স্মৃতিকথা

মুক্তিযুদ্ধ ২

৩০শে মার্চ  সদরঘাট  থেকে লঞ্চে আমরা ঢাকা ছাড়লাম। ভাল করে মনে নেই। মনে হচ্ছে পরদিন সকালের দিকে আমরা চাঁদপুরের মতলব গিয়ে পৌঁছালাম। হাটার পথে রণিকে জয়নাল বা পান্না কোলে নিয়েছে। মতলবের একজন বিখ্যাত মানুষের বাড়িতে আমরা আশ্রয় পেয়েছিলাম। মেজবানের নামটা এখন এই মূহুর্তে মনে পড়ছেনা। খুব খারাপ লাগছে। রাতে আমরা সেই বাড়িতে ছিলাম। সকালে নাশতা করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। রিকশা করে চাঁদপুর স্টেশনের দিকে গেলাম।যদি ট্রেন পাওয়া যায়। ভাগ্য ভাল ট্রেন পাওয়া গিয়েছিল। ওই ট্রেনে লাকসাম পৌঁছালাম। ওখানে গিয়ে আবার সবকিছু অনিশ্চিত পড়লো। ট্রেন ছাড়বে কি ছাড়বেনা তা কেউ বলতে পারছেনা। প্রায় সন্ধ্যার দিকে জানা গেল একটা ট্রেন ফেণী পর্যন্ত যাবে। সেই ট্রেনেই আমরা রওয়ানা দিলাম। ৩১ শে মার্চ আমরা ফেণী পৌঁছালাম। সকালে না বিকালে এখন ঠিক মনে নেই। সারা শহরে মানুষের ভিতর আতংক। খাজা সাহেব তখনও ফেণীতে। তারিখ মনে নেই। যতদূর মনে ৩রা এপ্রিল ফেণিতে পাক বাহিনী শেলিং করে। ওর পরেই মানুষ দলে দলে শহর ছাড়তে শুরু করে। আমরা সবাই আলাদা হয়ে গেলাম। চাচীআম্মা ও আমার বোনেরা সবাই পাঠান নগর চলে গেল। আমি শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও অন্যান্যদের নিয়ে প্রথমে রামপুর নানার বাড়ী গেলাম। নানার বাড়ি শহরের কাছে হওয়ায় আমরা দক্ষিণে মেজো খালার বাড়ী গেলাম। সেখানে এক রাত কাটাবার পর সকালবেলা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম কে কোথায় যাবো।

আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ী ও তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যরা আহমদ পুর চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা মানে আমি ইসহাক রণি ও আমার স্ত্রী কুঠিরর হাট বিষ্ণুপুর হাই স্কুলে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।বিষ্ণুপুর থাকার সময় কিছু যুবককে সাথে নিয়ে আমি নিয়মিত একটি হাতে লেখা বুলেটিন প্রকাশ করতাম।বিবিসি শুনে আমরা আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় কার্বণ কপি করে ওই বুলেটিন বিলি করতাম। ওই বুলেটিন আশে পাশের হাট বাজারে বিলি হতো। বেশ কিছুদিন থাকার পর খবর পেলাম ফেণীতে পাক বাহিনী ঢুকে পড়েছে। যেকোন সময়ে কুঠির হাট চলে আসতে পারে। কুঠিরহাট ছেড়ে দিয়ে আমরা আহমদপুর গেলাম। আরও অনেক পরিবার সে বাড়িতে ছিল। থাকার অসুবিধা থাকলেও খাওয়ার অসুবিধা ছিলনা। বেশ ভালই দিন কাটছিলো। হঠাত্‍ একদিন আমার চাচা শ্বশুর ও স্থানীয় নেতা বেলায়েত সাহেব জানালেন জামাইকে এখানে বেশীদিন রাখা যাবেনা। বাজারে নানা কানাঘুষা হচ্ছে। যেকোন সময় যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে।

