রূপকথা ৪

এক সপ্তাহ সোনারগাঁ থেকে আয়েশা বাসায় ফিরে আসে। সাথে বেশ কিছু কাটলারিজ ও টেবিল ন্যাপকিন নিয়ে এসেছে। এসব বাসায় ব্যবহার করবে। খালাকে বললো এখন থেকে সে বাসায় এসব ব্যবহার করবে। খালুকে ইংরেজীতে বললো সে এখন থেকে ইংরেজীতে কথা বলা প্রাকটিস করতে চায়। আমেরিকা গেলে সব সময় সবখানে ইংরেজী বলতে হবে। তাই এই প্রাকটিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খালু বললো আমার কোন অসুবিধা নেই। আমি চালিয়ে নিতে পারবো। তোর খালার অবস্থা কি হবে জানিনা। খালা ফারজানা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। আমি একটা শিক্ষিতা মেয়ে। আমার সম্পর্কে এসব বলছো। বলতে পারো প্রাকটিস নেই। বাইরের দুনিয়ার সাথে কোন যোগাযোগ নেই তাই। তুই বল । আমি চেষ্টা করবো। বরং এই ফাঁকে আমারও একটু চর্চা হবে। একটা স্পিকিং ইংলিশের বই নিয়ে আসবো।। দেখবি কোন অসুবিধা হবেনা। খালা ব্র্যাকফাস্ট টেবিল এভাবে সাজাবে। ন্যাপকিন গুলো এভাবে রাখবে। কোন অসুবিধা হবেনাতো। আরে না, কোন অসুবিধা হবেনা। চিন্তা করবিনা। সব ঠিক ঠাক চলবে। এবার তোর সোনারগাঁর কথা বল। ওখানে যারা তারাতো সবাই বিদেশী। যারা সার্ভিস দেয় তারাও ইংরেজীতে কথা বলে। হোটেলে লোকাল গেষ্ট কম। ফলে ওখানে কেউ বাংলা বলার চেষ্টা করেনা। আমার গাইড ক্রস সাহেব ব্রিটিশ এক্সেন্টে কথা বলেন। বুঝতে খুব অসুবিধা হয়। তিনি আমার সাথে আমেরিকাতেও থাকবেন। তিনি আমার লোকাল ও ওভারসীজ গাইড। তাঁর খরচ বহন করবেন বৃটিশ কাউন্সিল। আমি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হলে আমার খরচ বহণ করবে আমেরিকান ডিবেট সোসাইটি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের এ প্রোগ্রামটা এই সোসাইটি অর্গেনাইজ করেছে। সারা বিশ্ব থেকে পঞ্চাশ জন প্রতিযোগী থাকবে। আশা করছি বাংলাদেশ থেকে আমি থাকতে পারবো।

হ্যালো আয়েশা আমি আরসালান বলছি।জ্বী স্যার বুঝতে পেরেছি। আপনার নাম্বার আমার মোবাইলে সেভ করা আছে। সোনারগাঁয়ে অবস্থান করে কিছু শিখতে পারলে। জ্বী স্যার নিশ্চয়ই। এর আগেতো কোনদিন  পাঁচতারা হোটেল দেখিনি। থাকার কথাতো স্বপ্ন। তাছাড়া এতো স্পেশাল কেয়ার। ডক্টর ক্রসের সহযোগিতার কথা কোনদিনও ভুলতে পারবোনা। তিনি একজন পিতার মতো মানুষ। স্নেহ মমতা ও ভালবাসার কোন ঘাটতি নাই। স্যার ইংলিশ এক্সেন্ট শিখতে বেশ সময় লাগবে। এটা নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা। এক্সেন্ট একদেশের একরকম। আমেরিকানদের  এক্সেন্ট আরেক রকম। আমিতো বহু বছর বিলেত ও আমেরিকায় ছিলাম। ফোনেটিক্স আরেকটি নতুন বিষয়। যাকে বলে উচ্চারন বিধি। তোমাকে দেখতে পরিস্কার সুস্পষ্ট ভাষায় সুন্দর সাবলীল বলতে পারছো কিনা। আমরা বাংগালীরা যে ভাবে কথা বলি সেভাবে যেন না হয়। তোমার বলার ভংগী দেখে সবাই যেন খুশী হন ও আনন্দলাভ করেন। স্টেজ ম্যানার্স গুলোও তোমাকে একশ ভাগ রপ্ত করতে হবে। প্রথমে দেখবে তোমার ড্রেস এন্ট্রি ও মুভমেন্ট। সবশেষে ডেরিভারী ও কনটেন্টস। মোট নাম্বার একশ। এর ভিতর কনটেন্টসের জন্যে পঞ্চাশ। ম্যানার্স একাউন্টে তুমি সহজেই পঞ্চাশ পেতে পারো। তুমি নিজে কি মনে করো। তোমার কনফিডেন্স কি রকম। আশা করি ভালো করতে পারবো। আমরা চাই তুমি ফার্স্ট হও। এসব ব্যাপারে আমেরিকান ছেলেরা তেমন ভাল করেনা। তাদের ভালো ছাত্ররা গবেষণায় বেশী সময় দেয়। এজন্যে তারা নোবেল পায় বেশী। যারা ডিবেটে ভাল করে তারা রাজনীতি করে। এদের বেশী ভাগই আইন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে। তুমি রাস্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে পারো, গবেষণা করতে পারো। পৃথিবীতে বহু দার্শনিক ছিলেন যারা চলমান রাস্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন না। কার্ল মার্কস ও পুরোণো এ রাস্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন না। তিনি নতুন সমাজ ব্যবস্থার কথা বলে গেছেন। যেখানে রাস্ট্র রাজা বা সম্রাট হবে আর নাগরিকরা নিপীড়িত ও অত্যাচারিত।জার্মান দার্শনিক নীটসে রাস্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন না। তোমাকেও রাজনীতি ও রাস্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। অন্তরে বিশ্বাস করো তুমি হবে জগত বিখ্যাত একজন দার্শনিক। স্যার আমিতো এখন মাত্র অনার্সে পড়ি। আপনারা আমাকে উত্‍সাহ দিয়ে ,পালন করে এগিয়ে নিচ্ছেন। জানিনা আমার অন্তরে তেমন ক্ষমতা আছে কিনা। আমিতো একেবারেই অজ পাড়াগাঁর মেয়ে। এই প্রথম ঢাকা এসেছি। এসেই আপনাদের নজরে পড়েছি। ওভাবে চিন্তা করোনা। ভাবো তুমি বিশ্ব নাগরিক। এখানকার পরিবেশে কে কি বলে তাকে একেবারেই পাত্তা দিয়োনা। সাধারন মানসিকতার মেয়েরা অতি সাধারন চিন্তাকে অতিক্রম করতে পারেনা। বেশীর ভাগ ধনীর ছেলে মেয়েরা বিত্তের বাইরে চিন্তা করতে পারেনা। সেদিক থেকে তারা মানসিক ভাবে পংগু।

এানো আয়েশা, তোমার লেকচারের তারিখ ঠিক হয়েছে। ২৯শে ডিসেম্বর বিকেল তিনটায় সোনারগাঁ হোটেলের বলরুমে। শুধু ঢাবির ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সবাইকে আইডি দেখিয়ে প্রবেশ করতে হবে। ঢাবির শিক্ষকরাও থাকবেন। প্রত্যেক ডিপার্টমেন্ট থেকে বিশ জন ছাত্রছাত্রী উপস্থিত থাকতে পারবে। ভিসি স্যার ও ডক্টর ক্রস মঞ্চে থাকবেন। মিস্টার ক্রস প্রোগ্রামটা পরিচালনা করবেন। মনে আছেতো তোমাকে ইংরেজীতে লেকচার ডেলিভারী করতে হবে। নো ফিয়ার, নো সাইনেস। সেদিন খুব ভালো ড্রেস পরবে।  যদি মনে করো পার্লারে যেতে হবে তাহলে আগেই সেরে নিও। এক কাজ করো, তুমি আমি ও ক্রস সাহেব এক সাথে সোনারগাঁয়ে লাঞ্চ করি। দুটোর দিকে সোনারগাঁয়ের পার্লারে মেকআপ ও ড্রেসআপের কাজ সেরে নিও।আমার প্রস্তাব তোমার কেমন লাগলো। খুব ভালো স্যার। তুমি বাসা থেকে সোজা সোনারগাঁয়ে চলে এসো। আমি ক্রস সাহেব লাউঞ্জে  তোমার জন্যে অপেক্ষা করবো। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার  প্রতিনিধিদের দাওয়াত করা হয়েছে। তোমার ব্যাপারে ইতোমধ্যেই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মিডিয়া হুজোগে চলে।একবার কাউকে পছন্দ করলে তাকে অকারণে প্রমোট করতে থাকে। আবার অপছন্দ হলে অকারণে একেবারে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে। ভাবটা হলো, আমরা চোরকে দরবেশ বানাই। কারো কিছু বলার আছে ? ঠিক বারোটার দিকে আয়েশা হোটেল লাউঞ্জে প্রবেশ করে। ডক্টর ক্রস ও আরসালানের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। তারপর পার্লারের দিকে যায়। সেখানে প্রায় এক ঘন্টা লাগে। একজন রূপবতী নারী হিসাবে বেরিয়ে আসে আয়েশা। ডক্টর ক্রস এবং আরসালান আয়েশাকে দেখে অবাক। এতো দেখি রূপকথার নায়িকা। কি হলো তোমাকেতো চেনা যাচ্ছেনা। স্যার এতো আসল আয়েশা নয়। দেখো, দুনিয়ার মঞ্চটাইতো নকল। এখানে আমরা সবাই অভিনয় করে যাচ্ছি। আমরা চাচ্ছি সবাই তোমাকে পছন্দ করুক।  আমেরিকার অনুষ্ঠানের পর তুমি আসল আয়েশায় পরিণত হবে। তখন তুমি তোমার ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিকশিত হবে। তখন তুমি হয়ত হার্ভাডে পড়বে। চলো এবার আমরা লাঞ্চ সেরে ফেলি। আয়েশা বললো, আমি শুধুই স্যুপ আর ব্রেড খাবো। আমি বেশী খেতে পারিনা। ক্রস বললো, দেখো আয়েশা, তোমার যা ভাল লাগে তাই খেয়ো। পছন্দ মতো খাবে। আমরা সবাই ব্যুফে কোর্স খাবো। অনেক আইটেম থাকে।

বেলা তিনটার দিকে হল ভর্তি হয়ে গেছে। প্রায় ছয়শো ছাত্রছাত্রী। দুইশো শিক্ষক। ভিসি স্যার যখন হলে ঢুকলেন তখন সবাই দাঁড়িয়ে  তাকে সম্মান জানালো। তিনি সামনের প্রধান সোফায় বসলেন। তাঁর পাশেই প্রোভিসি স্যার। ভিসি স্যার ডক্টর ক্রস ও আরসালানের কাছে জানতে চাইলেন সব ঠিক আছে কিনা। স্যার এক বিন্দুও চিন্তা করবেন না। প্রোভিসি স্যারের পাশেই বসলেন পলসায়েন্সের চেয়ারম্যান ডক্টর নওশাদ। ভিসি স্যার বললেন, নওশাদ সাহেব আজতো আপনি হিরো। আপনারই দিন। স্যার সবই আপনার দয়া। আপনার সাহায্য না পেলে এতদূর এগোনো যেতো না। স্যার ক্রস সাহেবেরও অনেক অবদান। স্যার আপনি একেবারেই চিন্তা করবেন না। আমরা আপনার মুখ উজ্জল করবো। আপনার আয়েশা ঢাবির নাম জগতে ছড়িয়ে দিবে। আয়েশার আজকের পারফরমেন্স দেখেই আপনি আস্থাবান হয়ে উঠবেন। আয়েশা কোথায় মিস্টার ক্রস। আপনারা এখন দেখবেন না। সারপ্রাইজ থাকলো। সে সরাসরি মঞ্চে আসবে ডাক পড়লে। স্যার মঞ্চে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটু আলো আধারী থাকবে। ক্রস সাহেব ভিসি স্যার আর নওশাদ স্যারকে মঞ্চে গেলেন। হলে হাততালি চলছে। হাত তালি শেষ হতেই পাঁচ মিনিট লাগলো। তিনটা বিশ মিনিটে আয়েশার ডাক পড়লো। আয়েশা ঢুকতেই ক্রস সাহেব দাঁড়িয়ে হাত তালি দিতে লাগলেন। এরপর দাঁড়িয়ে গেলেন। ছাত্রছাত্রীদের হাত তালি আর থামছেনা। এরপর ভিসি স্যার হাত তুলে সবাইকে বসতে বললেন। হলে লাইট নিভলো। সব লাইটের ফোকাস মঞ্চের দিকে।  এমন সময় আয়েশা খুব ধীর লয়ে মঞ্চে প্রবেশ করলো। ছাত্রছাত্রীদের হাত তালি আরও বেড়ে গেলো। আলো আধারীতে রূপবতী আয়েশাকে অপরূপ দেখাচ্ছিল। বন্ধুরা অবাক বিস্ময়ে অপলক নয়নে আয়েশাকে দেখছে। ভাবছে এ কদিনে আয়েশা কেমন করে এমন হয়ে গেলো। সত্যিই কি এমন সম্ভব। আয়েশা তার লেকচার শুরু করলো। পিন পতনেরও শব্দ নেই।

