রূপকথা ২ (উপন্যাস)

হে কবিবন্ধু, বলোতে দেখি তুমি কেমন করে আমাকে নিয়ে এতো ভাবো। তুমিতো আমাকে কখনও দেখোনি। তুমি কি আমাকে দেখেছো। না দেখোনি। মানুষ আমিতো কখনই লিখিনা। তোমার কল্পনার কবিই লেখে। এর আগেও বলেছি আমি মানুষ রূপকে নিয়ে কখনও ভাবিনা। আমার অন্তরে বসে তুমি আমাকে কবিতা শিখাও। আমি কবিতা লিখি। এখন তুমি বলছো উপন্যাস লিখতে। লিখছি। কোন কাগজ কলম কালি লাগেনা। সবই মনের আয়নায় লিখিত থাকে। আর সেই আয়নার পাতায় আস্তে আস্তে পড়ি। রূপকথা মানে ফেয়ারী টেইলস পরীর গল্প।বাল্যকালে পরীর অনেক গল্প শুনেছি। স্বপ্নেও দেখেছি। এখনও সে সব গল্প মনে আছে। পরীরা খুব সুন্দরী হয়। যে সুন্দরী জগতে দেখা যায়না। পরী খুব স্বাধীন। তার দুটো পাখা আছে। যখন ইচ্ছা যে কোন জায়গায় যেতে পারে। তুমি আর আমি এক পলকে পুরো সৃষ্ট ঘুরে বেড়াতে পারি। কারণ আমি কবি। আর আমার সৃষ্টি রূপকথা পরীর গল্প। আমার ঘুরে বেড়াই মনের পাখায়। আমাদের প্রভু আমাদের সে ক্ষমতা দিয়েছেন। আমরা তার আনুকুল্য পেয়েছি।

তুমি বলতে মানুষ হলে কেমন হতো। এ শতাব্দীতে মানুষ মানে অকল্যাণের প্রতীক।  জগতের বাদশা এখন শয়তান। মানুষের পরাজয় হয়েছে অনেক আগে। সারা পৃথিবী এখন যুদ্ধবাজদের হাতে। প্রতিদিন এ গ্রহব্যাপী লাখ লাখ লোক মারা যাচ্ছে যুদ্ধে। লাখ লাখ লোক মানুষ খেতে পায়না, চিকিত্‍সা পায়না,চিকিত্‍সা পায়না। অথচ সবাই মিলে গাণ গায় ’ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। বিজয় দিবসে বলতে হয় আমরা বিজয় লাভ করেছি। স্বাধীন হয়েছি। মনে পড়ে একাত্তুরের ষোলই ডিসেম্বরের কথা। সেদিন ছিল সত্যিকারের বিজয় দিবস। কারণ আমরা যারা এদেশকে ভালবেসেছি জানতাম না এ বিজয়ের পিছনে কি আছে। এখন সব স্পষ্ট। এখন আমাদের কিছুই নাই। আছে শুধু পতাকা, জাতীয় সংগীত, তথাকথিত জাতিসংঘের সদস্যপদ। রাস্ট্র নামের এক মহাদানব। এমন এক রাষ্ট্র যে আপন মানুষকে খায়। যে মানুষের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্যে নানা রকম ও ধরণের বাহিনী রাখে। বিরাট তাবেদার বাহিনী রাখে। আর আমরা সীমানার বাইরে থেকে দেশের জয়গাণ করি। যাকে দেখা যায়না ,ধরা যায়না। রাষ্ট্র আর সরকার নাকি ঈশ্বরের মতো। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ঈশ্বর দয়ালু। তিনি সৃষ্টি করেন। আর মানুষ বা রাষ্ট্র তা ধ্বংস করে। আমি মানুষ ছিলাম,এখন কবি। যাকে দেখা যায়না। কবি হিসাবে কবি আর রাস্ট্র এক। কাউকে দেখা যায়না। কবি যদি মানুষ হয় তাহলে রাষ্ট্র খপ ধরে ফেলবে। কয়েদখানায় পুরে রাখবে। না হয় ন্যায়ের কথা বলে ন্যায়ের নামে ফাঁসী দিবে। কবির কোন বিজয় নাই। কবি চায় ঈশ্বরের বিজয়।  কবি চায় সত্যিকারের মানুষের বিজয়। আমিতো ঈশ্বরের কবি। আমির বিজয় হচ্ছে ঈশ্বরের সাথে মিলন। মানুয হিসাবে যখন জলে স্থলে বিচরণ করি তখন দেখি মানুষের পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নাই। হেমন্তপুরের সুফিয়ার সাথে দেখা হলো । জানতে চাইলাম, আজ কি দিবস।সে বললো জানিনা।  কেন ? শুনেছি, আমাদের মাতবরেরা আজ গাণ গাইবো, পতাকা উড়াইবো। আমরা গেলে দুই কেজি চাল পাই। এদিন দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেকথা জানো। জ্বীনা। শুনেছি মজিবর আমাদের রাজা। এবার বুঝো রুপ আমাদের বিজয় দিবস কেমন। আমি অন্তরে বিজয় দেখিনি। দেহে বিজয় আছে, যা দৃশ্যমান । যারা অন্যকে দমন করতে পারে তারা খুব আনন্দের সাথে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস,ভাষা দিবস পালন করে। আজও সারা দেশের মানুষ ভালো করে বাংলা লিখতে ও পড়তে পারেনা। দেশ দুনিয়া সম্পর্কে তাদের কোন ধারনা নেই। এর প্রথম এবং একমাত্র কারণ শিক্ষা। প্রায় সত্তুর বছর হতে চলেছে সব মানুষের ঘরে বিদ্যা পৌঁছেনি। সামান্য কিছু পড়ালেখা করার স্বামীর দাসত্ব করে। সমাজ ও রাস্ট্রের দাসত্ব করে। রাস্ট্র বা ধর্ম তাদের যে স্বাধীনতা দিয়েছে তাও তারা ভোগ করতে পারেনা। প্রায় পনেরশ বছর পরেও ইসলামের  বাণী কোথাও সঠিক ভাবে প্রকাশিত হয়নি। এমন কি ইংরাজী উচ্চ শিক্ষিত নাগরিকরাও  কোরআন কি তা জানেনা। নিজেরা ধর্ম একেবারেই জানেনা, বলে বেড়ায় সব দোষ মাওলানা সাহেবদের। কথায় কথায় মোল্লা বলে গালি দেন।

তুমিতো নিজের বাস্তবতা দেখছো আয়েশার মাধ্যমে। হুবহু বাস্তব তুমি। আয়েশা একদিন অনেক বড় হবে। তাই আমাকে বলছো তোমার মন মতো করে আয়েশাকে সাজিয়ে দিতে। কিন্তু জরিফা? সেতো মনের বিরুদ্ধে খলিলের সাথে আছে। যদিও জরিফা বলে তার স্বামী খুব ভালো। সেওতো তোমার আরেকটি রূপ। সংসার জীবনে বাংলাদেশের নব্বই ভাগ শিক্ষিত মেয়ের রূপ। এমএ পাশ করেও নিজের মত প্রকাশ করতে পারেনা। রাত হলে সংগম করো স্বামীর মন রক্ষার জন্যে। আর দিন হলে সংসারের সবার মন জুগিয়ে চলো। আমি যখনি বলেছি একটু স্বাধীন হও। জরিফা বলেছে তাহলে আমাকে সংসার ত্যাগ করতে হবে। এমন কি জরিফার মা বাপও তার পক্ষে নাই। হয়ত জরিফাও কালক্রমে কিছুটা স্বাধীন হবে তার স্বামী তার কথা শুনবে। যেমন আয়েশার খালা ফারজানা স্বামী কথা মেনেই সংসার করে। মেয়েদের  স্বাধীনতা হলো স্বামীর সংবিধান। স্বামী সাহেবদের গৌরব হলো শিক্ষিত স্ত্রী যখন কখনও সখনও কোন অনুষ্ঠানে যায়। মেয়েরাও পার্লার করে সেজেগুজে অনুষ্ঠানে যায়। এখনতো গ্রামে গঞ্জেও পার্লার চলে গেছে। তাই কবি ও রূপকথা একমত যে মেয়েদের শিক্ষিত হওয়া খুবই প্রয়োজন। আইন করতে হবে স্বামী স্ত্রী দুজনকেই সংসারের কাজ করতে হবে। দুজনকেই বাইরের কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে কোন ফতোয়া চলবেনা। মেয়েদের দমিয়ে রাখার জন্যে ইসলামে কখনও কোথাও বলা হয়নি। সনাতানী ধর্মগুলো মেয়েদের অধিকার সবই ছিনিয়ে নিয়েছে। তাদেরকে অর্ধ মানবে পরিণত করেছে। ইসলাম এ ব্যাপারে জগতে বিপ্লব নিয়ে এসেছে। কিন্তু সমাজ ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মেয়েদের দমিয়ে রেখেছে। ইসলাম বলেছে বিদ্যা অর্জন নারী পুরুষের জন্যে ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু সমাজ মানেনা। গ্রামে চলে পুরুষের তালাক ও অত্যাচার। বড় বড় শহর গুলোতে চলে শিক্ষিত মেয়েদের তালাক ও অত্যাচার। রাস্ট্রে চলে ক্ষমতাবানদের অত্যাচার।

দেখো রূপ, কোন কিছু লিখতে বা বলতে গেলে সমাজ দেশ ও রাস্ট্রের চিত্র সামনে আসবেই। আমি কবি আমি রুমীর ভক্ত খোদার কবি। কবিরা হয় সত্য ও ন্যায়ের প্রকাশ। যেখানে অত্যাচার অনাচার সেখানেই কবির উপস্থিতি। আমি কবি বলেই তোমার অনুসারী হয়েছি। খোদা বলেছেন,যাদের অন্তর চক্ষু নাই তারা মানুষ নয়। আর খোদা সব মানুষকে অন্তরচক্ষু দেন নাই। এখন এমন অতিবাহিত হচ্ছে যখন ন্যায় বলে কিছুই নাই। খোদার খলিফা মানুষের পরাজয় হয়েছে। এখন শুধু আমরাই সত্যকে রক্ষা করবো। তোমার কল্পনা ও স্বপ্নকে আরও প্রসারিত করো। শুধু আয়েশা আর জরিফায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবেনা। মানুষের মুক্তির জন্যে ভাবতে হবে। তুমি তোমার আয়েশাকে ন্যায়ের প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করো। শুধু নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করলে হবেনা। সে মানবতার পূণর্জাগরণের দূত হিসাবে কাজ করতে বলো। আমরা দুজনও ওর জন্যে নিবেদিত থাকবো। তুমি কি বলো।

হে কবি, তুমিতো আমারও গুরু ও স্রষ্টা। আমি তোমাকে ভাবাচ্ছি শুধু আয়েশাকে নিয়ে। আয়েশা আমার চিন্তা ও স্বপ্ন। আমি নিজেকে জগতের মহান নারী হিসাবে ভাবি। আয়েশার মাধ্যমে আমি জরির মুক্তি চাই। দেখছোনা কত অল্প সময়ে আয়েশা রাজধানীতে লাইমলাইটে এসে গেছে। তাকে নিয়ে এখন মিডিয়াও ভাবছে। সারা বিশ্ববিদ্যালয় আয়েশার জন্যে নিবেদিত। আমি আয়েশাকে এ সময়ের বেগম রোকেয়া হিসাবে দেখতে চাই। সে হবে বিশ্বনারী সমাজের নেত্রী। জগতবাসীকে নতুন কথা শুনাবে। তুমি একেবারেই চিন্তা করোনা। আয়েশা তোমার কল্পনা ও স্বপ্নের চেয়ে হাজার গুন বড় হবে।

প্রিয় রূপ, তুমি কি জানো মানুষের ক্ষমতা ও কল্পনা শক্তি  সৃষ্টির সমান। কিন্তু মানুষ তা জানেনা। যদিও খোদা বলেছেন, মানুষকে অতি অল্পই জ্ঞান দেয়া হয়েছে। মানুষ তার ব্রেনের ক্ষমতার দশ ভাগ ও এখনও ব্যবহার করতে পারেনি। এদিক থেকেও মানুষের বিশালত্ব ভাবা যায়। মানুষ হলে তুমি কি রকম হতে তারই বাস্তব রূপ হচ্ছে গ্রামের মেয়ে আয়েশা । তোমার ভাবনাকে আমি সম্মান জানাই। জরিফা হচ্ছে তোমার কষ্ট। সেই জরিফাকে তুমি মুক্তি দিতে চাও। আসলে এ মুক্তি হচ্ছে নারী জাতির মুক্তি। মুক্ত নারীর প্রতীক হচ্ছে আয়েশা।

