মতো পোষাক কিনবে। শপিংয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে তোমার বিয়ের গল্প শুনবো। কেমন করে রাজপুত্রকে পেয়ে গেলে। সব বলবো ভাবী। এখন খেতে বসো। কাল সকাল থেকে আমি এখানে থাকবোনা। শ্বাশুড়ীর কাছে যাবো। ওখানেই সাজবো। তোমরা যখন বিকেলে ওই ভাড়িতে যাবে তখন দেখা হবে। আমার কিছু বান্ধবী আসবে। বাংলাদেশে বরের তেমন আত্মীয় স্বজন নেই। পাকিস্তানে  ভারতে ও আমেরিকায় আছেন। ডক্টর আরসালানের দুই বোনই আমেরিকায় থাকেন। সবাই ওয়ালিমার সময় ঢাকায় আসবেন। তোমার কি আমেরিকা যাওয়া কনফার্ম? এক রকম বলতে পারো। আচ্ছা ভাবী, দেয়ালের ছবিটা দেখোতো। ভাল করে দেখো। বলতে পারো। চেয়ারে বসাতো মা মনে হচ্ছে। পিছনে দাঁড়ানো উনি কে? উনি নবাব সালামত খান। কিভাবে এ রকম বানালে। সব মেকআপ ভাবী। এসব ছোট খালার ম্যাজিক। বাবা মা দুজনেই রাজী হয়ে গেছেন। বাবারতো কথা বলার ঢং চেঞ্জ হয়ে গেছে। বাবার দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখো। ছোট খালা কেমন করে এ ম্যাজিক করলে। বাবারতো মোচের ঢং একেবারেই পরিবর্তন হয়ে গেছে। সত্যিই বাবাকে নবাবের মতো মনে হচ্ছে। হাসতে হাসতে সালামত খান বললেন, বাবা মোহাম্মদ নবাবের মতো বলছিস কেন। আমিতো সত্যিই জামালপুরের নবাব। আচ্ছা এবার বলোতো, তুমি কেমন করে এমন বদলে গেলে। এতো নরম হয়ে গেলে। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমি নিজেও বলতে পারিনা। তবে তোদের ছোট খালা হলো উছিলা। উনেছিসতো আমার বড় জামাই এখন থেকে আমাদের সাথে ব্যবসা করবে। তোরা জামাইকে সহযোগিতা করবি। ওর ব্যবসার হেড কোয়ার্টার জামালপুরে শিফট করবে।  শরিষাবাড়ি গদী থাকবে। ওকে গাড়ি কিনে দেবো। নিয়মিত আসা যাওয়া করবে। তোমরা তিনজনেই বিভিন্ন ব্যবসার দায়িত্ব থাকবে। এবার বলো তোমাদের মতামত। বাবা আমরাও খুব খুশী। তোমরাতো নিশ্চয়ই শুনেছো আমি নবার বংশের সাথে আত্মীয়তা করতে যাচ্ছি। এটা আমার মা আয়েশার ভাগ্য। ও রাজরানী হবে। ওর বিয়ে উকিল হলেন ভার্সিটির ভিসি স্যার। মা আয়েশা, এই ভবনের সবাইকেতো জানাতে হবে। দাওয়াত করতে হবে। ফ্ল্যাটওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতির সাথে কথা বলে সবাইকে দাওয়াত করবো।

রূপকথা তুমি তোমার বন্ধু আয়েশার কথা জানতে চেয়েছিলে ফোনে। কথা লম্বা বলে ফোনে বলিনি। আমি খুব খুশী হয়েছি তুমি সোনারগাঁ হোটেলের কফি লাউঞ্জে আসতে রাজী হয়েছো। কবিবন্ধু, সত্যিই বলছি আমিও খুব খুশী। বসো, আগে কফির অর্ডার টা দিই। তোমাকেতো খুবই সুন্দর লাগছে। পার্লার হয়ে এসেছো নাকি। না আমিতো কখনই পার্লারে যাইনা। ঘরে বসে সামান্য মেকআপ করি। এবার বলো আয়েশার খবর কি। তুমি কি জানো, আয়েশা এখন বারিধারা একটা বড়  ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। আগামী কাল ওর আকদ হবে। ভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিষয়ের শিক্ষক ডক্টর আরসালানের সাথে বিয়ে হচ্ছে। সে নবাব পরিবারের ছেলে। আয়েশা ওই বিভাগের ছাত্রী। ভার্সিটিতে ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কারণে তার নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাবিতে সবাই এখন তাকে চিনে। এখন সে  ভিসি স্যারের স্পেশাল কেয়ারে আছে। বলো এখন ঢাকা কি কাজে এসেছো। আমার বরের চিকিত্‍সা আর তোমার সাথে দেখা করা। বর কি জানে? না। তাহলে তুমি আর স্বাধীন হতে পারলেনা। তুমি কিন্তু একজন প্রতিভাবান নারী। একথা বোধ হয় তুমি কখনই অনুভব করতো পারোনি। তুমি কি জানো মোকসেদপুরের জরিফা এখন একেবারেই স্বাধীন। তার স্বামী এখন তার প্রধান বন্ধু। সে যে কোচিং সেন্টার শুরু করেছিল তা এখন এলাকার শ্রেষ্ঠ স্কুল। জরিফার ব্যান্ক একাউন্টে এখন অনেক টাকা। ইতোমধ্যে জমি কিনেছে। আর তুমি বরের ভয়ে অস্থির থাকো। আর তুমি আমাকে বলো সব একদিন ঠিক হয়ে যাবে। তুমি নিজেকে শুধুই একজন নারী মনে করো। কখনই মানুষ মনে করোনি। তোমার  বর তোমাকে একজন দাসী বউ মনে করে। ভোগের বস্তু মনেকরে। সেখানেই তুমি অবনত হয়ে আছো। এখানে কোথায় উঠেছো। আমার খালার বাসায়। কদিন থাকবে। আর কদিন পরেইতো একুশের মেলা। তুমি কি মেলা শেষ করে যাবে? এখন ঠিক বলতে পারছিনা। এখানেও কি চাপ আছে? না তুমি নিজেই অবনত। এক ঘন্টা পরেই দুপুরের খাবার সময়। তুমি আমার সাথে খাবে। আমি তোমাকে খালার বাসায় ড্রপ করে আসবো। আর কিনতে চাও। তোমার মন কি বলে। তুমিতো আমাকে দাদু ডাকো। এ সম্পর্কটা খুবই মিষ্টি। তোমার দাদু থাকলে বুঝতে। নাইতো কেমন করে বুঝবে। বরের ভয় থাকলে বলবে তোমার খালা কিনে দিয়েছে। তুমিতো খুব ভালো লিখো। তোমার দ্বারা কবিতে খুবই ভাল হবে। তোমার ভাষা খারাপ না। তুমি আবেগ সম্পর্কে যা লিখোছো তা খুবই বাস্তব। তুমি কি জানোনা আবেগের অবস্থান আবেগের বাইরে। তুমি জানো কিনা জানিনা। আমি সীমাহীন আবেগী মানুষ। অনেক ডক্তার দেখিয়েছি। কোন চিকিত্‍সা করেছি। কোন ফল হয়নি। আমার আবেগে আঘাত লাগলে আমার হুঁশ থাকেনা। খোদার সাথে আমার প্রেম। আমি বুঝি আর আমার খোদা জানে আমাদের অবস্থা কি। মানুষ কি ভাবে তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাইনা। মানুষতো হাল্লাজকে হত্যা করছে। যেমন সত্য জগতের কোন বিষয় নয়। যিনি সত্যকে ধারণ করেন তাকে জগত হত্যা করে। সমাজ পিটাইয়া মারে না হয় রাজা হত্যা করে আদালতের নামে। আমিতো  আইনকে ও সত্য মনে করিনা। আইন মানুষের তৈরি। নিজেদের সুবিধার জন্যে। এখনতো মানুষ সত্য মিথ্যার ফারাক বুঝতে পারেনা। এ সমাজ এ রাষ্ট্র কি তোমার মাঝে কোন ভাবনার সৃষ্টি করে। আমিতো আর সহ্য করতে পারছিনা। তাই সব সময় মৃত্যু কামনা করি। আমার মাশুক কেন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তা আজও বুঝতে পারিনা। তুমি কি জানো  ইমামে আজম হজরত আবু হানিফাকে খলিফা মনসুর বিল্লা আইনের দোহাই দিয়ে হত্যা করেছেন। একইভাবে সক্রেটিসকেও হত্যা করেছে।রাস্ট্রের কাজ হচ্ছে সত্যকে গলা টিপে হত্যা করা।

চলো, আমরা দুপুরের খাবার শেষ করি।  প্রথমে স্যুপ খাও। সবশেষে মিষ্টি বা ফল খাবে। অনেক আইটেম। এর আগে কি সোনারগাঁয়ে খেয়েছো। এতোক্ষণ আমার কথা শুনে কি বিরক্ত হয়েছো। উত্তরটা অন্তর থেকে দিবে। দেখো কবি, আমি খুবই সাধারন একটি মেয়ে।পড়ালেখা করেছি প্রচলিত নিয়মে। তেমন জ্ঞান নেই। তুমি কবি ও দার্শনিক। কি বলো, সব সময় বুঝতে পারিনা। মনে হয় তুমি আমার প্রেমে পড়েছো। পড়েছিতো। সত্যিই তোমার প্রেমে পড়েছি। তুমি আমার কাছে খোদার প্রতিবিম্ব। খোদার ছায়া। জগতের বা পরজগতের সব শ্রেষ্ঠ গুণই খোদার গুণ। সকল শ্রেষ্ঠ নামই খোদার নাম। তুমি মেয়ে কি পুরুষ তা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। তুমিতো বাস্তবে ছিলেনা। তুমি আমার সাথে স্বর্গেই ছিলে। মানবী হওয়ার বেদনায় তুমি জগতে এসে অতি সাধারন মানুষের মতো খুবই সাধারন একটা সংসার করছো। সংগমের আকাংখা তোমাকে উন্নাদ করেছে। তাই আমাকে ছেড়ে মাটিতে নেমে এসেছো। হে কবি, তোমাকে স্বর্গে দেখেছি। এখন মাটিতে দেখছি। তুমি সেখানেও সুখে ছিলে, এখানেও আছো। খোদা তোমার প্রতি এতো দয়াবান কেন। তিনি অবিরাম করুণা বর্ষণ করে যাচ্ছেন কেন তুমি তাঁর এতো প্রিয়। আমিতো কিছু চাইতে জানিনা। সুখ কাকে বলে আজও বুঝতে পারিনি। তবুও জগত ও জীবনময় শুধু সুখ দেখি। বলো এখন জগত সংসারে কেমন আছো। কেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছি তা বুঝতে পারছিনা। সংগমের বিষয় বলো। এর সুখ আছে অতি ক্ষণিকের। কিন্তু বেদনা অনেক লম্বা সময়ের। সংগম মানুষকে বেহায়া করে দেয়। পশু পাখি, প্রাণীকূল সবাই সংগমের জন্যে মাতাল। তাহলে মানুষ কে, কোথায়। মানুষ হচ্ছে খোদার রহস্য। চিনা চিনি আর জানা জানি হয়ে রহস্য ভেদ হয়ে যায়। কবি, তোমার কথায় আমি বিভ্রান্ত হচ্ছি। আমার হুঁশ চলে যাচ্ছে। এটাই হচ্ছে জগত আর পরজগতের দ্বন্ধ। তুমি একটু বিশ্রাম করো। তারপর শপিংয়ে যাবো। তোমার ইচ্ছা মতো জিনিষ কিনে দেবো। বলোনা বর জানতে চাইলে কি বলবো। বরকে ভয় পেয়োনা। খুব খুশি মনে নিজের ইচ্ছার কথা বলো। আল্লাহ তোমার সাথে আছেন। আমি সাংবাদিক এক মেয়েকে চিনি। যাত বিয়ে হয়েছে ক্লাস এইটে থাকতে। বাপ বিয়ে দিয়েছে জোর করে। সব কাজ বরের ইচ্ছা মতো করতে হতো। সেই মেয়ে এমএ পাশ করেছে খুব ভালো করে। সে এখন সরকারী সংবাদ সংস্থায় কাজ করে। প্রায় এক লাখ টাকা বেতন পায়। মেয়ের বয়স পনেরো ও ছেলের বয়স আট বছর। এবার বলো কার স্ট্রাগল বেশি। তুমি বিয়ে করেছো এমএ পাশ করে। বিয়ের শুরুতেই তুমি অবনত হয়েছো। ঠিক আছে রূপ তোমার জীবনকে সূর্যের আলোর মতো উদ্ভাসিত করো। আমি এখন বিদায় নিচ্ছি । যখন ইচ্ছা হয় আমাকে ডেকে নিও।

সেদিন রাতেই আয়েশা ভাবীদের নিয়ে শপিং করেছে। ভাবীরা খুব খুশি। বাচ্চাদের জন্যেও পাজামা শেরওয়ানী কিনেছে। ফুপি আমরা দাদার মতো সেজে নবাব হবো। নিশ্চয়ই হবে। দাদার নাতিরাইতো পরে নবাব হয়। আচ্ছা ফুপি নবাব হলে কি হয়। আগে অনেক পড়ালেখা করতে হবে। তুমিও কি বেশি বেশি পড়ছো। পড়ছিতো। তাহলে আমরা তোমার কাছে পড়ালেখা করবো। করবেইতো। দেখো বড়ভাবী, আমি কাল সকালে ওই বাসায় চলে যাবো। ওখানেই পার্লারের মেয়েরা আসবে। ওই বাড়ির মা আমার সব ড্রেস কিনে রেখেছেন। এখানে তোমরা সবাই ভাল করে ড্রেস করবে। ছোট খালা বাবার ও মায়ের পোষাকের ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন। আয়েশা ভাইদের বললো,ভাইয়া তোমরা বাবার মতোই ড্রেস করবে। খালা তুমি সব কিছু ভাল করে দেখবে। দুলাভাই আমরা ঠিক চারটায় ওই বাড়িতে পৌঁছাবো। আরসালান আমাদের রিসিভ করবে। নতুন গাড়িতে বাবা মা ও ছোট খালা যাবেন। কারণ, ছোট খালাই প্রিন্সিপাল কোঅর্ডিনেটর। ফারজানা আরসালানের মা গুলশান বেগমকে ফোন করে সব বিষয় ব্রীফ করেছেন। কাজী আর মাওলানা সাহেবের আবার মনে করিয়ে দিলেন। কাবিন আগেই লেখা হয়ে যাবে। আকদ হয়ে গেলে বর কনে দস্তখত করবে। আপনি কাজী সাহেবকে মোহর সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন। কোন চিন্তা করবেন না বেয়াইন সাহেবা। আমরা পঞ্চাশ লাখ টাকা মোহর ঠিক করেছি। বেয়াই সাহেব আপনি জানিয়ে দিবেন। আমি সরাসরি বলতে পারবোনা। তাঁকে আমি খুব ভয় করি। না বেয়াইন সাহেবা দুলাভাই খুব নরম ও দরদী হয়ে গেছেন। এখন ছেলে মেয়েদের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। যা হোক, আমরা বিকেল চারটার দিকে আসবো। কোন অসুবিধা নেই। গেইটে আরসু থাকবে। দেখবেন সব কিছুই ঠিক মত হচ্ছে। এখন ছাড়ি। সালাম বেয়াইন।

আমরা থাহলে দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করেই রেডি হতে শুরু করবো। কথা বলতে বলতেই সময় পার হয়ে যাবে। দেখি আয়েশা কি করছে। হ্যালো বিন্দু, কি করছিস। এলামতো এইমাত্র। মা আমাকে বলেছেন তোমার সাথে কথা হয়েছে। কোথাও কোন সুবিধা হবেনা, এ বাসায় লোকজন একেবারেই নাই। তাই মা’র একটু কষ্ট হবে। বাবাকে রিসিভ করার মতো লোক নাই। তাই আরসু রিসিভ করবে। সবাই ফুলের মালা পরাবে আরসু ও মা। এদের লোকবল সব নিজস্ব স্টাফ। আমি এখানে এসে নাশতা এষ করেছি। এখন পার্লারের মেয়েরা আসবে। মা আমাকে সব ড্রেস দেখিয়েছেন। পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে একটা শাড়ি কিনেছেন। মা’র যত অলংকার আছে সব আমাকে দিয়েছেন। খালা মাকে একটু দাও। হ্যালো মা, কেন আছো। এখানে পুরো একটা বাড়ি, ফ্ল্যাট নয়। বাবা ইচ্ছা করলে এ এলাকায় জমি কিনে রাখতে পারতো। পাঁচ লাখ টাকার জমি একশ কোটি হতো। এখন আমাদের একটা তিন হাজার স্কয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাটে থাকতে হচ্ছে। যাক সে সব নিয়ে এখন তুই চিন্তা করিস না। আল্লাহ তোকে রাজরানী করেছে। আল্লাতায়ালার লাখ লাখ শোকর। মা ঠিক সময় চলে এসো।

ঠিক চারটার সময় তিনটে গাড়ি এসে আরসালানদের বাড়ি সামনে এসে দাঁড়ায়। পরে কেয়ারটেকার এসে গাড়িগুলো ভিতরে নিয়ে পার্ক করার ব্যবস্থা করে। গুলশান বেগম ও আরসালান এসে সালামত খানকে রিসিভ করেন। সাথে আয়েশার মা ও ছিলেন। আসুন আপনারা ভিতরে আসুন। সবাইকে ফুলের মালা দিয়ে রিসিভ করা হলো। বেয়াই সাহেব আপনি এই চেয়ারে বসেন। আপনার পাশে বেয়াইন সাহেবা,দুই ছেলে, দুই মেয়ে দুই বউ বসবে। আয়েশার মামা ও খালু এখানে বসবেন। ভিসি সাহেব এসে গেলে আমরা আলোচনা শুরু করবো। সালামত খান আরসালানকে কাছে ডাকলেন, বাবা আমি তাড়া হুড়োর ভিতর তোমার জন্যে কিছুই কিনতে পারিনি। ধরো এই চেকটি তোমার কাছে রাখো। বেয়াইন সাহেবাকেও ডাকো। কি বেয়াই সাহেব,কিছু বলবেন। না তেমন কিছু না। সময়ের অভাবে আমিতো আরসালানের জন্যে কিছুই কিনতে পারিনি। তাই ওর হাতে এই চেকটি দিলাম। বেয়াদপী মাফ করবেন। কি যে বলেন বেয়াই সাহেব। আপনি সবার মুরুব্বী। এখন থেকে দুই পরিবারের মুরুব্বী আপনি। এই এক কোটি টাকার চেক নিয়ে আরসু কি করবে। আমি আমার জামাইকে উপহার দিলাম। আপনি না করতে পারবেন না। অন্যান্য মেহমানের সামনে আমি বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইনা আরসালান পা ছুয়ে সালাম করতে চাইলে সালামত খান তাকে টেনে বুকে নেন। পাঁচটার দিকে ভিসি সাহেব সবাইকে নিয়ে আরসালানদের বাড়িতে আসেন। সাথে পল সায়েন্সের কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রী এসেছেন। ফারজানা এসে গুলশান বেগমকে বললেন আয়েশাকে নিচে নিয়ে আসতে। প্রথমে কাবিনে দুজনে দস্তখত করবে। তারপর মাওলানা সাহেব দোয়া পরিচালনা করবেন। আয়েশা নিচে আসার পর সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। এ কি মানুষ না পরী ! আয়েশার বান্ধবীরা ওকে ঘিরে ধরলো। কিরে বিন্দু শেষ পর্যন্ত তুই জয়ী হলি। এমন শান্ত শিষ্ট স্যারকে কাবু করলি কি করে। চুপ কর, এসব বিষয় নিয়ে পরে কথা বলবো। এখানে সব মুরুব্বী। ভিসি স্যার, আমাদের চেয়ারম্যান স্যার আছেন। চুপ চাপ বস। দেখ কি হতে যাচ্ছে। আমরা এখন কাবিনে দস্তখত করবো। তারপর দোয়া হবে। দোয়ার পর আয়েশা ও আরসালান মুরুব্বীদের সালাম করলো। এরপর আয়েশা সবার সাথে আরসালানকে পরিচয় করিয়ে দিলো। আরসালান অনেকের সাথে কোলাকুলি করলো।

