আমার পরিচয় হবে আখেরাতে

আমার পরিচয় হবে আখেরাতে / এরশাদ মজুমদার

আমাকে দেখে কি চিনতে পারছো?
না পারছো না
চিনবে কেমন করে
আমিতো আর আমার মতো নেই
তাই তোমরা বুঝতে পারছোনা
আমি বরগুণার বজলের মেয়ে।

ঢলে জলে ঘুর্ণিতে
আমার মা বাবা আজ নি:স্ব
জমি নেই জিরাত নেই
হাঁস নেই মুরগী নেই
একটি ছাগল ছিলো
সেটাও আজ নেই
গতর খাইটাও
বাজান মাজান এক লোকমা খাবার পায়না।
সবাই বুঝিয়ে বললো
গাঁও গেরামে উপাস কাপাস দিয়ে কতদিন থাকবি বল
চইলা যা শহরে
দুমুঠো ভাত পাবি
চইলা যা শহরে
নিজেরে বাঁচাবি।
হুজুর বললেন, সবি পাবি
কিন্তু হারাবি ইজ্জত
বুঝলি বজলের মাঁইয়া
হ ঠিকই কইছেন চাচাজান
ভুখা মানুষের কি ইজ্জত হয় চাচা
আমরাতো শুধু মানুষ নই
ভুখা মানুষ
কোথাও ইজ্জত নেই
গাঁও বলেন আর শহর বলেন
এইতো সেদিন এসেছি ঢাকায়
কাজ নিয়েছি রাণা প্লাজায়
আজ তাই আমার কোন পরিচয় নেই
না আমি মানুষ
না আমি নারী
না আমি পুরুষ
সব পরিচয় মিশে গেছে
সব ইজ্জত মিশে গিয়ে ধুলোবালিতে
পড়ে আছে
না দাফন
না জানাজা
আখেরাতেই হবে আমার পরিচয়
এখন আমার কেউ নেই
একমাত্র খোদা ছাড়া।

হয়ত খোদাও চান নিপাত যাক সর্বহারা

বড় ভালবাসে করিম নিকাহ করেছিল শরিফাকে
এইতো সেদিন
এখনও মাস পেরোয়নি
একদিন সবই ছিল করিমদের
রাক্ষুসী মেঘনা লুটে নিয়েছে সবকিছু
জমি জিরাত,ঘরবাড়ি হালের বলদ হাস মুরগী
গর্কিতে মা বাপ দুজনই হারিয়ে গেছে
পাগলা ক্ষ্যাপাটে মেঘনায়
সেই থেকে করিম নি:স্ব সর্বহারা
গতর খেটেই চলছিলো দু মুঠো।
পাশের বাড়িতেই ছিল শরীফা
চোখে চোখ পড়লেই
ফিক করে হেসে দেয় শরীফা
কী করিম ভাই ,ঘরে বউ আনবানা
ধুর্ পাগলি,ঘর নাই দোর নাই চুলা নাই
কে দিবে কন্যা
এমন মদ্দরে
মনেরে জিগাও করিম ভাই
পাইবা উত্তর
আমি সহজ মানুষ
তর প্যাচের কথা বুঝিনা
চেখে চোখ রেখেই
করিমের দিন কাটে
সারারাত ভাবে কেমন করে পাবে সে শরীফারে
না,কোন আশা নাই
নিরাশার মাঝেই একদিন
বউ সাইজা ঘরে আসে শরীফা
এইতো সেদিনের কথা
এখনও মাস পেরোয়নি
করিম কান্দে এখন
কান্দে সারাদিন
বউরে,বউ আমার
কোথায় গেলি তুই
সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকে করিম
হাজার মানুষের ভীড়ে
আজরাইলের কারখানা
টুকরো রানা প্লাজার মাঠে
কেন এমন করলিরে বউ
তোর হাতের মেহেদী এখনও লেগে আছে
আমারও হাতে
ময়না পাখি আমার
দুবেলা না খেলেও তুইতো ছিলি
আমার বুকে
কেন তুই গেলি আজরাইলের কারখানার
কামের খোঁজে
হায়রে বুকের মানিক
যদি আমিও যেতাম রাণা প্লাজায়
কতনা ভাল হতো
এমন হতভাগা সর্বহারার কি কাজ জগতে বল
হয়ত খোদাও চান
এমনি করেই নিপাত যাক জগতের সকল সর্বহারা।