জরিফার স্কুল কেমন চলছে,চলুন দেখি। পাঁচজন মেয়ে জরিফার কাছে কোচিং করে। দুজন নবম শ্রেণীর। আর তিনজন অষ্টম শ্রেণীর। জরিফা এদের সব বিষয়ে পড়ায়। তবে বিশেষ নজর দিতে হয় অংক ও ইংরেজী বিষয়ে। জরিফা ভেবেছিল এক ঘন্টা করে সময় দিবে। কিন্তু এতে কুলোচ্ছেনা। তাই সময় বাড়িয়ে দিয়েছে। দেড় দুই ঘন্টা লেগে যায়। জরিফা চায় দশম শ্রেণীর ছাত্রীরা তার কাছে থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিক। তাহলে বুঝতে পারবে কোচিং কেমন হচ্ছে। জরিফা এটাকে বাণিজ্যিক কাজ বা পেশা মনে না করে সমাজ সেবা মনে করছে। প্রথম মাস পেরিয়ে যাবার পর জরিফা দশ হাজার টাকা পেয়েছে ছাত্রীদের কাছ থেকে। ছাত্রীদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছে কোচিং তাদের কাছে লাগছে। সবাই বলেছে খুব ভালো। আরও বলেছে ম্যাডাম আপনার কাছে পড়তে বিরক্ত লাগেনা। পরিবেশটা খুবই হাসিখুশী। এক ঘেঁয়ে না। তোমরা মনোযোগ দিয়ে পড়ো। তাহলে তোমাদের রেজাল্ট ভালো হবে। এখন থেকে তোমাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক পরীক্ষা হবে। পরীক্ষায় অংশ নেয়া বাধ্যতামূলক। রেজাল্ট ভালো না হলে এখানে আর কোচিং হবেনা। তোমরা জানো আমি শুধু টাকার জন্যে কোচিং ক্লাস খুলিনি। আমি ইকনোমিক্সে অনার্স মাস্টার্স করেছি। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছি। চাকুরীতে যাইনি। সিরিয়াসলি সংসার করবো বলে। তোমরাতো জানো আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজ। মেয়েদের বিকশিত হওয়ার পথ তেমন খোলা নয়। সবাই ভাবে শিক্ষিত হয়ে কি লাভ। তবে আগের চেয়ে মেয়েরা অনেক এগিয়ে গেছে। আরও এগোবে। শুধু বাচ্চা জন্ম দেয়া, রান্না করা আর স্বামীর সংঘ দেয়া মেয়েদের কাজ হতে পারেনা। আমার কথাই ভাবো, বিয়ের পর আট বছর ঘরে বসে আছি বউ সেজে। সৃজনশীল কিছু করা বা ভাবার কোন সুযোগ নেই। অনেকদিন পর তিনি বুঝতে পেরেছেন আমার কিছু করার দরকার । তাই তোমরা এ কোচিং সেন্টার দেখতে পাচ্ছো। আমার সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করার কথা। কিন্তু আমার মা বাবা ও শ্বশুরবাড়ি রাজী হয়নি।  অনেক মানসিক যন্ত্রনার ভিতর দিয়ে আমার সময় অতিবাহিত হয়েছে। আমার মন এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। নিজেকে একটু মুক্ত স্বাধীন মনে হচ্ছে।

টাকাটা হাতে পেয়ে জরিফা তার স্বামীর হাতে তুলে দেয়। খলিল টাকা নিয়েছে। কিন্তু মনের কথা জরিফাকে বলেনি। পরদিন সকালেই বললো চলো একটু ব্যান্কে যাবো। তোমার নামে একটা একাউন্ট খুলেছি। এখন যাবো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তোমার ছবি জমা দিবো। তুমি স্বাধীন ভাবে একাউন্ট পরিচালনা করবে। আমিও মাঝে মাঝে কিছু জমা দিবো। জরিফার খুশীর সীমা নাই। বাসায় ফিরে শ্বাশুড়ীকে সালাম করে। কি হলো বউমা। মা, ছাত্রীদের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা  পেয়েছি। আপনার ছেলে আমার নামে ব্যান্ক একাউন্ট খুলে দিয়েছে। টাকা জমা দিয়ে এসে আপনাকে সালাম করলাম। খলিল কই? সে তার অফিসে গেছে। আমি রিকশা করে বাসায় এসেছি। আমি তোমাকে দোয়া করি। তুমি সংসারের মুখ উজ্জ্বল করো। সে রাতই ছিল জরিফার আসল বাসর রাত। রাত জাগা পাখির মতো গুণ গুণ করেছে। বার বার খলিলকে চুমো খেয়েছে। খলিলও বুঝতে পেরেছে সংসারের সুখ কোথায়। খলিল জরিফার সম্পর্কও ধীরে ধীরে সুখের দিকে যাচ্ছে। জরিফা সারাদিন আনন্দময় থাকে। সংসারের সব কাজ হাসিমুখেই করে।

ছুটির দিনে হঠাত্‍ করেই গুলশান বেগম আয়েশাকে ফোন করে। হ্যালো বেটি আমি আরসালানের মা বলছি । জ্বী খালাম্মা আসসালামু আলাইকুম। আলাইকুম সালাম। কেমন আছেন।  শোকর আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ পাক খুব ভালো রেখেছেন। বেটি কেমন আছো। সেই যে গেলে আর ফোনও করলেনা। সরি খালাম্মা,মাফ করে দিবেন। আজতো ছুটির দিন। আমাদের এদিকে যদি আসতে পারো। আপনি হুকুম করলে কি না করতে পারি। না বেটি হুকুম না। আবদার করছি। তোমার কথা মনে পড়লো। সেতো আমার সৌভাগ্য। তাহলে আসবেতো। জ্বী আসবো। স্যার বাসায় আছেন নাকি। না আরসুতো ভার্সিটিতে চলে গেছে। কি যেন একটা কাজ আছে তাই । চলে আসবে ঘন্টা খানেকের ভিতর। বারোটার ভিতর চলে আসো তুমি। আমরা এক সাথে লাঞ্চ করবো। জ্বী ঠিক আছে। ফোন ছেড়েই গুলশান বেগম এলান করে দেন বাড়িতে বিশেষ মেহমান আসছে। সবাই যেন এলার্ট থাকে। গেটে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে। আর কিচেনে গুলশান বেগম নিজেই উপস্থিত থাকবেন।

Advertisements

শকুন

বাঁচতে হলে মরতে হবে
মরার মাঝেই অমর হবে
বাঁচার চেয়ে মরা ভালো
আঁধার চিরে আসবে আলো।
বাঁচতে হলে মরতে হবে
এখন তুমি কোথায় যাবে
ভয় করলেই ভয়ে খাবে।
দেশটা তোমার খাচ্ছে শকুন
তাড়াও শকুন জ্বালাও আগুন
বাঁচতে হলে মরতে হবে

রূপকথা (উপন্যাস)

আমার ইচ্ছা ছিল মনের কথা বলবো এমন কারো কাছে যার সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক আছে। এর আগে আয়েশাকে বলেছিলাম মনের কথা দেশ ও সমাজ নিয়ে। এখন আয়েশাকে দেখছি আমার অন্তরে রূপ হিসাবে ঠাই নিয়েছে। দৃশ্যমান জগতে রূপকে কখনই দেখিনি। কারণ রূপ আমার অন্তরের অদৃশ্য মানবী। যাকে আমার দৃশ্যমানের চেয়ে কোটি গুণ শক্তিশালী মনে হয়। এখন দেখছি রূপ বলছে তার না বলা অন্তরে জমে থাকা লাখো কথা। সেই বলবে আর আমি শুনবো আর লিখবো। আর সে হাসতে হাসতে বলতে শুরু করেছে ।
আমার মনে হয় তুমি আমার বন্ধু প্রিয়তমা ও প্রেয়সী তোমার জন্মেরও শত বছর আগে। আমার অন্তরে
জন্মেছো তুমি আর ধীরে ধীরে আমাকে ভালবাসতে শুরু করেছো। আমার মানব মন বহুবার তোমাকে দৃশ্যমান দেখতে চেয়েছে। যেমন আমার খোদা নিজেকে দেখার জন্যেই আদমকে সৃষ্টি করেছেন আপন সুরতে। আমিও আমার কল্পনায় তোমাকে নির্মাণ করছি একটু একটু করে। খোদা আমাকে ও তোমাকে নিয়মিত দেখতে পান। আর আমি না খোদা না তোমাকে দেখতে পাই।  দৃশ্যমান তুমি কোথায় আছো জানিনা। আমি তোমাকে অনুভব করি। আমার অন্তরচক্ষুুু তোমাকে অবিকল দেখতে পায়। কী অবাক!সেদিনের তুমি আজ হেলতে দুলতে স্কুলে যাচ্ছো। লাউয়ের ডগার মতো তরতর করে বেড়ে উঠছো।আমি বার বার ভাবছি তোমার চোখ মুখের আদলের কথা। যেমন আনারকলিকে নির্মাণের সময় শিল্পী ভেবেছিল। আমিও ভাবছি তোমাকে কেমন হবে তোমার সুুূ্রত। দৃশ্যমান তোমাকে দেখলে এ সৃষ্টি থেমে যাবে। থমকে যাবে জগতের প্রেমিক মানুষ। না আমি তোমাকে দেখতে দেবোনা জগতের মানুষকে।অনেকের শয়তান চোখ আছে। তারা তোমাকে চোখে চুষে খাবে। তাই তুমি আমার অন্তরেই থাকো। শুধু আমিই দেখবো তোমাকে। তুমিই এ জগতের অদ্বিতীয় নারী যাকে একজন কবি কল্পনা করেছে ও নির্মাণ করেছে। তুমিতো অরূপ। জগতের একজন সাধারন নারী হিসাবে তুমি হয়তো কোথাও জন্ম নিয়েছো । আর বড়ো হয়ে নারীতে রূপান্তরিত হচ্ছো।

একদিন তুমি বলেছিলে তুমি অনেক পড়ালেখা করতে চাও। আমি বলেছিলাম আমাকে বলছো কেন। আমিতো দৃশ্যমান জগতের সাধারন নারী আয়েশার সাথে কোন সম্পর্ক নাই। জগতে তুমি কারো কন্যা কারো প্রেমিকা কারো দয়িতা আর কারো মা। আয়েশা সাথে আমার কোন পরিচয় নেই। আমিতো কোন পুরুষ বা নারী নই। আমি শুধুই একজন কবি। আমার কাজ কল্পনা করে কিছু সৃষ্টি করা। তাই আয়েশা আমার কেউ নয়। এখন রূপই আমার একমাত্র সাধনা কল্পনা প্রেম ভালবাসা। তুমি বললে আমিই তোমার কল্পনার রূপ। এখানে আমি ব্রহ্মার এক পুত্রের প্রতিবেশী। এর তীরেই তোমার আনাগোনা চলাফেরা। লাফিয়ে নদীতে ডুব দেয়া। ভেলা ভাসিয়ে গাণ গেয়ে নদীকে গায়কে পরিণত করা। নৌকার   মাঝি আর রাখাল বালকেরা তোমার বন্ধু। কৃষকেরা ধান কাটে তোমার গাণের তালে তালে। শিশির কণা তোমার নুপুর পায়ে চুমো খায়। শিশির ভেজা পায়ের আলতা আরও লাল হয় চিক চিক মিষ্টি রোদের ছোঁয়ায়।

 রূপ, তুমি কি জানো আয়েশা কে? আমি জানতে চেয়েছিলাম একদিন।  তুমিই বললে, সে তোমারই  বাস্তব রূপ। অবিকল তুমি। আমি বলেছিলাম আমি কি যাবো আয়েশার গ্রামে। তুমি কঠোর ভাষায় বলাছিলে কখনই না। আয়েশাতো তোমার নয়। আমি তোমার তুমি আমার। আয়েশাকেতো তুমি সৃষ্টি করোনি। সেতো তোমার বাইরে থাকে।  আর আমি থাকি অন্তরে। তুমিতো কোন   মানব নও। একজন মহান কবি। আমরা দুজনই এক অন্তরে বাস করি। এ অন্তরে আমাদের প্রভুও থাকেন। আমাদের জন্ম কবির মনোস্বর্গে। আমাদের কোন মরণ নেই। মানব জন্মে মরণ আছে। আমাদের প্রভু তোমার অন্তরে আমাকে সৃষ্টি করেছেন।তিনিই তোমাকে কল্পনা শক্তি দিয়েছেন। তুমি কবি। তিনিই তোমাকে কবি স্রষ্টা বানিয়েছেন। এমন ক্ষমতা তিনি আর কাউকে দেননি। আয়েশার দিকে তাকালে আমার মৃত্যু হবে। সেদিন তুমিও আর কবি থাকবেনা। আমার মৃত্যু হলেই তুমি সাধারন মানবে রূপান্তরিত হবে। তখন তুমি হয়ত আয়েশাকে পাবে। জগততো হিংসা বিদ্বেষের জায়গা। এখানে নারীকে ভোগের বস্তু মনে করা হয়। মহান ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথেরও নারীর প্রতি অবিরাম ঝোঁক ছিল। দেখো এখানে নারী নিয়ে কত হানাহানি। এসব সাধারন মানুষ নারীর যৌবনের পাগল। অন্তর নয়, দেহের জন্য পাগল। দেহের ভিতর কি আছে তা শুধু খোদাই জানেন। তুমি কি জানো আদমের জন্মের বহুকাল পরে হাওয়ার জন্ম হয়েছে। কেনো হাওয়ার জন্ম হয়েছে তা খোদাই জানেন। তার আগেই তিনি মহাজগত আকাশ পাতাল গ্রহ নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন। আদম আর হাওয়ার মাধ্যমেই মানব জমিনের আবাদ শুরু হয়েছে। সাথে শয়তানেরও জন্ম হয়েছে। কারণ সে আদম রহস্য বুঝতে পারেনি। সাধারন মানুষও জানেনা সে আসলে কে?