সবশেষে আরসালান আয়েশার হাতে নগদ পঞ্চাশ লাখ টাকা তুলে দিলো। এ টাকা তোমার একাউন্টে জমা রেখো। এ টাকা একশ ভাগ তোমার। আজীবন বিনিয়োগ করে রাখতে পারবে। বাবা বুঝি তোমাকে এক কোটি টাকা দিয়েছে। তোমারতো পঞ্চাশ লাখ টাকা লাভ হয়ে গেলো। এ টাকাও তোমার একাউন্টে রাখতে পারবে। তোমার বাবার ভয়ে না করতে পারলাম না। চলো আমার ভাবীদের সাথে পরিচিত হও। ওরা দুজনই খুবই বিনীত। সব সময় হাসি খুশী থাকে। কি দুলামিয়া, আমার ননদকে কি ভাবে ভাগালে। না ভাবী আমি ওকে ভাগাইনি। ও আমাকে জালে আটকিয়েছে। এখনতো ভার্সিটিতেও পড়াবে, বাসায়ও পড়াবে বিছানায় শুয়ে। ভাবী এখনি মসকরা শুরু করে দিলে। দুইজন একসাথেই কুলসুম বেগমের কাছে যেয়ে বসে। ফারজানা বেগম কেয়েরটেকারকে ডেকে মিষ্টি সার্ভ করতে বললো। সালামত খান আয়েশার মামাদের কাছে যেয়ে বসেন। কি খবর শালা সাহেবেরা। তোমরা এসেছো দেখে আমি খুবই খুশি। দুলা ভাই আপনি নাকি মোমবাতি হয়ে এছেন। ছিলেনতো এক ইঞ্চি রড। হঠাত্‍ করে মোম হলেন কেমন করে। কে ম্যাজিক দেখালো। তোমাদের বোন ফারজানা। ও কি আপনার কানে হাত দিয়েছিলো। না, তা করেনি। কিন্তু চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করেছে। ওর এমন সাহস হলো কেমন করে। দুলাভাই আমরা আপনার সাথে আছি। তদন্ত করে বের করতে হবে এতো বড় সাহস কার। কার আর এমন সাহস হবে। নিশ্চয়ই আমার মেয়ে আয়েশার এ কাজ। বিন্দু ফারজানাকে উসকিয়ে দিয়েছে। দুলা ভাই আপনি নাকি সবাইকে হাতে রাখার জন্যে দুই হাতে টাকা বিলাচ্ছেন। আমরাতো এখনও কিছুই পাইনি। এখনি দিবো। পাবি,দুই হাত ভরে দেবো। ফারজানার কানটা মলে দে। কি বলেন দুলাভাই, সেতো একটা বাঘিনী। ও আপনাকে কাবু করে ফেলেছে। আমরা কোন ছার। দেখুন, আপনইতো ওকে লাই দিয়ে এ রকম বানিয়েছেন শেষ পর্যন্ত সে আমাদের কান কেটে নিবে। ও কি কারো কথা শুনে। আপা বললে হয়তো শুনতে পারে। যদি ফারির কান মলতে পারো তাহলে পাঁচ লাখ টাকা পাবে। একদিন সময় দিলাম। এমন সময় গুলশান বেগম এসে বললেন বেয়াই সাহেব ডিনার সার্ভ করতে বলেছি। আপনি ভিসি সাহেব ও ভার্সিটির মেহমানদের নিয়ে বসেন। বাকি সবাইকে ফারজানা বেয়াইন দেখবেন। কোন অসুবিধা হবেনা। আমাদের কেয়ারটেকার সব সামলিয়ে নেবেন। খালা আমাদের ফ্ল্যাটের মেহমানদের ভালো করে দেখবে। আরসু তুমিও থাকো। তা না হলে তোমাদের বদনাম হয়ে যাবে। সেটা এসে আমার গায়ে লাগবে।

আয়েশা ভিসি স্যারের কাছে যেয়ে পা ছুঁয়ে সালাম জানায়। আরে মা এখন সালাম করার সময় নয়। তোমার বিয়ের উদ্যোক্তা হয়ে আমি খুবই খুশি। তোমরা খুব ভাল জুটি হবে। আল্লাহ তোমাদের সুখে রাখবেন। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে তুমি একদিন সারা আমেরিকায় নাম করবে। তোমার জন্যে আমার অশেষ দোয়া রইলো। স্যার ইনি আমার মা। আর বাবা সালামত খান। ভিসি সাহেবকে আমার অন্তরের ভালবাসা জানাচ্ছি। দেখুন খান সাহেব, এ বিয়ের প্রথম উদ্যোক্তা ডক্টর ক্রস। তিনিই প্রথম আমাকে বিষয়টা জানান। আমি খুব আনন্দে বিষয়টা গ্রহণ করি। আরসালান মায়ের পক্ষে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, আগামী পঁচিশে ফেব্রুয়ারী হোটেল ওয়েস্টিনে ওয়ালিমার অনুষ্ঠান হবে। আপনারা সবাই আমন্ত্রিত। সন্ধ্যা আটটা। আয়েশাকে ডেকে কুলসুম বেগম খান সাহেবকে ডাকতে বলেন। শালাদের সাথে হঠাত্‍ করে এতো কি কথা বলছেন। ওরা একটু সেন্টিমেন্টাল। অল্পতেই বিগড়ে যেতে পারে। সম্পর্ক আস্তে আস্তে এগিয়ে নেন। আপনার নাতিরা কই। ওই দিকে মায়ের কাছে। কুলসুম বেগম সেদিকে এগিয়ে যান। নাতিদের বুকে টেনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন তোমরা খেয়েছো দাদু। কে খাইয়ে দিয়েছে। মা। খাবার কেমন হয়েছে। খুব ভালো দাদু। দাদু এ বাড়িটাতো বিরাট। এটা বুঝি ছোট ফুপির বাড়ি হবে। ফুফার সাথে পরিচয় হয়েছে। না, কে পরিচয় করিয়ে দিবে। ফুপিতো খুব ব্যস্ত। চলো ফুপির কাছে। কিরে বিন্দু আমার নাতিদের জামাইয়ের পরিচয় করিয়ে দে। এই আরসু, এদিকে আসো। এইযে দেখছো, এরা বাবার বন্ধু। বাবা এদের ঘোড়া। এ সাহস এই বংশে আর কেউ করতে পারেনা। আরসালান একজনকে কোলে তুলে নিলে আরেকজন আড়ি দিলো। ফুফা তুমি ওকে কোলে নিলে কেন। আমিতো ওর বড়। এমনসময় মোহাম্মদ কাছে এসে বললো, বাবা ফুফা তোমাদের দুইজনকে একসাথে কোলে নিতে পারবেনা। কেন পারবেনা। ফুফার গায়ে অত শক্তি নাই। তাহলে ছোট ফুপিকে কোলে নিবে কেমন করে। কোলে নিতে হয় তোদের কে বলেছে। কেউ বলেনি। হিন্দী সিনেমায় দেখেছি। বরেরা বউদের কোলে নেয়। এখন আসো আমরা আমাদের বাসায় ফিরার বাসায় ফিরে যাবো। মেহমানরা সবাই বিদায় নিলে খান সাহেব বাসায় ফিরার উদ্যোগ নিলেন। ফারজানা সবাইকে গাড়িতে উঠতে বলো। বেয়াইন সাহেবা আমাদের বিদায় দিন। আমরা বিন্দুকে সাথে নিয়ে যাবো। আরসালান কাল সকালে মা কে নিয়ে আমাদের বাসায় যেও।

রূপকথা ১০

দুপুরের খাবার রেডি এবং টেবিলে সাজানো হয়েছে। খান সাহেবের ইচ্ছা ছিল বাইরে কোথাও কেয়ে নেয়া। কিন্তু আয়েশা রাজী হলোনা। বললো বাসায় ফিরে কিছু আলাপ আলোচনা আছে। আয়েশা কিছুই কিনেনি। মার কাছে জানতে চাইলো মা খুশী কিনা। খালা বললো,বিন্দু তোর চয়েশ খুবই ভালো। কিন্তু আমাদের আফসোস তুই কিছুই কিনলিনা। কুলসুম বেগম বললেন, এতো টাকা খরচ করার কোন দরকার ছিলোনা। সারাজীবনতো বাবার পছন্দ মতো শাড়ি পরেছো। আক নিজে দোকানে গিয়ে নিজের পছন্দ মতো শাড়ি কিনলে। কি বলো বাবা তুমি খুশীতো। খুশী মানে হাজার বার খুশী। আমাদের সময়ে বউ নিয়ে শপিংয়ের কোন রেওয়াজ ছিলনা। তাছাড়া আমার বাবার সামনি দিয়ে বউ নিয়ে বের হতে সাহস করতামনা। বিয়ের পর পর কয়েকবার সিনেমা দেখতে গিয়েছি বাবার অনুমতি নিয়ে। তাও আবার বোখা পরো না হয় লম্বা ঘোমটা দাও। এখনতো দেখি বহু মেয়ে হিজাব পরে। দিন দিন বেড়ে চলেছে। যারা নিজেদের বেশি প্রগতিশীল মনে করে তারা হিজাব পরা পছন্দ করেনা। তোদের ভার্সিটিতে কি অবস্থা? এখন প্রায় ষাট ভাগের মতো মেয়ে হিজাব পরে। কিছু কিছু স্কুল কলেজে অতি উত্‍সাহী শিক্ষকেরা হিজাব বন্ধ করতে চায়। বিন্দু তুইও পরতে চাস। না বাবা, আমি খুব শালীন ভাবে চলি। ভার্সিটিতে বহু মেয়ে জিন্স ও টিশার্ট পরে। ওড়না পরলেও গলায় পেঁচিয়ে রাখে। বেশ কিছু মেয়ে আছে বুক ঢাকেনা। ওটা নাকি নারী স্বাধীনতার প্রতীক। কয়েকজন আছে লিভ টুগেদারও করে। তবে এসব করে ধনী ও বাম ঘরানার মেয়েরা। এরা রাজনীতিও করে। তোর কোন অসুবিধা হচ্ছেনাতো। না বাবা ,একেবারেইনা। আমার ব্যাপারে স্যারদের বিশেষ নজর আছে। তুমি বুঝতে পারছোনা যে, আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবেন ভিসি স্যার। তাঁর সাথে থাকবেন আমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান স্যার ও ডক্টর ক্রস। আগামী কাল সকালে এগারটার দিকে আসবেন। বিকেলে তোমার ড্রেস এসে যাবে। তুমি সেটা পরেই আরসালানদের বাসায় যাবে। মা তুমি মামাদের ফোন করে বলেছো। বলেছি, তোর বাবাও দাওয়াত করেছেন। আমার ভাইরা নরম মানুষ। আমি বলার সাথে সাথেই রাজী হয়ে গেছে। ওরা খুবই বিনয়ী। তোর বাবাইতো ওদের অবহেলা করতো। ওই কারণেই সম্পর্কটা দুর্বল হয়ে গেছে। দেখ, কত বছর ওদের সাথে যোগাযোগ নেই। অথচ কোন অভিমান নেই। বলার সাথে সাথে রাজী হয়ে গেছে। তোর বাবা যেভাবে বলেছে তাতে ওরা রাজী না হয়ে পারেনি।

আচ্ছা বাবা, আমরা কালকের বিষয় নিয়ে একটু আলাপ করি। আসো আগে লাঞ্চটা শেষ করে ফেলি। ঘরেইতো আছি। তাড়াহুড়ো নেই। খেয়েদেয়ে কফি খেতে খেতে কথা বলবো। বসো, সব খাবার টেবিলে আছে। তুমি বললেই তুলে দেবে। মা তুমি বাবার পাশে বসো। বাবা যেভাবে চাইবে সে ভাবেই তুলে দাও। কি বলো বাবা। ঠিক বলেছিস। ফারজানা কই? তুই এখানে বস।আপু তুই আর আমি পাশাপাশি বসবো। তুইতো বুদ্ধি করে কিছুই কিনলিনা। আরসালানের মা আমার জন্যে অনেক কিছু কিনেছেন। তাই আর কিনলামনা। বিন্দু এখন কোন কথা নয়। চুপচাপ খাও। তারপরেই সব বিষয়ে কথা বলবো।  সবাই একঘন্টার মধ্যে খাওয়া শেষ করে সোফায় বসলো। বুয়া সবার জন্যে কফি নিয়ে আসলেন। শোন বাবা, কাল এগারোটার দিকে ভিসি স্যার ও অন্যান্যরা আমাদের বাসায় আসবেন। তুমি বলবে, কথা পরে হবে। আগে নাশতা করুন। সময় থাকলে লাঞ্চ করে যাবেন। বেশি কোন কথা নেই। আপনার হাতে আমার মেয়েকে তুলে দিলাম।  আপনি খুব তাড়াতাড়ি আকদের ব্যবস্থা করুন। আমাদের কোন দাবী নেই। আপনাদের কোন দাবী থাকলে আমরা সেটা পূরণ করবো। মোহর কি হবে তা আপনারা ঠিক করবেন। তবে মোহরটা নগদ পরিশোধ করতে হবে। বরের ক্ষমতা অনুযায়ী মোহর হবে।  বাবা তোমার সাথে কথা শেষ করে স্যারেরা নিশ্চয়ই আবার আরসালানদের বাসায় যাবেন। বারোটার ভিতরেই তাঁরা মিশন কম্প্লিট করবেন। আমি ওই  বাড়ির মায়ের সাথে কথা বলে নেবো। তুমি জামাইকে কি দিবে তা ঠিক করেছো? সেটা আমি গোপন রাখতে চাই। একটু ইংগিতও দিবেনা। না কিছুই বলবোনা। আমার মেয়ের বিয়ের উকিল হলেন ভার্সিটির ভিসি সাহেব। আমি এতে খুবও বোধ করছি। সাথে রয়েছেন ডক্টর ক্রস ও ডক্টর আকমল। সত্যিই কুলসুম বেগম আমার বড় সৌভাগ্য। সাথে সাথে আমি অনুতপ্ত ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা না শিখিয়ে। এত  বড় ভুল আমার জীবনে আর নেই।

তাহলে বাবা, তুমি এখন রেস্ট নাও। কাল সকালের দিকে তোমার পোষাক নিয়ে আসবো। পুরো পেমেন্ট দেয়া আছে। এখন শুধু ডেলিভারী। খালা তুমিইতো যাবে। হ্যাঁ আমি যাবো। সাথে আপুকে নিয়ে যাও। বহু বছর পর আপু খোলা হাওয়ায় নিশ্বাস নিচ্ছে। তোর দুলাভাই আমাকে খুবই আদর  ও সম্মান করেন। কখনও মন্দ কথা বলেন নি। টাকা পয়সারও অভাব নেই। শুধু বাবার সাথে কি নিয়ে ঝগড়া করে সম্পর্কের জটিলা সৃষ্ট হয়েছে। বাবাকে একেবারেই নতুন করে দিয়েছে আমাদের একমাত্র মিষ্ট খালা । কেমন করে এমন বিস্ময়কর কাজ করলে খালা। কিছুই করিনি বলেছিতো। শুধু তোর বাঘ বাবাকে কষে বকা দিয়েছি। বাঘ কেন যেন সেদিন টু শব্দটিও করেননি। একেবারেই চুপ করে বসেছিলেন মাথা নিচু করে। আমি ভয়ও পাচ্ছিলাম। কিন্তু সেদিন কেন যেন মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। ্যাক সবই আল্লাহর ইচ্ছা। তা না হলে কিভাবে বাঘটা নরম হয়ে গেল। আসলে মোড়লী করে এমন মানুষটা এমন হয়ে  গিয়েছিল।

আচ্ছা দুলা ভাই আপনার কাছে কতটাকা আছে? এটাতো ব্যান্ক বলতে পারবে। আমি কি হিসাব রাখি। কেউ হিসাব রাখেনা। এছাড়া আমার নগদ তেমন টাকা নেই। আমি নগদ টাকা রাখিনা। মাড়োয়ারীর বলে টাকা হলো ব্যাংয়ের মতো। শুধু লাফাতে থাকে। তাই একে মুখ বন্ধ করে থলের ভিতর বেধে রাখতে হয়। নগদ টাকা মানুষের ব্রেইন নষ্ট করে দেয়। আমাদের অবস্থা দেখ। ওদের কোন দায়িত্ব নেই। কিন্তু ব্যয় করার অবাধ ক্ষমতা। এখন থেকে এসব বন্ধ হয়ে যাবে। সংসার খরচ অফিস থেকে যাবে। ওরা একটা মাসিক ভাতা পাবে। রাজ সকাল দশটায় অফিসে যেয়ে বসবে। বিকেলে ছয়টার ভিতে বাড়ি ফিরবে দুই ভাই এক সাথে। বউরা এদের চলাফেরা মনিটর করবে। বউ দুইটা খুবই শান্ত। সংসারে ওরা শুধু কাজ করে। কোন শব্দ নেই। এরা শিক্ষিত ভদ্র পরিবারের মেয়ে। আয়েশা বাপের কাছে এসে বাপকে আদর করে। বাবা তুমি মনে কষ্ট নিওনা সব ঠিক হয়ে যাবে। সব নিয়ম কানুন করে দাও। সব ব্যবসার পরিচালনার ভার ভাগ করে দাও। একথা তোমাকে আগেও বলেছি। যে ফেল মারবে তাকে আলাদা করে দিবে। অন্য জায়গায় বাড়ি করে দিবে। সে নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নিবে। বাবা ভাগ্য নিজেকেই গড়তে হয়। নাতিদের ছেড়ে আমি করে থাকবো। ওরাতো আমার সাথী। মা হাসতে হাসতে বললো, ওরা বাঘকে ঘোড়া বানায়। আমি শুধু হাসি আর দেখি। বাঘ কেমন নাতিদের পিঠে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেনা এই মানুষ সালামত খান। ছোট নাতি পিঠে উঠে কান ধরে হট হট করে। বড় নাতি বলে দাদু ঘোড়া বুড়া হলে কি করে। দাদু গুলি করে মারে। তোমাকেও ঘুলি করবো। আমিতো শুধু ঘোড়া না, তোমাদের দাদুও। গুলি করলে দাদু পাবে কোথায়। দাদু তোমরা কি পড়ালেখা করো। করি দাদু। কি পড়? এ ফর অ্যাপল, বি ফর বল, সি ফর ক্যাট। তুমি কি এসব জানো দাদু। না দাদু, এসব পারিনা। তোমার বাবা তোমাকে পড়ায়নি । না দাদু। ছেলেদের আলাদা বাড়ি করে দিলে তোর বাপ বেশীদিন বাঁচবেনা। মা নরম হয়ে কোন সংসার বা প্রশাসন চালানো যায় না। আমি আমেরিকা না গেলে তোমার ব্যবসা ঢাকায় বসে দেখবো। তখনতো তুই আরেক বাড়ির বউ হয়ে যাবি। নিজের ইচ্ছায় কি চলতে পারবি। বাবা তোমরা আর কিছু অশিক্ষিত মোল্লা ইসলামকে ডুবাচ্ছো । ইংরেজী শিক্ষিত লোকেরা ইসলাম জানেনা। অথচ তারাইতো দেশ আর সরকার চালায় । ষোল কোটি মুসলমানের দেশে বড় কো সরকারী পদে ইসলাম না জানলেও চলে। এ এক বিস্ময়কর দেশ। ভারতীয় সিনেমা গুলোতেহয় মুর্তি পুজা দেখানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশের দেশে মসজিদ মাদ্রাসা দেখালে সেন্সর বোর্ড সে সিনেমার অনুমতি দেয়না। এটা নাকি সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করে।