জালেমের পতন হবেই হবে

জালেমের পতন হবেই হবে / এরশাদ মজুমদার

যে জালেমের পতন হয়েছে হাজার বছর আগে
লোহিত সাগরে
সে জালেমের অনুসারী অনুগতরা এখনও খাবলে খাচ্ছে
খোদার দুনিয়া
এখনও মজলুমের ক্রন্দনে কম্পিত হয়
আরশিল আজীম খোদার আরশ
এখনও বাতাস ভারী হয় নির্যাতিতের আহাজারিতে
এখানে এই বাংলায়
আমাদের নেই কোন লোহিত সাগর
আছে শুধু পদ্মা মেঘনা যমুনা
আর ছোট্ট এক উপসাগর
কোথায় ডুববে বাংলার জালেমের
সকল অত্যাচার
হে খোদা,তুমি কি শুনতে পাচ্ছো গগণ বিদারী মাতমেরর সুর
এই গুণাহগার মজলুমের
আর কত নির্যাতিত হলে
তুমি শুনবে আমাদের ফরিয়াদ
আমরা তওবা করছি আমাদের ব্যর্থতার জন্যে
নমরুদ সাদ্দাদ আর ফেরাউনের ভয়ে
আমরা প্রতিবাদ করতে পারিনি
পারিনি বিপ্লব বিদ্রোহের শানিত অস্ত্র হাতে তুলে নিতে
পারিনি চলতে তোমার দেখানো পথে
তাই বলে নিওনা অপরাধ
দিওনা শাস্তি এই তস্য গোলামেরে
তুমি ছাড়া আমাদের আর কে আছে বলো
কোথায় যাবো তেমার দুয়ার ফেলে
দুহাতে টেনে তোলো
বাংলার নির্যাতির এই জাতিকে
আমরা আজ দিকহারা সর্বহারা
তোমার ওয়াদা পূর্ণ করো প্রভু
জালেমকে ডুবিয়ে মারো
আমাদের এই ছোট সাগরে
জগতবাসী আবার দেখুক
কেমন করে পতন হয়
মহাবিক্রমশালী জালেমের
খোদার ফুত্‍কারে।

বলেছিলে তুমি ফিরে আসবে

  1. সুফিয়া,সকালে বলেছিলে তুমি দুপুর হলেই
  2. ফিরে আসবে ঘরে
  3. দুপুর পেরিয়ে এখন বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে
  4. সুফিয়া, কি হলো তোমার
  5. আমিতো তোমার অপেক্ষায় আছি
  6. আর অপেক্ষা করছে
  7. তোমার তিন মাসের আমেনা
  8. বুকের দুধ খাবে বলে
  9. তুমিইতো বলেছিলে দুপুরে এসেই তুমি
  10. ওর তৃষ্ণার্ত শুকনো ঠোঁটে
  11. দুধে ভরা বোঁটা তুলে দিবে
  12. আমি বার বার ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছি
  13. সে যেনো চোখ দুটোকে
  14. দরজার দিকে ঠাই করেছে
  15. আমিও ছিলাম চেয়ে তোমার পথের পানে
  16. তুমি আসলেই
  17. বের হবো আমি রিকসা নিয়ে।
  18. দুজনে মিলেইতো গড়েছি ভালবাসার সংসার
  19. দুজনে মিলেইতো সুখ আনন্দের নিশানা
  20. আমেনাকে ডেকে এনেছি।
  21. কি হলো সুফিয়া
  22. এতো দেরী কেন
  23. কোথায় তুমি
  24. আমেনার কথা ভেবে আর করোনা দেরি
  25. এক্ষুনি আসো
  26. রানা প্লাজা থেকে ক’মিনিটের পথ
  27. পা চালিয়ে হাটো
  28. আসো সুফিয়া,এক্ষুনি আসো
  29. অত খাটুনির কিবা প্রয়োজন
  30. আমি খাটবো আরও বেশী করে
  31. তুমি আমাদের সোনা মানিক আমেনাকে
  32. দেখো রাতদিন
  33. ওর মুখ দেখে দেখে
  34. কাটবে আমাদের দিন
  35. সকাল ও সন্ধ্যা
  36. সুফিয়া ,আর দেরি করোনা
  37. তুমি আর ওভারটাইম করোনা

 