সম্ভবত মে মাসের শুরুতে আমাকে আহমদ পুর ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হলো। আমার সাথী হলো আমার ছোট ভাই সালু। সব কথা এখন আর ভাল করে মনে নেই। যতদূর মনে পড়ছে, মুন্সীবাড়ি থেকে আমরা প্রথমে আমার খালতো বোন নুরজাহানের বাড়িতে গেলাম। নুরজাহানের স্মামী রাজ্জাক সাহেব খুবই ভাল মানুষ ছিলেন। সে বারিতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা আবার রওয়ানা দিলাম। বিকেলের দিকে কাতালিয়া ফকির হাটে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়েই মহা বিপদে পড়লাম। আমাদের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় আমাদের কাছে ডেকে নিলেন। আমরা আশা করেছিলাম তিনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। ভদ্রলোক পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিলেন। এক ধরণের গোঁড়া মানুষ। কিছু না বুঝেই, বিনা স্বার্থেই ওই কাজ করছিলেন। তিনি আমাদের ডেকে এক চা দোকানে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমাদের পরিচিত আরও অনেক লোক ছিলো। ওই লম্বা কোর্তা পরা ভদ্রলোক আমাদের ভারতের দালাল ও পাকিস্তানের শত্রু বলে গালাগাল করছিলেন। অন্যান্য আত্মীয়রা ওই ভদ্রলোককে অনুরোধ করলেন এই বিপদের সময় কোন ঝামেলা না করার জন্যে।

৬ দফার প্রেক্ষিত

ershadmz August 12th, 2009

১৯৬৬ সালে বংগবন্ধু শখ মুজিবুর রহমান অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্যে ৬ দফা পেশ করেন। ৬ দফা মুলত ছিল পাকিস্তানকে একটি কনফেডারেটিং রাস্ট্রে পরিণত করার প্রস্তাব ছিল। সেই ৬ দফা নিয়েই জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করেছেন ৭১ সালের ২৪শে মার্চ পর্যন্ত। বাংগালী পুঁজিপতি ও বাংগালী আমলারা ৬ দফা প্রস্তাব তৈরী করেছিলেন। একথা সত্যি যে পাকিস্তানের সর্বযক্ষেত্রে বাংগালীরা পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানীরা বিষয়টি বুঝতে চেস্টা করেনি। অথবা এ ব্যাপারে আদৌ তাদের আগ্রহ ছিলনা। ৬ দফার কারণেই আওয়ামী লীগ ৭০ সালের নির্বাচনে বাংগালীদের একক দলে পরিণত হয়। ওই নির্বাচনে জামাত ছাড়া অন্যান্য দল আংশ গ্রহণ করেনি। মাওলানা ভাসানী নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন। মাওলানা সাহেবের ন্যাপ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে কম পক্ষে ২০ টা সিট পেতেন।

২৫শে মার্চের আগে

ershadmz August 9th, 2009

পাকিস্তানের সামরিক সরকার যদি ২৫শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের উপর আক্রমন না চালাতো তাহলে আজ ইতিহাস অন্যভাবে লিখা হতো। জেনারেল ইয়াহিয়া ছিলেন পাকিস্তানের সবচে বড় মাতাল সামরিক শাসক। তাকে উসকে দিয়েছে জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচন অনুযায়ী জুলফি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ছিলেন সারা পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা। সে হিসাবে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হওয়ার কথা শেখ সাহেবের। ইয়াহিয়া শেখ সাহেবকে প্রধান মন্ত্রী হিসাবে সম্বোধনও করেছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলেন জুলফি। তিনি বললেন একদেশ দুই প্রধান মন্ত্রী। জুলফির এই বক্তব্যের মাধ্যমেই পাকিস্তান ভেংগে যাওয়ার ইংগিত পাওয়া গেছে। ভুট্টো কি চায় তাও স্পস্ট হয়ে গেলো। ইয়াহিয়া ঢাকায় আসলেন বংগবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে আলাপ করার জন্যে। ইয়াহিয়া যখন ঢাকায় আসেন তখন সারা পূর্ব পাকিস্তানে আগুন জ্বলছে। ১লা মার্চ থেকেই শখ সাহেবের ডাকে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। শেখ সাহেব প্রতিদিন নতুন নতুন ফরমান জারী করছিলেন। সেই ভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের সরকার চলছিল। ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লাখো মানুসের জনসভায় ঘোষনা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২০শে মার্চ থেকে শেখ সাহেবের সাথে ইয়াহিয়ার যে আলোচনা শুরু হয়েছিল তার ফলাফল কি তা দেশবাসী কখনই জানতে পারেনি। শেখ সাহেব নিজেও তা কখনও দেশবাসিকে জানানো প্রয়োজন মনে করেননি। ২৫শে মার্চের সামরিক অভিযানের আগেই শেখ সাহেব পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কাছে ধরা দেন। কাউকে কিছু না জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে চলে গেলেন।পাকিস্তানীদের মহাভুল ছিল তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোভাব বা সেন্টিমেন্ট বুঝতে পারেনি। ফলে সামরিক অভিযানকে এই অঞ্চলের মানুষ একেবারেই সমর্থন করেনি। সামরিক অভিযানের পর ভারতের ভূমিকা কি হতে পারে সামরিক জান্তা মোটেই আঁচ করতে পারেনি। প্রায় কোটি লোক ভারতে চলে গিয়েছিল। ভারতের বিশ্বব্যাপী প্রচারের ফলে বিশ্ব জনমত ভারতের পক্ষে চলে গিয়েছিল। ১৬ই ডিসেম্বরের পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় পার্লামেন্টে বলেছিলেন,হাজার সালকা বদলা লিয়া। যারা ইতিহাস পড়েন বা এই উপমহাদেশর ইতিহাস জানেন তারা ইন্দিরা গান্ধীর ভাষনের সারমর্ম বুঝতে পেরেছেন। ওই ঐতিহাসিক ভাষনের মাধ্যমে মুসলমানদের ব্যাপারে ভারতের পররাস্ট্র নীতিরও প্রকাশ ঘটেছে। ভারতে মুসলমানদের প্রথম বিজয় ঘটেছে ৭১১ সালে মুহম্মদ বিন কাসেমের মাধ্যমে।

