আমরা কি আবার পরাধীন হবো

আয়েশা তোমার কি মনে আছে
একাত্তুরের সেসব দিনের কথা
আমরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম
এখান থেকে ওখানে
একদিন ছাড়তেই হলো প্রিয় নগর ঢাকাকে।
পায়ে হেঁটে রিকশা চড়ে নৌকা করে
কিছুটা পথ ট্রেনে করে
আবার পায়ে হেঁটে
ঘন্টার পথ দিন লাগিয়ে
প্রিয় গ্রামে ফিরে যাওয়া
দুদন্ড শান্তির জন্যে
হয়ত সেখানে হানাদার পৌঁছাতে
সময় লাগবে।
না লাগেনি তেমন সময়
হুট করে একদিন গ্রামেও চলে এলো তারা
তোমাকে ফেলে এবার
আমি একাই বেরিয়ে গেলাম
নিরুদ্দেশের পথে
পালিয়ে বেড়ানো
হঠাত্‍ একদিন শুনি
আমার লাশ নাকি ভেসে উঠেছে
আমার বাল্যকালের সাথী
মাছরাঙা নদীর তীরে
আমি কিছুটা মজাই পেয়েছিলাম
তোমার কথা ভেবে
মজার ক্ষণটুকু নিমেষ উবে গেলো
কিভাবে তোমাকে জানাই
আমি বেঁচে আছি ভাল আছি
এভাবেই দিনগুলো কেটেছে
আমাদের সেসব দিনগুলো।
এখনতো দুই হাজার তেরো সাল
একাত্তুরের টগবগে যুবক আমি
এখন বুড়িয়ে গেছি
মনে হাজারো সাহস থাকলেও
শরীর বলে না না
এসব তোমার মানায়না
সংসার পাগল তুমি তখনও
কখনই আমার হাতছাড়া করতে চাওনি
আজতো আর কথাই নেই।
আজ আবার মন হু হু করে কাঁদছে
কেন সোনার বাংলা
পুড়ে ছারখার হচ্ছে
কারা আগুন দিচ্ছে ঘরে ঘরে
কারা আগুন দিচ্ছে হাটে মাঠে বন্দরে বন্দরে
কারা পুড়িয়ে মারছে
মায়ের বুকের সোনা মানিককে
বলো আয়েশা,
কেন আজ সোনার বাংলা
পুড়ে ছাই হচ্ছে
কে এখন হানাদার বাহিনী
আর কেইবা মুক্তিযোদ্ধা
মনে বড় আশা ছিল
আমার দেশটা
চীন মালয়েশিয়া সিংগাপুর হবে
সবাই মিলে গড়ে তুলবো
সোনার বাংলা
কিছুই হলোনা আয়েশা
কারা আমার সবুজ শ্যামল দেশটাকে
লালে লাল করে দিলো
একাত্তুরেইতো হানাদার পালিয়ে গেছে
তেরো সালে কোন হানাদার
ঢুকে পড়েছে
আমাদের শান্তির নীড়ে
একাত্তুরে শত্রুকে বেশ দেখতে পেয়েছি
তার আস্তানাও চিহ্নিত ছিল
এখনতো শুনি একাত্তুরের মিত্র
শত্রু হয়ে গেছে।
আসলে কি জানো আয়েশা
সে সব সময়েই শত্রু ছিল
তুমি আমি বুঝতে পারিনি
আমারতো যাবার সময় হলো
তোমারও তেমন
ছেলেদের বুঝিয়ে যাবো ভেবেছিলাম
তারা কি বুঝবে
তারাতে বাপদাদার ইতিহাস
জানতে চায়না
শুনতেও চায়না
তোমার আমার কষ্টের কথা
বাপদাদার কষ্টের কথা।
ভয় হয় ,ওরা বুঝি আবার
প্রজা হয়ে যাবে
পতাকা নামিয়ে নিয়ে
অদৃশ্য রাজার পেয়াদা হয়ে যাবে।