আয়েশার লেকচার শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ভিসি স্যার চেয়ার থেকে উঠে আয়েশাকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগে তাঁর চোখ ভিজে গেলো। মা তুই জগত বিখ্যাত হবি। কারো শক্তি নাই তোকে থামিয়ে দিতে পারে,ইনশাল্লাহ। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তোর পড়ার খরচ চালাবে। তোর পথ চলাকে আমরা চিন্তামুক্ত করবো। এবার ভিসি স্যার দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের আয়েশাকে তোমরা কেমন দেখলে। তার লেকচার তোমাদের কেমন লাগলো। সবাই এক সাথে বলে উঠলো সি ইজ দা বেস্ট। শ্লোগান চলতে লাগলো সি ইজ দা বেস্ট। বাইরে স্ন্যাকসের ব্যবস্থা ছিল।  ছাত্রছাত্রীরা বাইরে এসে অপেক্ষা করছে আয়েশার জন্যে। কিন্তু আয়েশা সেখানে আসেনি। মিস্টার ক্রস ও আরসালান আয়েশাকে নিয়ে একটা রুমে গেলো। সেখানেই তাঁরা স্ন্যাক্স নিলেন। এরপর আয়েশাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। তুমি বাসায় যাও। রেস্ট নাও। এখন ক্লাসে আসার দরকার নেই। তুমি একুশ তারিখের জন্যে প্রস্তুতি নাও। যদি বের হও তাহলে গাড়ি নিয়ে বের হও তাহলে গাড়ি নিয়ে বের হয়ো, আরসালান বললো। আমাদের বাসায় কয়েকটা গাড়ি আছে। তুমি একটা ইউজ করতে পারো। ক্রস বললেন, ইয়েস আরসালান ঈক বলেছেন। তোমাকে এখন নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। যেখানে সেখানে যেওনা। এখন তুমি একজন সেলিবরেটি। আয়েশা বাসায় ফিরে গেলে খালা খালু চিনতেই পারছেনা। একি! এ কোন আয়েশা? আরে খালা, অবাক হয়ে কি দেখছো। আমি তোমার আয়েশা। আগে ভিতরে আসতে দাও পরে ভালো করে দেখো। বলরে মা তোর লেকচার কেমন হয়েছে। তা আমি কি করে বলবো। স্যারেরা বলবেন। ভিসি স্যার বলেছেন, আমার পড়ার সব খরচ বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে। আচ্ছা খালা বলতো আমেরিকা গেলে যদি স্কলারশীপ পেয়ে যাই তাহলে কি করবো। তাহলে সেখানে ভর্তি হয়ে যাবি। বাবা কি বলবে। সেটা আমরা দেখবো। তোর বাবা মেয়েদের শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। এখনতো পক্ষে। তাই  বলে কি বিদেশে পড়াতে রাজী হবে। শোন, আরসালান যদি তোকে বিয়ে করতে রাজী হয় তাহলে আমেরিকায় ভর্তি হওয়ার আগে বিয়ের কাজ সেরে ফেল। দেখো খালা ওরা প্রস্তাব না দিলে আমরা আগ বাড়িয়ে কিছু বলা ঠিক হবেনা। ওরা আমাদের চেয়ে হাজার গুণ উপরের পরিবার। আমার মা নরম, কিন্তু বাবার ব্যবহার কর্কশ। বাবা গ্রামের দাপুটে লোক, কিন্তু দেশব্যাপী নয়। বাবাকে গ্রাম্য বলা যায়। আমার ভাইয়েরাও তেমন আলোকিত মানুষ নয়। অতি সাধারন আত্মার মানুষ। রাজধানীতে একটা বাড়ি থাকলে আমাদের নিকট আত্মীয় স্বজন সবাই পড়ালেখা করতে পারতো। জ্ঞান লাভ করা ইসলামে কর্তব্য বাধ্যতামূলক ফরজ। নামাজ পড়া যেমন ফরজ তেমনি বিদ্যা অর্জন করাও ফরজ।সেটা আজও মুসলমানেরা তেমন মানেনা। এক সময় মুসলমানেরা সারা বিশ্ব কাঁপিয়েছে। এখন সারা বিশ্বে অপমানিত,লাঞ্চিত। এর একমাত্র কারণ জ্ঞানহীনতা,মুর্খতা। মুসলমান দেশ গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। তারা কি নিয়ে ব্যস্ত। তারা কেউ ইসলাম মানেনা। ইসলামের নামে মানুষকে ধোকা দেয়। এর ভিতর সউদী বাদশাহ সবচেয়ে খারাপ লোক। মারে, তুইতো সুযোগ পেয়ে লেকচার দিতে শুরু করেছিস। নারে খালা , মনের দু:খে এসব কথা বলছি। দুই হাজার সতেরো সালে এসেও আমরা মেয়েদের শিক্ষার কথা বলছি। এটা খুবই মর্মান্তিক একটি সংবাদ।

আমাদের বাংলাদেশের দিকে তাকাও। বলা হয় পনেরো কোটি মুসলমানের দেশ। বেশীর ভাগ নারী পুরুষ অশিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত। সবকিছুর ভুল ব্যাখ্যা করে। বিশেষ করে গ্রামের মাতব্বর, স্বচ্ছল অশিক্ষিত ও সামান্য আরবী শিক্ষিত হুজুর এরা নারী পুরুষের অশিক্ষার কারণে অত্যাচার চালায় গরীব মানুষের উপর। বিশেষ করে নারীদের উপর। এরা কেউই ইসলাম জানেনা। রাস্ট্র বা নেতারা এসব বর্বরদের পৃষ্ঠপোষক। পাকিস্তানের তেইশ বছর আর বাংলাদেশের সাতচল্লিশ যোগ সত্তুর বছর। কোটি কোটি মানুষ নিরক্ষর। সত্তুর বছরেও একটা জাতি শিক্ষিত হতে পারেনি। বলো খালা কে দায়ী? নেতাদের ছেলে মেয়েরা বিদেশে পড়ালেখা করে দেশে এসে নেতা হয়। আমি চেষ্টা তদবীর ও ফাসাদ করে ঢাকা এসেছি উচ্চ শিক্ষির জন্যে। তুমিই বলো আমি ঢাকা । বানা এলে আমার মেধার বিকাশ হতো। না হতোনা। বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দিতো গ্রামের বিত্তশালী বিএ/এমএ পাশ কোন ছেলের সাথে। এতোদিনে আমি মা হয়ে যেতাম। আর স্বামী দেবতার পায়ের নীচে বেহেশত খুঁজতাম। পশ্চিমারা বিদ্যার কারণেই শক্তিশালী। মুসলমানেরা যখন দেশ শাসন করে তখন পশ্চিমারা ভালো করে পোষাক পরতে জানতো না। তবে একথাও সত্য যে পশ্চিমা ছেলে মেয়েরা একটু উচ্ছৃংখল হয়ে গেছে। এর কারণ তারা ধর্ম ত্যাগ করেছে। তারা তাদের নবীজীকে অপমান করে। নানা রকম বদনাম করে। বেশ কিছু উচ্চ শিক্ষিত বাংলাদেশী মেয়ে উচ্ছৃংখল হয়ে গেছে। তারাতো আর সমাজের চিত্র নয়। তারা রাজধানী ভিত্তিক।আবেগের বশে অনেক কথা বলে ফেলেছি। আমার অপরাধ নিওনা। হয়ত আমার মুখে এসব শোভা পায়না। বাবার দাপটের সামনে এসব কথা একেবারেই অসম্ভব। এখন দোয়া করো খালা। ফেব্রুয়ারী মাসের একুশ তারিখে আমাদের ডিবেটের ফাইনাল। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হলেই আমি বিদেশে যেতে পারবো। এ কদিন আমাকে ক্রস সাহেব ও আরসালান সাহেবের অধীনে কাজ করতে হবে। ঠিক আছে মা। যা করবি বাসায় থেকেই করবি। হোটেলে আর যাবার দরকার নাই। না খালা হোটেলে যাওয়ার কোন প্রোগ্রাম এখনও দেখছিনা। প্রোগ্রাম হলেও রাজী হবিনা। দুলাভাই একেবারেই রাজী নাই । ওরা ভয় পায়, যদি মেয়ের কিছু হয়। না খালা, ও রকম কিছুই হবেনা। আমি এখন যে পরিবেশে আছি তাতে এ রকম কিছু হবেনা। ঠিক আছে কালা রাতের খাবার সার্ভ করো। আমি টেবিল সাজাচ্ছি।

ডিনার শেষ করে বিছানায় যাওয়ার আগে আরসালান ফোন করে আয়েশাকে। হ্যালো আয়েশা,আরসালান বলছি। ডিনার শেষ করেছো। জ্বী স্যার। এইতো এইমাত্র শেষ করলাম। একটু কথা বলা যাবে। নিশ্চয়ই বলা যাবে। স্যার আপনি এ রকম ফরমালিটিজ করছেন কেন। আফটার অল ইট ইজ ইউর প্রাইভেট টাইম। না স্যার, আমার সব টাইম এখন আপনাদের নিয়ন্ত্রনে। ক্রস সাহেব তোমাকে ফোন করেছেন। না স্যার এখনও করেননি। রাত দেখে হয়তো করেন নি। এটা ব্রিটন। সব কিছু মেপে চলে। ভেবেছে এতো রাতে ফোন করবে কিনা। হয়ত কাল সকালে করবে। তুমি কাল সকাল দশটায় ক্রস সাহেবের সাথে দেখা করো। সকাল আটটায় ফোনও করতে পারো কনফার্ম করার জন্যে। ঠিক আছে স্যার। নো প্রবলেম। আমি সকাল আটটায় ফোন করবো। ভালো ভাবে ড্রেস করে যেও। হয়তো কিছু বিদেশী তোমার সাথে কথা বলতে আসবে। কোন সমস্যা হবেনা। দেখো, তারা তোমার স্থির করা বিষয়ে কথা না বলে অন্য বিষয়েও কথা বলতে পারে। তোমার অসুবিধা হবে? না স্যার, আমি যে কোন বিষয়ে ইংরেজীতে কথা বলতে পারবো।

জরিফার সাথে তার স্বামীর সমঝোতা দিন দিন উন্নত হচ্ছে। তার কোচিং সেন্টারে ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আয়ও বাড়ছে। এখন তার মাসিক আয় তিরিশ হাজারের মতো। প্রায় পুরো টাকাই বেঁচে যায়। সে টাকা সে নিজের ব্যান্ক একাউন্টে জমা দেয়। প্রয়োজনে এক সমঞ সংসারের কাজে লাগাবে। তার স্বামীও খুশী। ভাবছে বাড়িতে একটি নতুন ঘর তৈরি করে ছাত্রী সংখ্যা বাড়াবে। বরকে বলেছে তার চিন্তার কথা। বর এক কথায়ই রাজী।  জরিফা খুশীতে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে চুমো খায়। তুমি খুশী নও আমার ছাত্রী সংখ্যা বাড়ছে দেখে। কি বলো, আমি সবচে বেশী খুশী হয়েছি। তোমার খুশীই আমার খুশী। মাও খুব খুশী। তুমিতো মাকে এটা ওটা কিনে দাও। সত্যিই জরি আমি এতোদিন খুবই অন্যায় করেছি। বুঝতে পারিনি তুমি কিসে খুশী হবে।   দেখো,আমি আরও অনেক কিছু করতে পারবো তোমার চিন্তার সহযোগিতা পেলে। তুমি জানো আমাদের এলাকার আয়েশা  জগত বিখ্যাত হতে চলেছে। ঢাবির ডিবেট চ্যাম্পিয়ন হয়ে নাম করে ফেলেছে। ঢাবির সকল ছাত্র ছাত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে এক নামে চিনে। সবাই তাকে আদর করে। একমাত্র কারণ সে সাহস করে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছে। পলসায়েন্সে ভাল রেজাল্ট করে তোমার কিচেনে ঝিয়ের কাজ করছি। তোমার মনে হয় আমার আর কোন যোগ্যতা নেই। রাত হলে তোমার বুকে থাকা। ভোর হলে উনুনে আগুন দেয়া। এতে আমার বাবা খুশী। মারতো মত প্রকাশের কোন অধিকারই নেই। বাবার ন্যায় অন্যায় সব মাকে মেনে নিতে হয়। দেখো জরি, আমাকে মাফ করে দাও। আমি একেবারেই বদলে গেছি। মনে করো তুমি এখন একশ ভাগ স্বাধীন। এখন থেকে নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। আয়েশার কথা আরও বলো। টিভিতে খবর শুনি। তুমিতো বাসায় কাগজ রাখোনা। খবর জেনে আমি নাকি নষ্ট হয়ে যাবো। এতো গ্রাম্যতা আমি জীবনে ভাবতেও পারিনি। তুমি ভেবেছিলে আমি স্বাধীন হলে তোমার উপরে চলে যাবো। শিক্ষিত মানুষতো স্ত্রীর গৌরবে ও সুনামে আনন্দিত হয়। তোমাকে দেখেছি ভিন্ন রকম। যাক তবুও ভালো এতো বছর পর তোমার হুঁশ হয়েছে। বললামতো আমি বদলে গেছি। আমাকে আর লজ্জা দিওনা। না প্রাণ সখি,লজ্জা পেওনা। তুমিইতো আমার সবকিছু। আমি খুবই আনন্দিত একটু স্বাধীন হতে পেরে। তাও নিজের অধিকারে নয়। তুমি স্বাধীনত দিয়েছো। আমার শ্বাশুড়ী মা তোমার চেয়ে অনেক বেশী মুক্ত মনের মানুষ। তোমার ভয়ে কিছু বলতেন না। আমাকে অনেক দিন বলেছেন, বৌমা তুমি এতো শিক্ষিত হয়েও ঘরে বন্দী হয়ে আছো। কি করবে মা, এদেশে মেয়েদের কোন স্বাধীনতা নেই। পুরুষেরা শিক্ষিত হয়েও মানুষ হতে পারেনি। আয়েশা নাকি ইন্টার ভার্সিটি ডিবেট প্রতিযোগিতায় নাকি চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। তাহলে সে আমেরিকা যাবে। আন্তর্জাতিক ডিবেটে যদি ভালো রেজাল্ট করতে পারে তাহলে সেখানে পড়ার স্কলারশীপ পাবে। শুধু গ্রামের কলেজ ছেড়ে সে ঢাকায় গেছে তাতেই এতো বিরাট পরিবর্তন। আর আমি এমএ পাশ করেও এতো দিন কোন মর্যাদা পাইনি। আমার বাপ বলতো মারে সব সময় জামাইর কথা মেনে চলবি। এতেই সংসারে শান্তি। প্রথম এক বছরতো তুমি আমাকে প্রতি রাতে জ্বালিয়েছো। আমি সারা বছর অসুস্থ ছিলাম। তুমি ডাক্তারের কথাও শুনতে না। এক সময় আমার মনে হয়েছিল বেশ্যা হলেই ভাল ছিল। তোমার মতো পুরুষদের কারণেই তসলিমা ও রকম এগ্রেসিভ হয়ে গিয়েছে। সে লিখতে পারে বলেই লিখে অন্তরের জ্বালা মিটিয়েছে। লোকলজ্জায় আমরা এসব সহ্য করে যাচ্ছি। আল্লাহপাকের হাজার শোকর যে দেরীতে হলেও তুমি বুঝতে পেরেছো। দেখো, এখন তুমি আর আমি আগের চেয়ে কত বেশী কাছালাছি। রাত্রের কাজও কতো আনন্দে করি। আগেতো আমি ছিলাম রক্ত মাংশের একটি পুতুল। এখন বন্ধু। কি বলো ঠিক বলছি কিনা। রাতে তোমাকে কিছুই বলতে হবেনা। আমিই বলবো আমাকে গ্রহণ করো। দুই আনন্দময় মানুষের মিলনমেলা।আচ্ছা বলোতো বন্ধু, এতোদিন তুমি আমায় কি ভাবতে। মন খুলে হৃদয় থেকে বলো। বলেছিতো জরি, আমি একেবারেই বদলে গেছি। তুমিই আমায় বদলে দিয়েছো। আমি এখন তোমাকে বন্ধু ভাবি। আমরা দুজনই সমান। আমরা এক যুগল। আগে কি ভাবতে। তুমি আমার যৌন সংগী। যখন দরকার তখনি মিলিত হবো।  মেয়েদের আর কি কাজ। বাপ দাদারা যা করেছেন আমিও তাই করি। মেয়েদের আবার কি অধিকার।উনুন দেখবে, সংসার পরিপাটি রাখবে। ছেলেপুলে হলে মানুষ করবে। এটাইতো শুনেছি বংশ পরম্পরায়। তাহলে আমি যে পড়লেখা করেছি তার কি হবে। সে সবতো মেয়েদের ফ্যাশন। অলংকারের মতো। আমার বউ,এমএ পাশ। সমাজে বলতে পারি। মেয়েরা পুরুযের অধীনে থাকবে। এর বেশী আর কিছু ভাবতে পারিনি।লেখাপড়া করে তুমি কি শিখেছো। চাকুরীর জন্যে পড়ালেখা করেছি। চাকুরী করছি,ভালো বেতন পাই। তোমাকে খুশী রাখার চেষ্টা করি। সবাইতো এ রকমই করে। আমাকে নিয়েতো তুমি কখনই বের হওনা। দেখো ওসব আমার ভালো লাগেনা। যাক ওসব পুরানো দিনের কথা বাদ দাও। এখনতো তুমি স্বাধীন। দেখি আগামী দিন গুলো কেমন আসে।