পরে হাজার সালের দিকে মুসলমানরা দিল্লীর ক্ষমতা লাভ করে। সেই শাসন ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত চলে। ১৮৫৮ সালে ইংরেজরা দিল্লীর ক্ষমতা দখল করে। এই দখলদারী ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলে। চতুর ধুর্ত ও শিয়াল প্রকৃতির ইংরেজরা ভারতীয় কংগ্রেসের সহযোগিতায় ভারতকে বিভক্ত করে দুটি দেশ গথণ করে। একটি মুসলমানদের জন্যে ও অপরটি হিন্দুদের জন্যে। মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দু টুকরা হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান শ্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তর হয়। এক হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন মুসলমান সেনাপতি হিন্দু সেনাপতির কাছে আত্মসমর্পন করে। ওই কারণেই ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন ‘হাজার সাল কা বদলা লিয়া’।

২।

এখন আবার ভারতের শাসকরা অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখছেন। তারা স্বপ্ন দেখছেন আফগানিস্তান থেকে কম্পুচিয়া পর্যন্ত প্রাচীন ভারতবর্ষ প্রতিস্ঠা করা যায় কিনা। এই উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিয়ে ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে মিডিয়ার ৮০ ভাগই ভারতের স্বার্থে কাজ করে। গুজব রয়েছে ভারত বাংলাদেশের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক জগতে মাসে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে। বেশীর ভাগ বুদ্ধিজীবী নিজেদের বাংলাদেশী মনে করেনা। ওদিকে ভারত শ্লোগান দিচ্ছে বিশ্ব বাংগালী এক হও। আবার সাবেক স্বাধীন সার্বভৌম বংগদেশ গঠণেও ভারতের আপত্তি আছে।

মুক্তিযুদ্ধ

ershadmz July 26th, 2009

৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে আমি অবজারভার ভবনে ছিলাম। তখন আমি পূর্বদেশের সিনিয়র রিপোর্টার। বিকেল বেলা বেরিয়েছিলাম মানু মুন্সির মটর সাইকেলে করে শহরের অবস্থা দেখার জন্যে। শহরের মুড ছিল খুবই মেঘলা। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড চলছে। হোটেল কন্টনেন্টালে গিয়েছিলাম অবস্থা বুঝার জন্যে। ওখানে গিয়ে শুনলাম জুলফিকার আলী ভুট্টো কিছুক্ষণ পরেই ঢাকা ছেড়ে যাবেন। তখন রাত এগারটা। হোটের লবিতে পরিচিত বাংগালী গোয়েন্দারা বললেন, এত রাতে এখানে কি করছেন? অবস্থা ভাল নয়। তাড়াতাড়ি চলে যান। হোটেল থেকে বেরিয়ে ইউনিভার্সিটির ভিতর দিয়ে আবদুল গণি রোড হয়ে অবজারভার ভবনে পৌঁছালাম। তখন সাড়ে এগার বা পৌনে বারটা বেজে গেছে। কারফিউ জারী হয়েছে সম্ভবত রাত বারটা থেকে।শেখ সাহেবের সাথে জেনারেল ইয়াহিয়ার আলোচনার কি হলো কেউ কিছু তা বুঝতে পারছেনা।  দিনের বেলায়ই মাহবুব ভাই বলেছিলেন, রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার জন্যে। মাহবুব ভাই বুঝতে পেরেছিলেন আলোচনা ভেংগে গেছে।