অলকাকে বাঁচতে দাও

সাদা বেন্ডজ আর প্লাস্টারে মোড়া
অলকা হাসপাতালের বেডে
শেষ নিশ্বাসটা ফেলার আগে
হয়ত দুই তিন মিনিট আগে
মাকে বলছে
কেমন করে এমন হলো মা
কিছুইতো মনে করতে পারছিনা
আমি আর বাবাতো এক সাথেই
বাসায় ফিরছিলাম
বাবাতো আমার পাশেই ছিলো
হাতে ছিল
আমার শীতের নতুন জামা
বাবার মুখে ছিল অনাবিল হাসি
একটু পরেই
আমরা বাসায় ফিরে যাবো
কি হয়েছিল মা
কেমন করে এমন হলো?
মা আয়েশার চোখে
সাগর সেঁচা অশ্রু
আমি কাঁদছো কেন মা
আমিতো বাসায় ফিরে যাবো
তোমার কথা মতো পড়ালেখা করবো
বড় হলে ডাক্তার হবো
বাবা কোথায় মা
বাবাতো আমার পাশেই ছিল
বাবা কি তাহলে বাসায় ফিরে গেছে
মা আয়েশা এবার
সাগরের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে
অলকার বুকে
সাগরের গর্জনের মতো
কান্নার ঢেউ ভেংগে পড়ে।
তুমি অমন করে কেঁদোনা মা
একটু পরেই আমরা বাসায় ফিরে যাবো
বাবাকে ডেকে নাও
আমরা বাসায় ফিরে যাবো
মাগো,তুমি আর কেঁদোনা
আমার কষ্ট হচ্ছে
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে
কেমন অন্ধকার নেমে আসছে
তোমার কান্না থামাও
আমাকে বুকে টেনে ধরো
ওই দেখো আগুন ধেয়ে আসছে
আমার দিকে
আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে
মা, বাঁচাও আমাকে
বাবাকে খবর দাও।
আয়েশা চিত্‍কার করে ডাক্তার ডাকে
ডাক্তার আসে
না,ততক্ষণে অলকাকে আগুন নিয়ে গেছে
হে আগুন
রাজনীতি থেকে সরে যাও
বাংলাদেশকে রক্ষা করো
আমাদের হাজারো অলকাকে।
( সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদকে নিবেদিত)

তোমরা মাথা তুলে দাঁড়াও

তোমরা স্বাধীন হয়ে গেলে একাত্তুরে
আর আমাদের মুক্ত করলেনা
প্রভুরই ইশারায় আমরা বহমান
হিমালয় থেকে সাগরে সাগরে
কত জনপদ কত শস্য শ্যামল
বিস্তীর্ণ মাঠ পেরিয়ে
আমরা বহমান
কালের পর কাল
বহুকাল ধরে
শুধু তোমাদেরই লাগি।
তোমরা স্বাধীন হয়ে গেলে
আর ভুলে গেছো আমাদের কথা
আমরা ছিলাম বলেই তোমরা
তোমরা রক্ষা পেয়েছো
নানা রূপে নানা রংয়ে
আমরাইতো রুখে দিয়েছি
তোমাদের শত্রুদের
আজ তোমরা স্বাধীন
আর আমরা এখন ক্ষত বিক্ষত
ছিন্ন বিচ্ছিন্ন শত বাধায়
এখানে সেখান আমাদের নিয়ে
কত খেলা হিমালয় থেকে ত্রিবেণী
কেউ বাঁধ দেয়
কেউ বুক চিরে ফালা ফালা করে।
জানি ,তোমাদের বলার মতো
কিছুই নেই এখন
আমার শত্রুরাইতো একাত্তুরে
তোমাদের বন্ধু ছিলো
তাই তোমরা এখন বোবা হয়ে আছো
তোমাদের মানুষ মারে মিনিটে মিনিটে
তোমাদের জমি দখল করে নেয়
পাকা ধানে মই দেয়
তবুও তোমরা কিছু বলতে পারোনা
তোমাদের ভাষা নেই
তোমাদের জবান খোলেনা।
আজ আবার তারা
তোমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ বাধে
আমাদের বুক রক্তে লাল
তোমরা কি দেখতে পাওনা
লাল জল রাশি
কেমন উথাল পাতাল

সাগর কেমন গর্জে উঠে
রক্তের জোয়ারে
সাগরের ভাষা
নদীর ভাষা
হিমালয়ের ভাষা
তোমরা কি বুঝতে পারো
তোমার কি শুনতে পাও
আমাদের আকুল আহবান
তোমরা ষোলয়ানা স্বাধীন হও
মাথা তুলে দাঁড়াও
জগতকে জানান দাও
তোমরা সত্যিই স্বাধিীন
আর আমাদেরও স্বাধীন করো
আমরা আবার মুক্ত স্বাধীন
অবারিত বয়ে যাবো
প্রাণ প্রিয় সাগরের পানে
আর গাইবো প্রাণ ভরে
প্রভুর গুণগাণ