দেখো রূপ,তোমার বুঝি মানুষ হতে খুব ইচ্ছা করে। খোদা ভালবেসেই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির ভিতরেই তিনি তাঁকে দেখেন। তিনি যদি বস্তু হতেন তাহলে কেমন হতেন। তিনি যেমন ইচ্ছা তেমন সৃষ্টি করতে পারেন। আমি কবি,তুমি আমার কল্পনা। আমার অন্তরে বাস করো। আমিই তোমাকে অন্তরে রেখেছি। কবিও কল্পনা জগতের অধিবাসী। আমরা দেহধারী মানুষ নই। যেমন ফেরেশতারা আছেন। আমরা তাদের দেখতে পাইনা। তারা সংসার করেন না। তারা নারী পুরুষ নন। শুধু খোদার নির্দেশ পালন করেন। আমরা মানুষ,তবে অদৃশ্য। আমরা দুজন নারী পুরুষ। তবে সাধারন মানুষের মতো নই। আমি জানি তোমার একটা মানবী মন আছে। তোমার সংগমের তৃষ্ণা আছে। তাইতো তোমার ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্যই আমি আয়েশা আর জরিফাকে সৃষ্টি করেছি। ওরা সংগম করে তুমি আনন্দ পাও। তুমি মা হতে চেয়েছিলে তাই জরিফা মা হয়েছে। তোমারই ইচ্ছায় জরিফা আস্তে আস্তে স্বাধীন হচ্ছে। সংগম সৃষ্টির মূল রহস্য। খোদা নিজে সংগম করেন না। কিন্তু সৃষ্টির সংগমে তিনি আনন্দিত হন। আমি কবি। খোদার গোলাম ও বন্ধু। দুজন খুব কাছাকাছি। হুকুম তামিল করাই কবির কাজ। লোকে মনে করে কবি লেখে। আসলে কবি নিজেও জানেনা কে লেখে। কবির অন্তরে কে ভাবনা জাগায়। ভাবনা সৃষ্টি করাই খোদার কাজ। তাই কবি ও জ্ঞানীরা ভাবতে পারে। নবী রাসুলগণ ভাবেননা। তাঁরা আল্লাহর মনোনীত ও বাছাই করা। সবাইকে নবী রাসুল করা হয়না। তাঁরা কবিও নন। কবিরা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। যেমন মাওলানা রুমী ও হাল্লাজ। একজন খোদা ও আদমের রহস্য ভেদ করেননি। আরেকজন করে জীবন দিয়েছেন। খোদার প্রেমিকরা রক্ত দিয়ে নামাজের অজু করেন। শাসকরা স্বাধীন মানুষকে হত্যা করে। খোদা তাদের মুক্তি দেয়। খোদা বলেন ,যারা আমাকে ভালবাসবে,আমার সাথে প্রেম করবে আমি তাদের প্রাণ গ্রহণ করি।  যেমন হাল্লাজ,  ঈসা, সক্রেটিস আবু হানিফার গ্রহণ করেছি। তুমিই বলো রূপ ওদের কি অপরাধ ছিল। কোন অপরাধ ছিলনা। তারা খোদাকে ভালবাসতো, সত্যকে ভালবাসতো।  খোদা তোমাকে আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমরাতো চাইলেই মানুষ হতে পারি। জগতে কি এখন মানুষ আছে। যে মানুষ খোদার ছায়া, প্রতিবিম্ব। যে মানুষ আল্লাহর নুরে আলোকিত। সে মানুষ কই। আমাদের ভুগোলের কথাই ভাবো। কি হওয়ার কথা ছিল কি হয়েছে। এখানে কোন আলোকিত মানুষ নেই। মানুষের মন ও হৃদয়ে শয়তান আসন গ্রহণ করেছে। এখানে কোথাও প্রেম ভালবাসা নেই। এদেশে যে কোন অপরাধ করা সম্ভব যদি তুমি রাজার ভাগিনা হও। সারা পৃথিবী অন্যায় অবিচারে ডুবে যাচ্ছে। শক্তিমান দূর্বলে উপর হামলা করছে। বিচার বলে কিছুই কোথাও। রোহিংগাদের কথা ভাবো। কি তাদের অপরাধ। মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠি দুনিয়াকে তোয়াক্কা করেনা। তারা জানে বাংলাদেশ একটু দূর্বল রাস্ট্র। তাই তারা লাখ লাখ মানুষকে সেদেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। হত্যা করেছে। নারীদের ধর্ষণ করেছে। আমাদের প্রাণপ্রিয় বন্ধু ভারত আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। চীন সরাসরি মায়ানমারের অত্যাচারকে সমর্থন করেছে। আমেরিকা পৃথিবী ব্যাপী গর্জণ করে চলেছে। তাকে থামাবার মতো কেউ নেই। পৃথিবী নিয়ে ভাবছি,কারণ এ জগতটা আমাদের প্রভুর সৃষ্টি। তিনি তাঁর প্রিয়তম মানুষকে এখানে পাঠিয়েছেন। আসো, আমরা শয়তানের চ্যালাদের ঘৃণা করি উচ্চকণ্ঠে। প্রভু নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করো। সদোম নগরীর মতো অত্যাচারীদের নির্মূল করো।

 

রূপকথা ( উপন্যাস ) ৩

আয়েশা বিকেলের নাশতা করে পাঁচটার দিকে বাসায় ফিরে। কিরে বিন্দু আজতো সারাদিন বারিধারায় কাটিয়ে দিলি। ডক্টর আরসালানের মায়ের সাথে গল্প। দুপুরের লাঞ্চ। মা বেটা দুজনেই গল্প জুড়ে দিয়েছে। স্যারের মা তো আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতে শুরু করেছেন। সারা বাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন। বাগানের গোলাপ দেখলাম। বুঝলেন খালা,ওরা এতো বড় যে ওদের সাথে কোন সম্পর্কের কথা ভাবতে খুব হয়। আমিতো আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি স্যারের মা কি চান। তিনি নিজের মেয়ের মতো একটা বউ চান। সেটাতো আমি হতে পারবোনা। আমি আমার জীবনটা জগতের মানুষের জন্যে দান করতে চাই আমি গ্রামের শিক্ষিত মেয়েদের অবস্থা দেখছি। এম এ পাশ করা মেয়ে গ্রামের বাড়িতে পড়ে। উপজেলা শহরের স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করতে পারে। কিন্তু স্বামী শ্বাশুড়ীকে খুশী করার জন্যে সারাদিন কিচেনে পড়ে থাকে। অবসর সময়ে বই পারেনা।টিউশনী করে সংসারের জন্যে দুটো পয়সা আয় করতে পারে। না তাও দিবেনা। বিদ্যাটা একটা অলংকার। সবাইকে বলার জন্যে। বুক ফুলাইয়া বলে আমাদের অমুকের বঊ এমএ পাশ। এছাড়া বিদ্যার আর কোন কাজও নেই। এমন কি মা বাপ ও মেয়ের সুরক্ষা বা স্বাধীনতা চায়না। মনে করে  মেয়েদের বিয়ে এবং সংসারই বড় কথা।

আল্লাহ যদি আমার প্রতি দয়াবান হন আমি ইন্টার ভার্সিটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিদেশে প্রতিযাোগিতা করতে পারবো। ওয়াশিংটনের ডিবেটে যদি ভাল করতে পারি তাহলে হয়ত স্কলারশীপ পেয়ে যাবো। ওখানেও দেড় দুই মাস ট্রেনিং হবে। এছাড়া এখন আমার বয়স মাত্র কুড়ি। স্যারের বয়স তিরিশ। দশ বছরের ফারাক। শরীরটাই শুধু নারী হয়ে উঠছে। বাকি সব বিষয়ে আমি এখনও শিশু। আমাদের দেশে এখনও বাল্য বিবাহ হয়। মেয়েরা কিছু জানেনা। কচি মেয়েটার একমাত্র কাজ সংগম যা স্বামী জোর করে মিলিত হয়। এ সমাজ আর কখন বদলাবে। স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে। স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় তার কিছুই হয়নি। কিছুলোক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সীমাহীন ধনী হয়ে গেছে। এখন সরকারকে বলতে হবে সবাই দুর্ণীতি করো। সরকারকে শুধু ট্যাক্স দিলেই হবে। যদি কেউ ট্যাক্স না দেয় তাহলে যাবজ্জীবন।তুই এতো কথা কোথায় জানলি বিন্দু। চোখ কান খোলা রাখি। চোখ কান খোলা রাখা সকল সজাগ নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের নিরানব্বই জন দুর্ণীতিবাজ হয়ে গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁশ হওয়া জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ছাত্র শিক্ষক সবাই জানে টাকা আর মাস্তানী থাকলে একদিন এমপি মন্ত্রী হওয়া যাবে। শিক্ষিত ভদ্রলোক নমিনেশনের জন্যে গেলে পার্টি বলে, আপনি ভদ্রলোক এ কাজ আপনার জন্যে নয়। আপনাকে মানুষ ভোট দিবেনা। আমরা উপযুক্ত লোক চাই,যে জিততে পারবে। যার কাছে কয়েকটা জীপ আছে, কয়েকটা আত্মরক্ষা মূলক অস্ত্র আছে। মাস্তান মার্কা দুইশ কর্মী আছে। নগদ দুই কোটি টাকা পার্টি ফান্ডে জমা দিতে  পারবে। আপনিতো এসবের কিছুই পারবেন না। মাঝ খানে পার্টির একটা সিট নষ্ট হবে। আপনি একজন ডেডিকেটেড মানুষ। পার্টির গৌরব। পার্টি জিতলে আপনাকে সম্মানিত করা হবে। যান পার্টির প্রার্থীর জন্যে কাজ করুন। মনে রাখবেন, জীবনের বড় আদর্শ হলো পার্টি ক্ষমতায় থাকা। তাহলেই দেশের উন্নতি হবে। পার্টির উন্নতি হলে আপনারও উন্নতি হবে। যে নমিনেশন পাবে সে আপনাকে পাঁচ লাখ টাকা দিবে।

দেখো খালা দেশের রাজনীতির এসব হলো চিত্র। ছাত্র নেতারা হলের মেয়ে কর্মীদের পাঠায় বড় নেতাদের বাগানবাড়িতে। এসব মেয়েরা হলের লীডার হয়। কালক্রমে রাজনৈতিক নেতা ও এমপি মন্ত্রী মনোনীত হয়। এমন অবস্থার পরিবর্তন হবে কি। সবাই হতাশ হয়ে গেছে। মন্ত্রী সাহেব বলেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্যে সরকার দায়ী নয়। বিরোধী দলের চক্রান্ত আছে। খালা আমি ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন হলেতো দেশের কিছু আসে যায়না। এমন কি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও পরিবর্তনের জন্যে আমি কিছুই করতে পারবোনা। দেশের ইজ্জ্বত নোবেল বিজয়ী ডক্টর ইউনুসের অবস্থা দেখুন। সারা বিশ্ব ইউনুসকে সম্মান করে। শুধু বাংলাদেশ করেনা। এমন কি প্রয়োজনও মনে করেনা।এমতাবস্থায় আমি বিদেশে পড়ালেখার গুরুত্ব দিচ্ছি। সূযোগ পেলে চলে যাবো। বাবাকে রাজী করানোর দায়িত্ব তোমাদের। এখন প্রশ্ন হলো বিয়েটা কখন করবো।  খালা তোমার কি মত। আমি কি আর বলবো। তোর বুদ্ধি আমার চেয়ে অনেক বেশী। ঠিক আছে, সময় সুযোগ মতো বারিধারার খালাম্মার সাথে কথা বললে কেমন হয়। দেখি উনি কি ভাবছেন।