রূপ বললো দেখো কবি, তোমার উপন্যাসের কতটুকু এগোলো। ভালই এগিয়েছে। আশা করছি মেলায় আসতে পারবে।। আমি খুব সিরিয়াসলি কাজ করছি। বেশি বড় করবোনা। খুব বেশী হলে একশ বিশ বা তিরিশ পৃষ্ঠা করবো। আয়েশার অবস্থা কি? সেতো খুব  করছে। ইতোমধ্যে ভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ডিবেটে। এখন ইন্টার ভার্সিটি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হবে বলে সবাই আশা করছে। আয়েশার ইন্টারন্যাশনাল গাইড ডক্টর ক্রস খুবই আশাবাদী। এমন কি তিনি মনে  করেন  আয়েশা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে। তোমার স্বপ্নের আয়েশার চেয়েও এই আয়েশা অনেক ভাল করছে। তুমিওতো কলেজে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলে। তোমার বাপ যদি তোমাকে ভার্সিটিতে পড়তে দিতে তাহলে হয়ত তুমি চ্যাম্পিয়ন হতে। তবে তুমি আয়েশার চেয়ে একটু বেশি অলস ও আয়েসী। তোমার মেধা আমার মনে হয় আয়েশার চেয়ে বেশি ছিল। এখনতো তুমি আমার অন্তরের রূপকন্যা। পরীর মতো ঘুরে বেড়াও ।বাস্তবে তুমি জরিফার চেয়েও পিছে পড়ে আছো। আমি নিজেও তোমাকে আয়েশার দেখতে চেয়েছিলাম। আমার সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আমি জানি তুমি আমার কথায় কষ্ট পাও। কল্পনায় আছো বলে একটু শান্তিতে আছো। বাস্তবে হলে তুমি কেঁদে বুক ভাসাতে। বরের বকা শুনতে শুনতে কাহিল হয়ে যেতে। কল্পনায় তোমার আকাংখা থাকলেও বাস্তবে তার কিছুই নাই। আমার অন্তরে থেকেও তুমি বাস্তবে ঘুরে বেড়াও । বর পেতে চাও। তার বুকের উম পেতে চাও অতি পাঁচটা সাধারন মেয়ের মতো। এর আগেও তোমাকে বলেছি মানবীর লক্ষ্য হলো প্রজনন। যেমন বিবি হাওয়া করেছিলেন। আমার সাথে থেকেও তুমি নেই। কিন্তু আমিতো কবি ছাড়া আর কিছু হতে পারবো না। আমি তোমাকে আমার কাব্যলক্ষ্মী ও জীবন দেবতা করেছিলাম। আমার মৃত্যু পর্যন্ত তুমি আমার সাথে থাকবে। তারপর তুমি ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাবে ।তুমি আমার অন্তর স্বর্গ থেকে নেমে মানুষের মর্তে ফিরে যাতে চাও। এখন বলো তুমি কখন আমাকে ত্যাগ করবে । আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুত। তোমার কারণেই আমি কবিতা লিখি । আদনের বাগানে তোমার সাথে গল্প করি। তুমি সবুজ  পাখি হও, নীল পাখি হও। তুমি পরী হও। পুরো স্বর্গ মর্ত্য ঘুরে আবার কাছে ফিরে আসো। আর এই কবি স্বর্গেই পড়ে থাকি। তুমিতো জগতে ইয়ে নর নারীর সংগম দেখো। জগতে কোটি কোটি নর নারী  যাদের দৃষ্টি নিম্নগামী তারা ভিডিওর মাধ্যমে এসব দেখে পাশবিক তৃষ্ণা মিটায়। বিভ্রান্ত হয়ে কোন পুরুষের সাথে শুয়ে পড়ে। এসব হচ্ছে অতি অতি প্রথমিক নরনারীর কাজ। তাই মানুষ খোদার কল্পনার মতো পবিত্র হতে পারেনা। আমি তোমাকে পবিত্রতম স্বর্গের নারী হিসাবে দেখতে চেয়েছিলাম। তোমাকে রাবেয়া বসরীর মতো পবিত্র দেখতে চেয়েছিলা। এখন দেখছি তুমি তা পারবেনা।  যাও তুমি মাটির পৃথিবীতে কাটিয়ে আসো। আমি আমার প্রভুর কাছে তোমার জন্যে প্রার্থনা করবো। তুমি যেনো সরাসরি অপরূপ নারী হিসাবে জগতে যেতে পারো। কোন মা বাপ তোমাকে তাদের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে হিসাবে গ্রহন করবে। এটাই আমার ইচ্ছা যা আমার প্রভু বাস্তবায়িত করবেন। তুমিতো জানো প্রভু আমাকে অতি ভালবেসে কবি করেছেন। কি হলো রূপ, তোমার চোখ ছলছল করছে কেনো। স্বর্গ ছেড়ে মর্তে যাওয়ার বেদনা আমাকে দূর্বল করে ফেলছে। জগতে গেলে কিন্তু আর ফিরতে পারবেনা। মানব জীবনে তোমাকে নানা ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করতে হবে। নানা পরীক্ষা দিতে হবে। হে কবি আমার বিচ্ছিন্নতা তোমার মনে কি কোন প্রতিক্রিয়া  হবেনা। নিশ্চয়ই হবে। এতদিনের সাথী। আমার মূল মাশুক আল্লাহ নিজেই। তিনিই আমার অন্তরে ভাবনা তৈরি করেন। তিনিই আমার কবি জীবনের মালিক।

পরের দিন সকাল দশটার দিকে ভিসি স্যার ফোন করেছেন। তিনি তাঁর টীম নিয়ে এগারোটার দিকে আসবেন বলে জানিয়েছেন। আয়েশা তার বাবাকে জানায়।  বাবা আমরা দুজনই নিচে যেয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা জানাবো। তুমিতো জানো এটা আমাদের সৌভাগ্য যে ভিসি স্যার বিয়ের উকিল হয়েছেন। আমি তোমার ভাগ্যবতী মেয়ে। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েই এতো নাম করেছি। তাই সবাই আমাকে আদর করেন। ভিসি স্যার এখন আমাকে বিদেশে পাঠাবার কথা চিন্তা করছেন। ক্রস সাহেব আমার স্কলারশীপের গ্যারান্টি দিয়েছেন। ঠিক এগারটায় স্যারেরা আমাদের বিল্ডিংয়ের সামনে এসে নামলেন। আয়েশার বাবা সালামত খান তাঁদের অভ্যর্থনা  জানালেন। আপনাদের সবাইকে সালাম। আমি সালামত খান, আয়েশার বাবা। বাবা, ইনি আমাদের ভিসি স্যার। ইনি আমার ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। আর ইনি আমার গাইড ডক্টর  ক্রস। চলুন স্যার আমাদের ফ্ল্যাটে।  আয়েশা সবাইকে নিয়ে ফ্ল্যাটে গেল।  বসুন স্যার। আয়েশা  আমরা তোমাদের বাসায় নাশতা শেষ করে আরসালানের বাসায় যাবো।  তোমার বাবার মত আমরা আগেই জেনেছি। একই বিষয় আর রিপিট করার দরকার নেই। সালামত খান জানালেন স্যার আপনি বিয়ের উকিল হওয়ায় আমি আপনার কাছে ঋণী। বলেন কি? আয়েশা আমার মেয়ের মতো। ও খুবই মেধাবী। আমরা চেষ্টা করছি  ও্কে বিদেশে পাঠাবার জন্যে। আপনি দোয়া করবেন। আপনার মেয়ে আপনার বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। সারা দেশের লোক ওর জন্যে গৌরবান্বিত হবে। নাশতা শেষ করেই ভিসি স্যার আরসালানের বাসায় গেলেন। আরসালান  সবারইকে রিসিভ করলো। আসুন স্যার, আমার মা।  আমার সৌভাগ্য যে বিয়ে  উপলক্ষ্যে আাপনারা আমার বাসায় এসেছেন।

দেখুন, আরসালানের মা, সালামত খান সাহেব বলেছেন আপনারা যেভাবে চাইবেন সেভাবেই বিয়ে হবে। তবে উনারা সেদিনই আকদ চান।  আমিও মনে করি সেদিনই আকদ হয়ে যাক। আপনি কি বলেন। আমরা রেডি আছি। সে ভাবেই সব ব্যবস্থা করেছি। আপনি চিন্তা করবেন না। কাজী সাহেব ও মাওলানা সাহেব উপস্থিত থাকবেন। পুরো মোহর আমরা নগদ পরিশোধ করবো। সে টাকা আয়েশার একাউন্টে এফডিআর করা থাকবে। সেদিন সকালেই আমি আয়েশাকে আমার এখানে নিয়ে আসবো। আমি আমার মনের মতো করে সাজাবো। আপনারা আয়েশার বাবাকে রাজী করাবেন। শেষ সময়ে যেন এ নিয়ে কোন কথা না হয়। আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি কেউ কোন আপত্তি করবেনা। আপনি সকালে গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে আসবেন এবং মনের মতো করে সাজিয়ে আসরে হাজির করবেন। দেখুন স্যার, আমার একটি মাত্র ছেলে। আমি ওর মা। পঁচিশে ফেব্রুয়ারী ওয়েস্টিনে ডিনার হবে। সেদিন হোটেলেই ওদের বাসর হব। এসব আমি আয়েশাকে বলেছি। একুশে ফেব্রুয়ারী আয়েশার ফাইনাল। আমি দোয়া করছি ও যেন চ্যাম্পিয়ন হয়। চ্যাম্পিয়ন না হলেও ও আমার ছেলের বউ হবে। আকদের পর আয়েশা এ বাড়িতে আসবে কিন্তু রাতে থাকবেনা। দিনের বেলাও  দুজন এক রুমে মিলিত হতে পারবেনা। দেখুন বেগম সাহেবা এসব আপনাদের পারিবারিক ব্যাপার। দুই পরিবার একমত হয়ে সব কিছু করবেন। তাহলে আমরা এখন যাই। লাঞ্চ রেডি। জ্বী না পারবোনা। আমার অফিসে মিটিং আছে। এখনি যেতে হবে। আরসালান বললো, স্যার কিছুইতো খেলেন না। পরশুতো আবার আসছি। স্যার, আমরা ডিনারের ব্যবস্থা করেছি।  ওয়েস্টিনের লোকেরা সার্ভ করবে। খাবার ওখান থেকেই আসবে।

ফেরদৌস থেকে আনা পোষাক ট্রায়াল দিয়ে ধেখছেন সালামত খান। মোকাসিনের পাম্পসু, আলীগড়ি পাজামা,আদ্দির পাঞ্জাবী,মাথায় ইন্দোনেশিয়ান টুপি মিলিয়ে এখন সালামত একজন বনেদী নবাব। কি দুলাভাই আয়নার সামনে বলুন নিজেকে চিনতে পারেন। আপা দুলাভাইকে দেখে কি মনে হয়। এখন তোমাকেও সাজাবো। দুজনকে পাশাপাশি রেখে ছবি তুলবো। সই ছবিই হবে এই পরিবারের অফিসিয়াল ছবি।এর আর কোন পরিবর্তন হবে না। পারসোনা থেকে একজন বিউটিশিয়ান ও ড্রেস ডিজাইনার এসেছেন। উনি আপার ড্রেস ও মেকআপ দেখবেন। তুমি কি বলো আপা। আমার কাছে এসব পাগলামো মনে হচ্ছে। এসব করার কি দরকার আছে। আছে আপু আছে। তাহলে জগতে ড্রেস ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে উঠতোনা। ঢাকায় এখন নামকরা বহু বিউটি হাউজ গড়ে উঠেছে। অনেকেই বিউটি পার্লার বলে থাকেন। আমাদের জামালপুরেও আছে। বিয়ের সময় মেয়েদের সাজাতে নিয়ে যান। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মেয়েরা সাজতে যায়। হ্যালো ম্যাডাম আপনারা কোন ডিজাইন ফলো করবেন। বেগম সাহেবার জন্যে মোগল নারীদের মেক আপও ড্রেস ফলো করবো। আমরা ডিজাইনের ছবি নিয়ে এসেছি। আপনি দেখেন। ঢাকার নবাববাড়ি মেয়েরা কেমন ড্রেস করতেন, এটা হলো নবাব সিরাজ উদ দৌলার পরিবারের মেয়েদের পোষাক, আর এটা হলো মোগল দরবারের সম্রাজ্ঞীদের পোষাক। আমরা এখান থেকেই বাছাই করবো। কুলসুম বেগম বললেন, দেখুন আমি একজন শিক্ষিতা মেয়ে। গ্রামে থাকি। ড্রেস মেকআপ বুঝি। এখন আমার বয়স হয়ে গেছে। পুরুষের বয়স হলে সৌন্দর্য বাড়ে। মেয়েদের তা হয়না।  বিয়ের পর থেকে সংসারের কাজ করতে করতে শরীরের কিছুই নাই। গ্রামের বিত্তবান পরিবারের বউ।  সারাদিন কাজ করো। দুপুরের খাওয়ার ঠিক নাই। বিকেলের গোসল করে দুপুরের খাওয়া শেষ করা। তখন সন্ধ্যা প্রায়। শ্বশুড়ীরা ছিলেন সংসারের কর্তা। তাঁদের হুকুম তামিল করাই ছিল নতুন বউদের কাজ। পুরুষরা সংসারের কিছুই করেন না। রাত গভীর হলে স্বামীর বিছানায় যাওয়া। এখন তোমরা আমাকে মোগল রাণী বানাবে। কিরে মা বিন্দু তুই কই গেলি? এসব তুই করছিস। না মা, এসব খালার কাজ। কিরে ফারি, এমন করছিস কেন? কই আপু, ওরা তোমাকে বলছে।  বলাতো ওদের ব্যবসা। ওরা বিদেশ থেকে বিউটির ব্যাপারে ডিগ্রী নিয়ে এসেছে। স্কুল কলেজে এখন বুঝি এসব ও পড়ায়। আমাদের দেশে নয়। বিদেশে আছে। আমাদের দেশে ফ্যাশন কলেজ ও ইউনিভার্সিটি হয়েছে। বহু ছেলেমেয়া পড়ালেখা করে। আমাদের পোষাক শিল্পে বহু ড্রেস ও ফ্যাশন ডিজাইনার দরকার। তাই বলে তোরা আমাকে মেকআপ দিয়ে রাণী বা সম্রাজ্ঞী বানাবি। আমার কি ওদের মতো ব্যাক্তিত্ব আছে। না তেমন সৌন্দর্য আছো। কুমারী মেয়েরা সখ করে একটু সাজে। তাদের মানায়। একটু সাজলেইতো শ্বশুর শ্বাশুড়ি বলতেন, কি বউ কারে রূপ দেখাও। কারো দিকে নজর পড়েছে। স্বামীরা চুপ করে থাকতো মা বাবার উপর কথা বলতেনা। আরো বাজে কথা বলতো। স্বামীরাও বলতো। কি হলো বিবি, রাতের বেলা সাজতে পারোনা, দিনের বেলা সাজো কেন? মধ্যবিত্ত মেয়েরা পাঁচ দশ হাজার টাকা খরচ করে জীবনে একদিনের জন্যে বিউটি পার্লারে যায় সেই মধুর রাতের জন্যে। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই শুরু হয় অত্যাচার। মা, বাবা কি তোমার সাথে কখনও মন্দ ব্যবহার করেছে। না না জীবনে ও না। আমি তোদের বাপের রূপ দেখে একটু পাগল হয়েছি। এমন রূপবান পুরুষ এর আগে কখনই দেখিনি। আমাকে দেখতে আমাদের বাড়ি গিয়েছিলেন। আমি পর্দার ওপার থেকে দেখেছি। আমার শ্বশুরকে সালাম করতে গিয়ে তোদের বাপকেও দেখেছি। আমার বাবা তোদের দাদাজানকে বলেছিলেন, দেখুন খান সাহেব আমার মেয়ের কোন দোষ দেখলে বকাঝকা করতে পারবেন না। গায়ে হাত তুলতে পারবেন না। আমি অতি বেশী আদরে মেয়েদের মানুষ করেছি। আপনাদের চাপে পড়ে মেয়েকে পড়ালেখা করিয়ে বিয়ে দিচ্ছি। তাছাড়া আমার শরীরও ভাল না। আমার ছেলেরা খুবই মেধাবী।  তোদের বাপেরা বংশগত ভাবে একটু কড়া মেজাজের। এরা পড়ালেখার চাইতে মোড়লী পছন্দ করে। আমি সারা জীবন তোর বাপকে ভয় পেয়েছি। তিনি কি আমাকে ভালবাসেন না সম্মান করেন কোনদিন বুঝতে পারিনি। এখন হঠাত্‍ করে নরম হয়ে গেছেন। একেবারেই নতুন মানুষ হয়ে গেছেন। হঠাত্‍ করে কেন যে এতো বললাম বুঝতে পারছিনা। বিন্দু, মেকআপের ব্যাপারে একটা মাইল্ড মেকআপ হলেই চলবে। দেখো মা, পোষাক সব কেনা হয়ে গেছে। এখন শুধু ম্যেকআপের একটা ট্রায়াল হবে ছবি তোলার জন্যে। তুমি হঠাত্‍ করে এতো ইমোশানাল হলে কেন বুঝতে পারলাম না। পুরাণো দিনের কথা মনে গেছে। তোমার মনে কি দু:খ আছে বলো। তোরা কি আমার পুরাণো দিন ফিরিয়ে দিতে পারবি। স্বপ্নগুলো কি এখন বাস্তবায়িত করা যাবে? এখন সামনে তোদের দিন। আমা শরিফা যেন সুখে থাকে। ঢাকায় ফারিকে একটা ফ্ল্যাট বা জমি কিনে দিতে চাই। তোর নানা  মারা যাওয়ার সময় ফারিকে তোর বাপের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। ঠিক আছে মা। তুমি এখন চোখ মোছো। কথায় কথায় এত ইমোশানাল হয়োনা। এখনতো তোমার আনন্দের দিন। আমার বাবা ও এখন শ্রেষ্ঠ বাবা। সালামত খান ফারজানাকে কাছে ডেকে নেয়। কিরে তুই এতো দূরে কেন? তুই আয়েশার খালা হলেও আমার মেয়ের মতো। তোর ভাইয়েরা মানে আমার শালারা সবাই পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমার শ্বশুর সাহেব নগদ তেন অর্থ রেখে যেতে পারেননি। তাই ফারিকে তোদের মা আমাদের  বাড়িতে নিয়ে । এখানেই পড়ালেখা করে। গ্রাজুয়েশনের পর ওকে মাহমুদের সাথে বিয়ে দিই। ওতো খুব ভালো ছেলে। ওরা এখন খুব সুখে আছে। ফারি  যদি এমএ পাশ করতো তাহলে দুজনেই ব্যান্কে চাকুরী করতে পারতো।

আচ্ছা বাবা, ভাইয়াদের আকদের অনুষ্ঠানে ভাবীদের নিয়ে আসতে বললে কেমন মনে হয়। এতো বড় অনুষ্ঠানে আসতে না বললে ওদের মনে কষ্ট লাগবে। লোকেও আজেবাজে কথা বলতে পারে। জামালপুরেও লোকজন  সমালোচনা করবে। ভাবীরাতো খুব ভালো মানুষ। শরীফাও বললো বাবা ওদের নিয়ে আসো। মা তুমি কিছু বলো। আমি কেন বলবো। তোদের বাবার আক্কেল নাই? সারা জীবনইতো আমাদের অবজ্ঞা করেছেন। আমরা মেয়ে তাই আমাদের কথার কোন দাম নেই। কিরে তোরা এতো কথা বলছিস কেন? আহমদ আর মোহাম্মদকে ফোন করে বলে দে। বল, আমি আসতে বলেছি। সাথে যেন বউদের নিয়ে আসে। এখন হাতে সময় নেই। তাই জামালপুর থেকেই সব পোষাক রেডিমেড কিনে নেয়। বউদের শাড়ি যেন আজই কিনে নেয়। আজই যেন ওরা রওয়ানা দেয়। বাবা, আমি ফোন করছি, তুমি একটু বলো, বাকি সব আমি বুঝিয়ে বলবো। ভাবীদের ও বলবো। ঠিক আছে,ফোন দে। হ্যালো বাবা আহমদ, তোদের জন্যে মনটা কেমন করছে। দেরী না করে এখনি রওয়ানা দে। কালকে আকদের অনুষ্ঠান। শরিফার জামাইকেও নিয়ে আসবি। এক সাথে আসলে ভাল হবে। ম্যানেজার সাহেবকে সব ভালো করে বুঝিয়ে দিস। ক্যাশে যেন বেশী টাকা না থাকে। মাল বিক্রির সময় যেন আমার সাথে আলাপ করে। সব টাকা যেন ব্যান্কে জমা হয়। তোরা প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় আজই কিনে নে। একটা গাড়ি সাথে রাখিস। ঠিক আছে বাবা। আয়েশা ফোন হাতে নিয়ে বলে ভাইয়া তোরা দুপুরের আগে পৌঁছাতে পারলে ঢাকায় শপিং করবো তোদের জন্যে। ভাবীদের সাথে কথা হয়েছে। ওরা খুব খুশী। প্রয়োজনে ভাবীদের একসেট করে অলংকার কিনে দেবো। মা তোদের জন্যে কাঁদছে। বারিধারার ঠিকানা আছেতো?  বারিধারা ঢুকার সময় ফোন করবি। আমি ড্রাইভারকে ডিরেকশান দিয়ে দেবো। দশ নাম্বার রোডে আসলেই আমরা তোদের রিসিভ করবো। শেরওয়ানী স্যুট দুটোই রাখবি। তাড়া তাড়ি আয়। আমরা শপিং করবো।

 

 

 

