১৬ ডিসেম্বরের পর

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জেনারেল নিয়াজীর নেতৃত্বে হিন্দুস্তানের ইস্টার্ণ কমান্ডের জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পন করেন বিকেল চারটায় রমনার ময়দানে। সারেন্ডারের দলিল জাতিসংঘে তৈরি হয়েছে। দিল্লী আর ইসলামাবাদ জানে দলিলে কি আছে। শুধু জানতোনা জেনারেল নিয়াজী। ইতোমধ্যেই দলিলটি দিল্লী কোলকাতা হয়ে ঢাকা এসে পৌছেছে কন্টিনেন্টালের রেডক্রসের কাছে।পাকিস্তান সরকার জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক চাপে সারেন্ডার করতে রাজী হয়। কিন্তু জেনারেল নিয়াজী এ বিষয়ে কিছুই জানতোনা এবং প্রথমে সারেন্ডার করতে রাজী হয়নি। পরে কেন্দ্রের চাপে সারেন্ডার করতে রাজী হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় পাঁচ হাজার বর্গমাইল এলাকা ভারত দখল করে নিয়েছিল বলে শুনেছি।

Advertisements

২৫শে মার্চের পর

২৫শে মার্চ রাত এগারটা পর্যন্ত আমি আর মানু মুন্সী হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের লবিতে ছিলাম। পরিবেশ ছিল খুবই থমথমে। গুজব রটেছে আলোচনা ভেংগে গেছে। ইয়াহিয়া পাকিস্তান ফিরে গেছেন। ভুট্টো তখনও কন্টিনেন্টালে। যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা আশা করে বসে আছি ভুট্টোর সাথে দেখা হবে। কিন্তু দেখা হয়নি। একজন বাংগালী গোয়েন্দা এসে আমাদের ঈশারায় বললো চলে যাওয়ার জন্যে। না হয় বিপদ হতে পারে। মানু মুন্সীর হোন্ডা করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় লোকজন নেই। দূর থেকে জয়বাংলা শ্লোগাণ শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই জনতা রাস্তায় বেরিক্যাড দিতে শুরু করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে অবজারভার হাউজের দিকে রওয়ানা দিলাম। অবজারভারে যখন পৌঁছি তখন  বারোটা ছুঁই ছুঁই।

সবাই জানতে চাইলো এত তাতে কোত্থেকে এলাম।  মিয়া ভাই মানে এহতেশাম হায়দার চৌধুরী জানতে চাইলেন কন্টিনেন্টালের অবস্থা কি? বললাম ওখানে বিদেশী আর গোয়েন্দা ছাড়া তেমন আর কেউ নেই। আশা ছিল ভুট্টোর সাথে দেখা হবে। কিছুক্ষণ পরেই তিনি ঢাকা ছেড়ে যাবেন।  বাংগালী গোয়েন্দা ভদ্রলোকের অনুরোধে হোটেল ছেড়ে চলে এলাম। এতক্ষণে কারফিউর খবর জানাজানি হয়ে গেছে। পরদিন মানে ২৬শে মার্চ কাগজ বের হবেনা। ২৬শে মার্চ হরতাল ঘোষণা করেছিলেন বংগবন্ধু। ইতোমধ্যে বংগবন্ধু জানতে পেরেছেন আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। আলোচনার সফলতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ও ভুট্টো। আমরা শুনেছি ছয় দফার চার দফা জেনারেল ইয়াহিয়া মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ভুট্টো সামরিক জান্তার সাথে  ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল। নিরররস্র জনগণের উপর হঠাত্ আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল ভুট্টোর। রাত বারোটার কিছুক্ষণ পরেই ট্যান্ক নিয়ে হাজির হলো সাঁজোয়া বাহিনী। সম্ভবত মানু মুন্সী ছাদের উপর থেকে ছবি তোলার চেস্টা করেছিল। ফলে অবজারভার হাউজের দিকে গুলি ছুড়লো সৈনিকরা। আমরা সবাই  টেবিলের নীচে ঢুকে পড়লাম। বোকামীর জন্যে মানু মুন্সীকে গালাগাল করতে শুরু করলেন। ২৫শে মার্চ থেকে ২৭শে মার্চ সকাল ৭টা পর্যন্ত আমরা অবজারভার হাউজেই আটকা ছিলাম। ৭টা থেকে ৯টা ফর্যন্ত দুই ঘন্টার জন্যে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তখন আমার বাসা ছিল শান্তি নগরে ,রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের উল্টো দিকে। বাসায় ছিলেন আমার স্ত্রী নাজিয়া আখতার ও বড় ছেলে নওশাদ। তারা খাটের নীচে লুকিয়ে ছিল।

  • দিনপন্জী

  • খোঁজ করুন