যা হাত মুখ ধুয়ে নে। তোর খালুও এসে গেছেন। এখন চা দেবো। আমি আর কিছু খেতে পারবো না ।শুধু চা খাবো। এমন সময় কালু এসে টেবিলে বসলেন। খালা চা বিস্কুট দিলেন। তুমি আর কিছু খাবে নাকি। না, একটু পরেইতো ডিনার দেবে। এই ফাঁকে বিন্দুর সাথে জমিয়ে আড্ডা মারি। কি বলিসরে বিন্দু। ঠিক আছে খালু। তোর বাবার সাথে ফোনে কথা হয়। জ্বী খালু নিয়মিত কথা হয়। বাবার এক কথা ভালো করে পড়ালেখা কর। অন্যদিকে মন দিবিনা। ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হবিনা। কোন মেয়ে গ্রুপের সাথে আটকে যাস  না। ওরা তোর সর্বনাশ করবে। আমি সব খবর রাখি। খালা খালুর কথা মতো চলবি। ওদের ভরসায় তোকে ঢাকা পাঠিয়েছি। ফারজানার সাথেও আমার কথা হয়। ও বললো ভার্সিটিতে তোর অনেক নাম ডাক। শুনে খুব ভালো লাগলো। কিন্তু পড়ালেখার কি হবে। তুমি চিন্তা করোনা বাবা। ডিবেটের চেয়ে পড়ালেখার গুরুত্ব অনেক বেশী।শুধু ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন হলে কি হবে, সেটা আমি বুঝি।

বাবা, ডিবেটের জন্যে আমাকে আমেরিকা যেতে হতে পারে। ডিবেট ভালো করলে আমি বিদেশে পড়ার জন্যে স্কলারশীপ পেতে পারি। নারে মা অত পড়ে কি করবি। মেয়ে মানুষ বিয়েটাই আসল কাজ। ফারজানা বললো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক নাকি তোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। হ্যাঁ বাবা। তবে সুস্পষ্ট কিছু না। ফারজানাতো বললোতো ছেলেটা খুব ভালো। খুবই খানদানী পরিবারের ছেলে। তাহলেতো কথা বললেই হয়। , না বাবা, এখন না। সময় বুঝে বলতে হবে। যদি বলিস আমি ডাকা এসে কথা শুরু করতে পারি। অথবা আগে তোর খালা খালু কথা শুরু করতে পারে। এখন না। আমি জানাবো তোমাকে। আগে আমি বিষয়টা বুঝে নিই। আরও কয়েক মাস যাক। তুমি বিষয়টা নিয়ে আর কারও সাথে এখন কথা বলোনা। ইতোমধ্যে আমি স্যারের বাসায় দুবার গিয়েছি। হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে তাদের আগ্রহ আছে। নানাভাবে আমাকে বুঝিয়েছে আমি তাদের মেয়ে।  স্যারের ইংগিতেই তাঁর মা গুলশান বেগম আমাকে অনেক আদর করছেন। দেখ মা আমরা গ্রামে থাকি বলে অতো নাম ধাম হয়নি। আমরাও খুবই খানদানী মানুষ অনেক জেনারেশন ধরে। শহরে থাকলে,ভাল বাড়ি থাকলে আর বিদ্যা থাকলে মানুষ খানদান হয়। দরকার হলে আমি তোর জন্যে রাজধানীতে বাড়ি কিনবো। জামাইকে উপহার দিবো। তুই এসব নিয়ে মোটেই ভাববিনা। আমি একটু পুরাণপন্থি তাই তোরা আমায় দেখতে পারিসনা।  আমি মনে করি আমরা কোন অংশেই কম নই। নগদ তেমন বেশী টাকা নেই। কিন্তু সম্পদের কি কমতি আছে। আমি মানছি বিদ্যার ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ কম ছিল। সেটা ভুল হয়েছে। আমরা জমি জিরাত নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। পড়ালেখা করলে বৃটিশের চাকুরী করে নাম করা যেতো। আমাদের এলাকার চৌধুরীরা ইংরেজী শিখে বৃটিশের তাবেদারী করেছে। তাতেই নাম আক হয়েছে। আমাদের খাস জমি বেশী। ওদের তালুকদারী জমি বেশী। আমার দাদাজান আমজাদ মিয়া তালুকদারী কিনে চৌধুরী হতে পারতেন। দাদাজান ইংরেজের  তাবেদারী পছন্দ করতেন না। একদিন তোকে সব লিখে দেবো। দশ গেরামের মানুষকে জিগ্যেস করে দেখিস লোকে কি বলে। যাক, সুযোগ পেয়ে মা তোকে আজ অনেক কথা বললাম। তোর মাতো আমাদের চেয়েও বড় খানদান। চেহারা দেখে বুঝতে পারিস না। দুধে আলতায় তাঁর গায়ের রং। আমি একটু রাগী কড়া মানুষ। তাই সবাই একটু ভয় পায়। এখন ছাড়িরে মা। আজ তোর সাথে অনেক্ষণ কথা বললাম। মনটা আমার ভাল হয়ে গেছে। আমার মেয়ে বংশের নাম উজ্জ্বল করবে যা আমার ছেলেরা পারেনি। নারী শিক্ষাকে অবহেলা করে আমি অন্যায় করেছি। আমার ভুল হয়েছে। বাবা মা কেমন আছে? মাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। অনেকদিন দেখিনি। ইন্টার ভার্সিটি ডিবেটের পর আসতে পারবো। চ্যাম্পয়ন হলে আর সময় তেমন থাকবেনা। আমেরিকা চলে যেতে হবে। বাড়ি এলে  এক সপ্তাহ থাকবো। সবার সাথে দেখা করবো। আমার কলেজের স্যারদের সাথেও দেখা করবো। আশে পাশের আত্মীয় স্বজন সবার সাথে দেখা করবো। আমি গাড়িতে আসবো। আবার গাড়িতেই ফিরবো। কোথাও কোন প্রোগ্রামে জয়েন করবোনা। তোমার কাছে কেউ এ ব্যাপারে এলে না করে দিও। আমার আসার কথা কাউকেই জানাবেনা।

কিরে বিন্দু দুলাভাই একজন কঠোর লোক তোর সাথে এতো কি কথা বললো। প্রায় এক ঘন্টা। না খালা, বাবা এখন আর আগের মতো নাই। মনে হচ্ছে, অনেক নরম হয়ে গেছে। এখন থেকে নারী শিক্ষার জন্যে কাজ করবে। আমার বিদেশ যাওয়াতেও বাবার কোন আপত্তি নেই। বাড়ির কাছেই একটা বালিকা বিদ্যালয় করার জন্যে বলেছি। বাবা রাজী হয়েছে। বাবা নিজের বংশ গৌরবের কথা বললেন। আজ বাবা অনেক কথা বললেন। এক বছরেও এতো কথা বলেননি। মেয়েদের ব্যাপারে বাবার ইতিবাচক চিন্তা সমাজের অনেক উপকার করবে। আমারও স্বপ্ন বিদেশ থেকে ফিরে দেশের শিক্ষা উন্নয়নে কাজ করবো। বাকি সব আল্লাহর মর্জি। খালা আমার একজন কবি বন্ধু আছে। এমন বৃদ্ধ বয়সে এমন যুবক আর দেখিনি। সম্প্রতি রূপকথা নামে তার একটি কবিতার বই বেরিয়েছে একুশে মেলার জন্যে। আমার বন্ধু রূপকথাকে ডেডিকেট করেছে। এখনও বাজারে আসেনি। আমাকে এক কপি উহার  দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারী মাসে মেলায় যাবে। তাঁর অনেক গুলো বই আছে। বিদেশ থেকে এওয়ার্ড পেয়েছেন দুই হাজার দুই সালে। এই কবি মেয়েদের একশ ভাগ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। তাঁর উপন্যাস গুলোতে নারীই প্রধান বিষয়। এই কবি ফেসবুকে আমার প্রিয়তম বন্ধু। ডিভাইনিটিতে বিশ্বাস করেন। খোদাকে বলেন মাশুক। ইতি রুমী হাল্লাজ খৈয়াম হাফিজ সাদী গালিব ও আল্লামা ইকবালের ভক্ত। তবে রুমী ও হাল্লাজকে মুর্শিদ বলেন।ফেসবুকে তাঁর খুব সুন্দর ছবি আছে। একদিন তোমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। তোমার সাথে দেখা হয়। না এখনও হয়নি।তিনি বলেছেন, দেখা হবে। সোনারগাঁ লাউঞ্জে কফির দাওয়াত দিয়েছেন। ফোন নাম্বার দিয়েছেন। কখনও কল করিনি,উনিও করেননি। রূপকথা কি ভাবে চিনে। ফেসবুকেই পরিচয় হয়েছে। গরীব মেয়েদের প্রচুর সাহায্য করেন।

ডক্টর আরসালান ফোন করে জানালেন,ভার্সিটিতে যেতে হবে। জরুরী কাজ আছে। কখন আসবো স্যার। বেলা এগারোটার দিকে আসো। আমি সাড়ে দশটার দিকে ডিপার্টমেন্টে পৌঁছালাম। বন্ধুদের দেখা হলো। কিরে আয়েশা তুইতো সেলিব্রটি হয়ে গেলি। স্যারেরাতো ক্লাসে শুধু তোর কথাই বলে। বলেন গত পঞ্চাশ বছরে নাকি এতো চৌকশ ছাত্র ভার্সিটিতে আসেনি। তুই নাকি পুরো ভার্সিটিতে ফার্স্ট হয়ে যাবি। কর্তৃপক্ষ তোকে নিয়ে বেশী করছে। যা নস তাই বানাচ্ছে। সব হচ্ছে ডক্টর আরসালানের কারণে। তিনিই সব কিছু ঘটাচ্ছেন। তার তালে সবাই নাচছেন। আমরা জানি তিনি মেধাবী ছাত্র, নামজাদা খানদানী পরিবারের ছেলে। দেখতেও রাজপুত্রের মতো। শুনেছি তোরতো নাকি ক্লাশ মওকুফ করা হয়েছে ডিবেটের প্রিপারেশন নেয়ার জন্যে। আজ কেন এসেছিস। স্যার খবর দিয়েছেন। ওহ, তাই বল। চেম্বারে যাবি নাকি। জানিনা, না ডাকলে যাবোনা। তোরা সবাই বুঝি আমাকে নিয়ে মজা করিস। তুইতো মজার জিনিষ। গ্রাম থেকে এসেই একেবারে সেলিব্রেটি হয়ে গেলি। শুধু ডিবেটের মেধা নয়। ওরতো আরও অনেক গুণ আছে। খুবই সুন্দরী, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। আমরাতো বড় বড় শিল্পপতির মেয়ে। আমরা অনেক ইন্টেলিজেন্ট, হ্যান্ডসাম। স্যারের আমাদের দিকে নজর পড়েনা। দেখ,তোরা সবাই আমার চেয়ে অনেক গুণী। তোদের সামাজিক মর্যাদা আমার চেয়ে হাজার গুণ বেশী।আমিতো গ্রামের একটি সাধারন মেয়ে। খুব সাধারন  ড্রেস করি। জীবনে কোনদিন পার্লারে যাইনি। আমার কোন ব্যান্ক একাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড নেই। তোদের সাথে আমি কোন ভাবেই ম্যাচ করিনা।  আমার দামী গাড়ি নেই। সিএনজিতে চলাফেরা করি। থাক ওসব কথা ছাড়। থাকবে কেন। তুইতো পরীক্ষা না দিলেও ফার্স্ট হয়ে যাবি।

এমন সময়ে ডক্টর আরসালানের পিয়ন এসে আয়েশাকে খবর দেয়। স্যার ডাকছে আপনাকে। যান আমি আসছি। আরে আরে যা যা। তোর বন্ধু ডাকছে। যাইরে। ফিরে এসে তোদের জানাবো। মিষ্টি মধুর কথাগুলো কেমন করে বলবি। রুমে একা পেয়ে চুমো খাসনা আবার।  স্যার, ম্যা আই কামিং ? ওহ সিওর। ইউ আর ওয়েলকাম। বলো কেমন আছো। জ্বী স্যার, খুব ভালো। তোমার বাড়ির সবাই কেমন আছে। সবাই ভালো। আমার বাবাকে আপনার কথা বলেছি। কি বলেছো জানিতো। স্যার কেমন করে। জানিতো তুমি কি বলতে পারো। বলেছো আমরা খুব খানদানি মানুষ। খুব শরীফ ঘরাণার লোক। আমার মা খুব ভালো মানুষ। তোমাকে খুব আদর করে। আমার কথা কিছু বলোনি। সব বলেছি। আপনি খুব মেধাবী। বিনীত ভদ্রলোক। খুব মিষ্ট ভাষী। স্যারের এতো প্রশংসা করায় তোমার বাবা কি বললো। বাবা আগের চেয়ে অনেক নরম হয়ে গেছেন মনের দিক থেকে। ঢাকা আসলে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবে। নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো উনি যেতে চাইলে। আমরাই তাঁকে দাওয়াত দিবো। তাহলে তিনি নিশ্চয়ই আসবেন। কি বলো। জ্বী স্যার।