রূপকথা ৯

সালামত খান ঘুম থেকে উঠেছেন সন্ধ্যার পর। শীতকাল পাঁচটার দিকেই সূর্য ডুবে যায়। হাত মুখ ধুয়ে বসার ঘরে এসে বসলেন। কুলসুম বেগম বললেন আমি আপনার জন্যে চা করে আনবো। তুমি যাবে কেন? এখানেতো চা কফি করার জন্যে  লোক আছে। আয়েশা,দেখতো মা বুয়াকে কফি বানাতে বল। আর কিছু খাবে না। একটু পরেইতো রাতের খাবার খাবো। তোরা এখানে ক’টার সময় রাতের খাবার খাস। তুমি যখন চাইবে তখনি খাবার দিবে। কিচেনের জন্যে এখানে ফুলটাইম লোক আছে। তোমার যখনি ইচ্ছা তখনি চা কফি নাশতা করতে পারবে। কাজের লোকদের তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো। এদের পাঠিয়েছেন আরসালানের মা। আমরা আস্তে আস্তে লোক নেবো। তোরাতো আজ আর বের হতে পারলিনা। তাতে কোন অসুবিধা নেই। তুমি যেতে চাইলে আমরা যাবো। খালা তুমি এখন যাবে। নিশ্চয়ই যাবো। ওদের সাথে আমার কথা হয়েছে। গেলেই মাপ নিয়ে নিবে। এক ঘন্টা সময় লাগতে পারে। আগে নমুনা দেখাবে। দুলাভাই নিজেই কাপড় পছন্দ করবেন। না না, আমি কিছুই পছন্দ করবোনা। ঠিক আছে খালা তুমি যাও। আমি এখানে মায়ের সাথে থাকি। আপু, তুই যাবি/ না ,আমিও মায়ের কাছে থাকবো। চলুন দুলাভাই। পাজামা পাঞ্জাবী আর পাম্পসু পরেন। মাথায় টুপি পরেন। গায়ে চাদর পরেন। মা আয়েশা, তুই কাল সকালে গাড়ির দোকানে যা। তুই সব পছন্দ করে নিয়ে আয়। তোর হাতে সাইন করা চেক বই দিয়ে দিবো। যা পছন্দ তাই কিনবি। টাকার জন্যে চিন্তা করিসনা। আমার সংসাড়ে আনন্দ ফিরে এসেছে এতো বছর পর। এখন আমি বাকি জীবন আনন্দে থাকতে চাই। তোরা কি বলিস? হ্যাঁ বাবা আমরাও আনন্দ চাই। মা হবেন তোমার জীবন সংগিনী, দাসী নয়। রাজীতো বাবা। রাজী মানে, হাজার বার রাজী। তোর মা হবেন প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আমার মেয়ে শরিফাও হবে একজন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আয়েশ যদি দেশে ফিরে আসে তাহলে সে হবে ওর মায়ের প্রধান সহকারী। কি বলিস মা। বাবা এখনকার দুনিয়ায় স্থান কোন বিষয় নয়। পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। যে কোন বিষয়ে আমাকে জানালে আমি অনলাইনে জানিয়ে দেবো। স্কাইপ বা হোয়াটসআপে তুমি আমাকে দেখতে পাবে কথা বলতে পারবে। আমি বাড়িতে  তোমার জন্যে একটা ট্যাব কিনে রাখবো। আপা চালাবে। তুমি আস্তে আস্তে শিখে নেবে। ঠিক আছে বাবা তুমি এখন টেইলারের কাছে যাও। খালা বাবাকে নিয়ে যাও। ফিরে আসলে কথা বলবো। চলুন দুলা ভাই। না হয় দেরী হয়ে যাবে।

আয়েশা আরসালানকে ফোন করে জানতে চায় কাল সকালের প্রোগ্রাম। বিকেলে তিনটার পর দুটো ক্লাস আছে। তাহলে আমি সকালে দশটার দিকে আসছি। বলো, কেন আসবে? বাবা টাকা দিয়েছেন গাড়ি কেনার জন্যে। এতো তাড়াহুড়া কিসের?  তা জানিনা। বাবা বলেছেন গাড়ি কিনতে। হয়তো তোমাকে দিবেন। আমাদের বাসায় দুটো গাড়ি,আরেকটা গাড়ি দিয়ে কি করবো। সেটাতো আমি জানিনা। মা কি কিছু বলেছেন। মাকে তুমি এতো দিনেও চিনতে পারোনি। আপনি কি রকম ছেলে। নিজের মাকে ভালো করে চিনতে পারেননি। অপেক্ষা করুন, আর দেখুন বাবা কি করেন। আর কি করবেন। তোমার বাবার কথা শুনলেই ভয় করে। কেন ভয় করেন। ভাবা একেবারেই নরম হয়ে গেছেন। আপনাকে বাবার সহকারী হতে হবে। সেটা আবার কি? দেখবেন সব আস্তে আস্তে। আল্লাহই জানেন আমার ভাগ্যে কি আছে। ভাগ্য দেখতে হলে আমাকে বিয়ে করতে হবে। বাদ ও দিতে পারেন। ভিসি স্যারকে জানিয়ে দেন আপনি আমাকে বিয়ে করবেন না। তুমি কি পাগল হয়েছো। তাহলে কি করবেন? না করার সাহস আমার নাই। মানে কি ? আমি তোমাকে বিয়ে করবো। ভাল না বেসেই বিয়ে করবেন। আপনার সাহসতো কম নয়। একটা মেয়েকে ভাল না বেসে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছেন। দেখো আয়েশা, সবতো করছেন মা। আপনার বুঝি ইচ্ছা নাই। তুমিতো দেখছি আমাকে পছন্দ করোনা। কেন এমন মনে হলো। তোমার কথায়। আমিতো কখনই এমন কথা বলিনি। আমি শুধু জানতে চাইছি কন্যাকে আপনি ভালবাসেন কিনা। কন্যা আবার কে? তুমিতো দেখছি আমাকে পাগল বানিয়ে দিবে। সেটাইতো আমার কাজ। কেন, আমি পাগল হলে তোমার কি লাভ? অনেক লাভ। সারা জীবন পাগল নিয়ে সংসার করবো। না না, এসব কি বলছো। আমি পাগল নাকি? আমি কি বলেছি আপনি পাগল। আপনিইতো বলেছেন। এখন বলো কাল কখন আসবে। আমার সাথে ব্রেকফাস্ট করো। তোমার গাড়ি আছেতো। বাবার মাইক্রোটা আছে। নতুন গাড়ির চাবি পেলে আপনি ড্রাইভ করে আনবেন। পরে আমাদের  ড্রাইভার চালাবে। ওকে আসো, সকালে কথা হবে।

ফারজানা আখতার ফেরদৌসের কাজ সেরে এপেক্সের শোরুমে যান সালামত খানকে নিয়ে। তিন জোড়া পাম্পসু কিনে রাত আটার দিকে বাসায় ফিরে। এর আগে আয়েশা শরিফা মায়ের সাথে জমিয়ে গল্প জুড়ে দেয়।দুই বোন দুই পাশে মাঝখানে মা কুলসুম বিবি। সালামত খান ডাকেন আকবরের মা বলে। বড় ছেলের নাম আকবর খান। ছোট ছেলে হুমায়ুন খান। মা, তোমার বাল্যকালের কথা বলো। কতকাল তোমাকে এভাবে পাইনি। বুকে ধরিনি। তুইতো মাত্র সেদিন ঢাকা চলে গেছিস। কিন্তু আমার এ মেয়েটা সাথে কত বছর কথা হয়নি। এখন মোবাইলের যুগ। জামাই কথা বলতে দিতোনা। কেন যে এমন ক্ষ্যাপে গিয়েছিল তা আজও জানিনা। জামাইটা খুবই ভালো ছিল। তোর বাপই ওকে বিগড়ে দিয়েছে। মা বহুবার আমি পায়ে ধরে মাফ চেয়েছি বাবার পক্ষে। বলেছি , বাবা মুরুব্বী মানুষ। তুমিতো ছেলের মতো। কই তিনিতো তোমাকে দেখতে একবারও আসেননি। তুমিতো কিছু করোনি। তোমার উপর কিসের রাগ। ছোট নাতি দুটো কি ক্ষতি করেছে। প্রায়ই বলতো মা নানুজী আসেনা কেন। আমি মুখ লুকিয়ে শুধু কাঁদতাম। মা ও আমাকে খুব ভালবাসতো। বাবার সাথে ঝগড়া হওয়ার পর থেকে খারাপ ব্যবহার শুরু করে। মা, এতোদিন আমার বুকের উপর একটা পাথর চেপে ছিল। এখন সেটা নেমেছে। মা তুমি আগের মতো পিঠা বানাতে পারো। পারবোনা কেন। তোরা সব কিছু জোগান দে। আমিতো চালের গুড়ি ও খেজুরের গুড় নিয়ে এসেছি। আম্বিয়া বুয়াকে জিগ্যেস করে দেখি উনি পারেন কিনা। আরে, আমিই বানাবো। শীতের সকালে তোদের বাবা প্রতিদিনই পিঠা খায়। বউরাই বানায়। এখন পিঠায় আগের মতো মজা হয়না। গ্যাসের চুলা। আমরা শীতের সময় আলাদা মাটির চুলা তৈরি করি। লাকড়ি ব্যবহার করি। আমার বূরা খুবই ভালো।  বেয়াই বেয়াইনও খুব ভালো। কিন্তু আমার ছেলে গুলো মনের মতো মানুষ হলোনা। মা তুমি ওসব চিন্তা করোনা। সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখো মা, ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাবাইতো চেয়েছেন ওরা গ্রামের মোড়ল মাতব্বর হোক। বাবা ওদের মোড়লী বিচার শিখিয়েছেন। ওরা গুন্ডামী করে বেড়ায় বাবা থানাকে টাকা দেয়। বাবা যদি বলতো তোদের এসব করা দরকার নেই। ঢাকা যা,পড়ালেখা কর। তা না করে বাবা ওদের মোড়ালী শিখিয়েছেন। অল্প বয়সে দুজনকেই বিয়ে করিয়েছেন। বাবা যেমন চেয়েছেন ওরা তেমন হয়েছে। এখন আর আফসোস করে কি লাভ। বাবাতো আমাকেও না পড়িয়ে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আজ রাতে আমরা দুই বোন তোমার সাথে শোবো মা। তোর বাবার বাতের ব্যারাম। সারা রাত ব্যাথা করে। আমি অষুধ মালিশ করে দিই। তুমি বুঝি বাবার পা টিপো। তা একটু টিপে দিই। উনিতো আমার মুরুব্বী। একটু খেদমততো করতেই হয়। আমার মা বলে দিয়েছিল জামাইর মন জুগিয়ে চলবি। সামান্য একটু পড়ালেখা করেছিস বলে বেয়াদবি করবিনা। শুনেছি, আগের জামানায় স্বামীরা বিবিদের পিটাতো। ওরা কাঁদতেও পারতোনা। বলতো খানদানী মেয়েরা আওয়াজ করে কাঁদতে পারতোনা। তোদের বাবা কোনদিনও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। আকবর হওয়ার আগে কুসুম বলে ডাকতেন। পরে আকবরের মা বলে ডাকতেন। আমার থাকতে আমার আদরের সীমা ছিলনা। তোদের বাবা আমার শ্বশুর বাবাকে খুব ভয় পেতেন।চোখ তুলে কথা বলতেন না। আমার বাপজান ও শ্বশুরবাবাকে বলে দিয়েছিলেন আমাকে আদর যত্ন করতে। নিজের মেয়ের মতো রাখতে।

ফারজানা এসে কুলসুম বিবির পাশে বসেন। খালা তুমি এতোক্ষণ কি করলে। টেইলারের ওখানেমতো। কাজ সেরতে এপেক্সে গিয়েছিলাম পাম্পসু কেনার জন্যে। তিন জোড়া সু, তিন সেট পাজামা শেরওয়ানী অর্ডার দিয়েছি। সাথে রয়েছে মোজা, গেঞ্জী রুমাল। কাল সন্ধ্যায় নিয়ে যাবো পার্লারে। দাড়ি মোচ ট্রিম করার জন্যে। খালা , বাবা তোমার কথা খুব শোনে।  বলতো ফারি, তোর দুলাভাইকে তুই কি করতে চাস। দেখো আপা, দুলা ভাই আমার বাপের মতো। বাবা মারা যাওয়ার পর উনিই আমার দায়িত্ব নিয়েছেন। পড়ালেখা করিয়েছেন। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে বিয়ে দিয়েছেন। আমার বরও খুব ভালো। দুলাভাইকে মান্যগন্য করে। ভালো চাকুরী করে।

কি হলো ফারি, এসেছিতো অনেক্ষণ হলো। চা কফি কিছু একটা দাও। বাবা, এখন সাড়ে আটটা। একটু পরেইতো ডিনার করবে। সেতো না হয় করবো। এখন এক কাপ কফি দে। আজ একটু দেরীতে ডিনার করি। তোদের সাথে চুটিয়ে আড্ডা মারবো। বাবা, তুমি আ্ডা দিতে জানো। আমি তোদের মতো আড্ডা দেইনা। আড্ডা মারি। দেওয়া আর মারা শব্দের ভিতর অনেক ফারাক। আড্ডা শব্দে জোর আছে। বাবা তুমি ভাষাও বোঝো। তোরা কি মনে করিস। আমি ম্যাট্রিক  মানে তোদের এসএসসি পরীক্ষায় বাংলায় লেটার পেয়েছিলাম। স্কুলের ম্যাগাজিনে নিয়মিত আর্টিকেল লিখতাম। আমার বাবা আমাকে আর পড়তে দেননি। আমাদের পেশা কৃষি ও ব্যবসা। তাই বাবা বলেছেন সংসারের হাল ধরো। তুমি আমার একমাত্র ছেলে। বাবা তুমিতো আমাদের এসব কথা কোনদিন বলোনি। বলবো কখন, বিরাট এক সংসারের দায়িত্ নিয়েছি বাইশ তেইশ বছরে। বিয়ে করেছি পঁচিশ বছর বয়সে। তারপরে আর সময় কই। শরীফার মা, তুমি মেয়েদের সব কথা বুঝিয়ে বলো। রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা কাজ করে বাবার সব সম্পদ রক্ষা করেছি। নিজে বাড়িয়েছি অনেক। আমার কৃষি জমি আছে একশ’ বিঘার উপরে। সম্পদ আছে বলেই লোকে সম্মান করে। আমার বাবাকেও লোকে সম্মান করতো। এখনতো সম্পদের সাথে বিদ্যার খুব প্রয়োজন। বিদ্যা ছাড়া সমাজে ইজ্জত থাকেনা। সেটা আমি দেরীতে বুঝতে পেরেছি। আমার শ্বশুর ও শালারা সবাই শিক্ষিত। আমার শ্বশুর বাড়ির সবাই বিদ্বান। তাঁদের পেশা ও সম্মান হলো বিদ্যা। এখন আমার মা বিন্দু শিক্ষার দুয়ার খুলে দিয়েছে। শরিফাকে আমি আবার পড়াবো। আমি চাই সে এমএ পাশ করুক। কলেজে শিক্ষতা করুক। জামাইকে আমার ব্যবসা শিখিয়ে দেবো। বাবা, ওর নিজেরোতো অনেক বড় ব্যবসা। দুটোই দেখবো। জামালপুর থেকে ওর এলাকার দুরুত্ব সত্তুর আশি কিলোমিটার হবে। আমি ওকে গাড়ি কিনে দেবো। যাতে সে সব ব্যবসা দেখতে পারে। তুমি যা ভালো মনে করো তাই করো। বাবা, তুমি ওর উপর মনে কষ্ট রেখোনা। আরে পাগলী , আমি সব ভুলে গেছি। ছেলেদেরও ব্যবসা ভাগ করে দেবো। সবাই আমার ব্যবসা দেখবে। নেট মুনাফা যা করবে পঁচিশ ভাগ পাবে। মাসে একটা ভাতা পাবে। ওরা চেম্বারের মেম্বার হবে। আস্তে আস্তে চেয়ারম্যান হবে। জেলার জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নিবে। সালামত খান ফাউন্ডেশন করে দেবো। জায়গা দিবো, বিল্ডিং করে দেবো। নেট মুনাফার দশ পার্সেন্ট ফাউন্ডেশনে যাবে। আয়েশা ও জামাই ফিরে আসে তাহলে ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব নিবে। বাবা তুমিতো আমার স্বপ্নের কথা বলছো। কাল সকালে গাড়ি কিনতে আরসালানকে সাথে নিয়ে যাবো। তুমি কি বলো? সেতো খুব ভালো কথা। রাজী হয়েছে তো?। কথা বলেছি, কাল সকালে যাবো। উনি গাড়ির দোকান ভালো চিনেন। কাকরাইলের ম্যানহাটন মটর্সে যাবো। ওখানে আনওয়ার সাহেব নামে ভদ্রলোক আছেন। খুবই ভালো মানুষ। আমাদের কবি সাহেব আমাকে ঠিকানা বলে দিয়েছেন। ইনি নামকরা কোন কবি নন। কবি হওয়ার জন্যে তিনি কারো দুয়ারে ধর্ণা দেন না। তিনি জগতের আধ্যাত্বিক কবিগুরু মাওলানা রুমীর ভক্ত। তিনি বলেন, রুমী  তাঁর মুর্শিদ। বাংলাদেশের কবি সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা রাজ আনুকুল্য পাওয়ার জন্যে দাসে পরিণত হয়েছেন। তাঁরা কবিতা লেখেন দরবারী কবি হিসাবে। রাজা রাণীর দয়ার শরীর। প্রশংসা করলে রাজকোষ খুলে দেন।

সকাল সাড়ে নয়টায় আয়েশা আরসালানের বাসায় গিয়ে পৌঁছায়। ভিতরে ঢুকেই আরসালানকে দেখতে পায়। সালাম স্যার। স্যার মাফ করবেন, আমি নাশতা করে এসেছি। মা শীতের পিঠা বানিয়েছেন। আপনার জন্যেও নিয়ে এসেছি। আপনার কেয়ারটেকারের হাতে দিয়েছি। তাড়াতাড়ি করুন স্যার। আমরা এক্ষুনি বের হবো। মা কই? মায়ের শরীরটা বোধ হয় তেমন ভালো নয়। তাই শুয়ে আছে। আমি বলেছি, তুমি আসবে। আয়েশা হন হন করে দোতলায় উঠে যায়। কি হয়েছে মা। আমায় ফোন করোনি কেন। কখন থেকে শরীর খারাপ করছে। চিন্তা করিসনা। এ বয়সে এমন হয়। শরীরে তেমন শক্তি থাকেনা। তুই এসেছিস এখন একটু ভাল লাগছে। উঠো মা নীচে চলো। আমার সাথে নাশতা করবে। পারবে যেতে? না এখানে নিয়ে আসবো। তুই ধর, আস্তে আস্তে নেমে যাবো। মা, বাসা থেকে তোমার জন্যে আমার মা তোমার বেয়াইন নাশতা বানিয়ে পাঠিয়েছেন। পারলে খাও। বেয়াইন সাহেবার নাশতা খাবোনা মানে। একশ’বার খাবো। কি হলো স্যার, আপনি রেডিতো। মাকে খাইয়ে আমরা বেরিয়ে যাবো। আরে বাবা, কফিটা শেষ করি। আমার দেরি হয়ে যাবে।  বাবা মাইক্রো নিয়ে বের হবেন। আমি ফিরে মাকে নিয়ে শপিংয়ে যাবো।  সবাই বের হবেন। খালা,  শরিফা আপা ও মা। দেখুন, গাড়ি কিনতে বেশি সময় দেয়া যাবেনা। আপনি গাড়ি পছন্দ করবেন,আমি চেক লিখে দেবো। তোমার কোন কালার চয়েস নাই। না, আপনার চয়েসই আমার চয়েস। সতেরার নবেম্বরের মডেল নিবেন। আনওয়ার সাহেবের সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি তিনচারটা গাড়ি সিলেক্ট করে রাখবেন। আমি তাঁকে চিনি। আমার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক। সিলেক্ট করা গাড়িটা রেখে আসবো। টাকা দিয়ে দিবো। ট্রায়াল বেসিসে আরেকটা গাড়ি নিয়ে আসবো। বলবো , আমাদের গাড়িটা কম্প্লিট রেডি করে খবর দিতে। লাখ দশেক টাকা আমাদের হাতে থাকবে।