আমার ক্যানসারের নাম ছিল দারিদ্র

তোমাদের সাথে আমার আর দেখা হবেনা
এটাই ছিল আমার ভাগ্যে
এমন যাওয়া
যাবার বেলা কারো সাথেই হবেনা দেখা
না হাসপাতাল , না ডাক্তার,না কোন অষুধ পথ্য
না ঘর ,না সংসার
না পুত্র কন্যা
না আমার প্রিয়তম স্বামী
না বাবা মা, ভাই বোন
হয়ত এটাই ছিল আমার ভাগ্যে
এমনি করেই আমি চলে যাবো
আমার যত প্রিয়তম,সবাইকে বলছি
তোমরা দেখো
আমার অনি আর মুমুকে।
আকাশে তারারা জেগে উঠলেই বলো
ওই দূরের তারাটাই আমি
আমি জুলেখা
তুমি আদর করে ডাকতে লেখা
লেখাপড়া তেমন শিখিনি
তবুও তুমি আমার নাম দিয়েছিলে লেখা
আমার অনি আর মুমুকে দিও
লেখা আর পড়া
হাতে দিও কাগজ কলম কালি
আকাশের দিকে তাকিয়ে বলো
তোমাদের মা
তোমাদের দেখছে
আমি তারার মতো মিটমিট করে হাসবো
প্রিয়তম তুমি
আর দাঁড়িয়ে থেকোনা রানা প্লাজার কাছে
ঘরে ফিরে যাও
ফিরে যাও অনি আর মুমুর কাছে
ওয়াদা করো
ওদের তুমি কখনও কোনদিন
কোন পোষাক কারখানায় পাঠাবেনা
হে প্রিয়তম আমার,ওয়াদা করো
ওদের তুমি
মানুষের মতো মানুষ করবে
একদিন ওরা বড় হবে
বলবে আমার কথা
আমার গল্পের কথা
কেমন করে আমি নাই হয়ে গিয়েছিলাম
আমার কোন অসুখ ছিলনা
আমি সুস্থই ছিলাম
আমার একটি ক্যানসার ছিল
ক্যানসারের নাম ছিল দারিদ্র
আর রোগটি আমি উপহার পেয়েছিলাম
আমার দেশ
আমার রাস্ট্র বাংলাদেশ থেকে।

তুমিই আমার প্রথম সাক্ষী

তুমিই আমার প্রথম সাক্ষী

বেলালকে তুমি সবার আগেই জান্নতে পাঠিয়েছো
আমি জানি তুমি মজলুমকে ভালবাসো
মজলুমের আহাজারি আর কান্নায় তোমার আরশ কাঁপে
আমার আহাজারি শোনো,হে খোদা
আমিতো এখন অনন্ত পথের যাত্রী।
এখানে এখন শুধু অন্ধকার
জানিনা কবরে মৃতের অন্ধকার কেমন
আমিতো এখনও মরিনি
নিশ্চিত মৃত্যুর পথের যাত্রী
শুধু তুমিই এখন আমার সহায়
যেমন ইচ্ছা তোমার তেমনি হবে।
শোনো প্রভু আমার আর্তনাদ
বেলালের মতো আমিও এক সর্বহারা
আমিও একজন মজলুম,নির্যাতিত,অপমানিত
তোমার এ জগতে এসে আমিতো কিছুই পাইনি
তুমিই তার প্রধান সাক্ষী
আর সাক্ষী তোমার কাতেবীন
জগত সাক্ষী, সাক্ষী জগতের আকাশ বাতাস
তোমার পরমপ্রিয় এ জগতে
আমিতো ছিলাম জালেমের হাতের পুতুল
যেমন ছিল মিশরবাসীরা ফেরাউনের হাতে
তবুওতো আমি সকাল বিকাল নিয়েছি তোমার নাম
বলেছি শোকর হে খাদা
শোকর তোমার রহমত ও নেয়ামতের
আমিতো জানিনা খোদা তোমার কুদরত ও অপার মহিমা
আমি এক অতি সাধারন আদম সন্তান
মিসকীন মা আর বাবা
আদর করে নাম রেখেছিলো
জান্নাতবাসী শ্রেষ্ঠ রমনী মরিয়মের নামে নাম
তোমার সেই মরিয়মের নামের গুণেই আমাকে ক্ষমা করো
তোমার ক্ষমাকে বাধ্যতামুলক করো
এই মজলুমের জন্যে
এ জগতের নমরুদ আর তার চেলাদের কাছে
আমি শুধু অপমান পেয়েছি
আজ আশা শুধু মহা সম্মানের তোমার কাছে
প্রভু তুমি শুধু চোখের জল ফেলোনা
হাত বাড়িয়ে আমায় আমায় টেনে তুলে নাও
আমিতো পড়ে আছি জালেমের দোসর রানা প্লাজায়
তোমার কুদরতী হাত বুলিয়ে দাও
এই রূহের ভিতর
তোমার হাতদুটো আরেকটু লম্বা করো
আমার হাততো নিয়ে গেছে জালেমের হাত
হাত বাড়াবার মতো হাত নেই আমার
ক্ষমা করে দাও প্রভু গোলামের এমন অনুরোধে।

Options
Ershad Mazumder
সাভার ট্রেজেডী নিয়ে কবিতা লিখুন। কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হবে।
Like · · Unfollow Post · Share · 8 hours ago
Nazma Begum likes this.
Write a comment…
Options
Mosharraf Khokon
বাংলাদেশের লাশ

আহা মানুশ, মানুশের পর মানুশ
আহা শবুজ, শবুজের পর শবুজ

  • Calendar

    • April 2013
      M T W T F S S
      « Feb   May »
      1234567
      891011121314
      15161718192021
      22232425262728
      2930  
  • Search