প্রিয়তমা  তুমি কি জানো আয়েশার জন্ম রহস্য। না কবি স্রষ্টা, এ বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নাই। এ রহ্স্য শুধু আমাদের প্রভুই জানেন। প্রাণী সহ সকল সৃষ্টিকেই তিনি প্রজনন ক্রিয়া শিখিয়েছেন। সংগমে সৃষ্টির রহস্য ও আনন্দ লুকিয়ে আছে। খোদা বলেন মানুষ আমার রহস্য আমি মানুষের রহস্য। সৃষ্টির গভীরে এ রহস্য লুকিয়ে আছে। কবিই একমাত্র খোদার বাণী প্রচার করতে পারে। নবীজী বলেছেন, আসল কবিরা আল্লাহর ছাত্র। আমার ইচ্ছা ছিল আয়েশার সাথে কথা বলবো। তুমি বললে তুমিই আয়েশার হয়ে কথা বলবে। আমিও রাজী। আয়েশা এখন কেমন আছে। কি করছে। এখনও কি গ্রামেই আছে। আয়েশার সাথেতো তোমার নিয়মিত কথা হয়। তুমি বললে, আমিইতো আয়েশা এ কথা তোমাকে বার বলতে হয় কেন। আমি বললাম দু:খিত। এমন আর হবেনা।

আয়েশা এখন আর গ্রামে নেই। এইচএসসি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে রাস্ট্র বিজ্ঞানে। ইকনোমিকসেও চান্স পেয়েছিল। ওর পছন্দ রাস্ট্র বিজ্ঞান। ইচ্ছা আছে এমএ শেষ করে বিদেশে যাবে পিএইচডি করার জন্যে। এখন সে রাজধানীতে খালার বাসায় থাকে। খালা আজমেরী বেগম একজন গৃহবধু। স্বামীর ইচ্ছায় চাকুরী গ্রহণ করেননি। তারও ইচ্ছা ছিল সরকারী স্কুলে চাকুরী করা। কিন্তু বর রাজী হয়নি। আয়েশার বাবা  আসমত আলী একজন ডাকসাইটে স্থানীয় নেতা। ব্যক্তিগত জীবনে সত্ হলেও চিন্তার জগতে একেবারেই প্রাচীন পন্থী গোঁয়ার। বিত্তের জোরে সবাইকে দাবিয়ে রাখেন। আজমেরী বেগমের বিয়ের সময় ফায়সালা হয়েছিল বউকে দিয়ে চাকুরী করানো যাবেনা। আজমেরীর বাবা একজন বিনীত ভদ্রলোক। শিক্ষিত ও মার্জিত। গ্রামে শিক্ষকতা করতেন।  এখনকার সমাজে শিক্ষিত মানুষের দাম নেই। তার উপরে বিত্তহীন। ফলে মেয়ের বিয়েতে তার মতামতের তেমন দাম ছিলনা। সবই বড় জামাই আসমত আলীর সিদ্ধান্ত। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় সবাই আছমত আলীকে মান্য গণ্য করে।  আয়েশার ঢাকায় এসে পড়ার ব্যাপারে তার বাবা রাজী ছিলনা। কিন্তু আয়েশার অদম্য ইচ্ছার কাছে অবনত হয়। বলেছিল পড়তে না দিলে সে পালিয়ে যাবে। তার বাবা বলেছিল স্থানীয় কলেজে পড়তে। আয়েশা রাজী হয়নি। যেহেতু সে মেধাবী মেয়ে আত্মীয় স্বজন সবাই আছমত আলীকে নিম রাজী করিয়েছে। বলেছে মেয়ের যদি কোন অঘটন ঘটে তাহলে আত্মীয়রা দায়ী থাকবে। আজমেরী বলেছিল মেয়ে আমার বাসায় থাকবে ভয়ের কিছু নাই। ঢাকা থেকে পড়ালেখা করলে দুলাভাই আপনার সামাজিক ইজ্জত বাড়বে। ভাল বর ও পাওয়া যাবে। যদি বিসিএস পাশ করে তাহলেতো সরকারী বড় অফিসার হতে পারবে। যদি আইন পড়ে তাহলে ব্যারিস্টার হতে পারবে। এ মেয়ে শেষ পর্যন্ত আপনার মুখ উজ্বল করবে। আমার এখানে থাকলে আপনার খরচও কম হবে। আছমত আলী ভারিক্কী গলায় বলে উঠলো তোরা ওর খরচ চালাবি কেন। আমিই মেয়ের সব খরচ দেবো। ব্যান্ক একাউন্ট খুলে দেবো। মাসের এক তারিখে টাকা জমা হয়ে যাবে। মেয়ে স্বাধীন ভাবে প্রয়োজন মতো খরচ করতে পারবে। আমিতো রাজী হয়েছি তোমরা সবাই বলাতে। এখন আমার মনে কোন বাধা নাই। মেয়ে যতদূর পড়তে চায় পড়াবো। আয়েশাকে কাছে ডেকে আদর করতে থাকেন। জবাইযা মা যা ঢাকায়। যতদূর পড়তে চাস পড়। উল্টা পাল্টা কিছু শুনলে জবাই করে ফেলবো। না আব্বু তেমন কিছু কখনই হবেনা। যদি কোন ছেলে তোর পছন্দ হয়ে যায় আমাকে জানাবি। অথবা তোর খালা খালুকে বলবি। আমি তোরে দোয়া করি বড় হ মা। অনেক বড় হ ।

আয়েশা খালার  বাসায় থেকে নিয়মিত পড়ালেখা করছে। একটা অটো রিকশা নিয়মিত আনা নেয়া করে। ছুটির দিনে ওই অটোতেই বেড়াতে বের হয়। বছর শেষ হতে না হতেই ডিপার্টমেন্টে আয়েশার নাম ডাক। সে ভালো ছাত্রী। ডিবেটে প্রথম। ইন্টার ডিপার্টমেন্টাল ডিবেটে আয়েশা ফার্স্ট হয়েছে। সে দেখতে যেমন সুন্দরী তেমনি পরিশীলিত ও মার্জিত। পোষাক আশাকেও শালীন। এখন রাজধানীর ইন্টার ভার্সিটি ডিবেটে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।আয়েশা এখনও ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হয়নি। চারিদিক থেকে ভীষণ চাপ। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠণের বড় বড় নেতারা তার সাথে দেখা করছে। তাকে সরাসরি বড় পোষ্ট দিতে অফার করছে। নেতারা বলছেন, তোমার ভবিষ্যত বড় উজ্বল। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবে। তা না চাইলে মন্ত্রী হতে পারবে। আয়েশা বলে, দেখুন বড় ভাই আমি মাত্র সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। এখন রাজনীতিতে জড়াবোনা। নিরিবিলি পড়ালেখা করতে চাই যদি আপনারা সহযোগিতা করেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উজ্বল করতে চাই। ইন্টার ভার্সিটি ডিবেটে আমি ফার্স্ট হতে চাই। এ নিয়ে স্যারেরাও খুব সহযোগিতা করছেন। তাঁরা চান আমি প্রথম হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করি। এরপরে সারাদেশে ডিবেট হবে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্যার ডক্টর আরসালান বলেন, আয়েশা তোমাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। তোমার প্রতিভা আছে। এটা তোমাকে দৃঢভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আত্মবিশ্বাস মানুষ মানুষকে অনেক বড় হতে সাহা্য্য করে। তোমার সে প্রতিভা আছে। বিশ্বের বড় বড় মানুষের ভাষণ পড়ো। তাদের জীবনী পড়ো। সব ধরণের বই বিশ্ববিদ্যালয়য় দিবে।

 ডক্টর আরসালান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র । খুবই খানদানী পরিবারের সন্তান। পরিবারের চারশ’বছরের ইতিহাস রয়েছে। তাঁকে দেখলেই মনে হয় তিনি রাজপুত্র। ডিবেটের ব্যাপারে তিনি আমার গাইড। তিনি বারিধারায় নিজের বাড়িতে থাকেন। বাবা নাই। মা আছেন। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে আসা যাওয়া করেন। এখনও বিয়ে করেননি। খানদান মিলিয়ে পরিবার ও মেয়ে পাওয়া যাচ্ছেনা। মা আদিবা খান পন্নী। এক ছেলে তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। সবাই বিদেশে থাকে। ডক্টর আরসালান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার জন্যে দেশে ফিরে এসেছেন। আয়েশার ব্যাপারে আরসালানের মনে বিন্দুর মতো এক ভাবের জন্ম হয়েছে। নাথিং সিরিয়াস। কিন্তু আয়েশার পরিবার সম্পর্কে কিছুই জানে না।

একদিন ক্লাসের পর আয়েশাকে ডেকে নেয় আরসালান নিজের চেম্বারে। হ্যালো আয়েশা বি সীটেড। কেমন আছেন।

 জ্বী স্যার ভালো আছি।

দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বসে কথা বলুন।

ধন্যবাদ স্যার।

এই বইটা আপনার জন্যে। আর্ট অব ডিবেটিং। এটা জগত বিখ্যাত বই। ডিবেটে আপনার মেধা আছে। ইউ ক্যান রাইজ টু দি স্কাই থ্রো ডিবেট। ইউ ক্যান বি এ্যা গুড লইয়ার।

স্যার, তুমি করে বলুন। আমার লজ্জা লাগে।আপনি আমার শিক্ষক। আপনাকে আমি খুবই সম্মান করি।

ঠিক আছে। বলো, তোমার বাসা কোথায়। স্যার আমি গ্রামের অতি সাধারন পরিবারের মেয়ে। গ্রাম থেকে রাজধানীতে এসেছি। এখানে খালার বাসায় থাকি। খালু কোম্পানীতে এইচআর ম্যানেজার। একটা অটো আছে। ওটা দিয়ে আসা যাওয়া করি।