কি খবর আনওয়ার ভাই কেমন আছেন? জ্বী ,খুব ভালো আছি। আপনিতো দেখছি আমাদের কবি সাহেবের মতো কথা বলেন। তিনি সকল অবস্থায় বলেন, খুব ভালো আছি। তিনি সদা হাস্য থাকেন। আপনি কি কবি সাহেবের কাছ থেকে শিখেছেন। বলতে পারেন। উনি আমার খুব প্রিয় মানুষ। এবার বলুন, কোন গাড়ি গুলো বাছাই করেছেন। এই চারটা। একই মডেলের গাড়ি। আপনারা শুধু কালার পছন্দ করুন। আরসালান বললো, আনওয়ার ভাই এখন পুরো টাকা দেবোনা। লাখ দশেক টাকা থাকবে। আমরা আরেকটা গাড়ি নিয়ে যাবো। না, যেটা সিলেক্ট করবেন সেটাই নিয়ে যান। ইতোমধ্যে আমরা রেজিস্ট্রেশনের কাজ শেষ করে ফেলবো। নাম্বার প্লেট লাগিয়ে দেবো। সিট কাভার ও বাম্পার গার্ড লাগাবো। অত আলাদা করে বলতে পারবো না। যা দরকার সব লাগিয়ে দিবেন। সব কিছু ঠিক ঠাক করে ফোন করবেন। আসুন অফিসে বসুন। কার নামে রেজিস্ট্রেশন হবে তার ডিটেইল বলুন। ছবি দিন। স্যার আপনার নামে করাবো। তুমি পাগল হলে। স্যার বাবাতো তাই বলেছেন। তোমার নামে রেজিস্ট্রেশন করো। তাহলে দুজনেরই হলো। আনওয়ার ভাই, এখন তিরিশ লাখ টাকার চেক দিচ্ছি। বাকিটা পেপার্স ডেলিভারীর সময় দেবো। আপনি ইন্সুরেন্স রেডি করে রাখবেন। এবার বলুন পেপার্স কখন দিবেন। পরশু বিকেলে আসুন। এই চাবি বুঝে নেন। স্যার আপনি চাবি হাতে নেন। মাইক্রোর ড্রাইভারকে তাহলে ছেড়ে দিচ্ছি। ভাই আপনি বাসায় চলে যান। বলবেন আমি নতুন গাড়িতে স্যারের সাথে আসছি। আয়েশা গাড়িতে উঠো। আমার পাশে বসো। আচ্ছা এখন বলো, তুমি আর কতোদিন স্যার বলে আপনি আপনি করবে। আমার একেবারেই ভাল লাগছেনা। এই মূহূর্ত থেকে তুমি বলবে। তাহলে বুঝি আপনার ভালো লাগবে। দেখো, মশকরা করোনা। ঠিক আছে, আর আপনি বলবোনা। এই কথা বলেই আয়েশা আরসালানের হাতে হাত রাখে। সামনের দিকে তাকাও। না হয় একসিডেন্ট করবে। আরও কাছে আসো ,একটা চুমো দিয়ে গাড়ির উদ্বোধন করবো। তুমিতো দেখছি ভারী দুষ্টু লোক। আমি মাকে বলে দেবো। বিয়ের আগেই এসব করতে চাও। তুমি করে বলেছি, তাতে হয়নি। এখন  বলছে একটা চুমো খাবো। সকালে যে নাশতা করেছো তাতে হয়নি। তুমি এতো নিষ্ঠুর কেনো। তোমার সাথে শুয়ে গেলে খুশী হতে তাইনা। তাহলে বুঝি খুব দয়ালু হতাম। এসব কিছুই হবেনা। এখন চলো। চলছি, কপালে একটা চুমো খাই। আয়েশা কপাল এগিয়ে দেয়। আরসালান ঠোটে চুমো দিয়ে দেয়। দেখো এক মাঘে শীত যায়না। এই দিনতো শেষ নয় ,আরো দিন আছে। দুজনেই কথা বলতে বলতে বারিধারা পৌঁছে যায়। রাস্তা খালি থাকায় খুব তাড়াতাড়ি এসে গেছি। আরও কিছুক্ষণ সময় গাড়িতে থাকলে ভালো হতো। কি বলো বিন্দু। ওহ মাই গড, তুমি আমার ডাক নামও জেনে গেছো। রাস্তায় আরও কিছুক্ষণ রাস্তায় থাকলে খুব বুঝি ভালো লাগতো। নিশ্চয়ই ভালো লাগতো। তুমিতো আমার হবে বউ। আমিতো তোমায় ভালবাসি। শেষ পর্যন্ত ভালবাসতে শুরু করেছো। সে নয়,প্রথম দেখাতেই ভালবেসে ফেলেছি। বলতে পারিনি। এখন বুঝি না বলে থাকতে পারলেনা। তোমাকে দেখলেই আমার মাথা গুলিয়ে যেতো। এছাড়া জীবনে কোন মেয়ের দিকে তাকাইনি। মেয়েরা ইংগিত করলেও ইগনোর করতাম। বহু মেয়ে মোবাইলে ভালবাসার কথা বলতো। আমি বলতাম, ক্লাশে দেখা হবে। তখন কথা হবে। বিন্দু হো হো করে হাসতে থাকে। তোমার মতো ছেলে যে ভালবাসতে পারে এটা আমিও ভাবিনি। ছেলেদের চোখ মেয়েরা পড়তে পারে। আমার চোখ দেখে তুমি বুঝতে না। আমি যে তোমাকে ভালবাসি তা ক্রস সাহেবও বুঝতে পেরে ভিসি স্যারকে বলেছেন। ভিসি স্যারকে বিয়ের উকিল ঠিক করেছেন। আর তুমি বুঝতে পারোনি। তুমিতো একটা গাধা। দেখো এখনি গালি দিতে শুরু করেছো। আমি এখনও তোমার স্যার। ছাত্রীর সাথে প্রেম করো কেন? এখন মাকে বলে দেবো কি তুমি আমাকে প্রেম নিবেদন করেছো। এসব প্রাইভেট ব্যাপারে মাকে জড়াচ্ছো কেন? ওহ, তুমি চুমো খাবে আমি বলতেও পারবোনা। উপরে ভাবতো হলো খুব সিরিয়াস শিক্ষক। ভিতরে ভিতরে চুরি করে কলা খাওয়া। চলো মাকে গাড়িটা দেখাই। মা নিচে আছে কিনা দেখো। মা দোতলার পূবের বারান্দায় রোদ পোহাচ্ছেন। মা গাড়ি এনেছি, স্যার কালার চয়েস করেছেন। তোর বুঝি চয়েস ছিলোনা। না মা, দেখলাম স্যারের অভিজ্ঞতা বেশী। আমিতো স্যারের নামে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে চেয়েছিলাম। বাবাও বলেছিলেম। পাগল নাকি? বেয়াই সাহেব জামাইকে বুঝি গাড়ি গিফট দিতে চান। বাবা বলেছেন, কি গিফট দিবেন সেদিন আপনারা দেখতে পাবেন। কাউকে বলেননি। আচ্ছা বিন্দু তুই এখনও আরসুকে স্যার স্যার করিস কেন? আপনি বলিস কেন? কি বলবো মা? তুমি করে বলবি। আমার যে শরম লাগে। গাড়িতে আসার সময় কোন কথা বলিস নি? বলেছি। স্যার বলেছেন তুমি করে বলতে। এটা বুঝি বলার বিষয় হলো। এখন থেকে তুমি করে বলবি। ঠিক আছে মা। এখন ওই বাসায় যাই। বাবাকে গাড়িটা দেখাই। তোরতো উচিত্‍ ছিলো আগে ওই বাসায় যাওয়া। আপনার ছেলে যেতে চায়নি। তা অবশ্য ঠিক করেছে। এখনি জামাইর দেখা দেওয়া ঠিক হবেনা। বেয়াই সাহেব যদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের বাসায় আসবেন সেদিনই দেখা হবে। তার আগে দেখা হোক আমিও চাইনা। তুমি কি বলিস। আমি আর কি বলবো। এটাতো মুরুব্বীদের ব্যাপার। তাহলে আমি যাই মা। ভালো থাক।

বেলা বারোটার দিকে আরসালানদের ড্রাইভার আয়েশাকে নিয়ে বাসায় যায়। গাড়ি রেখে আয়েশা ফ্ল্যাটে যায়। বাবা নিচে চলো, নতুন গাড়ি দেখবে। সবাই চলো। সালামত খান বলেন, আমি কি আর গাড়ি চিনি। দেখতে ভালো লাগলেই ভালো। জামাই কি বলেছে? উনিইতো সিলেক্ট করলেন। ড্রাইভ করে এনেছেন। কাগজপত্র রেডী হওয়ার আগে আমরা ট্রায়াল রান করছি। এতে বুঝা যাবে গাড়ির সবকিছু ঠিক আছে কিনা। কুসুম বেগম বললেন, তোর বাবাতো ঠিকই বলেছেন। আমরা কি গাড়ির কি বুঝি বা জানি। আমি খুবই খুশী আমার মেয়ে ঢাকা শহরে নিজের গাড়িতে ঘুরে বেড়াবে। মা আরসালাদের তিনটা গাড়ি। এমনিতেই পড়ে থাকে। ওদের কাজের লোকেরাও বাইরে গেলে গাড়ি নিয়ে যায়। বাবা তোমার শরীর কেমন লাগছে। কেনরে মা।বুড়া বয়সে শরীর কি জোয়ান বয়সের মতো থাকে। বল, আমাকে কি করতে হবে। আমরা মাকে নিয়ে শাড়ির দোকানে যাবো। সাথে আপু আর খালামনি যাবেন। আমি চাই তুমিও আমাদের সাথে থাকো। ভালো শাল দেখলে তোমার জন্যে একটা শাল কিনবো। আমি তোদের সাথে যেয়ে বিরক্ত হবোনাতো। আমি তোমার সাথে গল্প করবো। মা,খালা ও আপু শাড়ি পছন্দ করবেন। দুটো গাড়িই রাখো। বিখ্যাত শাড়ির দোকান বেশী দূরে নয়। এক দোকা থেকেই সব পছন্দ করবি। কি করবো বাবা হাতে সময়তো খুব ই কম। জামালপুর হলেতো আমি বললেই ওরা বাড়িতে শাড়ি নিয়ে আসতো।  বাবা বাজেট কতো। তোমার কাছে নগদ কতো টাকা আছে। তা লাখ পাঁচেক হবে। যথেষ্ট। এতেই হয়ে যাবে। তা না হলে আরসালানের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতাম। না না, তুই পাগল হলি নাকি। জামাইর কার্ড ব্যবহার করবি। তোর কোন আক্কেল নাই। চল, আগে আমি সাউথইষ্ট ব্যান্কে যাবো। ওখানেই আমার মূল একাউন্ট। গুলশান সাউথইস্টে চলো। ওখানে আমাদের কবি সাহেবের খুব ভালো সম্পর্ক। তাঁকে সাউথইস্ট ব্যান্ক খুবই সম্মান করে। তাঁকে অনুরোধ করবো ব্যান্কে থাকার জন্যে। উনার বাসা ব্যান্কের কাছেই। উনি তোমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন। শোন, আমার নাম শুনলে দেখবি সবাই আমাকে রিসিভ করবেন। জামালপুরে শাখা খোলার সময় আমার একাউন্ট নাম্বার ছিল এক। এখনো এক নাম্বারই আছে। ম্যানেজার সাহেবকে ফোন করলে আমার অফিসে চলে আসেন। তবুও কবি সাহেবকে আসতে বল। একজন কবির সাথে পরিচিত হই। জামালপুরের সাংবাদিকরাও আমাকে খুব সম্মান করেন। তাহলে চল< আগে ব্যান্কে যাই। তোর নামে একটা ক্রেডিড করে দিই। লিমিট থাকবে পাঁচ লাখ টাকা। বিয়ের পর জামাইর কার্ড ব্যবহার করবিনা। এতে তোর বাপের মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। বাবা ঠিকই বলেছো। দুটো  গাড়ি নিয়েই আমরা ব্যান্কে গেলাম। কবি সাহেব বাইরে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আসো বিন্দু, সবাইকে নিয়ে ভিতরে আসো। ম্যানেজার হামিদ সাহেবের সাথে বাবাকে পরিচয় করে দিলেন কবি সাহেব। সালামত খান, আপনাদের  জামালপুর ব্রাঞ্চের  এক নাম্বার একাউন্ট হোল্ডার। আর বলতে হবেনা খান সাহেবের নাম আমরা সবাই জানি। তিনি এক নাম্বার কাস্টমার। জামালপুর চেম্বারের সভাপতি ছিলেন। জামালপুরে সবাই তাঁকে চিনে ও সম্মান করেন। হামিদ ভাই, খান সাহেবের মেয়ে আয়েশাকে ভাল করে চিনে রাখুন। ও ঢাকা ভার্সিটির ডিবেট চ্যাম্পিয়ন। আশা করছি, দেশের চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। তারপর আমেরিকা যাবে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশীপের জন্যে। তাঁর ইন্টারভিউ টিভিতে দেখেছি। কাগজে অনেক রিপোর্ট হয়েছে। আয়েশার নামে একটা ক্রেডিট কার্ড করতে হবে। কিন্তু কার্ডতো আজ পাবেন না। তদবির করে আগামী কাল বিকেলের ভিতর পাওয়া যেতে পারে। ঠিক আছে আপনি চেষ্টা করুন। হামিদ সাহেব জানতে চাইলেন কোথায় শপিং করবেন। আয়েশা বললো, ব্যান্কের কাস্টমার কোন বড় দোকান থাকলে সেখানেই যাবো। তাহলে আমি  শপার্স ওয়ার্লডে বলে দিচ্ছি। অথবা বাসাভিিতে করতে পারেন। আমাদের রেফারেন্সে গেলে অনেক কম দামে পাবেন। কোন অসুবিধা হলে আমাকে ফোন করবেন। থ্যান্কস এ হামিদ ভাই। কি বলেন কবিভাই। আপনাকে আমরা মহা সম্মান করি।

রূপকথা ৮

শরিফার সাথে ফোনে আয়েশা কথা বলছে। কিরে আপু কতদিন তোর গলা শুনলাম। দুলা ভাই কই। জামাই শ্বশুরের মহব্বত হয়ে গেছে।  আমাদের পরিবারের উপর থেকে মেঘ কেটে গেছে। দেখি কেমন মেঘ কেটেছে। দুয়েকদিনের ভিতর বাবা আর মা ঢাকা আসবেন। তুইও মায়ের সাথে ঢাকা আয়। তাহলে বুঝবো মেঘ কেটে গেছে কিনা। দুলাভাইটা কি আমার বাবার মতো এখনও। দুইজনের বিরোধেইতো আমাদের পরিবারে কষ্ট নেমে এসেছো। দুলাভাইতো ষন্ডামার্কা বলদ। তোর মুখ বুঝি আর কোন দিন ঠিক হবেনা। তুইতো নাকি ঢাকায় খুব নাম করেছিস। তুইও নাম করতে পারতি। বাবার জন্যে পারিসনি। এটা হলো এক ধারণের গলা টিপে মেরে ফেলা। তোকেতো দুলাভাইও মেরেছে। সব পুরুষই এক রকম। তবে ওদের বুঝালে অনেকেই বুঝবে। তুই এতকথা জানিস কেমন করে। তোরও মেধা ছিল। এখনও সময় আছে। প্রাইভেট পরীক্ষা দেয়ার জন্যে নাম রেজিষ্টার কর। আমি ষন্ডা দুলাভাই রাজী করাবো। এখনি সময়। লোহা গরম আছে। পিটালেই নরম হয়ে যাবে। আর বাচ্চা নিবিনা। শোন, মায়ের সাথে ঢাকা আয়। বাবা বারিধারায় ফ্ল্যাট কিনবেন। এবার ঢাকা এসে গাড়ি কিনবেন। তোর দুলা ভাইকে দুই লাখ টাকা দিয়েছেন পোষাক কিনার জন্যে। বড় জামাইয়ের সাথে এখন খুব ভাব। বড় জামাইকে নিয়ে শহরে ব্যান্কের অফিসে যাবেন ইন্ডাস্ট্রী করার জন্যে।  বাবারতো দেখচি বিরাট পরিবর্তন হয়ে গেছে। কেমন করে হয়েছে জানিস। সব করেছেন ছোট খালা। আচ্ছা করে কষে  শক্ত করে বকাবকি করেছেন ঘন্টা খানেক ধরে। তারপরেই বাবা বদলে গেছেন। একেবারেই বদলে গেছেন। ওর পরেই বলেছেন দেখো ছোট গিন্নী এখন থেকে তোমার বড় আপা যা বলবেন আমি তাই শুনবো। খালা খালুকে টাকা দিয়েছেন পছন্দ মতো পোষাক কেনার জন্যে। বাবা কাছে থাকলে ফোনটা তাঁকে দাও। আছেন, কাছেই আছেন। বাবা,আয়েশা কথা বলবে। দে দে , কতদিন মায়ের সাথে কথা হয়না। ও নাকি সময় পায়না আমার সাথে বা তার মায়ের সাথে কথা বলার জন্যে। মারে তুইতো দেখছি নাম করে বাবা মাকে ভুলে গেছিস। কি যে বলো বাবা। তোমাদের কোন পাষন্ড ভুলবে। তোমারা আমাকে পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছো। তোমরা আমাকে লালন করছো। নারে মা, আমি তোদের সকলে প্রতি অবিচার করেছি। আমার দুটো মেয়ে ভাল ছাত্রী। বড়টাকে পড়ালে সেও তোর মতো হতে পারতো। কলেজে শিক্ষকতা করতে পারতো। অনেক বছর হয়ে গেলো তোর মাকে বন্দী করে রেখেছি। তোর ভাই দুটোতো মানুষ হয়নি। ওদের চিন্তায় আমি বেশীদিন বাঁচবোনা। এখনতো তোরা দুই বোন আমার শক্তি। আমি আপুকে বলেছি প্রাইভেট ডিগ্রী পরিক্ষা দিতে। বাবা তোমরা ঢাকা আসার সময় আপুকে নিয়ে এসো। তুমি আসার আগেই আমরা বারিধারায় ভাড়ায় ফ্ল্যাট পেয়ে যাবো। কম্প্লিট ফার্নিসড ফ্ল্যাট। আমরা যেকোন সময় উঠতে পারবো। দেখি বড় জামাই রাজী কিনা।রাজী মানে, একশ বার  রাজী হবে। কোথায় আপত্তি, কেন আপত্তি। দুলা ভাইকে ও ঢাকা নিয়ে এসো। এখন রাখি বাবা। রওয়ানা দেবার সময় ফোন করে জানিয়ে দিও। বাড়ি রেডী হয়ে গেলে সরাসরি ওখানে উঠবে। কি নিয়ে আসবে বাবা। একটা মাইক্রো। নতুন গাড়ি কেনার আগে মাইক্রোটা আমার কাছে থাকবে।খুব ভালো কাজ করেছো। এইতো তোমার বুদ্ধি খুলছে। আগে ছিলে গ্রামের ফালতু মোড়ল। এখন হবে রাজধানীর এলিট। নবাবদের বেয়াই সাহেব। হাতে সময় থাকলে তোমাকে নিয়ে প্রথমে যাবো ফেরদৌসে। দুদিনের ভিতর তোমার সব পোষাক রেডী করে ফেলবো। খালা তোমাকে ফেরদৌসে যাবে। আমি মাকে নিয়ে মেয়েদের পোষাকের দোকানে যাবো। সাথে আপুও থাকবে। খবরদার বাবা, আপুকে ছাড়া আসতে পারবেনা। জিপিএ ফাইভ পেয়ে যে মেয়েটা অনার্সে ভর্তি হতে পারতো সে এখন দাসীতে পরিণত হয়েছে। রাত হলে স্বামীর সংগ দেয়,সকাল হলে পুরো সংসারের দাসী। সবকিছুর জন্যে তুমি দায়ী বাবা। তুমি একমত কিনা বাবা। নিশ্চয়ই একমত। সেজন্যেইতো আমার ভুল স্বীকার করে সবার কাছে মাফ চেয়েছি। তোর মায়ের কাছেও মাফ চেয়েছি। বাবা, আর বলোনা। তুমি কি আমার কথায় রাগ করো। নারে মা, তোরা আমার অন্তর চক্ষু খুলে দিয়েছিস। আমার বাবারও অর্থবিত্ত ছিল। আমি ইচ্ছা করলে আরো পড়তে পারতাম। গ্রামে থেকে কলেজে পড়ার কথা ভাবিবি। আমার বাপ ফরিদ খাঁ ও কিছু পড়ালেখা করেছেন। তিনিই বেশ জমিজমা রেখে গেছেন। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান। এখন আমি বুঝতে পেরেছি বিদ্যার কি প্রয়োজন। আমার মা আয়েশা সবার চোখ খুলে দিয়েছে।এখন আমার ধন সম্পদ ও টাকার প্রতি মায়া নাই। চাই আমার সন্তানেরা আনন্দে থাকুক। আমার বংশধরেরা বিদ্যা বুদ্ধিতে জগত আলো করুক। লোকে বলুক সালামত খানের বংশধর সবচেয়ে সেরা পরিবার। আব্বু, আপুকে বিএ পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করো। আমার বিশ্বাস দুলাভাই রাজী হবেন। শোন, বারিধারার ফ্ল্যাট রেডী কর। আমি সোজা ওখানে উঠবো। ফারজানাকে বলে রাখিশ। সে যেনো বর সহ ওখানে থাকে। বাবা, তুমি ড্রাইভারকে বলে দিও আমেরিকান এ্যাম্বাসীর উত্তর দিকে পার্ক রোড। ওই রোডেই বারিধারা ক্লাব। তুই পরে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে নিস। আমি অত ডিরেকশন দিতে পারবোনা। আজ রাতে তোরা বারিধারার ফ্ল্যাটেই থাক। ফারজানাকে বলে দে। মা, ভালো থাক। আমি এখন ছাড়ি। অনেক কাজ,গোছগাছ করতে হবে। বাবা নগদ টাকা বেশী হাতে রেখোনা। সব কাজ চেকে করবে। তোমার ক্রেডিট কার্ডও দরকার।ঠিক আছে মা।