রাত বারোটার পর দৈনিক বাংলার( তখন দৈনিক পাকিস্তান) মোড়ে ট্যান্ক দেখা গেলো। যতদূর মনে পড়ে, ট্যানম্কের ছবি তোলার জন্যে মানু মুন্সী ক্যামেরা ক্লিক করেছিল। ফ্ল্যাসের আলো দেখেই সৈনিকরা অবজারভারকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে অবজারভারের জানালার কাঁচ ভেংগে পড়ে। সবাই ভয়ে এদিক ওদিক ছুটতে থাকে এবং টেবিলের নীচে মাথা লুকায়। মুসা সাহেব একচোট মানু মুন্সীকে গালিগালাজ করলেন। ওই তোলা ছবিই পরে টাইম ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল বলে শুনেছি। ২৫শে মার্চ থেকে ২৭শে মার্চ সকাল সাতটা পর্যন্ত কারফিউ জারী ছিল।আমরা অবজারভার অফিসেই আটকা ছিলাম। রাত হলে ছাদের উপর গিয়ে দেখতাম শহরের কোথায় কোথায় আগুন জ্বলছে। খবর পেলাম রাজারবাগে পুলিশ লাইনের আশে পাশে আগুন লেগেছে।

২৭ মার্চ সকালে কয়েক ঘন্টার জন্যে কারফিউ শিথিল করা হয়। আমরা সবাই অফিস থেকে বেরিয়ে নিজ নিজ বাসার দিকে রওনা দিলাম। আমি রিকসা না নিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম।মনে হলো দৌড়ালে রিকসার আগে বাসায় যেতে পারবো। বাসায় গিয়ে অনেক্ষণ দরজায় ধাক্কা দিলাম।অনেক্ষণ পর তোমার মা দরজা খুললো। তোমার মা মনে করেছিল আমি আর বেঁচে নেই।তাছাড়া আমার যা স্বভাব ছিল। আমার মনে হয়েছিল রাজারবাগের আগুনে আমাদের বাসাও পুড়ে গিয়েছে। তখন তোমার বয়স দুই বছরের মতো।রাজধানী কিছুটা নরমাল হলে দিনের বেলা কারফিউ বেশ কয়েক ঘন্টার জন্যে শিথিল করা হলো।

৩০শে মার্চ আমরা ঢাকা ছেড়ে ফেণীর জন্যে রওনা হলাম। আমাদের সাথে ছিলেন আবু জাফর পান্না ও জয়নাল কাকা। কিভাবে কেমন করে ফেণী পৌঁছাবো তার কিছুই ঠিক ছিলনা। ঢাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ পায়ে হেটে রিকসা করে গ্রামের দিকে ছুটে চলেছে। সবার মনে ভয়।পথে আর্মি থামায় কিনা। ধরে নিয়ে যায় কিনা।