অতি সাধারন বলছো কেন। তুমিতো খুবই মেধাবী মেয়ে।  তোমার কি নাম যেনো।

জ্বী স্যার, আয়েশা আখতার। আমার নানা নাম রেখেছেন।

বইটা তোমার খুব কাজে দিবে।  ভালো করে পড়ো। আমি জানতে চাইবো তুমি কেমন পড়েছো

ঠিক আছে স্যার।

একদিন আমার বাসায় এসো। এই আমার কার্ড। এখানে ঠিকানা আছে। ফোন করে এসো।

ঠিক আছে স্যার। ছুটির দিন আসবো। এখন আসি স্যার যদি অনুমতি দেন।

ওকে, আসো।

আয়েশা ডক্টর আরসালানের রুমে প্রায় এক ঘন্টা ছিল। বান্ধবীরা ঠাট্টা করছে। কিরে স্যারের চোখ পড়েছে বুঝি। স্যারের চোখে পড়ার জন্যে অনেক মেয়েই চেষ্টা করছে। তাঁর চোখ পড়েনা। খুবই কম কথা বলার মানুষ। ক্লাস নিয়ে আর কোথাও যাননা। সোজা একেবারে বাসায়। তাই সহজে কেউ কথা বলার সাহস পায়না। আয়েশাকে রুমে ডেকে নেয়াটা  অবাক ব্যতিক্রম। তাই কানা ঘুসা হচ্ছে। আরে না না তোরা খামাকা ওসব কথা ভাবছিস। স্যার ডিবেট নিয়ে কথা বলেছেন ,আর এই বইটা দিয়েছেন। দ্যা আর্ট অব ডিবেট। এটা ভালো করে পড়তে বললেন। বুঝতেইতো পারছিস ইন্টার ভার্সিটি ডিবেট কম্পিটিশন। আরও বহু মেধাবি ছেলে মেয়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে। বিশেষ করে নর্থ সাউথ ও ব্রাক ভার্সিটি।স্যারেরা আশা করেন আমি ঢাবির মুখ উজ্জল করবো। ডিবেটের বিষয় হলো আগামী পৃথিবী ও আন্তর্জাতিক সমাজ। একই বিষয়ে পরে ওয়াশিংটনে ডিবেট হবে। অংশগ্রহণকারী দেশ গুলো থেকে একজন করে প্রতিনিধি থাকবে। ইন্টার ভার্সিটিতে প্রথম হতে পারলেই আমি ওয়াশিংটন যেতে পারবো।  ডক্টর আরসালানের সাথে আমার নিয়মিত কথা বলতে হবে। তিনিই আমার গাইড। তিনি চান আমি বিশ্বশ্রেষ্ঠ হই। এ নিয়ে তোরা গুজব বানাস না। আমি ফার্স্ট হতে পারলে দেশের নাম হবে। আমি বিদেশে পড়ার স্কলারশীপ পাবো। সেদিন আর কথা না বলে আয়েশা সোজা বাসায় চলে যায়। খালুর সাথে ডিবেট নিয়ে আলাপ করে। বাবার সাথে নিয়মিত কথা বলে। আসমত আলী মেয়ের সাফল্যে খুব খুশী। আমার মেয়েটার ব্যাপারে খুব সজাগ থাকবে। কোন ঝামেলায় যেনো জড়িয়ে না পড়ে। রাজধানীতে বাজে লোকের অভাব নাই। আমার মেয়েটা মেধাবী হলেও সহজ সরল। অল্পতেই মানুষকে বিশ্বাস করে। এখতো চোখের আড়াল তাই খুব চিন্তা করি। ওর মা বলে জজ ব্যারিস্টার হওয়ার কি দরকার।

মোকসেদপুরের জরিফা  যদিও মুখে বলে সে খুব ভালো আছে। কিন্তু আলাপে মনে হয় তেমন খুশী নয় সংসারে।জরিফা উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে। উপজেলা শহরে থাকে স্বামীর সাথে। ঘরে শ্বাশুড়ী আছেন। তিনি একজন পুরাণপন্থী মানুষ। বউয়ের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। জরিফার বরও এ ব্যাপারে চুপ। বউ কিছু করুক স্বামী তা চায়না। জরিফার বাপও মেয়েদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। মেয়েকে এমএ পাশ করিয়ে গ্রামেই বিয়ে দিয়েছেন মুরুব্বীরা। জরিফার ইচ্ছা ছিল কলেজের শিক্ষক হওয়া। স্বামীর কারণে সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। জানতে চাইলেই বলে সংসার ভেংগে যাবে। জরিফা সুন্দরী হওয়ায় স্বামী ভয় পায়। উপজেলা শহরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। নিজে একা কখনও বের হয়না। নিজে একাকী শপিং করতে যায়না। এমন কি নারী বিষয়ক নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনতেও স্বামী সাথে থাকে। অথবা স্বামী নিজেই কিনে আনে। ইদানিং ছেলেকে নিয়ে স্কুলে আসা যাওয়া করে। কিন্তু উপজেলার সব খবর রাখেনা। কোন স্যোসাল ওয়ার্কও করেনা। নারী সমিতি আছে কিনা তারও কোন খবর রাখেনা। তার নিজের কোন ব্যান্ক একাউন্ট নেই। অথচ স্বামী একজন ব্যান্কার। কিছু জানতে চাইলে জরিফা বলে ভালইতো আছি। স্বামীর সংসার করি। দিনে রান্নাবান্না করি। রাত হলে স্বামীকে সংগ দিই। স্বামীরও তেমন আর কোন মনোরঞ্জন নেই। বেচারা সারাদিন খাটে। সংসারের জন্য টাকা কামাই করে।

ফেসবুকে জরিফার লেখা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এতো সুন্দর বাংলা। খুবই পরিশীলিত। রুচিবোধের প্রশংসা না করে পারা যায়না। এমন একটি আধুনিক মেয়ে অদৃশ্য শৃংখল পরে গ্রামে পড়ে আছে স্বেচ্ছা পরাধীন হয়ে। স্বামী মাসে বেতন এনে জরিফার হাতে দেয়। কিন্তু খরচ করার কোন অধিকার তার নেই। সেখান থেকে টাকা নিয়ে স্বাধীন ভাবে খরচ করতে পারেনা। সোজা কথায় বলা যায় জরিফার কোন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই। স্বামী ইব্রাহিম খলিলও উচ্চ শিক্ষিত। উপজেলাতেই একটা ব্যান্কে চাকুরী করে। ভালো কোন ব্যান্কে যায়না বদলীর ভয়ে। বদলী হয়ে গেলে বউ নিতে পারবেনা। মাকে একা ফেলে কোথাও যাবেনা। তাই জরিফাকেও কোথাও নেয়া যাবেনা। খলিলের মনে ভয় এমন সুন্দরী বউয়ের দিকে যদি কারো নজর পড়ে যায়। বউয়ের চিন্তায় খলিলের মন সব সময় আতংকে থাকে। উপজেলা শহরের ইয়ং বিসিএস অফিসারদের যদি নজর পড়ে যায় তাহলেতো আর রক্ষে নাই। খলিল জানে তার বউ একটু বাইরে যেতে চায়। সে বউকে সীমাহীন ভালবাসে। যা চায় তাই করে দেয়। কিন্তু বাইরে যেতে দিবেনা। নিজের ইচ্ছে মতো টাকা পয়সা খরচ করতে পারবেনা। ভালো চাকুরী করলে যদি জরিফার নাম হয়ে যায়। তাই চাকুরী করতে দেয়না। কাগজে লিখতে দেয়না যদি লেখা ছাপা হয়  বাইরে বা জেলা উপজেলা থেকে লোকজন বাড়িতে আসতে শুরু করবে। কাগজের লোকেরা ইন্টারভিউ নিতে চলে আসবে। তাই জরিফাকে বন্দী করে রাখাই খলিলের ইচ্ছা। এভাবেই বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। ইতোমধ্যে ছেলে হয়েছে। সে এখন স্কুলে যায়।

খলিলের বন্ধুরা জরিফাকে নিয়ে মশকরা করে। হাসি তামাশা করে।  দোস্ত, বউকে বোরখা পরিয়ে আনতে পারিস। তাহলেতো বউটা খোলা বাতাসে নিশ্বাস নিতে পারে। খলিল বলে বউতো বোরখা পরতে চায়না। তোরাতো জানিস জরি খুবই আধুনিক মেয়ে। আমি ভয় পাই। আমি জরিকে খুবই ভালবাসি।

মোটেই ভালবাসিস না। তুই বউয়ের রূপকে ভালবাসিস। তোর ভালবাসা দেহে। অন্তরে নয়। তুই ইনফেরিওরিটি কম্প্লেক্সে সাফার করিস। হীনমন্যতায় ভুগিস। তোর যোগ্যতা বউয়ের চেয়ে কম। এটা কোন আধুনিক চিন্তা নয়। তোর মানসিক বৈকল্য আছে। জরির বাপও তেমন খোলা মনের মানুষ নন। ছাত্রী ভাল বলে অনেক দূর পড়ালেখা করতে পেরেছে। জরির বন্ধুরা অনেকেই বিসিএস দিয়ে বড় সরকারী চাকুরী করে। অনেকেই এমবিএ করে বড় কোম্পানীতে কাজ করে। কিন্তু জরিফার সে ভাগ্য হয়নি বাপ ও স্বামী খলিলের কারনে। এমন শিক্ষিত মেয়ের কোন প্রয়োজন ছিলনা খলিলের। নাইন পাশ করা একটা সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করলেই চলতো। বউয়ের বিদ্যা খলিলের অহংকার। এলাকায় এমএ পাশ বউ আর নেই । কিন্তু তার এ অহংকার ভাবে বুঝা যায়।  অন্তরে খুবই দরিদ্র। জরি জানে স্বামীর সাথে দ্বিমত করে সংসার করা যাবেনা। তাই সে চুপ থাকে। জরির বাবাও মেয়েদের অধিকারে বিশ্বাস করেনা। এমএ পাশ করলেও মেয়ে শুধুই একজন মেয়ে এর বেশী কিছু নয়। জরিফার কোন ইচ্ছা আকাংখা বা স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। এ মনোবেদনা কখনই যায়নি। নিজের  মনকে জরি দমন করে রাখে।খলিল জানতো জরির দু:খের কথা। তবুও জরির মনকে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রন করে।

আগেই বলেছি রূপ আমার কল্পনা। আমার অন্তরে বাস করে। আমার কাব্য জগতকে জাগিয়ে রেখেছে। তার উত্‍সাহে আমি কবিতা লিখি সাহিত্য চর্চা করি। অন্তরের কথা  রূপকে বলি। জানিনা আমি রূপকে ভালবাসি কিনা। কল্পনার রূপ সত্যিই এক অকল্পনীয় চরিত্র। মাঝে মাঝে মনে হয় সে আমার মতোই একজন মানুষ। মনে হয় ওর সাথে আমি ঘন্টা ঘন্টা কথা বললেও আমার বিরক্তি হবেনা। রূপ আমাকে কেমন ভালবাসে তা বুঝতে পারিনা। আমি নিজেও খুবই আবেগী। আবেগ আমার শরীর মনকে দূর্বল করে রাখে। আমি এক অবাক লোক। নিজেকে ভাল করে চিনতে পারিনা। আমি আসলে এমন কেন।  মানুষ কি আমার মতো হয়। আমি অবাক এক আনন্দের সরোবরে বাস করি। অন্তরে এতো আনন্দে কোথা থেকে আসে তাও বুঝতে পারিনা। আমার চিন্তার জগতে নেগেটিভ কিছুই নেই। আমি মানুষকে অসম্ভব বিশ্বাস করি। শিশু কাল থেকেই আমি এ রকম। মানুষের ব্যথায় ব্যথিত হই। দূর্বল আর অত্যাচারিতদের পক্ষে আছি। আমি লিখতে বলতে ও পড়তে ভালবাসি। আমার অন্তর জগতেহঠাত্‍ করেই রূপের আগমন। রূপ কোথাও আছে কিনা জানিনা। সে বাস্তব না একেবারেই কল্পনা আজও বুঝতে পারিনা। অন্তরচক্ষুতে রূপকে দেখেছি। সে একেবারেই বেহেশতের চির তরুণী হুর বা স্বর্গের উর্বশী বা অপ্সরী। রূপের রূপ আমকে আগ্রহী করেনা। আমি ঐ রূপে মুগ্ধ নই। কল্পনায়তো দেহ বা সংগমের কোন অস্তিত্ব নেই। এখানে রূপ শুধু সৌন্দর্য। হয়ত আমার অন্তর একটা স্বর্গ। রূপ দিনরাত শুধু বলতে থাকে লেখ লেখ। লেখাইতো তোমার কাজ। খোদাইতো তোমাকে লেখার জন্যে সৃষ্টি করেছে। মনে রাখবে আমাকে কখনই মানবী রূপে দেখার চেষ্টা করোনা। আমার বাস্তব রূপ আয়েশাকে আমি যেমন বলবো তেমন করে নির্মান করো। আয়েশা রূপসী ও মেধাবী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হবে। পূর্ণাংগ পরিপূর্ণ নারী হবে। পুরুষর সাথে হবে বন্ধুুত্ব। মনে রাখবে নারী কখনই শুধু যৌনতার প্রতীক নয়। নারী পূর্ণাংগ মানব। সৃষ্টির প্রতীক। জগতে নারীর কি প্রয়োজন তা খোদা ভালই জানেন। মানব সভ্যতা ধ্বংসের এগিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ খোদা যে ভাবে চেয়েছেন সে ভাবে নারীকে মর্যাদা দেয়া হয়নি। জগতের বড় বড় নেতারাই নারী কেলেংকারীতে জড়িত।