আয়েশা গুলশান বেগমকে ফোন করে। মা, আমি এখন বারিধারা পার্ক রোডে। যে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি তা সাজাতে হবে। এটা একটা ফার্নিসড ফ্ল্যাট। আর কে আছে সাথে। এখন কেউ নেই। একটা পরেই খালা আসবে। পাগলী মা আমার। আমি এক্ষুনি আসছি। সাথে লোকজন থাকবে। একজন বাবুর্চি, একজন বুয়া ও একজন সহকারী। বাইরের সিকিউরিটি ফোন করলেই পাঠিয়ে দেবে। তুমি  আমাকে বাড়ি নাম্বার বলো। তোমার কিছুই করতে হবেনা।  ঘরে গ্রোচারী সব আছেতো। ঠিক আছে বেটি। গ্রোচারীর জন্যে আমি লোক পাঠাচ্ছি। দশ পনের দিনের পুরো জিনিস নিয়ে আসবে। তুমি আজ ভার্সিটি যাবেনা? আরসু তোমার কথা জানতে চেয়েছিলো। স্যারের সাথে বেশ কয়েকদিন দেখা হয়নি। আমি ক্রস সাহেবের সাথে  কাজ করে বাসায় ফিরে যাই। ফোনেতো কথা বলতে পারো। আমার শরম লাগে। আগে করতাম,এখন করিনা। আচ্ছা ,আমি আরসুকে বলছি তোমাকে ফোন করার জন্যে। ঠিক আছে মা। দশ মিনিট পরেই আরসালানের ফোন আসে। হ্যালো আয়েশা, কেমন আছো। তোমার কোন খবর নেই। সরি, আমি মনে করেছিলাম আপনি ফোন করবেন। আবার ভাবলাম ক্লাশ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আপনিতো ক্লাশ আর বাসা ছাড়া আর কিছু বুঝেন না। এখনতো আপনাদের বাড়ির কাছে চলে এসেছি। সেখান থেকেই কথা বলছি। মার সাথেও কথা হয়েছে। মা লোকজন নিয়ে আসছেন। দুপুরে আমরা এখানে খাব। মাও বুঝি তোমার ওখানে খাবে? মনেতো হয়। বাবুর্চি বুয়া আয়া সব আপনাদের বাড়ি থেকে আসছে। আমার মা ও বাবা আগামী কাল সকালে আসবে। সাথে আমার বড় আপুও থাকবে। অন্য আত্মীয় স্বজনও থাকতে পারে। আমিও কি দুপুরে তোমার ওখানে চলে আসবো। কেন? যদি কোন কাজে লাগি। নিজের বাসায় কোন কাজ করেন? তা করিনা। নিজে কোনদিন গ্রোচারী করেছেন? না। তোমাদের সাথে থাকলাম। বাসা সাজাবার ব্যাপারে আইডিয়া দিলাম।  তোমাকে বড় একটা লাইব্রেরী সাজিয়ে দিতে পারি। সেটা অবশ্য আপনি ভালো পারবেন। আপনি এসেইতো বলবেন কফি দাও। এখনতো এখানে সে রকম কোন ব্যবস্থা নেই। তুমি চিন্তা করোনা। আমি ফ্লাস্কে করে কফি নিয়ে আসবে। এটা অবশ্য ভাল আইডিয়া। খালাকে বলেছি বাসা থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসতে। তিনি বারোটার ভিতর পৌঁছে যাবেন। কাল থেকে আপনারা কেউ এ বাসায় আসতে পারবেন না। কেন? নিয়ম নাই। এটা ট্রেডিশন। তিনদিন পর বাবা মা সহ আপনাদের বাড়ি আসবো। আমাকে দেখতে? হ্যাঁ, মেয়েদের দেখতে পারলে ছেলেদের দেখা যাবেনা। এভাবে আনুষ্ঠানিক বর দেখার কথা শুনিনি। তোমার বাবা কি আমাকে দেখবেন? বাবাইতো দেখবেন। শুনেছি তোমার বাবা খুবই রাগী। কাউকে তোয়াক্কা করেন না। ঠিকই শুনেছেন। আমাকে পছন্দ না হলে? তখন কি হবে? কি আর হবে, বিয়ে হবেনা।  তুমি আর আমি রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করতে পারিনা। কেন? এমনিতে।  আমরা কি প্রেম করি। আপনি কি আমাকে ভালবাসেন? মাতো বললো আমাদের বিয়ে হবে। তাহলে মাকেই জিগ্যেস করেন। মাতো বলেছেন আমার বিয়ের দায়িত্ব উনি নিয়েছেন। তাই আমি নিশ্চিন্ত। আমার মাতো তোমাকে পছন্দ করেছে। আমার মা পছন্দ করলেই হলো। আর আপনি আমাকে পছন্দ করলেই হলো। পছন্দ করেন কিনা তাই বলুন। মায়ের পছন্দই আমার পছন্দ। আমি আপনার ব্যক্তিগত মতা জানতে চেয়েছি। আপনি পছন্দ না করলে আমি বিয়ে করবোনা। আমি মাকে বলে দেবো আপনি আমাকে পছন্দ করেন না। আজ আপনার সামনেই বলবো। পছন্দ না করে বিয়ে করা ঠিক হবেনা। আয়েশা, আমি আসছি তোমার ফ্ল্যাটে। বিয়ে না হলে এখানে এসে কি করবেন। তুমি আমাকে কষ্ট দিচ্ছো কেন? কেন কষ্ট হবে। আপনিতো প্রেম করেন না। মার সাথে আলাপ করে আমাকে জানাবেন আপনি কি করবেন। আমি এখন রাখছি। আল্লাহ হাফেজ। আরসালান পার্ক রোডে আসার সময় কেএফসি থেকে খাবার নিয়ে আসে। ফারজানা বেগম ও খাবার নিয়ে এসেছেন। গুলশান বেগমের বাসা থেকেও খাবার আসছে।

তখন বেলা তিনটে। টেবিলে খাবার সাজাবার জন্যে ফারজানা আখতার বুয়াকে বলেছেন। আসুন বেয়াইন সাহেবা, সবাই টেবিলে আসুন। আরসালানকেও ডাকুন। আসো বাবা। মা, আমরা খেতে খেতে কথা বলি। খালা কিছু কথা বলবেন। আজ আপনাদের বাসায় যাওয়ার কথা আছে। বলো খালা। এখন  না, খাওয়ার  পর বলবো। তখন আরামে কথা বলা যাবে। ঠিক আছে বেয়াইন ,খাওয়ার পরেই শুনবো। বিকেল চারটার দিকে সবাই সোফায় বসে আরাম করছে। এমন সময় চা কফি এসেছে। ফারজানা কথা  শুরু করলেন। আজতো আপনাদের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। সেটা এখন এখানে সেরে ফেলতে চাই। আজতো আর সময় নেই। আয়েশার  বাবা মা  আগামী কাল ঢাকা এসে পৌঁছাবেন। এখানে দুপুরে খাবেন। একটু রেস্ট নেবেন। তারপর আমরা শপিংয়ে বের  হবো। আয়েশা তার মা আর  বোনকে  নিয়ে বের হবে। আমি দুলাভাইকে নিয়ে টেইলারের কাছে যাবো। আর দুলাভাই আজই গাড়ি কিনবেন। আমরা চাই যেদিন যাবো সেদিনই আকদ হয়ে যাক। আপনারা কাজী ও মাওলানা সাহেব রেডি রাখবেন। আয়েশার মামারা সবাই অনুষ্ঠানে থাকবেন। বড় জামাই ও আসবেন। সব মিলিয়ে পনেরো জন থাকবেন। এবার বলুন আপনি রাজী আছেনতো। আর মোহর কথা হবে বলুন। সেটা আপনাদের বিষয়। বেয়াই সাহেব যা বলবেন তাই হবে। মোহরের ব্যাপারে আমাদের কোন মত নেই। সবকিছুই আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম। বেয়াই সাহেব কখন আমাদের বাসায় আসবেন এখন জানাতে পারবেন। এ সপ্তাহেই জানাবো। শুধু টেইলারের ওখানে আমাদের দুইদিন সময় লাগবে। আয়েশার মা ও বোনের জন্যে দুই দিন লাগবে। তাহলে জানুয়ারীর পঁচিশ তারিখ করুন। দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলে মোহর ঠিক করবো। মেয়েকে আর জামাইকে আমরা সাজিয়ে দিবো। আপনাদের কিছুই করতে হবেনা। না বেয়াইন, রাজী হতে পারলাম না। আয়েশাকে সাজাবার দায়িত্ব আমাদের। আকদের পর ফেব্রুয়ারীর শেষে আমরা ওয়ালিমা করবো ওয়েস্টিনে। আপনাদের নিকট দূর সকল আত্মীয়কে দাওয়াত করবেন। আমাদেরতো ঢাকায় তেমন আত্মীয় নেই। ওয়ালিমা অনুষ্ঠানে আমার জামাই ও মেয়েরা আসবে। পাকিস্তান ও ভারত থেকেও আমার কিছু আত্মীয় আসবেন।

আচ্ছা, বেয়াইন সাহেবা, আপনারা তাড়াহুড়ো করে কেন গাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনছেন। আকদের আগে এসবের কি প্রয়োজন। এসব দুলাভাইয়ের ইচ্ছা। আমাদের কিছু বলার নেই। তিনি যা বলবেন তাই হবে। মাঝখানে হঠাত্‍ আরসালান বলে বসলো মা আয়েশার বাবাতো খুবই রাগী মানুষ। যদি আমাকে পছন্দ না করেন। সবাই হেসে উঠলো। কেন মা, তোমরা হাসছো কেন? বাবা, হাসছি তোর কথা শুনে। আয়েশা মুচকি হাসছে। বেটি তুমি বলো,তোমার বাবা আরসুকে পছন্দ না করে তাহলে কি হবে। মা, তখন আমি আপনার ছেলেকে বিয়ে করে আমাদের ফ্ল্যাটে এসে উঠবো। তাহলে হবেতো মা। কি বেটা তুমি কি তাহলে আয়েশার সাথে ওদের ফ্ল্যাটে গিয়েই উঠবে।  মা যেটা নিয়ম সেটাই হবে। তুমি কি নিয়ম কানুন কিছুই জানোনা। না মা, আমি আর কোন কথা শুনবোনা। আপনার ছেলেকে আমি বিয়ে করবোই। আমার বাবা পছন্দ না করলেও। কি বেটা, এবার ঠিক আছেতো। তুমি এসব নিয়ে একেবারেই চিন্তা করোনা। আয়েশা সবকিছু সামলে নেবে। আয়েশার বাবা এলে আমি কি সামনে যাবো? নিশ্চয়ই যাবে ,সালাম করবে। উনি কিছু প্রশ্ন করলে খুব বিনয়ে উত্তর দিবে। তুমি সবার মেহমানদারী করবে। সবার সাথে পরিচিত হবে। হাসিখুশী থাকবে। উনিতো তোমার বাবা। আমরা সবাই মিলে তাঁদের খেদমত করবো। সার্ভিস দেয়ার জন্যে ওয়েস্টিন থেকে তিনজন বেয়ারা নিয়ে আসবো। ওরাইতো খাবার সাপ্লাই করবে। বেটা আরসু তুমি কি ভার্সিটির কাউকে দাওয়াত করবে? নিশ্চয়ই করবো মা। ভিসি স্যার, আমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান স্যার ও ডক্টর উইলিয়াম ক্রস। ভিসি স্যার বলেছিলেন,তিনি আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আয়েশার বার কাছে যাবেন। এতো আমাদের জন্যে খুবই মর্যাদার বিষয়। উনি হবেন আমাদের উভয় পক্ষের উকিল। মা, আয়েশা সব জানে। কিরে মা কিছু বলিসনিতো। আমার বাবার কনফারমেশনের জন্যে আগে ভাগে কিছু বলিনি। বাবাকে জানিয়েছি। তিনিও খুব খুশী। বলেছেন, আমার মেয়ের বিয়ের উকিল হবেন ভিসি সাহেব,এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কি হতে পারে। আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শোকর।

আরসালান ডক্টর ক্রসকে ফোন করে জানালো যে সবাই রাজী। আয়েশার বাবা ঢাকা আসবেন আগামী কাল। তিনদিন পর আপনারা তিনজন আয়েশার বাবার কাছে যাবেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আমাদের দেশের রেওয়াজ ভিসি স্যার জানেন। তেইশে জানুয়ারী আপনারা আমাদের বাসা হয়ে আয়েশার বাবার কাছে যাবেন। ধরুন, আমাদের বাসায় আসলেন সকাল দশটায়। এগারোটায় আয়েশাদের বাসায় যাবেন। তাঁদেরকেও ঠিক মতো ব্রীফ করা আছে। আয়েশা আমার পাশেই আছে। ওর সাথে কথা বলবেন? ও কি লজ্জা পাচ্ছে? কথা বলে দেখেন। কি খবর আয়িশা, কেমন আছো? জ্বী স্যার খুব ভালো। শেষ পর্যন্ত আমরাই তোমার বিয়ের উকিল হয়ে গেলাম। সেতো আমার ও আমার পরিবারের জন্যে সৌভাগ্য। আমার বাবা মাও খুব খুশী হয়েছেন। আমার মামারাও খুশী। আমরাও সবাই খুব খুশী। তুমিতো   আমাদের প্রিয় ছাত্রী। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে সুনাম বয়ে আনবে। তবে স্যার বিয়েটা একটু আগে হয়ে যাচ্ছে। আমিতো এখনও গ্রাজুয়েশনই করিনি। ভাগ্যে কি আছে জানিনা। চিন্তা করোনা,তোমরা দুজনই বিদেশে পড়ালেখা করবে। ডক্টর আরসালান আরেকটা পিএইচডি করবেন। আমার ইচ্ছা তোমরা হার্ভার্ডে পড়ো। সরকার ও রাজনীতির বিষয়টা ওখানেই খুব ভালো পড়ানো হয়। জগতের সেরা শিক্ষকরা ওখানে পড়ান। তুমি যদি ডিবেটে প্রথম দশজনের ভিতর থাকো তাহলে হার্ভার্ডে পড়ালেখা ফ্রি হয়ে যাবে। এমনিতেই অনেক দেশ তোমাকে স্কলাশীপ দেবে বলেছে। খরচের বিষয়টা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবেনা। তোমরা দুজনই যদি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারো খুব ভালো। ডরমেটরিতে টিচারদের জন্যে ভালো একোমোডেশন আছে। তা না হলে আশে পাশে ভাল সার্ভিস ফ্ল্যাট আছে। সেখানেও থাকতে পারবে। অনেক গুলো দেশ তোমার পাশেই আছে। আরসালানের বিষয়টা ভিসি স্যার দেখবেন বলেছেন। আয়িশা গুডলাক ফর ইউ। তোমার কল্যাণ কামনা করছি। তোমরা সুখি দম্পতি হও। দোয়া করবেন স্যার। তাহলে আমি এখন রাখছি। ভিসি স্যারকে বিষয়টা জানাতে হবে। স্যার ফ্রি আছেন কিনা জানতে হবে। এমন কি মহা গুরুত্পূর্ণ কোন ভিভিআইপির সাথে এপয়েন্টমেন্ট থাকলে তা সেরে জরুরী ভিত্তিতে আয়েশার বিষয়টাকে প্রায়োরিটি দিতে হবে।

পরেরদিন সকাল এগারোটায় সালামত খান  বারিধারায় পৌঁছান। সাথে আয়েশার মা ও বোন ছিল। সবাই বাড়ির গেটেই অপেক্ষা করছিলো। আয়েশা বাবা মার পা ছুঁয়ে সালাম জানায়। শরিফাকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে থাকে। আপু শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেলি। আমি সীমাহীন আনন্দিত হয়েছি। আল্লাহপাকের কি কুদরত। আমার বিয়েকে কেন্দ্র করে সব বিবাদ দূর করে দিয়ে মহামিলন ঘটিয়েছেন। শরিফা বলে,বিন্দু তুই আমাদের পরিবারের ভাগ্য। আমরা কখনো ভাবিনি বাবা একদিন এমন নরম হয়ে যাবেন। এতো উদার হয়ে যাবেন। আচ্ছা বিন্দু বলতো তুই কেমন করে এতো  বিখ্যাত হয়ে গেলি। কি এমন মিরাকল জানিস তুই। আপা আমি নিজেও জানিনা। কি রে তোরা বোনে বোনে এত কি কথা বলছিস। চল আগে ফ্ল্যাটে যাই। হাত মুখ ধুই। সরি বাবা ভুল হয়ে গেছে। আপাকে কত বছর পর দেখলাম। তাই আবেগ সামলাতে পারিনি। চলো চলো, লিফটের থার্ড ফ্লোর ডি ফোর। মা তুমিতো কখন ঢাকা আসোনি। আপা এসেছিলো এইচএসসি পাশ করে  ঢাকায় ভর্তি হতে। কিন্তু বাবার কারণে পারেনি। বাবার টাকা পয়সা বা সম্পদের অভাব ছিলনা। শুধু অভাব ছিল একটা ভালো মনের। জানিনা বাবা কেন এমন ছিলেন। অহংকার আর গোঁয়ার্তুমি বাবাকে অমানুষ করে ফেলেছিল। যাক শেষ পর্যন্ত  বাবা বদলে গেছেন। তুমি কিছু মনে করোনা। বার বার তোমার অতীতের কথা ফিরে আসছে। তোরা এখন বকলে আমি কিছু মনে করিনা। আমি শুধরে গেছি এটাই আমার আনন্দ। আজ আমার হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার খুলে গেছে। আমার মেয়ের ভাগ্যে আমি আজ সম্মানিত। মেধাবী মেয়ে, নবাব পরিবারের সাথে সম্বন্ধ হচ্ছে। আমার কারণেই আমার বড় মেয়েটা এতদিন কষ্ট পেয়েছে। মা, তোরা সবাই আমাকে মাফ করে দে। বাবা তুমি ওয়াদা করো আপাকে অনার্সে ভর্তি করে দেবে। আপা এখন থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে। দুলাভাই মাঝে মধ্যে এখানে আসবেন থাকবেন।  আপার ছেলে দুটো এখানে থাকবে। তুমি কি বলো আপু। আমি রাজী। তোর দুলাভাইও রাজী।  তাহলেতো আর কোন সমস্যা থাকলোনা। বাবা, আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়বো। প্রথমে যাবো গাড়ির দোকানে। সতেরো মডেলের একটা প্রিমিও কিনবো। পঁয়ত্রিশ লাখের ভিতর হয়ে যাবে। কি বলো বাবা। ঠিক আছে। তোর যেমন ইচ্ছা তেমন কিনবি। টাকা নিয়ে ভাববিনা। এসব সম্পদতো তোদেরই। আমি শুধু এতোদিন রক্ষা করেছি। এখন দেখছি আমার দুই ছেলে সব ধ্বংস করে ফেলবে। ওদের আমি মানুষ করতে পারিনি। আমি সব সময় ভেবেছি ওরা আমার মতো হবে। মাতব্বরি করবে।হায়রে কপাল। সালামত খানের ছেলেরা হয়েছে মাতাল ও জুয়াড়ি। এই যে, ওদের সাথে করে আনিনি আমার খুব খারাপ লাগছে। ওরা কেউ আসতেও চায়নি। ওরা নিজেরাই বুঝে ওরা এখন আর ভদ্র সমাজের উপযুক্ত নয়। বাবা, তুমি ওসব নিয়ে এখন চিন্তা করোনা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আমেরিকা যাওয়ার আগে ওদের ঢাকা নিয়ে আসবো। এখানে ভিন্ন পরিবেশে থেকে ওরা পরিবর্তন হতে বাধ্য। ওদের বউরাওতো পড়ালেখা জানা। শ্বশুর শ্বাশুড়ী শালারা সবাই শিক্ষিত ভদ্রলোক। ওদের অনেকেই ঢাকা থাকেন। বড় দুলা ভাই কখন আসবেন। বলেছে, আরসালানদের বাসায় যদিন যাবো সেদিন সকালেই এসে পৌঁছাবে। ওকে একটি মাইক্রো ভাড়া করে আসতে বলেছি। আপা, উলাভাইয়ের ভাল কাপড় চোপড় আছেতো? আছে আছে অনেক কাপড়। গ্রামের সওদাগরতো পোষাক নিয়ে তেমন ভাবেনা। তাছাড়া বসেতো আড়তে। চেম্বার বা ব্যান্কে যেদিন যায় সেদিন খুব পরিপাটি হয়ে যায়। গ্রামে পোষাক নিয়ে তেমন কেউ ভাবেনা। ভাবো অর্থবিত্ত আছে কিনা। আমার শ্বশুরের অনেক সম্পদ। সেতো একমাত্র ছেলে। সে সব পেয়েছে। বোনদের কিছু দিয়েছে। বিয়ের পরতো ভালই ছিল। বাবার সাথে কি নিয়ে বিরোধ হয়ে বিগড়ে গেছে। তখন থেকেই বাবার সাথে বেয়াদপী করতো। আমাকে বন্দী করে রাখতো। আমার শ্বাশুড়ী বহুবার বলেছেন বাবার সাথে মিটমাট করে ফেলতে। বলতেন, যা উনি তোর মুরুব্বী। পিতার সমান। ওঁর সাথে এমন জিদ করিসনা। বদ দোয়া লাগবে। বূটাকে বাপের বাড়ি যেতে দিসনা। নাতিরা নানার বাড়ি যেতে পারেনা। এমন জিদ কিসের। আল্লাহ এসব পছন্দ করেন না। তোর বাপতো খুবই নরম ঠান্ডা মানুষ ছিলেন। উনি থাকলে এমন করতে পারতিস না। উনি জানতেন সালামত খান একটু ওরকম টাইপের মানুষ। নিজে বড় তেমন একটা ভাব আছে। তবুও তোর বাপ বলতো আমার বেয়াই সালামত খানকে এক ডাকেই সবাই। জামালপুরে যদি বলতাম আমি সালামত খানের বেয়াই সবাই চেয়ার এগিয়ে দিতো। তোর বাপ থাকতে উনি আমাদের বাড়িতে বহুবার এসেছেন। তোর সাথে কিসের বিরোধ আমি বুঝিনা। আপন ছেলে হলে তুই এমন করতে পারতিস।