তোমাদের মা

ershadmz July 11th, 2009

নাজিয়া আখতার। বাবার নাম শামসুল হুদা। মায়ের নাম খায়ের উন নেসা। দুজনই এখন আর জগতে নেই। দুজনেরই কবর সোনাগাজীর আমিরুদ্দিন মুন্সী বাড়ির কবরস্থানে। তোদের নানীর বাবার বাড়ি মাতুভুঁইয়া। আর নানার বাড়ি আমিরুদ্দিন মুন্সীবাড়ি। এই বাড়িটি ফেণী জেলার বিখ্যাত বাড়ি। তোমাদের মায়ের ফেণী শহরের বাড়ি মাস্টার পাড়ায়। যে বাড়িতে রণির জন্ম হয়েছে ১১ই সেপ্টেম্বর ভোর আজানের সময়।একজন পেশাদার নার্স এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তোমাদের মায়ের সাথে আমার বিয়ে হয় ১৯৬৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। সন্ধ্যা ৭টার সময় আমি বর সেজে একটি জীপে করে মাস্টারপাড়া যাই। তখন অঝোরে বৃস্টি হচ্ছিল। জীপটা ছিল ফেণীর প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য খায়েজ আহমদ সাহেবের।( খাজা আহমদ নয়)। তখন তিনি সবে বিএ পরীক্ষা দিয়েছেন। আমাদের বাসর রাত্রিটি তেমন আরাম দায়ক ছিলনা। আমাদের পুরাণো ঘরটার পেছনের বারান্দায় যে কামরাটি ছিল সেটি ছিল আমাদের বাসর ঘর। সে ঘরটি এখন আর নেই। বাংলা সন ১৩৪২ সালে বাবা এটি তৈরী করেছিলেন। ভিটি পাকা টিনের ঘরটি তখনকার দিনের আধুনিক ঘর ছিল। বাসর ঘরের কামরায় আমরা মাত্র একদিন ছিলাম। পরে বাইরের আলাদা ঘরে চলে এসেছিলাম। সাপ্তাহিক ফসলের প্রথম অফিস ছিল এখানেই।একটা ফোনও ছিল।নাম্বার ৯৯। যেখানে পরে তোমার মা পাকা ঘর তৈরী করেছিলেন। এটা এখন এল প্যাটার্ণের একটা বড় ঘর। আমি ফেণী থাকতেই তোমাদের মা কিছুদিন ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজে লেখাপড়া করেছিলেন। পরে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে চলে এসেছিলেন। আমিও ঢাকা চলে এসেছিলাম ৬৯ সালের শেষের দিকে। ফসল তখনও ফেণী থেকে প্রকাশিত হতো।আমি দৈনিক পুর্বদেশে সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে যোগ দেই। সেই থেকে ঢাকায় আছি। প্রথমে আমরা ছিলাম শান্তি নগরে তাজুল চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায়। উনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন।

আমার মা

ershadmz July 4th, 2009

আমার মায়ের নাম আশরাফ উন নেসা। মা ছিলো বাবার চেয়ে লম্বা ও ফর্সা। লেখাপড়া কিছু জানতেন বলে মনে হয়। মা আমাকে অন্ক করাতো। মনে আছে ক্লাশ ফোরে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় মা আমাকে অংক দেখিয়ে দিতো। পারিবারিক হিসাব নিকাশেও মা ছিলো খুবই পারদর্শী। সংসারের আয় কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে মা’র ভাবনার শেষ ছিলোনা। ৫১ সালে মা যখন দুনিয়া ছেড়ে চলে যায় তখন আমরা ভাইবোন ছিলাম ৫জন। সবার ছোট ছিলো মনি। ওর আসল নাম এখন আর মনে নেই। মা মারা যাওয়ার পর মনিকে আমরা কাতালিয়ার খালার বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। সেখানেই সে মারা যায় বছর খানেক পর। মা’র বাবার নাম কলিমুদ্দিন পাটোয়ারী। রামপুর পাটোয়ারী বাড়ি।নানা ছিলেন বেশ লম্বা। মামা খালারাও ছিলেন লম্বা। কিন্তু আমার নানী ছিলেন বেটে। নানীর ভাই সেকান্দর নানাও লম্বা ছিলেন। আমার দুই মামা ছিলেন। বড় মামার নাম মকবুল আহমদ ও ছোট মামার নাম আজিজুল হক। মা মারা যাওয়ার পর ছোট মামাই আমাদের খোঁজ খবর নিতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছোট মামা আমাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ছোট মামার ছেলে হারুন আমাদের খোঁজ খবর নেয়।

রাজনীতির হাতেখড়ি

ershadmz July 3rd, 2009

৫০ সালের দাংগার বেশ আগে আমি মাস্টারপাড়ার রবীন্দ্র পাঠাগারের সদস্য হয়েছিলাম। সেখানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আমির হোসেন কাকা। তিনি তখন মেট্রিক পরীশার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাঠাগারের পরিচালনায় ছিলে ফেণী কলেজ ও হাইস্কুলের বামপন্থী চিন্তাধারার শিক্ষকরা। ওই পাঠাগারেই আমি না বুঝেই বামপন্থী ধারার ছোটদের বই পড়তে শুরু করি। ওখানেই আমি পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকতে শিখি। হাজী মহসিনের ছবি এঁকে পুরস্কার পেয়েছিলাম। ৫১/৫২ সালের দিকে খাজা আহমদ সাহেব আমাকে ‘ছোটদের অর্থনীতি’ পড়তে দিয়েছিলেন। খাজা সাহেব তখন তাকিয়া বাড়ির একটা ঘরে থাকতেন। তখন তাঁর সংগ্রাম নামে একটা সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। তখনকার মুরুব্বীরা খাজা সাহেবের কাছে যাওয়া পছন্দ করতেন না।