দেখো কবি, আমি তোমাকে দুটি চরিত্রের কথা বলেছি। এক আয়েশা। দুই জরিফা। একজন বিজয়ী আরেকজন জয় পরাজয়ের দোলাচলে আছে। আগেই বলেছি আয়েশা  আমার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। জরিফাও সুযাগ পেলে আয়েশা হতে পারতো। কেন হয়নি তা তুমি ভাল করেই জানো। পুরুষের অবহেলার জন্যে। খলিল সার্টিফিকেট ধারী শিক্ষিত পুরুষ। চাকুরী পেয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্যে। তার অন্তরচক্ষু বিকশিত হয়নি। ফলে জরিফার বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। সমাজও চায় নারীরা বিকশিত না হোক।

অপরদিকে রাজধানী বা বড় নগর বা শহরে কিছু তথাকথিত শিক্ষিত নারী আছে যারা স্বেচ্ছাচারী। নারী স্বাধীনতার নামে নারীর অমর্যাদা করেছে। এরা পশ্চিমা বিকৃত নারীদের অনুসরন করে। এদের প্রধান কাজ হচ্ছে ক্লাবে যাওয়া, শরাব পান করা। এদের পোষাক আষাকে অশালীন। এদের বিয়ে ভাংগে বার বার করে। মোটা অংকের মোহর আদায় করে। এদের সন্তানেরাও মা বাবার অনুসারী।এরা সমাজের নেতৃত্ব দেয়। এদের প্রগতিশীলতা মানে হচ্ছে ধর্মের বিরোধিতা করা। এদের কাছে ধর্ম মানে ইসলাম। এ হলো আমাদের সমাজের অবস্থা। মফস্বলে জরিফারা অধিকার হারা। নগরে উচ্ছৃখল নারী। আরবী আলেমদের ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা। রাস্ট্র ও সরকারের ইসলাম ব্যবহার।

জরিফা চেয়েছিল বাসায় কিছু মেয়েকে পড়াতে। খলিলের অনুমতি চেয়েছে। এখনও কিছু বলেনি। কিন্তু না ও করেনি। জরিফা আশা করছে হ্যাঁ করবে। রাতে দুজনে খোশ গল্প করছে। এমন সময় খলিল কথাটা তুললো। বলো জরি ,কেন তুমি বাসায় ছাত্রী পড়াতে চাও। তোমার হাত খরচের কি অসুবিধা হচ্ছে।মাসে কতটাকা পাবে। জরিফা খলিলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, দেখো টাকাটা বড় নয়। আমিতো কোন অভাবে নেই। আমি পড়ালেখাটাকে চর্চার ভিতর রাখতে চাই। মেয়েদের পড়াতে  গিয়ে ওদের বই গুলো পড়া যাবে। সাথে অভিধানের ব্যবহারও হবে। আমাদের ঘরে জায়গার অভাব নাই। একটা রুম হলেই হবে। চার পাঁচটা চেয়ার হলেই চলবে। একটা টেবিল লাগবে। টাকাটা প্রধান বিষয় নয়। বিকেল তিনটা থাকে পাঁচটা। এ সময়তো ঘুমিয়ে থাকি। একটা ট্রায়াল দিয়ে দেখি পারি কিনা। যদি দেখি পারছিনা তখন ছেড়ে দেবো। খলিল ভাবে কথাটা তুলে সে ভুল করেছে কিনা। এখন নাও বলা যাবেনা। এবার খলিল জরিফাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু জরি মুখ ফুরিয়ে নেয়। কি হলো ওদিকে ফিরলে কেন। আমিতো না বলিনি। তোমার প্রস্তাবটা ভালো। চেস্টা করো।ঠিক আছে, এক তারিখ থেকে শুরু করবো। কয়টা চেয়ার কিনে দাও। একটা টেবিল হলে খুব ভালো হবে। তাহলে ঘরের টেবিলটা ব্যবহার করতে হবেনা। একটা ভালো অভিধান কিনে দিও। এরপর খলিল কাজটা সেরে নেয়। দুজনেরই রাতের ঘুমটা ভাল হয়েছে। ভোর বেলা দুজনেরই মন ফুরে ফুরে । জরি গুণ গুণ করে গান গাইতে গাইতে ওয়াশরুমে যায়। এটা ছিল জরির জন্যে একটা বিপ্লব। সেদিন জরিকে দেখে খলিলের খুব ভালো লাগছিলো। এতো হাসি খুশী আর কোনদিন দেখেনি।  ওয়াশরুম সেরে জরি বাইরে আসে। শ্বাশুড়ী এসে জানতে চাইলো এতো খুশীর কারণ। না মা এমনিতেই। না বউমা এমনিতে তুমি কখনই এতো হাসি খুশী থাকোনা।  তোমাকে দেখলেই মনে হতো তুমি যেন  কি ভাবছো। আমি খলিলকে বহুবার বলেছি বউকে খুশী রাখ। এভাবে চললে বউ একদিন কঠিন রোগে পড়বে। ও আমার কথায় কান দিতো না। আজ তোমাকে খুশী দেখে আমিও খুশী। নতুন নাতি নাতনী আসবে নাকি। না মা । এক তারিখ থেকে আমি বাসায় ছাত্রী পড়াবো। আপনার ছেলে অনুমতি দিয়েছে।

এতো খুবই খুশীর খবর। আমিতো এটাই চেয়েছিলাম। এতো বড় শিক্ষিত মেয়ে ঘরে পড়ে থাকলে কি মানায়। এতোদিন পর খলিলের হুঁশ  হয়েছে । দেরীতে হলেও ভালো। দোয়া করেন মা আল্লাহ যেনো তাঁকে সুমতি  দেন।দেখো মা, আমি তেমন পড়ালেখা করতে পারিনি। আমার বাপজান আমাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছেন সমাজের রীতি মেনে। তোমার শ্বশুরও কিন্তু শিক্ষিত ছিলেন। তিনিও তাঁর মেয়েদের বেশী পড়তে দেননি। অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। খলিল নিজের  ইচছায় উচ্ছ শিক্ষিত বউ ঘরে এনেছে। সেই বউকে সে ঘরে বন্দী করে রেখেছে।  আমি বুঝতে পারতাম তোমার  মন কেন  খারাপ থাকতো। দোয়া করবেন মা ওর মন যেন এ রকমই থাকে।

অফিসে যাওয়ার আগে খলিল জরিকে নিজেদের রুমে ডেকে নেয়। বুকে জড়িয়ে ধরে চুমো খায়। জরি আরও বেশী খুশী হয়।  ভাবছে খলিলের মন এদ্দিন পর গলতে শুরু করেছে। জরি তোমাকে খুশী  দেখে  আমিও ভীষণ খুশী। আমি দু:খিত যে তোমার মনটা বুঝতে পারিনি। এখনতো বুঝতে পেরেছো। এতেই আমি হাজার বার খুশী। আমার  শ্বাশুড়ী মা ও  খুশী। এখন আমি অফিসে চললাম।  দুপুরের দিকে আমায় কল দিও। ঠিক আছে  যাও। জরি দুপুরের দিকে খলিলকে কল দেয়। কি খবর বন্ধু মন মেজাজ ভালোতো। খলিল বললো খুব ভালো। একেবারেই ফুর ফুরে। জরি কুশী মনে জানালো এখন থেকে যখন চাইবে তখনি পাবে। আমি খুশী হলে তুমিও খুশী। সংসারের উন্নতি হবে। আমাদের ছেলেটার উন্নতি হবে। চেয়ারের অর্ডার দিয়ে দাও। টাকা না থাকলে বাবার কাছে থেকে আনিয়ে নেবো। ছি ছি কি বললে জরি। শ্বশুর সাহেব কি মনে করবেন। এতো সামান্য টাকা। অফিস থেকে অর্ডার দিয়ে দেবো। পাঁচটা চেয়ার একটা টেবিল। ভালো দেখে কিনিও। বাড়িতে মেহমান আসলে কাজে লাগবে। তুমি কি জানো মাও খুব খুশী। তিনি বলেছেন আমার ছেলের সুমতি হয়েছে।

আয়েশা সোমবার সকালে আরসালানকে ফোন করে। স্যার আপনি কি  ফ্রি আছেন? কে বলছো। জ্বি স্যার। আমি আয়েশা। আপনার ছাত্রী। তুমি কেমন আছো। জ্বী স্যার ভালো আছি। এখন কোথায়। বাসায়। আপনি ফ্রী থাকলে আসতে চাই। নিশ্চয়ই আসবে। আমি ফ্রী আছি। ছুটির দিন আমি বের হইনা। কটায় আসবে। আপনি বললে এখনি রওয়ানা দিবো। আপনার জন্যে খেজুরের রসের পিঠা আনবো। আপনি খানতো। খুব খাই। কোথায় পাবো। আমার খালা বানিয়েছেন। খালা খুব ভালো পিঠা বানান। আমার মাও বানান। তোমার গ্রামের বাড়ি কোথায়? জামালপুর।কে কে আছেন সবাই আছেন। কটার দিকে পৌঁছাবে। স্যার সাড়ে দশটায়। গাড়ি আছে। আমার একটা সিএনজি আছে। ওকে তাহলে আসো।

এগারোটার কয়েক মিনিট আগে আয়েশা বারিধারায় ডক্টর আরসালানের বাড়িতে পৌঁছে। বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই বাড়ির নিরাপত্তা কর্মিরা আয়েশাকে সিএনজি থেকে নামায়। তারপর কেয়ারটেকার আয়েশাকে রিসিভ করে ভিতরে ফ্যামিলি লাউঞ্জে নিয়ে বসায়।বাড়ির স্টাফরা বুঝতে পেরেছে সাহেবের বিশেষ মেহমান। দুজন মানুষঅনেকদিন এ রকম মেহমানদারী এ বাড়িতে হয়নি।

আয়েশা ভাবে সে কোথায় এলো। এখানে সব কিছুই রাজকীয় ও নবাবী। আয়েশা এ রকম ভাবেনি। এতো বড় বাড়ির কথাও ভাবেনি। এক বিঘার উপরে একটি তিনতলা বাড়ি। থাকেন শুধু দুজন মানুষ। মা ও ছেলে। কেয়ারটাকার হলো বাড়ির ম্যানেজার। সব মিলিয়ে বারো জন  স্টাফ। মা ছেলে পাশা পাশি দুই রুমে থাকেন।আয়েশার মেহমানদারির জন্যে সবাই ব্যস্ত। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর মা ও ছেলে নিচে নেমে আসেন। আরসালানের মা গুলে গুলশান এক জমিদারের মেয়ে। জমিদার সাহেব পরে নবাব হয়েছিলেন। আত্মঞরা সবাই তাঁকে গুল বেগম বা বড় বেগম বলে থাকেন। একজন স্টাফ এসে আয়েশাকে জানালো বেগম সাহেবা আসছেন। আপনি মাথা ঝুকিয়ে সালাম পেশ করবেন। ভুল যেন না হয়। গুলবেগম এসে প্রধান সোফাতে বসলেন। আয়েশা এগিয়ে গিয়ে কদমবুচি করে। গুলবেগম দাঁড়িয়ে আয়েশার কপালে চুমো খান। গলায় একটা চেইন পরিয়ে দেন। দোয়া করি বেটি তুমি রাজরাণী হও। আমার বেটার কাছে তোমার কথা শুনেছি। তুমি নাকি খুব ভালো  ছাত্রী। ক্লাসে ফার্স্ট হও। ডিবেটে ফার্স্ট হয়েছো। তুমি রূপে গুণে  এক নম্বর আছো। বেটি তুমিতো কিছুই বলছোনা। কোন সংকোচ করোনা। যখন ইচ্ছা হবে চলা আসবে।  বেটা না থাকলেও আসতে পারো। আমি তোমার সাথে গল্প করবো। আমিতো একাই থাকি। তোমার নাম কি বেটি। জ্বী, আয়েশা আখতার। ঢাকায় কোথায় থাকো। জ্বী শ্যামলী। আমার খালার বাসায়। আরসালান মাকে বললো ,  একদিনেই সব জেনে ফেলবে নাকি। দেখছোনা আয়েশা শরমে মূখ নামিয়ে রেখেছে। ওকে ছেড়ে দাও।  স্যার আমি এখন যাবো। তোমার কি তাড়া আছে। আয়েশা চুপ করে থাকে। এমন সময় দুই ট্রলিতে কুড়ি রকমের নাশতা আসে। বলো এবার কি করবে। বেটা আরসু তুমিই বেটিকে নাশতাটা হতে তুলে দাও। আমি অতি সাধারন একটি মেয়ে। আমিতো শরমে মরে যাচ্ছি। এতো যত্ন, এতো মেহমানদারি। আমিতো ভাবতে পারছিনা। দেখো বেটি এটা আমাদের খানদানী রেওয়াজ। মেহমানের খেদমত করা। ধরে নাও এটা আল্লাহর তরফ থাকে মেহমানদারি। দেখুন খালাম্মা আমি এর যাগ্য নই। দেখো বেটি তুমি আমাদের সম্মানিত মেহমান। আয়েশা তুমি তোমার পছন্দ মতো নাশতা তুলে নাও। তুমি চাইলে আমিও তুলে দিতে পারি। স্যার এতো নাশতা। বুঝতে পারছিনা কোনটা নেবো, কি নেবো।  সংকোচ করোনা। নিজের বাড়ি মনে করেই নাও। স্যার আমিতো সাধারন পরিবারের মেয়ে। এতো মেহমানদারী জীবনে দেখিনি। মেহমানদারী কাকে বলে আজ দেখলাম। এখন সামান্য কিছু নাও। তোমার জন্যে লাঞ্চ তৈরি হচ্ছে। লাঞ্চ করে তারপর যাবে। খালারা চিন্তা করবেন। ফোন করে দাও আর নাশতা সেরে আমরা ডিবেট নিয়ে কথা বলবো। বইটা পড়েছো? শুরু করেছি। আজ বিস্তারিত আলোচনা করতে পারবোনা। যা পড়েছো তা নিয়ে আলোচনা করবো। নাশতা সেরে চা কফি কি নেবে। স্যার আমিতো চা কফি খাইনা। বাসায়ও খাওনা? না স্যার। তাহলে চকোলট ড্রিংক্স নাও। আমি কফি খাই। চকোলেট ড্রিংক্স ও পছন্দ করি। এখন আর কিছু খাবো না।