এবার বলো, তোমার প্রিপারেশন কেমন। আমারতো মনে হয় ভালো। বৃটিশ কাউন্সিলের লেকচার প্রোগ্রামে তুমি নব্বই পেয়েছো। ম্যানার্স এটিকেট ও প্রোনান্সিয়েশন আরও ইম্প্রুভ করতে হবে। আমেরিকার বিখ্যাত সব ভার্সিটির বাছাই করা ছাত্ররা অংশ নিবে। ইউরোপের ও এশিয়ার সেরা ছাত্র ছাত্রী অংশ নিবে। আমেরিকায় ল্যান্ড করার পর আর কোন বাংলা কথা নয়। বৃটিশ কাউন্সিলের ক্রস সেখানেও তোমার গাইড থাকবেন। তুমি তাঁর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখো। এখন কি কথা হয়। জ্বী স্যার। মাঝে মাঝে কথা হয়। না প্রতিদিন কথা বলো। আমার শরম লাগে। উনি যদি বিরক্ত হন। বৃটিশরাতো এমনিতেই একটু ভারিক্কী চালের। এখন থেকে সবাই তোমাকে ওয়াচ করবে। নতুন আয়েশাকে সবাই দেখতে চায়। সব সময় মাথা ঠান্ডা রাখবে। কে কি বললো সেদিকে খোয়াল করোনা। ছেলে মেয়েরা তামাকে নিয়ে গল্প বানাবে। এটা ভার্সিটির মেয়েদের খাসালত। এসব কথাকে একেবারেই পাত্তা দিওনা। চেয়ারম্যান স্যার যে কোন সময় তোমার টেস্টের ব্যবস্থা করতে পারেন কোন নোটিশ ছাড়াই। মনে রেখো। পুরো রেডি থেকো। এমন কি এক ঘন্টার নোটিশে তোমাকে লেকচারে অংশ গ্রহণ করতে হতে পারে। বৃটিশ কাউন্সিলের লেকচারের কথা মনে রেখো। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির হলে ফাইনাল হবে একুশে ফেব্রুয়ারী দুই হাজার আঠার সালে।  কারোই যেন মনে না হয় তুমি মুখস্ত বলছো। না স্যার তেমন কিছুই হবেনা। তোমাকে এলার্ট করছি স্যার যে কোন সময় এক ঘন্টার নোটিশে তোমাকে ডাকতে পারেন। আগামী এক সপ্তাহ তুমি আয়নার সামনে লেকচার প্র্যাকটিস করো। এ কদিন তুমি ক্রস সাহেবের তত্বাবধানে থাকো । দরকার হলে তুমি একটা ফাইভ স্টার হোটেলে থাকো। হোটেলের একজন স্টাফকে বলা হবে তোমাকে যেন সকল ধরনের ম্যানার্স শিখানো হয়। ঠিক আছে স্যার, আমার আপত্তি নাই। তুমি ডিপার্টমেন্টেই থাকো। আমি চেয়ারম্যান স্যারের সাথে কথা বলে তোমাকে জানাচ্ছি। ওকে স্যার আমি মেয়েদের যাচ্ছি। আমি মেয়েদের কমনরুমে যাচ্ছি। মেয়েদের ক্যান্টিনেও থাকতে পারি। আয়েশা ক্যান্টিনে ঢুকতেই বন্ধুরা মৌমাছিত মতো ধরলো। গল্প বানানোর জন্যে। বল আয়েশা, স্যার কিভাবে প্রেম নিবেদন করলেন। হাত ধরে হাটু গেড়ে বললেন, আই লাভ ইউ ডারলিং। তুই কি বললি। মি টু ডার্লিং। কিরে কিছু বল। আমি বললেতো গল্প বানানো হবেনা। তোরা ভাল করে উপন্যাস লিখে যা।উপন্যাসের নাম দিবি আয়েশা নামা।মজাদার উপন্যাস হবে। ভার্সিটির ছেলে মেয়েরা কিনে শেষ করবে। আমি  গ্রামের মেয়ে এখনও শিখে উঠিনি। তোরা লিখ আমার কোন আপত্তি নেই। প্রয়োজনে তোরা ডক্টর আরসালানের সাথেও কথা বলতে পারিস।

আয়েশার কাছে একটি কল এসেছে। দেখলো ডক্টর আরসালানের কল। একটু বাইরে এসে বললো, জ্বী স্যার বলুন। আমি আপনার কলের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। চেয়ারম্যান সাহেব  ভিসি স্যারের সাথে কথা বলে অনুমতি নিয়েছেন। তুমি ও মিস্টার ক্রস এক সপ্তাহের জন্যে সোনার গাঁ হোটেলে থাকবে শুধুমাত্র ম্যানার্স ও এটিকেট শিখার জন্যে। এ কদিনে তুমি শিখে নেবে টেবিল ম্যানার্সের সব কিছু। বিদেশে গিয়ে যেন কোন রকম এ্যাম্বেরাসিং সিচুয়েশনে না পড়। ইন্টারন্যাশনাল এ ডিবেটে মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিশ্বমানের ব্যক্তিত্ব তৈরি করা। ঢাবি চায় এবার বাংলাদেশ যেন একটা ভাল পজিশনে থাকে। ওই ডিবেটের মাধ্যমে তুমি সারা বিশ্বে পরিচিত হবে। এমন কি বিভিন্ন দেশ থেকে তোমার দাওয়াত আসতে পারে। তুমিও মানসিক ভাবে তৈরি হও। ভিসি স্যার তোমার এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেক টাকার ফান্ড দিয়েছেন। আমেরিকার খরচটা ফার্ড ফাউন্ডেশন দেবে। আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এতে অংশ নিবে। সোনার গাঁয়ের বিল দেবে বৃৃৃটিশ কাউন্সিল। ডক্টর উইলিয়াম ক্রস থাকাতে আমরা এ সুযোগ পেয়েছি। এখন বাসায় যাও। কাল সকালে সোনারগাঁয়ে উঠবে। তুমি  ঠিক দশটায় হোটেল লাউঞ্জে থাকবে। হোটেল থেকে কোন কাজে বের হতে হলে ক্রসের গাড়িতে বের হবে। ক্রস কে পিতার মতো সম্মান করবে। লাঞ্চ ডিনার ও ব্রেকফাস্ট তার সাথেই করবে। রাত দশটায় ঘুমোতে যাবে। ভোরে উঠে ইংরেজী কাগজে চোখ বুলাবে। কয়েক সেট ভাল ড্রেস নিয়ে যাবে। কয়েক জোড়া জুতা রাখবে। ভালো মেকআপ কিট সাথে রাখবে। আমি প্রধান গাইড হিসাবে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবো। নিজেকে কখনই একা মনে করোনা।  আমি সব সময় তোমার সাথে আছি। শেষ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমার ছুটি নাই। চেয়ারম্যান স্যার অনেক আশা করে আমায় দায়িত্ব দিয়েছেন। তোমার সাফল্যের জন্যে আমি  সকল ধরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখবো। আমি জানি সেকথা। আমি না থাকলে আমি এতোদূর এগোতে পারতাম না। এটা তোমার ভাগ্য। ভার্সিটির সেরা ছাত্ররা বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। অনেকে খুব হালকা ভাবে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। তুমি অবশ্য কলেজে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলে। সেটা কাজে লেগেছে। ড্রেসের জন্যে টাকা পয়সা লাগলে আমাকে জানিয়ো। আমাদের বাজেট থেকেই সে টাকা দিবো। স্যার আমার বাবা মফস্বলের একজন স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত। তিনি খুবই প্রভাবশালী মানুষ। নগদ টাকার চেয়ে আমাদের সম্পদ বেশী। বাবা বলেছেন,আমার প্রয়োজনীয় সব টাকা দিবেন। আমাদের বাজেট একেবারেই কম না।ভিসি স্যার বলেছেন যতো টাকা লাগে তিনি দিবেন। ফাইনাল তারিখে তোমার কলেজের স্যারেরা আসবেন। আমরা দাওয়াত করেছি। তোমার বাবা ও খালুকে আসতে বলবো। তুমিও বলে রেখো।জ্বী স্যার বলবো। তবে আপনারা দাওয়াত করলে বাবা খুশী হবেন।

আয়েশা বিকেলে বাসায় ফিরে খালাকে সব জানায়। কাল সকালেই আমি হোটেল সোনার গাঁয়ে যাবো। ওদের গাড়ি আসবে। আমি নটার সময় রেডী হয়ে যাবো। তুমি আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিও। নতুন কাপড় গুলো দিয়ে দিও। সাত সেট দিও। সাথে মেকআপ কিটটা দিও। হোটে যাওয়ার সময় তুমি আমাকে সাজিয়ে দিও। ওখানে লাউঞ্জে ক্রস সাহেব থাকবেন। আমাকে নিতে তাঁর গাড়িই আসবে। আমেরিকায় ক্রস সাহেব যাবেন আমার ইন্টারন্যাশনাল গাইড হিসাবে। এই বিন্দু তুই হোটেলে যাচ্ছিস কেন? না খালা, এক সপ্তাহ হোটেলেই থাকতে হবে। তুমি কিছুই চিন্তা করোনা। এরপরেই শুরু হবে ডিবেট ।ফাইনাল একুশে ফেব্রুয়ারি । শিক্ষামন্ত্রী প্রধান অতিথি থাকবেন। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি  সাহেবরাও থাকবেন । সে অনুষ্ঠানে আমার বাবা মা আত্মীয় স্বজন থাকতে পারবেন। পুরো ঢাকা ভার্সিটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে তাদের আশা পূরণ করতে হবে। খালা আমিও খুব একসাইটেড।  বুকটা দুরু দুরু করছে। স্যারেরাতো সিওর আমি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবো।তোমাদের কি ধারণা খালা, আমি কি পারবো। তোর স্যারেরা সবাই যখন বলছে নিশ্চয়ই পারবি। খালু আপনি কি বলেন। তোর উপরে আমার আস্থা আছে। তুই ঢাকায় এসে যে এতো ভালো করবি তা কেউ কল্পনা করেনি। কেন খালু আমিতো জামালপুরেও কলেজের চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সেখানে শুধু যুক্তি তর্কের বিষয় ছিলো।  এখন সারা বাংলাদেশের ভার্সিটির চ্যাম্পিয়ন দের নিয়ে প্রতিযোগিতা। অন্যান্য প্রতিযোগিদের  যুক্তি তর্ক আমি শুনেছি। তাই আশা করছি আমি পারবো। তোমরা দোয়া করো। বাবা মাকেও দোয়া করতে বলো।

পরদিন সকাল সাড়ে নটায় ক্রস সাহেবের গাড়ী এসে হাজির। খালাকে বললাম আমাকে ভালো করে সাজিয়ে দিতে। খালা বললো আমি অতো ভালো করে সাজাতে পারবো। খালু সেদিন একটু বিলম্বে অফিসে যাচ্ছেন। দুজনে এক সাথে বিদায় দিলেন। কোন যেন মন খারাপ করছিলো বুঝতে পারলাম না। গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি এমন সময় বাবা ফোন করেছেন। কিরে মা বিন্দু ,হোটেলে থাকার কি দরকার ছিলো। ওই হোটে আমার বিশ্ব নাই। কি যা বলেন বাবা। এসব হোটেলে বিদেশী মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী থাকেন। বড় বড় কোম্পানীর এমডিরা থাকেন। খুব শক্তিশালী সিকিউরিটি। ওসব নিয়ে আপনার চিন্তা করার কোন দরকার নাই। এরপরতো আমেরিকা যেতে হতে হবে। বিন্দু তোর মা’র সাথে কথা বল। ফোন ধরেই আম্বিয়া বেগম কাঁদতে শুরু করলেন। মারে ,শুনেছি বাজে রাতে হোটেলে থাকে। শেষ পর্যন্ত আমার কপালে এই ছিলো। হোটেলের কথা শুনলে কেউ বিয়ে করবেনা। আরে মা এটা কোন সাধারন হোটেল না। তুমি এখনও সেকেলে রয়ে গেছে। বাবার এখন বেশ পরিবর্তন হয়েছে। আমি এখন গাড়িতে, হোটেলের দিকে যাচ্ছি। তুমি আমার জন্যে দোয়া করো। এক বিন্দুও চিন্তা করবেনা। দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ চলে যাবে। তোমার আনন্দ হচ্ছেনা তোমার মেয়ে সারা দেশের ভিতর চ্যাম্পিয়ন হবে। হচ্ছে আনন্দ। বিয়ে হলে এসব দিয়ে কি করবি। বরের খেদমত করাই মেয়েদের কাজ। ছেলে মেয়ে ্লে ওদের মানুষ করা মায়ের কাজ। মা ও রকম ভাবনা এখন আর নেই। মেয়েরা মন্ত্রী হয়, সচীব হয়। আমিও হবো।  বেশী উপরে উঠে গেলে কেউ বিয়ে করতে চায়না। চৌধুরী সাহেবদের মেয়েটা ঢাকায় থেকে অনেক পড়ালেখা করেছে। শেষে নিজে পছন্দ করে এক ছেলেকে বিয়ে করেছিল। সে বিয়ে টিকেনি। মেয়ে  ছেলের উপরে উঠে গেলে বিয়ে টিকে না। না মা এখন সে রকম নয়। তবে মেয়েরা আর ছেলেদের দাসী নয়। বন্ধু সাথি ও পার্টনার। সমান অধিকার। পুরাণো সনাতন ধর্মে স্বামীকে দেবতা বলা হয়। স্বামীর পা ধোয়া জল খায়। তুমি যেমন বাবার ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকতে। তুমিতো কতো উঁচু পরিবারের পড়ালেখা জানা মেয়ে। ইচ্ছা হলেও কখনো একটা বই পড়তে পারোনি। দাদার সম্পদ দেখে তোমাকে বিয়ে দিয়েছে বাবার সাথে। আম্বিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর বলে দেখ বিন্দু আমার মা বাপ বলেছেন শ্বশুর বাড়ির মুরুব্বীদের খেদমত করবে। ছোটদের আদর করবে। বরের মন খুশী রাখবে। শ্বাশুড়ির মুখে মুখে কখনই কথা বলবেনা। তুমি তাঁর মেয়ের মতো। শ্বাশুড়ি অবুঝ হলেও মানিয়ে নিবে। ঠিক আছে আমি এখন ছাড়ি। হোটেলে এসে গেছি। একটু দেরী হয়ে গেছে।