৫৩/৫৪ সালের দিকে আমি ফেণী মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। ওই সালেই আমি বারিক মিয়া সাহেবের স্কুলে ধর্মঘট করানোর অভিযোগে গ্রেফতার হই। পরে আমার বাবা মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন।

১৯৫০ এর দাংগা

ershadmz July 3rd, 2009

১৯৫০ এ আমি ফেণী মডেল স্কুলে পড়ি। এর আগে স্কুলের কথা বলেছি। স্কুলটি বারিক মিয়া সাহেবের স্কুল বলে পরিচিত ছিল। এই দাংগায় আমাদের পাড়া উকিল পাড়ার বাসিন্দা হিন্দু উকিল ও শিক্ষকরা ভারতে চলে গিয়েছিলেন। আমাদের পড়া মোটামুটি খালি হয়ে গিয়েছিলো। আমদের পুকুরের পুব পাশের বাড়িটি ছিলো মহেশ উকিলের। দক্ষিণে ছিলো সতীশ মোক্তারের বাড়ি। উত্তরে ছিলো মাখন কাকাদের বাড়ি। মাখন কাকারা দাংগার পর উকিল পাড়া ছেড়ে ডাক্তার পাড়া চলে গিয়েছিলেন।

দাংগার সময় মাখন কাকারা সবাই আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শুনেছি দাংগায় অংশ নিয়েছিল রামপুর পাটোয়ারী বাড়ির লোকেরা। এর পেছনে নেতা ছিলেন প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা খাজা আহমদ সাহেব। কিন্তু দাংগার পর তিনিই প্রথম শান্তি কমিটি গঠণ করেন। দাংগার কারণে ফেণীর স্কুল কলেজ সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই দাংগায় ফেণীর বিখ্যাত উকিল গুরুদাস কর ও তাঁর ছেলে হরেন্দ্র কর মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের বাড়িঘরেও আগুন দেয়া হয়েছিল। ওই দাংগায় ফেণীর ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। এখন উকিল পাড়ায় কোন হিন্দু বাসিন্দা নেই। ওই দাংগার কারনেই ফেণী হাইস্কুলের হিন্দু শিক্ষকরা আস্তে আস্তে চলে গিয়েছিলেন।

পত্রিকা প্রতিস্ঠা

ershadmz July 1st, 2009

১।  সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম বেসরকারী কৃষি কাগজের আমিই প্রতিস্ঠাতা। পত্রিকার নাম ফসল। এটা প্রতিস্ঠা করি ১৯৬৫ সালের ১৭ই মার্চ। এর আগে আমি অবজারভার ও সংবাদে সাড়া চার বছর চাকুরী করি। ৭০ সাল পর্যন্ত ফসল ফেণী থেকে প্রকাশিত হয়। ৭২ সালে এটা ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ৭৫ সালে সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয় অন্যান্য সব কাগজের সাথে। আবার প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সহযোগিতায় ফসল সারা দেশ ছড়িয়ে পড়ে। পত্রিকাটি এখন দৈনিক। কিন্তু প্রকাশিত হয়না।

২। ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক রিপোর্টার প্রকাশ করি। এটি ছিল একটি নাগরিক কাগজ। ট্যাবলয়েড সাইজে আট পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হতো। সেই সময়ের খুবই পপুলার কাগজ ছিল সাপ্তাহিক রিপোরটার। এখন এ কাগজটিও বন্ধ।

৩। ১৯৮৪ সালে মুজিবুল হায়দার চৌধুরীর সহযোগিতায় ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলী নিউজ প্রকাশ করি। পত্রিকার এডিটর ছিলেন ওবায়দুল হক সাহেব। আমি ছিলাম ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ম্যানেজিং এডিটর। চৌধুরী সাহেব ছিলেন কোম্পানীর চেয়ারম্যান। কাগজটা বেশ কিছুদিন টিকে থাকলেও আমি মাত্র কয়েক মাস ছিলাম।