স্যার বাইরে আমাদের সিএনজি ড্রাইভার আছে। ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। সবই রেওয়াজ মোতাবেক চলছে। তবুও তুমি যখন বলছো দেখি। আরসালান কেয়ার টেকার রহীম মিয়াকে ডাক দেয়।জ্বী হুজুর। বাইরে যে মেহমান আছে তাকে দেখছোতো। জ্বী  হুজুর সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাঁর বিশ্রামের ব্যবস্থা করো। তিনি দুপুরে এখানে খাবেন । কোন অযত্ন যেন না হয়। খেয়াল রেখো। জ্বী হুজুর।

তোমার গ্রামের বাড়ি কোথায় যেন বললে। গ্রামের বাড়ি জয়কৃষ্ণপুর। জামালপুর শহরেও একটি বাড়ি আছে। বাবা আসা যাওয়া করেন। আমি মা ও আমার ভাই শহরেই থাকি। আমি শহরে থেকেই কলেজে পড়েছি। বাবা ঢাকা পাঠাতে রাজী হননি। আমার কলেজের স্যারদের চাপে পড়ে বাবা রাজী হয়েছেন। বাবা চেয়েছিলেন বিয়ে দিয়ে দিতে। বাবা খুবই পুরাণপন্থী। খুবই মেজাজী। শেষ পর্যন্ত ঢাক আসতে পেরেছি। ঢাবিতে চান্স পেয়েছি। আমার ইচ্ছা ছিল পল সায়েন্সে পড়া। আমার সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। বাবা হলে রাখতে রাজী হয়নি। তাই খালার সাথে থাকি। বাবা নিয়মিত টাকা পাঠান। খালাও পড়ার খরচ চালাতে রাজী ছিল। কিন্তু বাবা খালুকে  বললেন তুমি চাকুরীজীবী মানুষ। এ চাপ নিতে পারবেনা। খালুর খুব ইচ্ছা ছিল পড়ার খরচ চালাতে। বাবা কিছুতেই রাজী হলেন না। বাবা একটা সিএনজিও কিনে দিয়েছেন। তোমার বাবার এ সিদ্ধান্তটা ঠক হয়নি। একটা ছোট খাট  গাড়ি কেনা যেতো। আমিই বলেছি সিএনজি কিনতে। ইতোমধ্যে আমি ড্রাইভিং শিখে নেবো। তারপর গাড়ি কিনবো। তোমার এ সিদ্ধান্ত আমি সমর্থন করি। স্যার সিএনজিটা ভাড়া দিয়ে রেখেছি। আমাকে আনা নেয়া করে। বাকি সময় ড্রাইভার নিজে চালায়। অন্য সময় আমার দরকার হলে আগে বলে রাখি। যেমন আজতো সারাদিন আমার সাথেই আছে। আমাদের এলাকার ছেলে। বাবাই ঠিক করেছেন। সে মন্দ কিছু করার সাহস করবেনা। এবার বলো তোমার ডিবেটের কথা। বইটা তাড়াতাড়ি শেষ করো।  প্রাইভেট এন্ড পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় একশ ছেলে মেয়ে ডিবেটা অংশ নিবে। মেয়েদের সংখ্যা বেশী।  তোমার জন্যে খুবই টাফ হবে কিনা ভাবছি। না স্যার ও নিয়ে ভাববেন না। আমি  ইংরেজীতে বলবো। আপনি আমাকে ভাল করে উচ্চারন শিখিয়ে দিবেন। দরকার হলে একজন ভাল শিক্ষকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। সেটা আমার মাথায় আছে। আমি ভিসি স্যারকে বলবো। তিনিই সব ব্যবস্থা করবেন। তিনি তোমার জন্যে ইতোমধ্যে ভাল একটা ফান্ড বরাদ্দ করেছেন। তুমি শুধু প্রিপারেশন নাও। যত বই দরকার হবে কিনতে পারবে। ভিসর স্যার একটি টীম গঠণ করেছেন। তোমাকে তৈরি করবে সবাই মিলে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের একজন ব্রিটিশ টিচারও আছেন  ওই টীমে আছে। ইংরেজী বলার স্টাইলটা তিনি তোমাকে শিখাবেন। এবার বলো তুমি কি ভাবছো। স্যার আমি ভাবতে পারছিনে। এটাতো আমার কল্পনার বাইরে। আমার ইচ্ছা আছে। কল্পনা আছে। কিন্তু তা এতো তাড়াতাড়ি বাস্তব হবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। আপনিতো আমাকে বিশ্ব দরবারে হাজির করার স্বপ্ন দেখছেন। আপনার ঋণ এ জীবনে শোধ করতে পারবোনা। মা বাবা আর শিক্ষকের ঋণ কি কেউ শােধ করতে পারে। এটা আমার জন্যে বিরাট গৌরবের বিষয় যে আমি তোমার মতো একজন চৌকশ মেধাবী ছাত্র পেয়েছি। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যেও গৌরবের বিষয়। তুমি সেকেন্ড ইয়ার থেকে থার্ড ইয়ারে উঠার পরীক্ষা না দিলেও চলবে। বিনিময়ে ডিবেটে তোমাকে চ্যাম্পিয়ন হতেই হবে। তুমি ডিবেটের জন্যে একশ ভাগ সময় মনোনিবেশ করো।  তুমি কি তোমার সাফল্য নিয়ে কিছু ভাবছো। ভয় পাচ্ছো। একেবারেই ভয় করোনা। তুমি জিতবেই। স্যার আপনি আমার জন্যে দোয়া করবেন । তোমার চেষ্টাই প্রধান। তারপর আল্লাহর সহযোগিতা  ও মা বাবা মুরুব্বীদের দোয়া। লম্বা ছুটিতে গ্রামে থাক নাকি। না স্যার। এখানে থাকলে পড়ালেখা ভাল হয়। তোমার খালার বাসায় পড়ালেখার পরিবেশ কি রকম। খুব ভালো স্যার। আমার জন্যে একটা রুম আলাদা। এটাচ্ড বাথারুম আছে। খালা আমার খুব যত্ন নেয়।

হুজুর বড় বেগম সাহেবা এখনি নামবেন। আপনাকে বলেছেন মেহমানকে নিয়ে টেবিলে যেতে। আরসালান আয়েশাকে নিয়ে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। বসার নিয়ম নেই। বড় বেগম বসলে তারপর অন্যরা বসবে। মা আসসালামু আলাইকুম। ওয়ালাইকুম সালাম বেটা। ভাল আছো। বসো বেটি, আমার পাশে বসো। কাছে টেনে নিয়ে বসালেন । হাতের আংগুল দেখলেন। তোমার আম্মা আব্বা কেমন আছেন। জ্বী, সবাই ভালো। এখানে কোথায় থাকো। জ্বী খালার বাসায়। বেটা আরশু, আয়েশা বেটি কি খায় জেনে নিয়েছিস। না মা। টেবিলে আছে। ও নিজের পছন্দ মতো তুলে নিবে। তা হয়না বেটা। মেহমানের পাতে খাবার তুলে দিতে হয়। ওতো মেয়ে মানুষ। লাজুক।  তোমার ডাক নাম কি আছে বেটি। জ্বী, বিন্দু। আমার মা এই নামেই ডাকে। খুব  ভালো বিন্দু বেটি। মিস্টি নাম। হুরমত বেগম বিন্দু বেটিকে খানা তুলে দাও। আরশু বেটা তুমিও দেখো। জ্বী, দেখছি। বলো আয়েশা কি নিয়ে শুরু করবে। জ্বী স্যার , এতো কিছু কেমন করে খাবো। তোমার পছন্দ মতো খাও। আগে অল্প পোলাও নাও। ঠিক আছে স্যার। অল্প কোরমা নাও। তারপর তোমার পছন্দ মতো খাও। বেটি তোমার কি খানা পছন্দ বলো। আরেকদিন তোমাকে খাওয়াবো। আমাকে তুমি খালাম্মা বলে ডেকো। আমি খুশী হবো। জ্বী ডাকবো। তোমার বাড়ির কথা আরেকদিন শুনবো। মা আয়েশার বাড়ির কথা তোমাকে আমি পরে শুনাবো। ঠিক আছে বেটা আরসু। বুঝলে বিন্দু বেটি আমাদের বাড়িতে আত্মীয় স্বজন তেমন কেউ আসেনা। সবাই দূর দূর থাকে। মেয়েরা আমেরিক থাকে। পাকিস্তান ও ইন্ডিয়াতেও আত্মীয়রা থাকে। এখানে ঢাকায় দুয়েক জন থাকে। আরসু বেটা ইউনিভার্সিটি চলে গেলে আমি খুব একা হয়ে যাই। বই পড়ি আর গালিবের গজল শুনি। সময় কাটেনা। বিদেশ থেকে মেয়েরা ফোন করে। আরসু না থাকলেও এসো। জ্বী খালাম্মা, আসবো ছুটির দিন। আমাকে ফোনে জানিয়ে দিও। আমার ফোন নাম্বার সেভ করে রাখো। তোমার নাম্বারও আমাকে দিয়ে যেও।এরপর আয়েশা অল্প সাদা ভাত আর মাছ নেয়। সব শেষে ইরাণী শিরনী।