আসলে বাবার কারণেই লোকটা এ রকম হয়ে গেছে। মেয়ের বাপকে একটু বুঝে শুনে চলতে হয়। আমার প্রতি বাবার কোন মায়া ছিলনা। তাই পাষানের মতো ব্যবহার করে। শ্বশুর বাড়িতে আমি এতিমের মতো ছিলাম। মনে হতো এ জগতে আমার কেউ নেই। শরীফা এসে বাপের কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বাবা মাফ করে দিও। বাঘের মতো মানুষ সালামত খানও হু হু করে কাঁদতে থাকেন। শরীফার কথায় বুক ভেংগে যায়। আয়েশার মা কাছে এসে বসেন। চলেন, একটু বিশ্রাম নিবেন। ওদের কথায় কান দিবেন না। এই কদিন ওরা কম কথা শুনায়নি। না শরীফার মা, ওদের বলতে দাও। আমার মেয়ে শরীফা মাটির মানুষ। ওর প্রতি এ কয় বছর অনেক অন্যায় করেছি। তোমার প্রতিও অন্যায় করেছি। তোমরা সবাই আমাকে মাফ করে দাও। আমার মা শরীফা এখন থেকে আমার বাড়িতে থাকবে। জামাই বলবো আমার ব্যবসা দেখা শুনা করতে। আমি ওকে শেয়ার দিয়ে দেবো। দুপুরের খাবার খেয়ে সালামত খান ও কুলসুম বেগম এক বিছানায়  বিশ্রাম নিতে যান। বহুদিন তাঁরা দুজন দিনের বেলা এতো কাছাকাছি হননি। কুলসুম বেগম সালামত খানের মাথা হাত পা টিপে দেন। ঘুম এসে যায়। কুলসুম বেগম বেরিয়ে আসেন মেয়েদের কাছে। তোর বাবা ঘুমিয়ে গেছেন। মনে হলো বহুদিনের ক্লান্তি। দিনের বেলা কখনই ঘুমান না। আমার মনে হয় শরীর নরম হয়ে গেছে। তোরা আর জ্বালাস না। আজ আর বের হতে পারবে বলে মনে হয়না। মা আয়েশা তুই কি বলিস। টিকই বলেছো মা।  বাবার বয়স কত হবে মা? মনে হয় ষাটের উপরে সত্তুরের নিচে। আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর। আঠার বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়েছে। আমার বাপজান বলতেন আমার কুসুম ভাগ্যবতী। রাজরাণী হয়ে থাকবে। ছেলেটা দেখেছিস। একেবারে রাজপুত্রের মতো। আমার শ্বশুর সাহেব ও এ রকম ছিলেন। এরা খুবই পুরাণো পরিবার। পাঁচ পুরুষের সম্পদ আছে। তোদের বাবার নাম ডাক হয়েছে বেশী। কেন যেন সবাই ভয় পেতো। আমার সাথে কখনও মন্দ কথা বলেননি। দিনের বেলা তেমন কথা হতোনা। রাতে দুজনে এক সাথে থাকতাম। খুব ভোরে আজানের সাথে উঠে যেতেন। আমি একটু আলসে ছিলাম। ফজরের নামাজ পড়তামনা। আমার শ্বশুর বলতেন, ও আমার মেয়ে। কদিন হেসে খেলা দিন কাটাক। আমায় কাছে নিয়ে বসাতেন। জিগ্যেস করতেন আমি গাছে উঠতে জানি কিনা। পুকুরে সাঁতার কাটি কিনা। একদিন ডেকে জানতে চাইলেন আমি সালোয়ার কামিজ পড়তে পছন্দ করি কিনা। একদিন তোর বাবাকে ডেকে বললেন মিয়া সালামত বউয়ের মন বুঝো। কেন বাবা, কি হয়েছে? কোন অসুবিধা? না না অসুবিধা হবে কেন। ভাল করে খেয়াল রাখবি। ও আমার মেয়ে। অনেক কষ্ট করে আমি ওকে এ বাড়িতে এনেছি। বেয়াই সাহেব এমএ পাশ ছেলে পেয়েছিলেন। আমি আমার শ্বশুর সাহেবকে আব্বাজান বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে লম্বা করে কুসুম মা বলে ডাকতেন। তোদের বাবার মন খারাপ থাকে ছেলেদের কারণে। শরীফার জামাইর সাথেও সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি দেখি এখন মানুষটা মোমের মতো হয়ে গেছে।

 

রূপকথা ৭

কি খবর আয়িশা কেমন আছো? কদিন হলো তোমার সাথে দেখা হয়না। তাই আরসালান সাহেবকে বললাম তোমাকে নিয়ে এখানে আসতে। জ্বী স্যার আপনার খবর পেয়েই ছুটে এলাম। ধন্যবাদ। ডক্টর আরসালান আপনিও এখানে এটেন্ড করতে পারেন। আয়িশার সাথে এখন প্রতিদিনই বিদেশী দূতের প্রতিনিধিরা দেখা করতে আসবেন। সপ্তাহে তিনি চারদিন মেহমানেরা আসবেন আয়েশার সাথে আলাপ করবেন। আরসালান আপনি থাকলে খুব ভালো হবে। আপনিতো আয়েশার শিক্ষক। আপনি তার সম্পর্কে ভালো জানেন। আগত অতিথিদের প্রয়োজনীয় ব্রীফ করতে পারবেন। একেবারেই ইনফরমাল আলোচনা। কোন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা নেই। দুইতিনজন কূটনীতিক এক সাথেও আসতে পারেন। তারা আয়েশার সাথে খোশ গল্প করবেন বিশ্বে চলমান হালহকিকত নিয়ে। দেখবেন চলমান বিশ্বের খবর আয়েশা কতটুকু জানে। এ সপ্তাহ এভাবেই যাবে। পরের সপ্তাহে আমরা দুজন থাকবো না আয়েশার সাথে। সে একাই মেহমানদের অভ্যর্থনা জানাবে। আমরা পাশের রুমে আয়েশার পারফরমেন্স দেখবো। কি বলেন, ডক্টর আরসালান। খুবই চমত্‍কার। আফটার অল আপনার প্লানিং। আমি বুঝতে পারছি আপনি আয়েশার জন্যে খুবই কনসার্ন্ড। কেন হবোননা বলুন। আপনারা সবাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। সারা বাংলাদেশের আস্থা আমার উপর। তবে আমি ভেবে অবাক হচ্ছি যে ,গ্রাম থেকে এসে একটি মেয়ে  এতোদূর এগিয়ে যেতে পারে।  আপনাদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে মেয়েটার ভিতর আগুন আছে। আমরা শুধু সে আগুনকে জ্বালিয়ে রাখছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো মেয়েটার এডাপটিবিলিটি পাওয়ার। এটা সাধারনত গ্রামের মেয়েদের ভিতর থাকেনা। এর উপরে রয়েছে মেয়েটার রূপ ও সৌন্দর্য। শহরের মেয়েরা ঘসে মেজেও এতো সুন্দর হতে পারেনা। ওকে দেখে মনে হয় ইরাণী মেয়ে। আপনার কি মনে হয়? আমি ওভাবে ভাবিনি ও দেখিনি। এক কাজ করুন, মেয়েটাকে আপনি বিয়ে করে ফেলুন। খুব ভাল মানাবে। আপনি নিজেও শরীফ ঘরাণার মানুষ। আপনার সাথে মানাবে ভালো। আমি কিন্তু আয়েশার ফ্যামিলী ব্যাকগ্রাউন্ড জানিনা। শুনেছি ঢাকায় খালার বাসায় থাকে। বাপের অবস্থা ভালো। খবর আপনিতো দেখছি সব খবর রাখেন। শুনেছি,  নিজে থেকে আমি কোন খবর নিইনি।  এটাও শুনেছি, ঢাবির ছেলে মেয়েরা আয়েশা আর আপনাকে নিয়ে নানান গল্প করে। ওটা ঢাবির কালচার। বানানো গল্প নিয়ে গসিপ করা। আমি তাই আয়েশাকে দূরে থাকতে বলেছি। আপনি কি আয়েশার মন জেনেছেন। না আমাদের সোসাইটিতে সরাসরি এসব কথা বলার  রেওয়াজ নেই। অভিভাবকরা কথা বলেন। আমি কি ভিসি স্যারকে বলবো বিষয়টা। এখনি বলবেন , না ফাইনালের পর বলবেন। আপনি রাজী আছেন কিনা? ভিসি স্যারের কাছে জানতে চাইবো আপনাদের দুজনের বিয়ে হলে কেমন হয়। তখন তিনি বিষয়টা চিন্তা করতে পারবেন। কদিন গেলে তিনি নিজেই জানাবেন। দূতাবাসের বন্ধুরা এসে গেছেন। আলোচনা শুরু করা যাক। দেড়টার দিকে আমরা লাঞ্চ করবো। আয়েশা এঁরা দুজনই সুইডেন ও ডেনমার্ক দূতাবাস থেকে এসেছেন তোমার সাথে আলাপ করতে। স্যার, মিট মিস আয়েশা।  হ্যালো, আপনার সাথে কথা বলতে পেরে খুবই আনন্দিত। আপনি এখন কি পড়ছেন? রাজনীতিতে অনার্স করছি। এখন ব্যস্ত আছি ডিবেট নিয়ে। আশা করছি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপে অংশ নিতে পারবো। আমরা শুনেছি আপনি খুব ভালো লেকচার দেন। আমার স্যারেরা শিখিয়েছেন। এখনও ট্রেনিং দিচ্ছেন। তারই অংশ হিসাবে আজ আপনারা সাথে কথা বলতে এসেছেন। আমরা শুনেছি বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে আপনি উচ্চ শিক্ষা নিতে চান। জ্বী ,আমার আমার তেমন ইচ্ছা আছে। আপনাদের সহযোগিতা পেলে নিশ্চয়ই পড়বো। বাকি সব আল্লাহর ইচ্ছা। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে আমার খুব আগ্রহ। তাই সরকার ও রাজনীতি নিয়ে পড়তে চাই। এ বিষয়ে পিএইচডি করবো। পরে সুযোগ পেলে আইন পড়বো। পড়া শেষ করে কি দেশে ফিরবেন। জ্বী, ইচ্ছা আছে। তবে শুরুতে আমেরিকায় থাকতে চাই। বিশ্ব রাজনীতির ফোকাল পয়েন্ট হলো আমেরিকা। সেখানে থেকেই কথা বলতে চাই। আমাদের দেশ গুলো আপনার কেমন স্টাডি আছে। কিছু আছে। আপনার জন্যে কিছু বই নিয়ে এসেছি। আমেরিকায় ডিবেট শেষ হলে আপনি আমাদের দেশ গুলো সফর করতে পারেন। আমরা আপনাকে এখনি মৌখিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমাদের দুজনের কার্ড দিচ্ছি। আপনি সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন। আপনারা ডক্টর ক্রসের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন।

আপনি কি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবেন? ভাবি, এখানে রাজনীতিতে কোন নিয়ম কানুন নেই।জনগণের আকাংখা মোতাবেক নির্বাচন হয়না। ছাত্র ও যুবশক্তির দেশপ্রেমের কোন দর্শণ নেই। তারা দলের কাজ করে। তারা শক্তিতে বিশ্বাস করে,যুক্তিতে নয়। রাজনৈতিক দলগুলোতে  আভ্যন্তরীন ডেমোক্রেসী নেই। একজন লোক তিরিশ চল্লিশ বছর সভাপতি থাকে। তিনিই সব ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর চিন্তাই দলের চিন্তা। নির্বাচন কমিশন সরকারকে ভয় করে। অনেকেই চাকুরী রক্ষার জন্যে কথা বলে। সরকার নিজেও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন চান না। একবার ক্ষমতায় গেলে আর নামতে চায়না। পৃথিবীতে অনেক ডেমোক্রটিক ডিক্টেটর আছেন। যারা তিরিশ বছর ক্ষমতায় আছেন। বাংলাদেশে দুর্ণীতি একটা আদর্শে পরিণত হয়েছে। এমন একজন রাজনীতিক নেই যিনি স্বচ্ছ ও আদর্শবান। আমি যদি যুক্তিতর্কের খাতিরেও এসব কথা বলি তাহলে আমার বিরুদ্ধে মামলা দেবে। এখানে নিম্ন আদালত গুলো একশ ভাগ সরকারের কথা মতো চলে। এখন সমাজে গুম শব্দটি বহুল প্রচারিত। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন বিশ্বের জন্যে একটা মডেল। নির্বাচন না করেও সরকার গঠণ করা যায়। ভোটার না থাকলেও সরকারী কর্মচারীরা বাক্সে ব্যালট ভরে দেয়। আপনারা নিশ্চয়ই এসব জানেন। আপনাদের আবার কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা আছে। কূটনৈতিক জগতে ন্যায় আচার বিচার এখন জেলখানায় আছে। আবার ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে সকল অবৈধ যৌনচারকে আইনী অনুমোদন দেন। আপনারা ধর্মকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। আপনারা  নবী ঈসা(আ)কে নিয়ে তামাশা করেন। অথচ আপনারা নিজেদের নিয়ে গৌরব বোধ করেন। দেখুন, সত্য ও ন্যায় সারা বিশ্বে এক। ধনীদের সত্য আর গরীবের সত্য বলে আলাদা কিছু নেই। আমেরিকার আইন দেশের মানুষের জন্যে একরকম ভিন দেশের জন্যে আরেক রকম। অথচ আমেরিকা বিশ্বের মুরুব্বী মনে করে। আমেরিকার নির্বাচনও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে বিশ্ব এখন এক অসহায় সময়ের ভিতর দিতে পার হচ্ছে। বিশ্বে ক্ষমতার লড়াই চলছে। কে বড় আর কে ছোট।সব মানুষ সমান। খোদা মানুষ সৃষ্ট করেছেন কতগুলো মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে। সরকার গুলো এখন মানুষের খোদা হয়ে গেছে। এখন দলীয় আনুগত্য দেখে বিচারপতি,রাস্ট্রপতি সেনাপতি বিদ্যাপতি নিয়োগ দেয়া হয়। গণতন্ত্র এখন রাজনীতিকদের দাসে পরিণত হয়েছে। তাই আমি বিশ্ব ব্যবস্থার উপর পড়ালেখা করতে চাই। বিশ্বের জ্ঞানী ও দার্শনিকদের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশে কথার বলার তেমন স্বাধীনতা নেই। এখানে সমাজের নব্বই ভাগ অবহেলিত। এমন সময় ডক্টর ক্রস বললেন, আসুন সবাই আমাদের মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় হয়ে গেছে। টেবিল সাজানো হয়ে গেছে। বলুন, আপনাদের মুক্ত আলোচনা কেমন হয়েছে। মিস্টার রচেস্টার বললেন, মিস আয়েশা খুব ভালো কথা বলেছেন। আমরা তাঁর উজ্জল ভবিষ্যত কামনা করি। আমরা তাঁকে সকল সহযোগিতা দিতে রাজী আছি। ডক্টর ক্রস যখন দরকার হবে আমাদের জানাবেন। নিশ্চয়ই জানাবো। আসুন, আমরা খেতে খেতে কথা বলবো। মিস,আয়েশা আপনি কি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারবেন? আমি আশা করছি। তবে মনে রাখবেন,এটাতো বিশ্ব প্রতিযোগিতা।আমার চেয়ে ভাল প্রতিযোগী আছে। আমেরিকা থেকে অনেক বেশী প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছে। ভারত পাকিস্তান থেকেও আছে। চীন থেকেও আছে। ক্রস বললেন, মিস্টার রচেস্টার আমি আয়িশার ব্যাপারে খুবই আশবাদী। ওকে আমরা যে ভাবে তৈরি করছি তা আর কোন দেশ করছে বলে মনে হয়না। ঢাবিও এ বিষয়কে সিরিয়াসলি নিয়েছে। বৃটিশ কাউন্সিলকে পার্টনার করেছে। আমি পুরো সময় দিচ্ছি। এছাড়া আমেরিকাতেও আমরা এক মাস সময় পাবো। এটা আমাদের জন্যে একটা চ্যালেজ্ঞ। এখানে ফান্ডের কোন সমস্যা নেই। ভিসি সাহেব একশ’ভাগ সাপোর্ট দিচ্ছেন। পুরো বৃটিশ কাউন্সিল সাপোর্ট দিচ্ছে। আমেরিকাতে আমাদের প্রথম রাত হচ্ছে প্রতিযোগীদের পরিচিতি ডিনার। পরেরদিন পরিচিতি সভা। পঞ্চাশ দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নিচ্ছে। আয়েশাকে বলেছি একদম ফ্রি থাকতে। কোন ধরণের জড়তা নয়। নিজেকে একজন নারী বা নর মনে করার দরকার নেই। নিজেকে শুধুই মানুষ ভাববে। মেধাবী কিন্তু একটু বেয়াড়া ধরণের ছেলেও থাকতে পারে। সেটা আমরা কমিটির সাথে আলাপ করে নেবো। আমরা সব প্রতিযোগীর সিভি চেক করবো। আমার ধারণা আয়িশা প্রতিযোগীদের ভিতর সর্ব কণিষ্ঠ।