৪।১৯৯৬ সালে নিউনেশন ছেড়ে দিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাহাবুদ্দিন সাহেবের সহযোগিতায় দৈনিক রিপোর্টার প্রাকাশ করি। আমি ছিলাম সম্পাদক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর। এখানেও আমি বেশীদিন টিকতে পারিনি। কোম্পানী তিন মাস চালিয়ে কাগজটি বন্ধ করে দেয়। আমার ধারনা সাহাবুদ্দিন সাহেব এ কাজটি করেননি। আবুল হাসেম নামের তাঁর একজন কর্মচারী কাগজ দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন। এই আবুল হাসেমই কাগজ বন্ধের উসকানি দিয়েছিল। লোকটা যে ভাল নয় তা সাহাবুদ্দিন সাহেব বহুপরে জানতে পেরেছিলেন।

সংগঠণ

ershadmz June 30th, 2009

১।  সংগঠন করা আমার প্রিয় কাজ ছিল। বল্যকালেই আমি আমার এলাকা উকিল পাড়ায় পাঠাগার স্থাপন করি। নাম ছিল ‘শিল্প ও শ্যামলী’। আমিই পাঠাগারের প্রতিস্ঠাতা , আমিই প্রধান নির্বাহী। বন্ধুরা আমার চাপে পড়ে দুই একটা বই দিয়েছিল। পাঠাগারটি ছিল আমাদের কাচারী ঘরে। একটা ছোট আলমারি আর কিছু চেয়ার। এগুলো ঘর থেকে নিয়েছিলাম।পাঠাগারটি বেশীদিন চলেনি।

২।   ফেণী হাই স্কুলে গিয়ে দেয়াল পত্রিকা বের করার জন্যে স্যারদের উত্‍সাহিত করলাম। সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এলেন আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক রামপুরের আবদুস সাত্তার স্যার।আমাদের পত্রিকার নাম ছিল ‘আলো’। স্যার ছিলেন প্রকাশনা কমিটির সভাপতি। আমি ছিলাম সম্পাদক। পত্রিকাটি খুবই পপুলার ছিল।আমার বন্ধু কবি শামসুল ইসলাম ছিলো সহকারী সম্পাদক।

৩। এক সময়ের ফেণীর খ্যাতনামা সংগঠন সৃজনী সংসদের আমি ছিলাম প্রতিস্ঠাতা। এখন সংগঠণটি নেই। আমি ফেণী থাকলে এটা বন্ধ হতোনা। সৃজনী সংসদ ছিল ফেণীর শিক্ষিত মানুসের সংগঠণ। যারা ফেণী ক্লাবে যেতে চাইতোনা বা যেতে পারতোনা তাদের জন্যই ছিল সৃজনী সংসদ।

৪।    ফেণী প্রেসক্লাবেরও আমি প্রতিস্ঠাতা সম্পাদক ছিলাম। ফেণীর এসডিও আনিসুজ্জামান ও এসডিপিআরও রশীদ খানের আন্তরিক সহযোগিতায় এ ক্লাব প্রতিস্ঠিত হয়। ফেণীতে তখন বেশ কিছু সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। আমি ছিলাম সাপ্তাহিক ফসলের সম্পাদক। আমি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ও প্রতিস্ঠাতা সদস্য। এর মুল উদ্যোক্তা ছিলেন অবজারভারের ফজলুর রহমান, মর্ণিং নিউজের আবদুর রহমান, এপিপির নুরুল ইসলাম, ইত্তেফাকের মঈনুল আলম। তখন চট্টগ্রামের ডিসি ছিলেন কাজী জালাল ও এসপি ছিলেন খালেক সাহেব। আইউব খান ক্লাবের উদ্বোধন করেছিলেন।

৫। জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিদের সংগঠণ কবিতাপত্রেরও আমি প্রতিস্ঠাতা। এবার এই সংগঠনটি সাত বছরে পড়লো। ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক কবিতা পরিষদের পুরস্কার পাওয়ার পর দেশে ফিরে আমি এই প্রতিস্ঠান প্রতিস্ঠা করি। কবিতাপত্র এখন জাতীয় প্রেসক্লাবের কবিদের প্রাণ। প্রতি মাসের শেষ তারিখে ক্লাবে কবিতা পাঠের নিয়মিত আসর অনুস্ঠিত হয়। এই তারিখে কবিতাপত্র নামে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয়। এতে প্রায় ৩০টি কবিতা ছাপা হয়। প্রখ্যাত গীতিকার কেজি মোস্তফা কবিতাপত্রের সম্পাদক।

মন্তব্য দিন

কোন মন্তব্য নেই এখনও

Comments RSS TrackBack Identifier URI

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s