বেলা তিনটা।  আয়েশা বাসায় ফিরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গুল বেগম আয়েশাকে দোতলায় নিয়ে যায় নিজের রুমে। দেখ বেটি আমি এই রুমে থাকি। একটা মেয়ে আছে খাস করে আমার খেদমত করে। খুব ভালো মেয়ে । ওর স্বামী গ্রামে থাকে । আমি বাড়ি করে দিয়েছি। মাসে একবার ঢাকায় আসে। আমি মাসের টাকা ওর স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দিই। বাকি সব কাজের লোক নীচে থাকে। বেটা আরসু এর উপরে একটা কামরায় থাকে। ওখানে সহজে কেউ যায়না না ডাকলে।  ওখানে কফি চা বানাবার মেশিন আছে। ও নিজেই বানিয়ে নেয়। আরেকদিন তোমাকে পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাবো। বেশ ভালো একটা বাগান আছে। অনেক ভালো গোলাপ আছে। নানা রংয়ের গোলাপ। আরসুর আব্বাজানের খুব পছন্দ ছিল সাদা গোলাপ। তিনি ইরাণ থেকে আনিয়েছিলেন। আমার আব্বাজান নবাব ছিলেন। আরসুর আব্বাজান ছিলেন আইসিএস অফিসার। পাকিস্তানে আসার পর হয়ে গেলেন সিএসপি। সত্তুর সালে রিটায়ার করে ঢাকায় থাকে যান। বারিধারাতে বাড়ি করেন। তখন এখানে এতো বাড়ি ছিলনা। অনেক গাছে ছিল। নিরিবিলি ছিল। তাই সাহেব ঢাকাকে পছন্দ করেছেন। এখানে মানুষ খুব ভালো। পাকিস্তানের মানুষ একটু খটখটে। পাহাড় পর্বতের মানুষতো। যেমন মক্কা আর মদিনার মানুষের ভিতর অনের ফারাক। খালাম্মা আপনি অনুমতি দিলে আমি এখন বাসায় ফিরতে চাই। কেমন ইচ্ছা হচ্ছে তোমাকে এখানে রেখে দিই। যাক তবু এজাজত দিলাম। কিন্তু বাসায় ফিরবে আমাদের গাড়িতে। না খালাম্মা। আমি সিএনজি নিয়েই ফিরবো। এ ব্যাপারে আপনার অনুরোধ রাখতে পারবোনা। মাফ করে দিবেন। আপনি মায়ের মতো। ঠিক আছে। আজকের জন্যে এজাজত দিলাম। এরপর আসলে আমার সাথে থাকবে। জ্বী ঠিক আছে। গুল বেগম আয়েশার হাতে অনেক গুলো গিফট তুলে দেয়। খালা খালু আর ওর নিজের জন্যে।

বিকেল চারটার দিকে আয়েশা শ্যামলীতে খালার বাসায় পৌঁছে। সিএনজি ড্রাইভার রুহুল জানতে চাইলো আপু আপনার স্যার কি নবাব? না কেন? এ রকম খানদানী বাড়িতে আমি জীবনে কখনও আসিনি। আমাকে যেভাবে মেহমানদারী করলো আমি এ জীবনে ভুলতে পারবোনা। আমাকে পাজামা পাঞ্জাবী গিফট দিয়েছে।ঘরে ঢুকেই খুশীতে আয়েশা খালাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। কিরে হয়েছে। ভয় পেয়েছিস নাকি । ব্যাচেলর স্যারের বাসায় কেউ এতোক্ষণ থাকে। বলবো খালা ,পরে সব বলবো।খালুজান আসুক। এক সাথে শুনো। অবাক বিস্ময়কর বাস্তব গল্প। জীবনে দেখিনি শুনিনি। এই দেখো তোমাদের গিফট। এই আমার গিফট। মাথা খারাপ হওয়ার মতো। কি দেকলাম। মনে হয় স্বপ্ন।খালুজান এখনি আসবেন। চা খেতে খেতে বলবো।  এমন সময় মাহমুদ সাহেব বাসায় ঢুকেন। সবাইকে হাসিমুখ দেখেই জানতে চেয়েছেন। কি হয়েছে। খালুজান আগে হাত মুখ ধুয়ে আসেন। চা খেতে খেতে বলবো। তাই খালাকে এখনও কিছু বলিনি। খালাম্মা চা দিতে বলেন। কিছু বিস্কুট দেন।

সবাই টেবিলে। খালুজান আপনি কি জানেন আজ আমি আর স্যার ডক্টর আরসালানের বারিধারা বাড়িতে গিয়েছিলাম সকাল এগারোটায়। আগে বুঝতে পারিনি ডক্টর আরসালান কে? তিনি কেবলই ঢাবির একজন শিক্ষক নন। নামকরা নবাবের নাতি। মা গুলশান বেগম নবার সাহেবের মেয়ে নবাবজাদী। আরসালান সাহেবের বাবা একজন আইসিএস অফিসার। সেক্রেটারী হিসাবে রিটায়ার করেছেন। বারিধারায় এক বিঘার উপরে একটা তিনতলা বাড়ি। মাত্র দুজন বাসিন্দা। বারোজন কাজের লোক। দুজনের খেদমতে বারোজন। বিরাট ফুলের বাগান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো তাদের কালচার ম্যানার্স। জীবনে প্রথম এ রকম খানদান দেখলাম। আমার কি যত্ন নিয়েছে ভাষায় বলে বুঝাতে পারবোনা। আরসালানের তোর প্রতি কোন দূর্বলতা আছে ? জানিনা খালাম্মা। একেবারেই নতুন পরিচয়। ডিবেটকে কেন্দ্র করে নিয়মিত কথা হচ্ছে। তিনি ডিবেটের জন্যে আমার গাইড। ভার্সিটিতে বুঝা যায়না তিনি অত বড় খানদানের ছেলে। এতো সাদাসিধে জীবন অন্য শিক্ষকদের নাই। সবার পোজপাজ আছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের। মনে হয় সবাই নবাব নন্দিনী। তুই কিছুই আঁচ করতে পারিস না। না বুঝতে পারছিনা। না খালা আমরা খামাখা ওই ভাবে ভাবছি। ও রকম পরিবারে আমরা বেমানান।  তা ছাড়া উনি চাইলেই আমি রাজী হবো কেন। আমি অনেকদূর এগোতে চাই। আমাকে ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন করার জন্যে তিনি কাজ করছেন। ডিবেটের বিষয়টা শেষ হয়ে গেলে দেখা যাবে উনি কি ভাবছেন। তবে গুলশান বেগমের আদর যত্নে আমি মোহিত। চেহারা সুরতে আমার মায়ের মতো। ফারাক শুধু খানদান আর শরাফতি। বাংলাদেশে তাঁর মতো দ্বিতীয় কোন নারী আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। এক কথায় বলা যেতে পারে মহা খানদানি মহিলা। বলেছেন, তোমার স্যার না থাকলেও তুমি এসো। আমার সাথে দিন কাটাবে। আমি গাড়ি পাঠিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবে। আবার পাঠিয়ে দেবো। খালুজান

আপনার গিফট টা পছন্দ হয়েছে। খুবই ভালো। ওরা ধনী মানুষ । তার উপর নবাবের মেয়ে। দিলতো বড় হবেই। এরা বাসায়  গিফট কিনে রাখে। নিকটজন কেউ গেলেই গিফট দেয়। হয়তো এটা তাদের খানদানী রেওয়াজ। আরও কিছুদিন যাক,তখন বুঝতে পারবি। যদি কোন প্রস্তাব দেয় তাহলে বলতে হবে আমরা খুবই সাধারন পরিবার ঢাকায় কোন বাড়ি নাই। কখনও দরকার হয়নি। সব জানলে হয়ত তারাই পিছিয়ে যাবে। যাক পিছিয়ে তাতে কিছু আসে যায়না। তুই একদিন বিখ্যাত হবি। তখন এসব খানদান তোর কাছে  ম্লান হয়ে যাবে। চিন্তা করিসনা এসব নিয়ে এখন। তবে আসা যাওয়া রাখ। ডিবেট শেষ হলে পড়ালেখার দিকে মন দিবি। অনার্স ও মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হতে হবে। কিছুদিন ঢাবিতে শিক্ষকতা করে বিদেশ যাবি পিএইচডি করার জন্যে। তখনকার পরিস্থিতি কি হবে তাতো আজ বলা যাবেনা।তোর ডিবেট কখন?  জানুায়ারীর শেষ তারিখে। ডিবেটের উদ্যোক্তা হচ্ছে ইউএনডিপি। বাংলাদেশ থেকে একজন সিলেক্ট করবে।  খুবই টাফ কম্পিটিশন হবে। নর্থ সাউথ সব সাপোর্ট দিবে। জানুয়ারীর পনেরো তারিখে সবাইকে ক্যাম্পে যেতে হবে। বৃটিশ কাউন্সিল ক্যাম্পের অফিসিয়াল গাইড এন্ড নিয়ন্ত্রক। ছয়টা গ্রুপে ভাগ করা হবে প্রতিযাগীদের। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বাছাই করে ফাইনালে নেয়া হবে। আমেরিকাতে যেতে হবে একমাস আগে। সেখানেও আন্তরাস্ট্র প্রতিযোগিতা হবে।  ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ক্যাম্প হবে। ষাটটি দেশ অংশ গ্রহণ করবে। একমাস ব্যাপী প্রতিযাগিতা চলবে। আমাদের দেশের পাঁচজন ইংরেজীর শিক্ষক যাবেন চ্যাম্পিয়ন প্রতিযাগীকে নিয়ে। তাঁরা চ্যাম্পিয়নকে কোচিং করবেন। এখানে কোন গ্রুপ থাকবেনা। দুজন করে মুখোমুখি মোকাবিলা হবে। ডক্টর আরসালান আমার প্রধান ও একমাত্র গাইড। বাকি যারা যাবেন তাঁরা বাংলাদেশের গাইড গ্রুপ। প্রতিদিন সকালে ডাক্তার এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন। এরপরে রয়েছে ম্যানার্স এটিকেট ড্রেস বিষয়ক উপদেস্টা আছেন প্রত্যেকের সাথে একজন করে। ডায়াটিশিয়ন ও থাকবেন। ইনি প্রতিযাগীরদের সৌন্দর্য দেখবেন। সৌন্দর্য বিষয়ে প্রয়োয়োজনীয়  পদক্ষেপ নিবেন। আমেরিকায় এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হবে। এখন বল তোর কনফিডেন্স কেমন। খালা আমিতো গ্রামের মেয়ে। এখানে এসেই ঢাবিতেও ভর্তি হয়ে গেছি। সব কিছু এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। ইন্টার ডিপার্টমেন্ট ডিবেটে বেশী প্রতিযোগী ছিলনা। ছেলেরা এসব বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয়না। তাই আমি ফার্স্ট হয়ে গেছি।  তুমিতো জানো আমি কলেজের ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। পরে কলেজ ডিবেট কমিটির সভাপতি ছিলাম। তখনও কলেজের প্রিন্সিপাল সাহেব আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। পুরো কলেজের ছাত্ররা আমাকে চিনতো এবং সম্মান করতো। শুধুমাত্র ডিবেটের কারণে আমার পড়ালেখার খরচ ফ্রি করে দিয়েছিলেন। তবে ঢাবিতে আরও বেশী ছাত্র অংশ নিলে আমি হয়ত চ্যাম্পয়ন হতে পারতামনা। এটা যে আন্তর্জাতিক প্রতিযাগিতা তা ছেলেরা তখন বুঝতে পারেনি। আমারও ভাগ্য ভালো সুযোগটা পেয়ে গেছি। এ ব্যাপারে আমাকে সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন ডক্টর আরসালান। তাঁর স্বপ্ন আমাকে ওয়ার্লড চ্যাম্পিয়ন করবেন। তাঁর কারণেই পলসায়েন্সের চেয়ারম্যান স্যারও উত্‍সাহী হয়ে উঠেছেন। উনিই ভিসি স্যারকে এ ব্যাপারে সকল প্রকার সহযোগিতা করার রাজী করিয়েছেন। ভিসি স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে কথা বলেছেন। উত্‍সাহ দিয়েছেন। বলেছেন, তোমাকে অবশ্যই চ্যাম্পিয়ন হতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম আরও বৃদ্ধি করতে হবে। কিছুদিন ক্লাস না করে ডিবেটের ব্যাপারে নজর দাও। আমি নিয়মিত মনিটরিং করছি। এ ক’দিন তোমাকে সুস্থ থাকতে হবে। কিছুর প্রয়োজন হলে আমার সাথে সরাসরি কথা বলতে পারো। আমি পিএসকে এখনি বলে দিচ্ছি তোমার দেখা করার ব্যাপারে। আমাদের খুব আশা ও ভরসা তোমার  উপর। তোমার ব্যাপারে স্পেশাল কেয়ার নিবেন ডক্টর আরসালান। তিনি খুব মেধাবী শিক্ষক। বিদেশ থেকে দেশে এসে শিক্ষকতা করছেন দেশের টানে। এছাড়া তিনি খুবই খানদানী শরীফ পরিবারের সন্তান। তিনি তোমার প্রধান গাইড। তিনি যেভাবে বলবেন সেভাবে চলবে।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইংরেজী ভাষাবিদ ডক্টর উইলিয়াম ক্রস  এক সপ্তাহ আয়েশার দেখাশুনা করবেন। বিশ্ববিদ্যায় ক্রসকে নিয়োগ দিয়েছে। আয়েশা প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ব্রিটিশ কাউন্সিলে থাকে ক্রসের চেম্বারে। দুপুরে দুজন একসাথে খায়। এটা একটা পরিশ্রমী প্রোগ্রাম। স্পেলিং ও প্রনানসিয়েশান ট্রেনিং শুরু হলো।  এরপর চলবে ম্যানার্স এন্ড এটিকেট ট্রেনিং। ক্রস আয়েশাকে বললেন, ইউ মাস্ট ফিল দ্যাট ইউ আর এ ইংলিশ স্পিকিং লেডি। ইউ মাস্ট ওয়াক লাইক এ ইংলিশ লেডি। আসুন আয়িশা, আপনি এখানে দাঁড়ান। ভাবুন এটা একটা বড় হল। আপনার সামনে এক হাজার শ্রোতা আছে। সবাই আপনাকে দেখছেন ও শুনছেন। টিভিতেও আপনাকে দেখানো হচ্ছে।  আপনি আপনার বক্তৃতা শুরু করুন। অবশ্যই মনে রাখবেন এখানে সবাই বিদেশী শ্রোতা ও বিচারক। কি মনে হলো স্যার। ভালো। আরও ইম্পরুভ করার অনেক সুযােগ আছে। কিভাবে শুরু করবেন, কি ভাবে দাঁড়াবেন, কিভাবে হাঁটবেন, কিভাবে পোষাক পরবেন, কিভাবে মেকআপ নিবেন এসব বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দিতে হবে। একজন বিউটিশিয়ান আসবেন। তিনি আপনাকে কিভাবে মেকআপ করবেন দেখিয়ে দিবেন। আপনাকে দেখে সবাই যেন মুগ্ধ হন। সবাই যখন হাত তালি দিবেন তখন আপনি হাত তুলে সবাইকে ধন্যবাদ জানাবেন। কিভাবে ঢুকবেন ও হাত তুলে নাড়বেন সেটা আপনাকে শিখিয়ে দেওয়া হবে।

