পিতা পুত্রীকে

তোমাকে আমি পেয়েছি সে খোদারই ইচ্ছা বা দয়া। এ এক বিস্ময় আমার জীবনে। আমি ভেবে পাইনা কেমন করে এমন হলো। আমাদের সম্পর্কে পুর্ণতা দেবার আশায় এ চিঠি লিখতে শুরু করলাম

Advertisements

শুনেছি

এক

তখন আমি কোলে ছিলাম। বয়স হয়ত ছমাস। বড় বাড়ি বড় উঠান। জেঠাত বোনের কোলে ছিলাম। ঊঠানে পিচ্ছিল  খেয়ে তিনি পড়ে গেলে আমার উরুর হাড় ভেংগে যায়। প্রথম ছেলে অনেকদিন পর। আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। আর আমি জন্মেছি ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে। বিলম্বে সন্তান হওয়ার কারণে আমার মাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। বাবা তখন রেংগুনে থাকতেন। ভাংগা পায়ের কারণে আমি অনেক বিলম্বে হেটেছি। আমার বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার কারণে আমি কিছুদিন আমার জেঠিআম্মার বুকের দুধ খেয়েছি। ইনি আমার জেঠা ফজলে আলী সাহেবের বিবি। আমার জেঠিআম্মা ছিলেন খুব মিষ্টি মানুষ।। আমার মা মারা যাওয়ার কারণে জেঠিআম্মা আমাদের অনেক আদর করতেন।

 

রক্তের নদী

মা এ নদীটা লাল কেন
নদীর জল কি মা কখনও লাল হয়
লাল নদী সাঁতরে আমরা কোথায় যাচ্ছি
কেন যাচ্ছি নিজেদের ঘর বাড়ি ছেড়ে।
যারা আগুন দিচ্ছে তারা কারা
কেন বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে
কেন সব কিছু ধ্বংস করছে
ওরা কি মানুষ নয় মা
ওদের তো দুই পা দুই চোখ
চেহারা আমাদের মতোই
দেশটা কি আমদের নয়
ওখানেইতো দাদা দাদীর কবর
মা আব্বাকে দেখছিনা কেন
আমাদের সাথেইতো ছিল
মা জুলেখা শুধু প্রাণ নিয়ে দৌড়ায়
আর বলে কথা বলিস না
শব্দ হলে বাঁচবিনা
তুই না থাকলে আমি শূণ্য হয়ে যাব
পুরো জগতটাই আমার
হাওয়া হয়ে যাবে
নদীটা লাল আমাদের রক্ত লাল
নদী মানুষের জন্য কেঁদে কেঁদে
লাল হয়ে গেছে।
ওই আকাশটা দেখ
লালে লাল মানুষের রক্ত মিশে
তোর বাপের রক্ত
তোর বোনের রক্ত
লাখো মানুষের রক্ত
কান্নার আওয়াজ শুনতে পাস বাপ
ওই শোন, নদী কাঁদছে আঁকাশ কাঁদছে
কাঁদছে বন জংগল পশু পাখি
প্রকৃতির কান্নায় কান্নায়
কাঁদছে পাখ পাখালি
কান্দেনা শুধু সুচির মন
কান্দেনা জেনারেল আর
জাতি সংঘের মন।
চল বাপজান হন হন করে চল
থামলে চলবোনা
এই জানটা সুচি রাক্ষসী খাবো
চল বাজান হন হন করে চল
কোথায় যামু মারক্তের নদী
বাপ জানি না
খোলা আছে আল্লাহ্ র দুনিয়া।

১৬ ডিসেম্বরের পর

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জেনারেল নিয়াজীর নেতৃত্বে হিন্দুস্তানের ইস্টার্ণ কমান্ডের জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পন করেন বিকেল চারটায় রমনার ময়দানে। সারেন্ডারের দলিল জাতিসংঘে তৈরি হয়েছে। দিল্লী আর ইসলামাবাদ জানে দলিলে কি আছে। শুধু জানতোনা জেনারেল নিয়াজী। ইতোমধ্যেই দলিলটি দিল্লী কোলকাতা হয়ে ঢাকা এসে পৌছেছে কন্টিনেন্টালের রেডক্রসের কাছে।পাকিস্তান সরকার জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক চাপে সারেন্ডার করতে রাজী হয়। কিন্তু জেনারেল নিয়াজী এ বিষয়ে কিছুই জানতোনা এবং প্রথমে সারেন্ডার করতে রাজী হয়নি। পরে কেন্দ্রের চাপে সারেন্ডার করতে রাজী হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় পাঁচ হাজার বর্গমাইল এলাকা ভারত দখল করে নিয়েছিল বলে শুনেছি।

২৫শে মার্চের পর

২৫শে মার্চ রাত এগারটা পর্যন্ত আমি আর মানু মুন্সী হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের লবিতে ছিলাম। পরিবেশ ছিল খুবই থমথমে। গুজব রটেছে আলোচনা ভেংগে গেছে। ইয়াহিয়া পাকিস্তান ফিরে গেছেন। ভুট্টো তখনও কন্টিনেন্টালে। যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা আশা করে বসে আছি ভুট্টোর সাথে দেখা হবে। কিন্তু দেখা হয়নি। একজন বাংগালী গোয়েন্দা এসে আমাদের ঈশারায় বললো চলে যাওয়ার জন্যে। না হয় বিপদ হতে পারে। মানু মুন্সীর হোন্ডা করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় লোকজন নেই। দূর থেকে জয়বাংলা শ্লোগাণ শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই জনতা রাস্তায় বেরিক্যাড দিতে শুরু করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে অবজারভার হাউজের দিকে রওয়ানা দিলাম। অবজারভারে যখন পৌঁছি তখন  বারোটা ছুঁই ছুঁই।