হাসিমুখে ডক্টর ক্রস বললেন, ওয়েলকাম মিস আয়িশা। ইউ উইল নাও স্টার্ট এ নিউ লাইফ। আসো আমাকে ফলো করো। রিসেপশন কাউন্টার থেকে একজন তাদের নিয়ে গেলো নাইন্থ ফ্লোরে। দুটো রুম পাশাপাশি। নয়শ এক ও নয়শ দুই।  ক্রস সাহেব একে ও আয়েশা দুইয়ে। আয়েশা রুমের ভিতরে গেলে ক্রস সাহেব আয়েশার হাতে সাতদিনের একটা রুটিন দিলেন। সকালে কটায় উঠবে আর কটায় শুতে যাবে। সারাদিন কি করবে। টেবিল ম্যানার্স কি তারও বিশদ বিবরন আছে। ক্রস সাহেব আয়েশাকে জানালেন, এখন থেকে তুমি নিয়মিত ইংরাজী ভাষা ব্যবহার করবে। কিছুতেই বাংলা বলতে  পারবে না।বাংলা নিষিদ্ধ করা হলো আগামী দুই মাসের জন্যে।

 

 

 

 

 

রূপকথা ২ (উপন্যাস)

হে কবিবন্ধু, বলোতে দেখি তুমি কেমন করে আমাকে নিয়ে এতো ভাবো। তুমিতো আমাকে কখনও দেখোনি। তুমি কি আমাকে দেখেছো। না দেখোনি। মানুষ আমিতো কখনই লিখিনা। তোমার কল্পনার কবিই লেখে। এর আগেও বলেছি আমি মানুষ রূপকে নিয়ে কখনও ভাবিনা। আমার অন্তরে বসে তুমি আমাকে কবিতা শিখাও। আমি কবিতা লিখি। এখন তুমি বলছো উপন্যাস লিখতে। লিখছি। কোন কাগজ কলম কালি লাগেনা। সবই মনের আয়নায় লিখিত থাকে। আর সেই আয়নার পাতায় আস্তে আস্তে পড়ি। রূপকথা মানে ফেয়ারী টেইলস পরীর গল্প।বাল্যকালে পরীর অনেক গল্প শুনেছি। স্বপ্নেও দেখেছি। এখনও সে সব গল্প মনে আছে। পরীরা খুব সুন্দরী হয়। যে সুন্দরী জগতে দেখা যায়না। পরী খুব স্বাধীন। তার দুটো পাখা আছে। যখন ইচ্ছা যে কোন জায়গায় যেতে পারে। তুমি আর আমি এক পলকে পুরো সৃষ্ট ঘুরে বেড়াতে পারি। কারণ আমি কবি। আর আমার সৃষ্টি রূপকথা পরীর গল্প। আমার ঘুরে বেড়াই মনের পাখায়। আমাদের প্রভু আমাদের সে ক্ষমতা দিয়েছেন। আমরা তার আনুকুল্য পেয়েছি।

তুমি বলতে মানুষ হলে কেমন হতো। এ শতাব্দীতে মানুষ মানে অকল্যাণের প্রতীক।  জগতের বাদশা এখন শয়তান। মানুষের পরাজয় হয়েছে অনেক আগে। সারা পৃথিবী এখন যুদ্ধবাজদের হাতে। প্রতিদিন এ গhরহব্যাপী লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছে যুদ্ধে। লাখ লাখ লোক মানুষ খেতে পায়না, চিকিত্‍সা পায়না,চিকিত্‍সা পায়না। অথচ সবাই মিলে গাণ গায় ’ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। বিজয় দিবসে বলতে হয় আমরা বিজয় লাভ করেছি। স্বাধীন হয়েছি। মনে পড়ে একাত্তুরের ষোলই ডিসেম্বরের কথা। সেদিন ছিল সত্যিকারের বিজয় দিবস। কারণ আমরা যারা এদেশকে ভালবেসেছি জানতাম না এ বিজয়ের পিছনে কি আছে। এখন সব স্পষ্ট। এখন আমাদের কিছুই নাই। আছে শুধু পতাকা, জাতীয় সংগীত, তথাকথিত জাতিসংঘের সদস্যপদ। রাস্ট্র নামের এক মহাদানব। এমন এক রাষ্ট্র যে আপন মানুষকে খায়। যে মানুষের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্যে নানা রকম ও ধরণের বাহিনী রাখে। বিরাট তাবেদার বাহিনী রাখে। আর আমরা সীমানার বাইরে থেকে দেশের জয়গাণ করি। যাকে দেখা যায়না ,ধরা যায়না। রাষ্ট্র আর সরকার নাকি ঈশ্বরের মতো। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ঈশ্বর দয়ালু। তিনি সৃষ্টি করেন। আর মানুষ বা রাষ্ট্র তা ধ্বংস করে। আমি মানুষ ছিলাম,এখন কবি। যাকে দেখা যায়না। কবি হিসাবে কবি আর রাস্ট্র এক। কাউকে দেখা যায়না। কবি যদি মানুষ হয় তাহলে রাষ্ট্র খপ ধরে ফেলবে। কয়েদখানায় পুরে রাখবে। না হয় ন্যায়ের কথা বলে ন্যায়ের নামে ফাঁসী দিবে। কবির কোন বিজয় নাই। কবি চায় ঈশ্বরের বিজয়।  কবি চায় সত্যিকারের মানুষের বিজয়। আমিতো ঈশ্বরের কবি। আমির বিজয় হচ্ছে ঈশ্বরের সাথে মিলন। মানুয হিসাবে যখন জলে স্থলে বিচরণ করি তখন দেখি মানুষের পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নাই। হেমন্তপুরের সুফিয়ার সাথে দেখা হলো । জানতে চাইলাম, আজ কি দিবস।সে বললো জানিনা।  কেন ? শুনেছি, আমাদের মাতবরেরা আজ গাণ গাইবো, পতাকা উড়াইবো। আমরা গেলে দুই কেজি চাল পাই। এদিন দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেকথা জানো। জ্বীনা। শুনেছি মজিবর আমাদের রাজা। এবার বুঝো রুপ আমাদের বিজয় দিবস কেমন। আমি অন্তরে বিজয় দেখিনি। দেহে বিজয় আছে, যা দৃশ্যমান । যারা অন্যকে দমন করতে পারে তারা খুব আনন্দের সাথে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস,ভাষা দিবস পালন করে। আজও সারা দেশের মানুষ ভালো করে বাংলা লিখতে ও পড়তে পারেনা। দেশ দুনিয়া সম্পর্কে তাদের কোন ধারনা নেই। এর প্রথম এবং একমাত্র কারণ শিক্ষা। প্রায় সত্তুর বছর হতে চলেছে সব মানুষের ঘরে বিদ্যা পৌঁছেনি। সামান্য কিছু পড়ালেখা করার স্বামীর দাসত্ব করে। সমাজ ও রাস্ট্রের দাসত্ব করে। রাস্ট্র বা ধর্ম তাদের যে স্বাধীনতা দিয়েছে তাও তারা ভোগ করতে পারেনা। প্রায় পনেরশ বছর পরেও ইসলামের  বাণী কোথাও সঠিক ভাবে প্রকাশিত হয়নি। এমন কি ইংরাজী উচ্চ শিক্ষিত নাগরিকরাও  কোরআন কি তা জানেনা। নিজেরা ধর্ম একেবারেই জানেনা, বলে বেড়ায় সব দোষ মাওলানা সাহেবদের। কথায় কথায় মোল্লা বলে গালি দেন।

তুমিতো নিজের বাস্তবতা দেখছো আয়েশার মাধ্যমে। হুবহু বাস্তব তুমি। আয়েশা একদিন অনেক বড় হবে। তাই আমাকে বলছো তোমার মন মতো করে আয়েশাকে সাজিয়ে দিতে। কিন্তু জরিফা? সেতো মনের বিরুদ্ধে খলিলের সাথে আছে। যদিও জরিফা বলে তার স্বামী খুব ভালো। সেওতো তোমার আরেকটি রূপ। সংসার জীবনে বাংলাদেশের নব্বই ভাগ শিক্ষিত মেয়ের রূপ। এমএ পাশ করেও নিজের মত প্রকাশ করতে পারেনা। রাত হলে সংগম করো স্বামীর মন রক্ষার জন্যে। আর দিন হলে সংসারের সবার মন জুগিয়ে চলো। আমি যখনি বলেছি একটু স্বাধীন হও। জরিফা বলেছে তাহলে আমাকে সংসার ত্যাগ করতে হবে। এমন কি জরিফার মা বাপও তার পক্ষে নাই। হয়ত জরিফাও কালক্রমে কিছুটা স্বাধীন হবে তার স্বামী তার কথা শুনবে। যেমন আয়েশার খালা ফারজানা স্বামী কথা মেনেই সংসার করে। মেয়েদের  স্বাধীনতা হলো স্বামীর সংবিধান। স্বামী সাহেবদের গৌরব হলো শিক্ষিত স্ত্রী যখন কখনও সখনও কোন অনুষ্ঠানে যায়। মেয়েরাও পার্লার করে সেজেগুজে অনুষ্ঠানে যায়। এখনতো গ্রামে গঞ্জেও পার্লার চলে গেছে। তাই কবি ও রূপকথা একমত যে মেয়েদের শিক্ষিত হওয়া খুবই প্রয়োজন। আইন করতে হবে স্বামী স্ত্রী দুজনকেই সংসারের কাজ করতে হবে। দুজনকেই বাইরের কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে কোন ফতোয়া চলবেনা। মেয়েদের দমিয়ে রাখার জন্যে ইসলামে কখনও কোথাও বলা হয়নি। সনাতানী ধর্মগুলো মেয়েদের অধিকার সবই ছিনিয়ে নিয়েছে। তাদেরকে অর্ধ মানবে পরিণত করেছে। ইসলাম এ ব্যাপারে জগতে বিপ্লব নিয়ে এসেছে। কিন্তু সমাজ ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মেয়েদের দমিয়ে রেখেছে। ইসলাম বলেছে বিদ্যা অর্জন নারী পুরুষের জন্যে ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু সমাজ মানেনা। গ্রামে চলে পুরুষের তালাক ও অত্যাচার। বড় বড় শহর গুলোতে চলে শিক্ষিত মেয়েদের তালাক ও অত্যাচার। রাস্ট্রে চলে ক্ষমতাবানদের অত্যাচার।

দেখো রূপ, কোন কিছু লিখতে বা বলতে গেলে সমাজ দেশ ও রাস্ট্রের চিত্র সামনে আসবেই। আমি কবি আমি রুমীর ভক্ত খোদার কবি। কবিরা হয় সত্য ও ন্যায়ের প্রকাশ। যেখানে অত্যাচার অনাচার সেখানেই কবির উপস্থিতি। আমি কবি বলেই তোমার অনুসারী হয়েছি। খোদা বলেছেন,যাদের অন্তর চক্ষু নাই তারা মানুষ নয়। আর খোদা সব মানুষকে অন্তরচক্ষু দেন নাই। এখন এমন অতিবাহিত হচ্ছে যখন ন্যায় বলে কিছুই নাই। খোদার খলিফা মানুষের পরাজয় হয়েছে। এখন শুধু আমরাই সত্যকে রক্ষা করবো। তোমার কল্পনা ও স্বপ্নকে আরও প্রসারিত করো। শুধু আয়েশা আর জরিফায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবেনা। মানুষের মুক্তির জন্যে ভাবতে হবে। তুমি তোমার আয়েশাকে ন্যায়ের প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করো। শুধু নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করলে হবেনা। সে মানবতার পূণর্জাগরণের দূত হিসাবে কাজ করতে বলো। আমরা দুজনও ওর জন্যে নিবেদিত থাকবো। তুমি কি বলো।

হে কবি, তুমিতো আমারও গুরু ও স্রষ্টা। আমি তোমাকে ভাবাচ্ছি শুধু আয়েশাকে নিয়ে। আয়েশা আমার চিন্তা ও স্বপ্ন। আমি নিজেকে জগতের মহান নারী হিসাবে ভাবি। আয়েশার মাধ্যমে আমি জরির মুক্তি চাই। দেখছোনা কত অল্প সময়ে আয়েশা রাজধানীতে লাইমলাইটে এসে গেছে। তাকে নিয়ে এখন মিডিয়াও ভাবছে। সারা বিশ্ববিদ্যালয় আয়েশার জন্যে নিবেদিত। আমি আয়েশাকে এ সময়ের বেগম রোকেয়া হিসাবে দেখতে চাই। সে হবে বিশ্বনারী সমাজের নেত্রী। জগতবাসীকে নতুন কথা শুনাবে। তুমি একেবারেই চিন্তা করোনা। আয়েশা তোমার কল্পনা ও স্বপ্নের চেয়ে হাজার গুন বড় হবে।

প্রিয় রূপ, তুমি কি জানো মানুষের ক্ষমতা ও কল্পনা শক্তি  সৃষ্টির সমান। কিন্তু মানুষ তা জানেনা। যদিও খোদা বলেছেন, মানুষকে অতি অল্পই জ্ঞান দেয়া হয়েছে। মানুষ তার ব্রেনের ক্ষমতার দশ ভাগ ও এখনও ব্যবহার করতে পারেনি। এদিক থেকেও মানুষের বিশালত্ব ভাবা যায়। মানুষ হলে তুমি কি রকম হতে তারই বাস্তব রূপ হচ্ছে গ্রামের মেয়ে আয়েশা । তোমার ভাবনাকে আমি সম্মান জানাই। জরিফা হচ্ছে তোমার কষ্ট। সেই জরিফাকে তুমি মুক্তি দিতে চাও। আসলে এ মুক্তি হচ্ছে নারী জাতির মুক্তি। মুক্ত নারীর প্রতীক হচ্ছে আয়েশা।