ফারজানা আখতার আয়েশার বাবার সাথে কথা বলার জন্যে গ্রামে গেছেন কয়েকদিন হলো। এখনও ফিরে আসছেন না। আয়েশা চিন্তায় পড়ে গেছে তার বাবা খালার সাথে কেমন ব্যবহার করছে এ নিয়ে। বাসায় গিয়ে খালুর সাথে কথা বলে জানতে পেরেছে সব কিছু ঠিক আছে। তোমার খালা দুয়েক দিনের ভিতর ফিরে আসবে। তোমার খাছালত অনুযায়ী শুরুতে ক্ষ্যাপে উঠেছিলেন। ভেবেছিলেন মেয়ে প্রেমে পড়েছে। এরপরেই কিছুক্ষণ বকবক করেছেন। চিত্‍কার করেছেন। বলেছেন এজন্যেই তিনি মেয়েকে ঢাকা পাঠাতে চাননি। তিনি শুনেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে মেয়েরা বেয়াড়া হয়ে যায়। ফারজানা বলেছেন, দুলাভাই, হাজার বছরেও আমরা এত বড় পরিবারে আত্মীয়তা করতে পারবোনা। এটা আয়েশার ভাগ্য। আয়েশা এখন সারা দেশের আলোচিত ব্যক্তিত্ব। কদিন পরে বিদেশ যাবে ডিবেটে অংশ নেয়ার জন্যে। আপনার এ মেয়েটি একশ ছেলের চেয়ে বেশী। জামাই শ্বশুর শ্বাশুড়িকে মান্য গণ্য করবে কি না। ওরা অনেক প্রাচীন ভদ্রলোক ও খানদান। আয়েশার শ্বাশুড়ী একজন নবাবের মেয়ে। তাঁর স্বামী একজন সাবেক সচীব। বারিধারায় এক বিঘার উপর বাড়ি। পাঁচ কাঠার উপর একটি তিনতলা বাড়ি।  বাকি জায়গা পুরোটাই ফুলের বাগান। দুজন মানুষের জন্যে পনেরো জন স্টাফ।আপনারতো ঢাকায় কোন বাড়ি ফ্ল্যাট বা জমি নেই। জামাইকে কি দিবেন। নিজের ছেলেদের শিক্ষিত করেননি। তারা গ্রামে মাতব্বরী করে বেড়ায়। মানুষ চুপ করে থাকে আপনার কারণে। আপনিতো আবার গ্রামের মোড়ল। এক রোখা মানুষ। নিজেকে ছাড়া আর কাউকে সম্মান করেন না।  আপনার মোড়লীপনাতো এই গ্রাম ও ইউনিয়নে। ভাগ্য ভালো আয়েশা ঢাকায় গিয়েছিলো পড়তে। তাই ওর বিশ্ব দুয়ার খুলে গেছে। সে নাম করেছে। এখন আপনি মেয়েকে দেখলে চিনতে পারবেন না। সে এখন বাংলাদেশের সেরা মেয়ে। একটা মেয়েকে নিজের প্রভাবে রাখার জন্যে কাছেই বিয়ে দিয়েছেন। এখন সে বরের দাসী। এতো বড় শিক্ষিত মেয়ের কোন স্বাধীনতা নেই। আপনি বরকে বলে দিয়েছেন মেয়েকে পুরো পরাধীন করে রাখার জন্যে। যেমন আপনি আমার বড় আপাকে রেখেছেন। তিনিওতো পড়ালেখা জানা ভদ্রলোকের মেয়ে। আমার বাবা গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। সমাজ সেবার জন্যেই গ্রামে পড়েছিলেন। তাঁর ছেলেরা আজ দেশে বিদেশের বিখ্যাত মানুষ। আপনিতো কখনই আমার বাবা ও ভাইদের সম্মান করেননি। অতি আবেগেই আজ এই সত্য ও কঠোর কথা গুলো বললাম। মাফ করে দিবেন। আজ আমি তোদের কাঠগড়ার আসামী। বল,যতো ইচ্ছা বল। আমার বড়বোন জীবনে কোনদিন মুখ খুলতে পারেনি। তিনি আপনার দাসীমাত্র। জীবনে তাঁকে কখনও সম্মান করেননি। আপনিতো স্ত্রীকে সম্মান করতেই শিখেননি। আমার মা মেয়েদের অতি যত্নে আদর করে মানুষ করেছেন। আমার মাও শিক্ষিত ছিলেন। আমার মা বাবা তাই কোনদিন আপনার বাড়িতে বেড়াতে আসেননি। আপনি তাঁদের দাওয়াত করেননি। আপনার কোন অনুতাপও নেই। আর কি বলবো দুলাভাই। জামাই গ্রামে এলে কোথায় থাকতে দিবেন। গ্রামেতো একটা সুন্দর বাড়িও করেননি। মানুষকে অবহেলা করা আপনার ধর্মে পরিণত হয়েছে। এখন বলুন কখন যাবেন ঢাকা। ডক্টর আরসালান মানে আপনার জামাইকে দোয়া করতে। আগে আমার বাসায় উঠুন। সেখানে বসে আমরা প্ল্যান করবো। আয়েশাতো এখন গ্রামের বাড়ি আসতে পারবেনা। ওর ডিবেট ফাইনাল ফেব্রুয়ারীর একুশ তারিখে। আমেরিকা যাওয়ার আগে বাড়ি আসবে। ঢাকায় গিয়ে প্রথমেই আপনার কাজ হবে ড্রেস তৈরি করা। একটা খুব দামী শেরওয়ানী, আলীগড়ি পায়জামা,খুব দামী দুই জোড়া পাম্প সু ও ইন্দোনেশিয়ান টুপি। দাঁড়ি গুলোকে একটু ড্রেসআপ করতে হবে। সেটা একটা পুরুষ পার্লারে নিয়ে ঠিক করতে হবে। দুলাভাই আপনিতো এমনিতে খুবই সুন্দর পুরুষ। রাজপুত্রের মতো চেহারা। ভাল করে সাজাতে পারলে একজন নবাবের মতো হবে। মুখ গোমরা করে রাখবেনা। সব সময় হাসিখুশী থাকবেন। ঢায় বারিধারায় একটা ফ্ল্যাট কিনুন। ওখানে মেয়ে আর জামাইকে তুলে বাসর সাজাবো। একটা গাড়ি থাকবে। এতে আপনার খুশী হবে। আপনি আমাদের সাথেই ঢাকা যেতে পারেন। আপাকেও সাথে নিয়ে চলেন।  তাঁর জন্যেও ভাল কিছু পোষাক কিনতে হবে। না আমি তোদের সাথে যেতে পারবোনা। টাকার ব্যবস্থা করতে হবে। হাতে অত নগদ টাকা নেই। পাঁচ কোটি টাকার ব্যবস্থা করবো। কি বলিস হবেতো? কিছু জামালপুরের শহরের জমি বেচতে হবে। একটা ছোট মার্কেট বেচলেই হবে। ্যাক, চিন্তা করিসনা। আয়েশার খুশীর জন্যে আমি সব করবো। দুলাভাই আকদের সময় আমার ভাই ও মামাদের দাওয়াত দিবেন। আমার মাকেও ঢাকা নিয়ে যাবেন। আমার ভাইদের শ্বশুররাও খুব খানদানী মানুষ। প্রায় সবাই ঢাকায় থাকেন। আমি সবার ঠিকানা জানি। আজ থেকে সব সিদ্ধান্ত তোর আর মাহমুদের। তোরা যা বলবি আমি তাই করবো। তাহলে দুলাভাই আমরা আজই চলে যাই। ঢাকা যেয়ে সব ব্যবস্থা করতে হবে। আরসালানের মা আমাদের বাসায় আসার সময় এক লাখ টাকার কাপড় চোপড় নিয়ে এসেছেন।আমি যাওয়ার সময় কি নিয়ে যাবো ভাবছি। আমি তোকে দুই লাখ টাকা দিচ্ছি এখন। এখন থেকে বিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোর বাসার সব খরচ আমার। আয়েশার সাথে আলাপ করে গিফট কিনে নিয়ে যাবি। অথবা নগদ টাকা জামাইর হাতে দিয়ে বলবি বাবা, তোমার পছন্দ মতো জিনি কিনে নিও। আমার মাকে বলিস, ও জামাইকে বুঝিয়ে দিবে। ঠিক আছে এখন তোরা যা। দুই লাখ টাকা নিয়ে যা। আমি আর তোর আপা দুই তিনদিন পরে আসবো।

ফারজানা আয়েশাকে ফোন করে সুসংবাদ দিয়েছে। আমরা এখনি রওয়ানা হয়ে যাবো। তুই বাসায় থাকিস। তোর সাথে অনেক কথা আছে। এতো অল্প সময়ে কোম করে সব আয়োজন করবো। তোর মাও ঢাকা আসবেন। বেলা চারটার দিকে ফারজানা ও মাহমুদ ঢাকা পৌঁছে। দুজনেই আগে ওয়াশরুমে যেয়ে চেঞ্জ করে আসে। বিকেলের চায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শোন, সোফায় বসে জমিয়ে চা খাবো আর কথা বলবো। সুযোগ পেয়ে সারা জীবনের জীবনের সব ক্ষোভ ঝেড়েছি তোর বাপের উপর। টু শব্দও করেননি। সত্যি করে বলছি, যে দুলা ভাইকে বাঘের মতো ভয় করতাম তাকে এ রকম ঝাড়ি দিতে পারবো জীবনে ভাবতেও পারিনি। যা বলেছি তাই শুনেছেন। সব রাজী হয়েছেন। শুরুতে একটু রাগ দেখিয়েছেন। বলেছেন, মেয়ে আমাকে না জানিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। তাহলে আমাকে জানাচ্ছো কেন। আমি যখন সারা জীবনের ক্ষোভ বলতে শুরু করেছি তখন একেবারে চুপ। একটি কথাও বলেননি। দুলা ভাইকে এতো নরম জীবনে দেখিনি। আপা দেখলাম,দুলা ভাইয়ের পক্ষে ওকালতি করছেন। আপাকেও ঝাড়ি দিয়েছি। দেখো খালা, ওটা মায়ের মুখের কথা অন্তরের নয়। মাকে আমি বহুদিন নীরবে কাঁদতে দেখেছি। মা সেই জামানার শিক্ষিত মেয়ে। পুরো বংশের মানুষ শিক্ষিত। সেই নারী এ বাড়িতে এসে দাসী হয়ে গেছে। এ যেন বাঘের মুখে হরিণ। একবার ভেবে দেখো আমি ঢাকা না আসতাম তাহলে অন্ধকারেই পড়ে থাকতাম। শোন, দুলাভাই বারিধারায় ফ্ল্যাট কিনবেন। গাড়ি কিনবেন। জামাইকে উপহার দিবেন। ওই ফ্ল্যাটেই তোদের বাসর হব । দুলা ভাইয়ের পোষাকের জন্যে দুই লাখ টাকা খরচ করবো। তোর মাকে তুই শপিং মলে নিয়ে যাবি। পার্লারে নিয়ে মহারাণীর মতো সাজাবি। আত্মীয় স্বজন সবাইকে কাপড় দিবো। তোর আকদ হবে ওয়েস্টিনে। একটা রাজকীয় অনুষ্ঠান হবে। কি বলিস বিন্দু। খালা, আমার কাছে সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে। তুমি কেমন করে বাবার মন জয় করলে। না কোন ম্যাজিক করিনি। বেশ কঠোর ভাবে বকাবকি করেছি। মনে হয়েছে অষুধ কাজে লেগেছে। তোর ভাইরা পুরো সময় ধরে বিরোধিতা করেছে। তোর বড়বোনকেতো তোর বাপ কিছুই দেয়নি। এখন মনে হচ্ছে তাকেও তার হক বুঝিয়ে দিবে। তোর ভাইরা সম্পদ উড়িয়ে দিবে কয়েক বছরেই। তোর বড় বোনটা বড়ই দু;খি। বিয়ের পর সহজে বাপের বাড়ি আসতে পারেনা। মেয়েটা ভালো ছাত্রী ছিল। এইচএসসি পাশ করার আর পড়ায়নি। অনেক কান্নাকাটি করেছে। তবুও তোর বাপের মন গলেনি। তোর মাও অঝোরে কেঁদেছে। এখন তাঁর বিস্ময়কর পরিবর্তন হয়েছে। তোর বিয়ের জন্যে শহরের একটি শপিং মল বিক্রি করে দেবে। তোর মনের কোন আশাই অপূর্ণ রাখবেন না।

দুলাভাই কাল অথবা পরশূ ঢাকায় এসে পৌঁছাবেন। সাথে আপাও থাকবেন। আমি তোর খালু যাবো ফেরদৌসে তোর বাবার ড্রেস তৈরি করার জন্যে। ইমারজেন্সী চার্জ দিয়ে দুদিনের ভিতর তৈরি করাবো। দুটো নবাবী শেরওয়ানী, দুটো চোস্ত পাজামা, দুটো আলীগড়ি পাজামা, আদ্দির পাঞ্জাবী, দুটো নাগরা ও দুটো পাম্প স্যু, ইন্দোনেশিয়ান টুপি। লুংগী পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুলাভাইকে পার্লারেও নিয়ে যাবো।পঁচিশ জনের জন্যে ড্রেস তৈরি করা হবে। তুই আপাকে নিয়ে শপিং মলে যাবি। আপার মনে যা চায় তাই কিনবি। হাতের জন্যে একটি দামী ঘড়ি কিনবি।  দুলাভাই আর আপার ড্রেস হয়ে গেলে গুলশান বেগমের বাসায় যাওয়ার প্রোগ্রাম করবো। আমরা দশ জন যাবো। তোর মামারাও থাকবেন। আরসালানের হাতে পাঁচ লাখ টাকা দিবো ড্রেস তৈরি করার জন্যে। বারিধারায় ফ্ল্যাট কেনার বিজ্ঞাপন দিবো ডেইলী স্টারে। তবে জরুরী ভিত্তিতে একটা বড় প্ল্যাট ভাড়া নেবো। একজন বাবুর্চি ও একজন আয়া নিয়োগ করতে হবে। এ ব্যাপারে তোর হবু শ্বাশুড়ী গুলশান বেগমের সহযোগিতা চাইতে পারবি। একটা নতুন গাড়ী কিনতে হবে। তুই আর আমি আজ বিকেলেই আরসালাদের বাসায় যাবো। ফোনে এখনি জানিয়ে দে। হ্যালো মা আমি আয়েশা বলছি। আজ বিকেলে আমি ও খালা আপনার বাসায় আসবো। আপনি স্যারকে জানিয়ে দিবেন। আমি কেন বেটি, তুমি জানিয়ে দাও। বেটা আরসু খুশী হবে। এখন থেকে তুমি আর আরসুকে স্যার বলতে পারবেনা। মা এখনি পারবোনা।  আমার বাবা কাল অথবা পরশু সকালে ঢাকা আসবেন। আমার মাও সাথে থাকবেন। আমার মামারাও থাকবেন ফাইনাল কথা বা আকদের দিন। আজ তোমরা ক’জন থাকবেন। শুধু আমি আর খালা। রাতে খাবে নাকি। জ্বী না। বিকেলের চা হলেই চলবে। সে খথা বললে কি হবে? তোমার খালাতো প্রথমবার আসবেন। আগে বলে খুব ভালো করেছো। তুমিতো আমার মেয়ে। তুমিতো যখন তখন আসতে পারো। ও নিয়ে আপনি ব্যস্ত হবেন না। তোমার খালুজানকেও সাথে নিয়ে এসো। তিনি তখন অফিসে থাকবেন। এখনি বলে দাও তিনি যেন আজ বিকেলে আর অফিসে না যান। আমি কি তোমার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবো? জ্বী মা, ফ্রি থাকলে পাঠিয়ে দিন। বাবা ঢাকা এসে প্রথমেই গাড়ী কিনবেন। বারিধারায় ফ্ল্যাট কিনবেন। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এ বিয়েতে বাবা পাঁচ কোটি টাকা খরচ করবেন। তাহলে মা এখন ছাড়ি। ওকে বেটি। তোমরা ঠিক সময় এসে যেও। তোমার খালুও যেন আসেন। আমাকে তাঁর ফোন নাম্বারটা দাও। আমি ফোন করে দাওয়াত দিবো।হ্যালো বেয়াই সাহেব,আসসালামু আলাইকুম। আমি ডক্টর আরসালানের মা বলছি। কেমন আছেন। জ্বী খুব ভালো আছি। শোকর আহামদুলিল্লাহ। আপনিতো শুনেছেন বোধ হয়, আজ বিকেলে আপনার বেগম সাহেবা ও আয়েশা মা আমাদের বাসায় আসবেন। আপনিও আসবেন। আমি খুব খুশী হবো। নিশ্চয়ই আসবো।একদম ঠিক সময়ে এসে যাবো। আপনি চিন্তা করবেন না।

আয়েশার বড় বোন শরিফার জামাইকে ফোন করেছে আয়েশার মা। বাবা, আমি তোমার শ্বাশুড়ী বলছি। শরিফার মা। তোমরা কেমন আছো? আমার নাতিরা কেমন আছে? জ্বী আম্মা সবাই ভালো আছে। শরিফাকে নিয়ে তোমরা যদি আসো তাহলে খুব খুশী হতাম। আম্মা আমিতো ব্যবসা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকি। আমার হাতে সময় নেই শ্বশুর বাড়ি বেড়াবার মতো। দেখো বাবা তুমি আমাদের একমাত্র জামাই। ছোট মেয়েটাও এখন কাছে নেই। ঢাকায় থাকে। মাসে একবারও দেখা হয়না। সেতো শুনি এখন জগত বিখ্যাত হয়ে গেছে। টিভি রেডিও আর কাগজে তার নাম ও ছবি ছাপা হয়। সেতো তোমাদের জন্যেও খুশীর খবর। কতদিন শরীফার মুখ দেখিনি। মেয়েটাকে নিয়ে তুমি আসো বাবা। বেশী কাজ থাকলে পরের দিন চলে যেও। বলো বাবা কখন আসবে। আসবো আম্মা,দুয়েকদিনের ভিতর আসবো। তোমার শ্বশুরও ফোন করবেন। তিনি এখন আর বাঘের মতো নেই। একেবারে মাটি হয়ে গেছেন। তুমি হাজার অপমান করো টু শব্দও করবেন না। বাঘ বুড়া হলে এমনিতেই নরম হয়ে যায় মা। এখনওতো মানুষের গোস্ত খান। দেখুন মা, আমার বাবা নেই।  আশা ছিল উনি  আমার বাবা হবেন । আমি কাউকে বাবা ডাকতে পারিনা। আমি সেজন্যে তোমার কাছে মাফ চাইছি। এখন থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার শ্বশুরকেও মাফ করে দাও।

পরেরদিনই শরিফা তার স্বামী আফজালকে নিয়ে ভাটারা আসে। বাড়িতে কি কান্নার রোল মা মেয়েতে মিলে। দুজনের কান্না দেখে নাতিরাও কাঁদতে থেকে। এমন সময় জামালপুর শহর থেকে আসেন সালামত খান। আফজাল শ্বশুরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম পেশ করে। না বাবা তুমি আমার বুকে আসে। জামাইকে বুকে নিয়ে সালামত খান কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন ,বাবা এই বুড়া বাপটাকে মাফ করে দাও। না বাবা, আমাকে মাফ করে দেন। আমি অনেক বেয়াদবি করেছি। আমার বাবা থাকলে তিনি আমাকে শাসন করে আদবে রাখতে পারতেন। তুমিতো আমার বড় ছেলে। ভিতর থেকে শরিফা বেরিয়ে এসে বাপ জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। মারে তোর বুড়া বাপটাকে চিরদিনের মতো মাফ করে দে। আমারি ভুলে আমার ছেলে বাপের সাথে রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আয়রে মা আবার আমার বুকে আয়। তোর মুখটা দেখি। কত মাস দেখিনি। যারে মা, জামাইকে নিয়ে কিছু খেতে দে। আমার সংসার আবার জেগে উঠলো। চারিদিকে সূর্যের আলো ঝকমক করছে। বাবা আফজাল তুমি শরিফাকে নিয়ে জামালপুর যাও কিছু ভাল শীতের কাপড় কিনো। আমার নাতিদের রাজপুত্রের মতো সাজাও। কই গেলে শরিফার মা। এইযে, জামাই বাবাকে দুই লাখ টাকা বের করে দাও। ওরা জামালপুর কাপড় কিনতে নাতিদের নিয়ে। এতো টাকা ইয়ে কি করবো বাবা। আরে বেটা সাজো জামাইয়ের মতো সাজো। আজ আমার আনন্দের দিন। আব্বাজান, ভাইজনরা কই? ওদের কথা আর জানতে চেওনা। ওরা প্রতিদিন আমার মথা কাটে। সমাজের কাছে মাফ চেয়ে সে মাথা জোড়া লাগাই। সালামত খানের বেটা বলে মানুষ ওদের মাফ করে। দুটা ছেলেই বিএ পাশ করে শহরের মাস্তান হয়েছে। বাড়িতে এসে বউদের সাথে মাস্তানী করে। আমি বউদের মুখ দেখাতে পারিনা। বেয়াইদের সাথে কথা বলতে পারিনি। একটা পোলাও এক পয়সা কামাই করেনা। আমার কপাল এমন খারাপ হবে আমি কোনদিন ভাবতে পারিনা। ওদের ঢায় রেখে পড়ালেখা করালে এমন হতোনা। দেখোনা, আমার মেয়ে আয়েশা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রী। সবাই তাকে চিনে। ইন্টার ভার্সিটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সে আমেরিকা যাবে। সেই আয়েশার ভাইয়েরা জামালপুরে গুন্ডামী করে। বাবা আফজাল তুমি ওদের একটু বুঝাও। বাবা আমিতো তাঁদের ছোট।  তাতে কি হলো? আকল বাপেরও বড়। আমি ওদের জন্যে সব করবো। ওরা ভালো একটা ইন্ডাস্ট্রি করুক। আমি টাকা দিবো। আমি কাল সকালে তোমাকে নিয়ে শিল্প ব্যান্কে যাবো। ম্যানেজারের সাথে আলাপ করবো। ঠিক আছে বাবা। আপনি এখন বিশ্রাম নিন।