সবাই জানতে চাইলো এত তাতে কোত্থেকে এলাম।  মিয়া ভাই মানে এহতেশাম হায়দার চৌধুরী জানতে চাইলেন কন্টিনেন্টালের অবস্থা কি? বললাম ওখানে বিদেশী আর গোয়েন্দা ছাড়া তেমন আর কেউ নেই। আশা ছিল ভুট্টোর সাথে দেখা হবে। কিছুক্ষণ পরেই তিনি ঢাকা ছেড়ে যাবেন।  বাংগালী গোয়েন্দা ভদ্রলোকের অনুরোধে হোটেল ছেড়ে চলে এলাম। এতক্ষণে কারফিউর খবর জানাজানি হয়ে গেছে। পরদিন মানে ২৬শে মার্চ কাগজ বের হবেনা। ২৬শে মার্চ হরতাল ঘোষণা করেছিলেন বংগবন্ধু। ইতোমধ্যে বংগবন্ধু জানতে পেরেছেন আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। আলোচনার সফলতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ও ভুট্টো। আমরা শুনেছি ছয় দফার চার দফা জেনারেল ইয়াহিয়া মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ভুট্টো সামরিক জান্তার সাথে  ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল। নিরররস্র জনগণের উপর হঠাত্ আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল ভুট্টোর। রাত বারোটার কিছুক্ষণ পরেই ট্যান্ক নিয়ে হাজির হলো সাঁজোয়া বাহিনী। সম্ভবত মানু মুন্সী ছাদের উপর থেকে ছবি তোলার চেস্টা করেছিল। ফলে অবজারভার হাউজের দিকে গুলি ছুড়লো সৈনিকরা। আমরা সবাই  টেবিলের নীচে ঢুকে পড়লাম। বোকামীর জন্যে মানু মুন্সীকে গালাগাল করতে শুরু করলেন। ২৫শে মার্চ থেকে ২৭শে মার্চ সকাল ৭টা পর্যন্ত আমরা অবজারভার হাউজেই আটকা ছিলাম। ৭টা থেকে ৯টা ফর্যন্ত দুই ঘন্টার জন্যে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তখন আমার বাসা ছিল শান্তি নগরে ,রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের উল্টো দিকে। বাসায় ছিলেন আমার স্ত্রী নাজিয়া আখতার ও বড় ছেলে নওশাদ। তারা খাটের নীচে লুকিয়ে ছিল।

আমি কবরেই আছি

মাগো আমি কবরেই আছি

নিখোঁজ মনে করে আমায় কোথাও খুঁইজোনা

আমার খোঁজে তোমরা আর পেরেশান হয়োনা

এখানে এখন আমি নিরাপদ

কোথাও নেই রাজার পেয়াদা সাদা পোশাকে।

 

আমি ভাল আছি মা

কোথাও কোন ঝামেলা নেই

নেই কোন রাজার কোতোয়াল

 

আমি ভাল আছি, আছি নিরাপদ

আমি রোজার মাস

তোমরা ইফতার আর সেহরী করছো

শুনতে পাই বাসন কোসনের টুং টাং শব্দ

শুনতে পাই আজানের ধ্বনি

আর ক‘দিন পরেইতো তোমাদের ঈদ

আমি নেই বলে দু:খ করোনা

এই কবর খোদার মুলুক

 

এখানে খোদার কোতোয়ালেরা আমার খবর নেয়

এখানে আমি বেঁচে আছি

ভালভাবেই আছি বেঁচে।

 

 

Nothing is guaranteed

Nothing is guaranteed of our life

এ জীবনের কোন কিছুই নিশ্চিত নয়

মানুষ নিজেই জানেনা তার জীবনে কি ঘটতে পারে

কি ঘটতে যাচ্ছে। এমন সত্যটাও মানুষ ভাবতে পারেনা

হয়ত ভাবতে চায়না

মানুষ মনে করে সে যা ভাবছে তাই ঘটবে।

মানুষ মরবে সে জানে শতভাগ নিশ্চিত

তবুও মানুষের মনে থাকেনা তেমন সত্যের কথা।

কেন সে শতভাগ নিশ্চিত সে কথাও জানেনা

রাজা বাদশাহরা হয়ত জানেনা একদিন তারা থাকবেনা

জানলে হয়ত তাদের চলেনা

ফকির আর মিসকিনেরা ভাল করেই জানে তারা মরবে

না খেয়েই রাস্তার পাশেই মরে পড়ে থাকবে

রাজা মরবে যুদ্ধের ময়দানে

নয়ত মরবে অপঘাতে আততায়ীর হাতে

রাজার খেলা বন্দুক আর তলোয়ার নিয়ে

মিশকীন খেলা করে খালি থালা নিয়ে

তবুও রাজা ভাবেনা আগামী কাল কি হবে

এসব নাকি পারিষদরা ভাবে

Nothing is guaranteed of our life

We know it,but kings still do not know.

  • দিনপন্জী

    • নভেম্বর 2017
      সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
      « অক্টো.    
       12345
      6789101112
      13141516171819
      20212223242526
      27282930  
  • খোঁজ করুন