জরিফার স্কুল কেমন চলছে,চলুন দেখি। পাঁচজন মেয়ে জরিফার কাছে কোচিং করে। দুজন নবম শ্রেণীর। আর তিনজন অষ্টম শ্রেণীর। জরিফা এদের সব বিষয়ে পড়ায়। তবে বিশেষ নজর দিতে হয় অংক ও ইংরেজী বিষয়ে। জরিফা ভেবেছিল এক ঘন্টা করে সময় দিবে। কিন্তু এতে কুলোচ্ছেনা। তাই সময় বাড়িয়ে দিয়েছে। দেড় দুই ঘন্টা লেগে যায়। জরিফা চায় দশম শ্রেণীর ছাত্রীরা তার কাছে থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিক। তাহলে বুঝতে পারবে কোচিং কেমন হচ্ছে। জরিফা এটাকে বাণিজ্যিক কাজ বা পেশা মনে না করে সমাজ সেবা মনে করছে। প্রথম মাস পেরিয়ে যাবার পর জরিফা দশ হাজার টাকা পেয়েছে ছাত্রীদের কাছ থেকে। ছাত্রীদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছে কোচিং তাদের কাছে লাগছে। সবাই বলেছে খুব ভালো। আরও বলেছে ম্যাডাম আপনার কাছে পড়তে বিরক্ত লাগেনা। পরিবেশটা খুবই হাসিখুশী। এক ঘেঁয়ে না। তোমরা মনোযোগ দিয়ে পড়ো। তাহলে তোমাদের রেজাল্ট ভালো হবে। এখন থেকে তোমাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক পরীক্ষা হবে। পরীক্ষায় অংশ নেয়া বাধ্যতামূলক। রেজাল্ট ভালো না হলে এখানে আর কোচিং হবেনা। তোমরা জানো আমি শুধু টাকার জন্যে কোচিং ক্লাস খুলিনি। আমি ইকনোমিক্সে অনার্স মাস্টার্স করেছি। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছি। চাকুরীতে যাইনি। সিরিয়াসলি সংসার করবো বলে। তোমরাতো জানো আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজ। মেয়েদের বিকশিত হওয়ার পথ তেমন খোলা নয়। সবাই ভাবে শিক্ষিত হয়ে কি লাভ। তবে আগের চেয়ে মেয়েরা অনেক এগিয়ে গেছে। আরও এগোবে। শুধু বাচ্চা জন্ম দেয়া, রান্না করা আর স্বামীর সংঘ দেয়া মেয়েদের কাজ হতে পারেনা। আমার কথাই ভাবো, বিয়ের পর আট বছর ঘরে বসে আছি বউ সেজে। সৃজনশীল কিছু করা বা ভাবার কোন সুযোগ নেই। অনেকদিন পর তিনি বুঝতে পেরেছেন আমার কিছু করার দরকার । তাই তোমরা এ কোচিং সেন্টার দেখতে পাচ্ছো। আমার সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করার কথা। কিন্তু আমার মা বাবা ও শ্বশুরবাড়ি রাজী হয়নি।  অনেক মানসিক যন্ত্রনার ভিতর দিয়ে আমার সময় অতিবাহিত হয়েছে। আমার মন এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। নিজেকে একটু মুক্ত স্বাধীন মনে হচ্ছে।

টাকাটা হাতে পেয়ে জরিফা তার স্বামীর হাতে তুলে দেয়। খলিল টাকা নিয়েছে। কিন্তু মনের কথা জরিফাকে বলেনি। পরদিন সকালেই বললো চলো একটু ব্যান্কে যাবো। তোমার নামে একটা একাউন্ট খুলেছি। এখন যাবো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তোমার ছবি জমা দিবো। তুমি স্বাধীন ভাবে একাউন্ট পরিচালনা করবে। আমিও মাঝে মাঝে কিছু জমা দিবো। জরিফার খুশীর সীমা নাই। বাসায় ফিরে শ্বাশুড়ীকে সালাম করে। কি হলো বউমা। মা, ছাত্রীদের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা  পেয়েছি। আপনার ছেলে আমার নামে ব্যান্ক একাউন্ট খুলে দিয়েছে। টাকা জমা দিয়ে এসে আপনাকে সালাম করলাম। খলিল কই? সে তার অফিসে গেছে। আমি রিকশা করে বাসায় এসেছি। আমি তোমাকে দোয়া করি। তুমি সংসারের মুখ উজ্জ্বল করো। সে রাতই ছিল জরিফার আসল বাসর রাত। রাত জাগা পাখির মতো গুণ গুণ করেছে। বার বার খলিলকে চুমো খেয়েছে। খলিলও বুঝতে পেরেছে সংসারের সুখ কোথায়। খলিল জরিফার সম্পর্কও ধীরে ধীরে সুখের দিকে যাচ্ছে। জরিফা সারাদিন আনন্দময় থাকে। সংসারের সব কাজ হাসিমুখেই করে।

ছুটির দিনে হঠাত্‍ করেই গুলশান বেগম আয়েশাকে ফোন করে। হ্যালো বেটি আমি আরসালানের মা বলছি । জ্বী খালাম্মা আসসালামু আলাইকুম। আলাইকুম সালাম। কেমন আছেন।  শোকর আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ পাক খুব ভালো রেখেছেন। বেটি কেমন আছো। সেই যে গেলে আর ফোনও করলেনা। সরি খালাম্মা,মাফ করে দিবেন। আজতো ছুটির দিন। আমাদের এদিকে যদি আসতে পারো। আপনি হুকুম করলে কি না করতে পারি। না বেটি হুকুম না। আবদার করছি। তোমার কথা মনে পড়লো। সেতো আমার সৌভাগ্য। তাহলে আসবেতো। জ্বী আসবো। স্যার বাসায় আছেন নাকি। না আরসুতো ভার্সিটিতে চলে গেছে। কি যেন একটা কাজ আছে তাই । চলে আসবে ঘন্টা খানেকের ভিতর। বারোটার ভিতর চলে আসো তুমি। আমরা এক সাথে লাঞ্চ করবো। জ্বী ঠিক আছে। ফোন ছেড়েই গুলশান বেগম এলান করে দেন বাড়িতে বিশেষ মেহমান আসছে। সবাই যেন এলার্ট থাকে। গেটে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে। আর কিচেনে গুলশান বেগম নিজেই উপস্থিত থাকবেন। এদিক ওদিক সব দেশে গুলশান বেগম আরসালানকে ফোন করেন। বেটা আয়েশা বেটিকে দাওয়াত করেছি। আসবে বলেছে। তুই ব্যস্ত না থাকলে এক্ষুনি চলে আয়। তুমি হঠাত্‍ তাকে দাওয়াত করতে গেলে কেন মা। ওতো এখন খুব ব্যস্ত। মন চাইলো বেটিকে একটু দেখি। তাই ফোন করে ডাকলাম। মেয়েটার আদব আমার খুব ভালো লাগে। খুবই নরোম মেয়ে। এ রকম খুব কম দেখা যায়। সেজন্যেইতো ওকে ডিবেটের জন্যে সিলেক্ট করা হয়েছে। তুমি আবার ডিবেটের কথায় চলে গেলে। তুমি এক্ষুনি আসো। আসছি মা। এক ঘন্টার ভিতর পৌঁছে যাবো। আয়েশা আগে এসে গেলে তুমি দেখাশুনা করো। সেকথা তোমার ভাবতে হবেনা। আমি ডেকেছি, আমিই দেখাশুনা করবো। অন্য কোন কথা বলে ফেলনা। যা বলবে তার এখনও বহু সময় আছে। তাড়াহুড়ো করোনা। ওতো মাত্র সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। অনার্স শেষ করতে আরো দুই বছর লাগবে। এ সময়ের ভিতর ও রাজী নাও হতে পারে। শুনেছি ওর বাবা খুব কড়া পুরাণপন্থি মানুষ। গ্রামের বিত্তবান মানুষ। গ্রামের মাতবর। এক গুঁয়ে। বাপের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আয়েশা কিছু করবেনা। উচ্চ শিক্ষার জন্যে কিছু স্বাধীনতা পেয়েছে। এর বাইরে কিছু না। ঈক আছে বাবা, এখন রাখি। বাসায় এসে বাকি কথা বলিস। দেরী করিসনা।

আয়েশা খালাকে বলে আরসালানের বাড়ির কথা। ছোট খালা ডক্টর আরসালানের মা গুলশান বেগম আমাকে যেতে বলেছেন। তুমি কি বলো। আমি কি বলবো। তোর স্যারের মা ডেকেছেন। কেন ডেকেছেন, কোন কাজ আছে নাকি। তাতো জানিনা। নবাবজাদীর তোর উপর নজর পড়েছে কি। কেমন করে বলবো। একদিনে কি এসব বুঝা যায়। খালা তা আমার মনে হয়না । তারা এত বনেদী খানদানি পরিবার। চট করে এমন সিদ্ধান্ত নিবে আমার মনে হয়না। আমি পড়ালেখা শেষ না করে এসব ভাবতে পারবোনা. তবে বাবাকে নিয়ে যতো চিন্তা। যদি তিনি মনে করেন ভালো ছেলে ও পরিবার পাওয়া গেছে তাহলে পড়ালেখা বন্ধ করে বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। বলবেন, পড়ালেখা করেতো এর চেয়ে ভাল পরিবার ও ছেলে পাওয়া যাবেনা। তখন আমি কি করবো বলো। ভয় পাসনা। আমরা সবাই দুলাভাইকে বুঝাবো। বাবা যদি গোঁ ধরে। তুমিতো জানো কি রকম মানুষ। আমার বিয়েতো প্রায়ই ঈক করে ফেলেছিলেন। কলেজের স্যারেরা বাবাকে রাজী করিয়েছেন উচ্চ শিক্ষার জন্যে। তখনও বাবা বলেছিলেন ভালো ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দিবেন। তোমাদের বলছি খালা, এবার কিন্তু আমি অবাধ্য হয়ে যাবো। আমি বাবার কোন সাহায্য নিবোনা। নিজের পড়ার খরচ নিজেই জোগাড় করবো।তোমাদের সবাইকে আমি উচিত শিক্ষা দিবো। কোথায় যাবি, যা মা। এখনি অমন আকাশ পাতাল ভাবিস না। পরিস্থিতি যখন যেমন তেমন মোকাবিলা করতে হবে।

আয়েশার তার সিএনজি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বারিধারা যাওয়ার জন্যে। একটু দেরি হয়ে গেছে। আশা করছে বারোটার ভিতর পৌঁছাতে পারবে। দেরী হলেও পাঁচ দশ মিনিট হতে পারে। এর আগেই আরসালান বাসায় পৌঁছে যায়। কি হলো মা তোমার বেটি কই। এখনও আসলোনা। তুমি শুধু শুধুই মানুষের জন্যে এমব্যারাসিং সিচুয়েশন ক্রিয়েট করো। হয়ত আয়েশা ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাজী হয়েছে। ফোন না করলে কি আসতো। না বললেতো কখনও আসবেনা। মেয়েটার জন্যে আমার মনে ভালবাসা হয়ে গেছে। না না ইচ্ছার বিরুদ্ধে নয়। ওর কথা শুনে মনে হয়েছে ফোন কল পেয়ে সে খুশী হয়েছে। সে হয়ত এ রকম একটা কলের অপেক্ষায় ছিল। যা হোক আমি ডেকেছি,সে আসছে। তোমার আপত্তি কোথায়। মা তুমি বুঝতে পারছোনা। সে আমার ছাত্রী। ওর ডিবেটের আমি প্রধান গাইড। এটা একটা বিরাট দায়িত্ব। সারা ভার্সিটি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ইন্টোর ভার্সিটি ডিবেটে সে চ্যাম্পিয়ন হবে। এ জন্যে ঢাবি অথরিটি ওর জন্যে লাখ লাখ টাকা খরচ করছে। ঢাবি অথরিটির দৃঢ বিশ্বাস আয়েশা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে। বহু বছর পর এখানে এ রকম একটা আগুনের মতো মেয়ে এসেছে। কল্পনা করা যায়না গ্রামে এ রকম একটা মেয়ের জন্ম হয়েছে। ভিসি সাহেব ওকে হলে ফ্রি থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু রাজী হয়নি। আয়েশা মনে করে হলের পরিবেশ তেমন ভালোনা। মেয়েরা নানা অন্যায় কাজে জড়িত হয়ে গেছে। তার উপর রয়েছে দলীয় রাজনীতি। সবাই জানে,কিন্তু দলীয় প্রভাবের কারণে কিছুই করা যায়না। ছাত্র নেতারা ছাত্রীদের বাধ্য করে অন্যায় অনৈতিক কাজে জড়াতে। এ নিয়ে খবরের কা্েও অনেক লেখালেখি হয়েছে।

বেলা বারোটা দশ মিনিটে আয়েশার সিএনজি আরসালানের বাড়ির সামনে থামে। কেয়ার টেকার হামিদ খাঁ তাকে রিসিভ করে। আরসালান লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিলো। হ্যালো আয়েশা, তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। আসো, বলো কেমন আছো। বেশ কয়েকদিন তোমার সাথে দেখা হয়নি। তুমিতো ফোন করেই চলে আসতে পারো। তা পারি স্যার। কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে। আপনারতো একটা প্রাইভেট লাইফ আছে। আপনি ডাকা আর আমি নিজে থেকে আসা আরেক কথা। আর এখনতো ডিবেট নিয়ে খুব টাফ টাইম যাচ্ছে। বৃটিশ কাউন্সিলের ক্রস সাহেব আবার খবর দিয়েছেন। তিনি আমাকে নিয়ে একটা স্পেশাল প্রোগ্রাম করতে চান। সে নিয়ে কথা বলতে চান। স্যার আপনারা কি কিছু জানেন। নিশ্চয়ই জানি। প্রস্তাবটা এসেছে ভিসি সাহেবের কাছে। তিনি রাজী হয়ে ক্রসকে জানিয়েছেন। তাই ক্রস তোমার সাথে আলাপ করতে চায়। বিষয়ের উপর তোমাকে একটা পেপার তৈরি করতে হবে। মূল পেপারটা বিশ পঁচিশ পৃষ্ঠা হবে। সারাংশ পাঁচ পৃষ্ঠা। প্রথমে পেপারটা আমি দেখবো। তারপর কমিটি দেখে ভিসি স্যারকে জানাবেন। এরপর এটা ক্রসের কাছে গেছে। ক্রস এখন একটা প্রোগ্রাম অর্গেনাইজ করবে। তোমার সাথে কথা বলে দিনক্ষণ ঠিক করবে। ওই প্রোগ্রামে আড়াইশ মেহমান থাকবে। প্রায় দেড়শ বিদেশী ও একশ দেশী মেহমান থাকবেন। একশ পারসেন্ট বিদেশী এক্সেন্টে লেকচার দেবে। মেহমানদের পক্ষ থেকে তোমার লেকচারের উপর মতামত দিবেন আমেরিকান এ্যাম্বাসেডর। আমরা এতো সব করছি অন্য ইউনিভার্সিটির প্রতিযোগীরা তোমার সাথে টেক্কা দিতে না পারে। আফটারঅল এটা ঢাবির ইজ্জ্বতের ব্যাপার।

কিরে আরসু, বেটিকে দাওয়াত করলাম আমি আর তুমি এখন ক্লাস নিতে শুরু করেছো। ওরে এক গ্লাস জুস দাও। বলো বেটি তুমি কি জুস নিবে। খালাম্মা আপনার পছন্দ মতো দিন। আমি তাতেই খুশী হবো। দেখো মা লাঞ্চের পর পুরো বিকেলটা তুমি আমার সাথে থাকবে। আমরা গল্প করবো। খালাম্মা আমিতো গল্প জানিনা। কথা বলতে বলতে গল্প তৈরি হয়ে যায়। আজ তোমার জন্যে পুরো বাংগালী খাবার বানিয়েছি। তুমি খেয়ে মজা পাবে। আমি নিজ হাতে তোমার জন্যে ইরাণী পায়েশ রান্না করেছি। ওটা তুমি বাসায় নিতে পারবে তোমার খালাজানের জন্যে। এখন থেকে তুমি প্রতি সপ্তাহে একদিন আমার কাছে আসবে। আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি। তুমি একেবারেই শরম করবেনা। ধরে নাও আমি তোমার আরেকজন মা। রাজী আছোতো। জ্বী, রাজী আছি। আপনিতো আমার মায়ের মতো। একজন মা গ্রামে, আরেকজন রাজধানী তে। আমার জন্যে ভালোইতো হলো।  জানেনতো মায়ের দায়িত্ব বেশী। তুমি আমায় ভয় দেখাচ্ছো। তোমার সব দায়িত্ব আমি নেবো। কোন অসুবিধা নেই আমার। কি আরসু তুমি কি বলো। আমি আর কি বলবো। তুমি বাড়ির মালিক তুমি যা বলবে তাই হবে। তোমার বাড়িতে তুমি যাকে পছন্দ করো তাকেই রাখতে পারো। তোমার কি ইচ্ছা আমিতো জানিনা। তোমার কি অভিমান হচ্ছে। কি যে বলো মা। আমি কি ও রকম মানুষ। তুমি কি আমাকে ও ভাবে বড় করেছো। তোমার দিল নরম। আমারও দিল নরম। মানুষের উপকার করতে পারলেই আমি খুশী। সে কারণেই আমি আয়েশার প্রধান গাইডের দায়িত্ব পেয়েছি। আমি একশ ভাগ চেষ্টা করবো আয়েশা যেন বিদেশ যেতে পারে। আমরা সবাই সেভাবেই আয়েশাকে তৈরি করছি। আয়েশা তুমি কি মনে করো। জ্বী স্যার। আমার ভাগ্য যে আপনি আমার গাইড। ডিপার্টমেন্টের ছেলে মেয়েরা একটু কানাঘুষা করছে। নানা ধরনের গসিপ তৈরি করছে। ওটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচার। তিলকে তাল করা ছাত্র ছাত্রীদের কালচার। ওসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাইনা। তুমিও এসব গসিপে কান দিওনা। শুধু হাসবে। কদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। পরীক্ষ শুরু হলে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

আরসু, তোরা কখন খেতে বসবি। তুমি ডাকলেই আসবো। দুটোর ভিতর সার্ভ করতে বলো। তুমি কি বলো আয়েশা। আমি আর কি বলবো স্যার। আমিতো মেহমান। মেজবানের সময়ই মেহমানের সময়। মেহমানতো খাবার চাইতে পারেনা। তুমিতো এখন মার মেয়ে হয়ে গেছো। তাই আর কোন ফর্মালিটিজ চলবেনা। এরপর যখন আসবে তখন আগেভাগে এসে নিজেই রান্না করে আমাদের খাওয়াবে। বলতে পারবেনা রান্না করতে পারিনা। খালাম্মতো আমাকে এ বাড়িতেই থাকতে বলেছেন। আমিতো যে কোন সময়ে চলে আসতে পারি। তখন বুঝবেন স্যার। দেখো মা তোমার আয়েশা কি বলছে। কি বলছে? বলছে যে কোন সময়ে এ বাড়িতে এসে উঠবে। আমিইতো বলেছি এ বাড়িতে থাকতে। ওটাতো তোমার বিনয়, ভালবাসা। আয়েশা বোধ হয় তোমার বিনয়কে সিরিয়াসলি নিয়েছে। এতো অবাক কান্ড দেখছি। কেন বাপ তোমার কি অসুবিধা। কেউ কি এভাবে কারো বাড়িতে উঠে। মানুষ জানতে চাইলে তখন কি বলবে। বলবো আমার বোনের মেয়ে। আমার বাড়িতে থেকে ঢাবিতে পড়ালেখা করছে। কি বলো বেটি। তাইনা? জ্বী খালাম্মা। আপনার ছেলে মনে হয় চায়না। তাহলে ওকে বের করে দেবো। কি বলো মা! নিজের ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে শেষ পর্যন্ত। তোমার মাথা ঠিক আছে। খুব ঠিক আছে। না খালাম্মা, এটা ঠিক হবেনা। একটা বাইরের মেয়ের জন্যে নিজের ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিবেন। লোকে কি বলবে। দেখ আরসু ,আমার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে এ বাড়িতে তোমার জায়গা হবেনা। টীক আছে মা। তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নিলাম। ভাবছি এ মেয়েটা কিভাবে তোমার মাথা খারাপ করে দিলো।

দেখো বেটি। তুমি ওর কথায় কান দিওনা। তুমি আমার বেটি , কার কি বলার আছে। এখন টেবিলে খেতে আসো। আরসু ওকে নিয়ে আয়। আমি কেন আনবো। ওতো তোমার বেটি, এ বাড়ির মেয়ে। বসো বেটি। নিজের পছন্দ মতো খাবার তুলে নাও। খালাম্মা, আপনারা প্রতিদিন এ ধরনের খাবারই খান। হাঁ বেটি, এরকমই। আর কি রকম খাবো। আমরাতো পুরোপুরি বাংগালী । এক সময়ে পরিবারে উর্দু জবানে কথা হতো। সে অনেক কাল আগে। সিল সিলায় এখনও সামান্য কিছু ছাপ থাকতে পারে। আপনি কি কখনও গ্রামে ছিলেন। না বেটি। আমার জন্ম করাচীতে। আমার আব্বাজান পাকিস্তান চলে আসেন। আমার বিয়ে হয়েছে সত্তুর সালে। আমার শ্বশুর সাহেব পুরো অবাংগালী ছিলেন। তিনি জমিদার ছিলেন। পাকিস্তান এসে কিছু কলকারখানা করেছিলেন। আরসালানের বাবা আইসিএস ছিলেন। তিনি পাকিস্তানে চলে আসেন সত্তুর সালে। এখানে এসে সিএসপি হন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে পোষ্টিং পান। সত্তুরের শেষের দিকে ইস্ট পাকিস্তানে এসে ঢাকায় সচিবালয়ে পোষ্টিং নেন। সেই থেকে আমরা ঢাকায় থাকি। বাইরে কোথাও আর পোষ্টিং হয়নি। তাঁর পূর্বপুরুষ বাংগালী ছিলেন। এখান কোলকাতা চলে যান। কোলকাতায় আমাদের এখনও অনেক আত্মীয় স্বজন আছে। অনেকে পাকিস্তানে আছে। আরসালানের বাবা খুবই নরোম মানুষ ছিলেন। বাংলা ভাষার কবি সাহিত্যিকদের তাঁর খুব বন্ধুত্ব ছিল। এরা সবাই আমাদের বাসায় আড্ডা দিতো। কবিতার আসর হতো। গাণের আসর হতো। কবি আবুল হোসেন ও ওবায়েদউল্লাহ খান আসতেন। তোমাকে দেখাবো উপরে সাহেবের লাইব্রেরীটা কেমন। ওখানে কয়েক হাজার বই আছে। সাহেব খুব পড়ুয়া ছিলেন। খুব সুন্দর বাংলা বলতেন। এখন খুব একা হয়ে গেছি। সাহেব নাই আড্ডাও নেই। কোন আসর নেই। আশে পাশের লোকজনের সাথেও তেমন মেলামেশ নেই। আমার ছেলেও বাপের মতো মিশুক না। পাঠাগার ব্যবহার করে। কিন্তু গাণ বাজনা করেনা। ভার্সিটিতেও ওর তেমন বন্ধু নেই। সহজে কাউকে বন্ধু করতে পারেনা। কয়েক বছরের মধ্যে তুমিই প্রথম আমাদের বাসায় এলে। তাও আবার ডিবেটের কারণে। জানিনা ডিবেট শেষ হলে তুমি আর আসবে কিনা। আসবো খালাম্মা। যতদিন ঢাকায় আছি ততদিন আসবো। ঢাকায় এতো আদর আর কোথাও পাইনি। আমি কোনদিন আপনার কথা ভুলবোনা। আল্লাহ তোমার ভালো করবে।

এতো সব খাবার কেন করেছেন। কে খাবে। তুমি খাও। তারপরে ঘরের অন্য  লোকেরা খাবে। আরসু তুমি ওকে খাবার তুলে দাও। ও তোমার মেহমান। আজ ও তোমার মেহমান। তুমি খাবার তুলে দাও। আমিই দিচ্ছি। সাদা ভাত ডাল আর লাল শাক নাও।খেয়ে দেখো কেমন লাগে। আমার খুব প্রিয় খাদ্য। কয়েক রকম ভর্তা আছে। আচার আছে। কি ভর্তা খাও। খালাম্মা সব রকম ভর্তা খাই। তোমাদের বাসায় কি এসব ভর্তা হয়। জ্বী খালাম্মা, আমাদের নিত্য দিনের খাদ্য। মোগলাই বা ইরাণী খাবার মাঝে সাঝে রান্না হয়। গ্রামে মুরগী রান্না হলেও মনে করা হয় মেজবানী। আমাদের বাড়িতে তা নয়। আমরাতো মোটামুটি স্বচ্ছল। শিক্ষিত পরিবার। আমাদের ঘরে পোলাও কোরমা পায়েশ সপ্তাহে দুই তিন হয়। আমাদের পরিবেশ আপনাদের মতো অভিজাত নয়। তবে আমরা গ্রামের প্রভাবশালী পরিবার। দেখো মা আমি তেমন মনে করিনা। আমরা পাঁচ ছয় জেনারেশন শিক্ষিত। তাই একটু পরিচিতি আছে। তোমার ম্যানার্স এবং এটিক্যাট আমার খুব ভাল লাগে। খুব কম মেয়েকে আমি তোমার মতো দেখেছি। তুমি খুবই মেধাবী ও বিনয়ী। খোদা সবাইকে এমন গুণ দেন না। তোমাকে দিয়েছেন। তুমি খুবই ভাগ্যবতী। খোদা তোমাকে অনেক বড় করবেন। দেখো মা তুমি আয়েশাকে বেশী পেম্পার করছো। এটা মোটেই ঠিক করছোনা। ঈক আছে খালাম্মা স্যারের সামনে আমার অতো প্রশংসা করবেন না। স্যারের হয়ত হিংসে হয়। ছাত্রীকে কেউ কি হিংসা করে। কি বলেন খালাম্মা। একদম ঠিক বলেছো বেটি। বেটা আরসু তুমি মনে করনা আমার বেটি খুবই গুণবতী। খালাম্মা আর বলবেন না । স্যার গোস্বা করলে আমার ক্ষতি হতে পারে। খবরদার আরসুু  অমন কাজ কখনই করবেনা। সব সময় মনে রাখবে আয়েশা আমার মেয়ে।

খালাম্মা, আমি আর খেতে পারবোনা। ঠিক আছে বেটি চলো যাই আমরা উপরে যাই। আমাদের লাইব্রেরীটা দেখবে। বেশ বড় ফ্যামিলি লাইব্রেরী। মা আয়েশা, আমার বেটা আরসু কেমন মানুষ। স্যার খুব ভালো মানুষ। আমাদের ডিপার্টমেন্টের সবাই স্যারকে খুব পছন্দ করে। আমার ভাগ্য যে স্যার আমার গাইড। তিনি চান আমি যেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হই। স্যারের বিশ্বাস আমি ওয়ার্লড চ্যাম্পিয়ন হতে পারবো। ভিসি স্যারও বিশ্বাস করেন। যদি চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাও তাহলেতো বিদেশের স্কলারশীপ পেয়ে যাবে হায়ার স্টাডিজের জন্যে। তখন কি করবে? যাবো। সুখবর। আরসালানও তা চায়। তুমি বিদেশে পড়ালেখা করে পিএইচ ডি করো। আমার ইচ্ছা ল’তে পিএইচডি করি। বিদেশের ভার্সিটিতে যেন পড়াতে পারি। প্রয়োজনে ল’ প্র্যাকটিস করতে পারি।

 

শকুন

বাঁচতে হলে মরতে হবে
মরার মাঝেই অমর হবে
বাঁচার চেয়ে মরা ভালো
আঁধার চিরে আসবে আলো।
বাঁচতে হলে মরতে হবে
এখন তুমি কোথায় যাবে
ভয় করলেই ভয়ে খাবে।
দেশটা তোমার খাচ্ছে শকুন
তাড়াও শকুন জ্বালাও আগুন
বাঁচতে হলে মরতে হবে

  • দিনপন্জী

    • ডিসেম্বর 2017
      সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
      « নভে.   জানু. »
       123
      45678910
      11121314151617
      18192021222324
      25262728293031
  • খোঁজ করুন