ডায়েটিসিয়ান মিস নুশরাত এসেছেন ব্রিটিশ কাউন্সিলে আয়েশার সাথে দেখা করতে। আয়েশা  ডক্টর ক্রসের রুমে নোট নিচ্ছিলো। ক্রস এ যাবত যতগুলো লেকচার দিয়েছেন তার বিস্তারিত তার বিশদ  কপি করে নিচ্ছেন। রাপোটিয়ার আগেই রেকর্ড করে রেখেছিলেন। সে গুলো আয়েশ এখন ল্যাপটপে সেভ করে রাখছেন। দেশের বাইরে গেলে পুরো নোট খুব কাজে লাগবে। মিস নুশরাত  দরজা নক করলে আয়েশা উঠে আসে। ওয়েলকাম মিস নুশরাত। আমরা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি। আয়েশা আপনাকে আগামী একমাস কিছু ফ্রি এক্সারসাইজ করতে হবে । আমি একটা খাবার তালিকা দিয়ে যাচ্ছি। এটা খুব দৃঢতার সাথে ফলো করবেন।  আপনার ওয়েট কিছুতেই পঞ্চাশ কেজির বেশী হতে পারবেনা। ফ্যাট হয় এমন খাবার মোটেই খেতে পারবেন না। আপনার বডি স্ট্রাকচার খুব ভালো। এখন যেমন আছে সে রকমই রাখতে হবে। যেদিন আমেরিকা যাবেন সেদিন ওয়েট পঞ্চাশ কেজিই থাকবে।

বিকেল পাঁচটার দিকে আয়েশা বাসায় পৌঁছায়। খালা দরজা খুলে দেন। ভিতরে ঢুকে আয়েশা সোফায় গা এলিয়ে দেয়। খুব টায়ার্ড লাগছে। কিরে ঘুমিয়ে পড়বিতো।  যা হাতপা ধুয়ে আয়। কিছু মুখে দিয়ে তারপর বিশ্রাম নে। তোর খালু ছটার দিকে ফিরবেন। আমি কিছু নাশতা তৈরি করছি। খালা  কি আর বলবো তোমাকে।  ডিবেটের জন্যে যে এ রকম ট্রেনিং তা এর আগে কখনই শুনিনি। মনে হচ্ছে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে যাচ্ছি। চিন্তা করতে পারো,আমি অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে। যাচ্ছি সুন্দরী প্রতিযাগিতায়। স্যার বলেছেন ,যে কোন বিষয়ে যুক্তি তর্ক বা ডিবেট শুধুমাত্র জয়ের বিষয় নয়। যে বিষয়ে যুক্তি উপস্থান করবে তা অন্তর থাকে বিশ্বাস করো। তাহলে তুমি জিতবেই। বিশ্বাসকে জয়ী করাই হচ্ছে জীবনের তর্ক।

স্যার বলেছেন, আয়েশা তোমার চোখে মুখে আমি আলো দেখেছি। তুমি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। প্রথম দেখাতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম তুমি দেশের নাম উজ্জ্বল করবে। তোমার ভাগ্য অত্যন্ত সুপ্রসন্ন।  পুরো ঢাবি প্রশাসন তোমাকে সাপোর্ট দিচ্ছে।  বাংলাদেশে তুমি চ্যাম্পিয়ন হবে এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমি চাই তুমি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হও। আরেকটা মনে রাখবে তোমার ট্রেনিং প্রসেস নিয়ে কারো সাথে আলাপ করবেনা। তোমার ডিপার্টমেন্টের ছেলে মেয়েদের সাথেও আলাপ করোনা। এ ট্রেনিং ব্যবস্থা শুধু তোমার জন্যে। খুবই স্পেশাল একটা একটা ব্যবস্থা। যুক্তি তর্কে তুমি সারা বিশ্বের প্রতিযাগীদের হারাবে। ছটার সময়ে আয়েশার খালু মাহমুদ বাসায় ফিরেন। সবার সাথে কুশল বিনিময় করে নিজের রুমে যান। ড্রেস চেঞ্জ করে ওয়াশরুম সেরে ফ্যামিলি লাউঞ্জে আসেন। এবার তোমাদের আনন্দের কারণ বলো। আমাদের বিন্দুতো প্রতিদিনই নতুন খবর নিয়ে আসে। আজ কি নতুন খবর। না খালুজান নতুন কোন খবর নাই। খালাজানের সাথে ডিবেটের ট্রেনিং প্রসেস নিয়ে কথা বলছি। আপনি ভাবতেও পারবেন না এটা কি ধরনের আন্তর্জাতিক ডিবেট।এখন বিউটি ট্রেনিং হচ্ছে। হেলথ এডভাইস হচ্ছে। এর আগে কখনও শুনেছেন ডিবেটের সৌন্দর্যের সম্পর্ক। আমিতো কখনই ডিবেটে অংশ অংশ গ্রহণ করিনি। এমবিএ পাশ করে সোজা চাকুরীতে। চাকুরী একটা এক ঘেঁয়ে জীবন। দেখোনা সকালে বেরিয়ে যাই সন্ধ্যায় ফিরি। তুমি আসার পর এখন ছুটির দিনে একটু বাইরে বেড়াতে যাই। মাঝে মধ্যে বাইরে খাই। দেখো ফারজানা, বলেছিলাম না এ মেয়েটা ঢাকায় পড়তে পারলে একদিন বিখ্যাত হবে। দেশে বিদেশ নাম হবে। দুলা ভাইতো ঢাকায় পাঠাতেই রাজী ছিলেন না। কোন ধরণের যুক্তি মানতে চাননা  একেবারেই পুরাণপন্থী গোঁরা মানুষ। গ্রামের সালিশ করে আরও গোঁড়া হয়ে গেছেন। তাঁর ধন জন থাকাতে জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন।  এখনতো মেয়ের সাফল্যে খুবই খুশী। আমরাও খুশী। আয়েশা তোর স্যার ডক্টর আরসালানের খবর কি? বেশ  কদিন হলো স্যারের সাথে দেখা হয়না। আমিতো সকালে ব্রিটিশ কাউন্সিলে যাই। বিকেলে বাসায় ফিরে আসি। এক সপ্তাহ ওদিকে  যাওয়া হয়না। ফোনে কথা হয়। স্যারই ফোন করেন। খোঁজ খবর নেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ট্রেনিংয়ে উপকার হচ্ছে কিনা। বলেছি, স্যার খুব উপকার হচ্ছে। এ  ট্রে নিং সারা জীবন কাজে লাগবে।

সপ্তাহ খা্নেক পার আয়েশা ডিপার্টমেন্টে যায়। বন্ধুরা সবাই ঘেরাও করে ধরে। কিরে তুইতো দেখছি বিশ্ব সুন্দরী হয়ে যাবি। এ কদিনেতো অনেরক সুন্দর হয়ে গেছিস। বলতো দেখি রহস্য কি? কোন রহস্য নাই। সবাই মনে করছে আমি ইন্টার ভার্সিটি ডিবেট কম্পিটিশানে চ্যাম্পিয়ন হবো। ওই মনে করা থেকে ভিসি স্যার আমার স্পেশাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ট্রেনিং নিচ্ছি। ডক্টর ক্রস আমাকে ট্রেনিং দিচ্ছেন। বিদেশে কিভাবে ডেবিটে অংশ নিতে হয়। সেজন্যে  সব ধরনের ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। সেখানে মেকআপ ও ড্রেসের ব্যাপার আছে। ল্যাংগুয়েজ ও স্পেলিংয়ের বিশেয ট্রেনিং হচ্ছে। আমি বলেছিলাম আগে ইন্টারভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন হই। তারপর বিদেশের ব্যাপার। স্যারেরা বিদেশের ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁরা মনে করছেন বিদেশে খুব যাওয়ার সময় খুব পাওয়া যাবে। এখন বল তোরা কেমন আছিস। আমরা সবাই ভাল আছি। এবার ডক্টর আরসালানের কথা বল। স্যারের সাথে অনেকদিন দেখা হয়নি,কথা হয়নি। এছাড়া স্যারের সাথে আমার কোন স্পেশাল সম্পর্ক নাই। তিনি আমার ডিবেটের প্রধান গাইড।  একটা বিশেষ ডিবেট কমিটি গঠণ করা হয়েছে। তাঁরাও আমাকে গাইড করেন। তুই কি মনে করিস। স্যারেরা মনে করেন আমি চ্যাম্পিয়ন হবো। আমিও মনে করি ও আশা করি। আয়েশা তুই সত্যিই ভাগ্যবতী । মাত্র দুবছরেই সারা বিশ্ববিদ্যায়ে নাম করে ফেলেছিস। এটা কল্পনাও করা যায়না। এইচএসসিতে যারা স্ট্যান্ড করেছে তাদের কোন পাত্তা নাই। সব ডিপার্টমেন্টের মেধাবীরাদের কোন খোঁজ খবর নাই। অথবা বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। আমি নিজেও মনে করি ছেলেরা যদি সিরিয়াস হতো তাহলে আমি কোয়ালিফাই করতাম না। এখন সব চাপ আমার উপর। গ্রাম থেকে এসে এ রকম লাইমলাইটে আসা আমার জন্যে একটা বোঝা। তোরাতো শহরের মেয়ে। আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে তোরা। শহুরে ভাবসাব আমি বুঝিনা। তোদের বাপ দাদারা শিক্ষিত। শহরে নিজেদের  বাড়ি আছে। আমি একেবারেই গেঁয়ো। জোর করে পড়ার জন্যে ঢাকা এসেছি। এর ঢাকা দেখিনি। আমার বাবা খুবই রক্ষণশীল। মেয়েদের পড়ালেখায় বিশ্বাস করেননা। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়াতে বিশ্বাস করেন। তাঁর বিশ্বাসের সাথে যুদ্ধ করে আমি জিতেছি। তাই এখন আমি ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র। তোদের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। এ কদিনতো ক্লাস করতে পারছিনা। জানিনা ভাগ্যে কি আছে। আরে তুই অত ভাবিস না। তুই চ্যাম্পিয়ন হবে। পুরো ভার্সিটি তোর জন্যে কাজ করছে। কেউ কেউ হয়ত ঈর্ষা করছে। তাতে কিছু আসে যায়না। এমন কি তুই ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হয়ে যেতে পারিস। তোর দিকে এখন সবার স্পেশাল নজর। হাজার নজর থাকলেও কোন লাভ নেই । আমাকেতো পরীক্ষা দিতে হবে। ডিপার্টমেন্টে বহু মেধাবী ছেলে মেয়ে আছে। তারা নিয়মিত পড়ালেখা করে। আমিতো ডিবেটের নামে ফেঁসে গেছি। ক্লাস করতে পারছিনা। তার আগেতো তুই বিদেশ চলে যাবি। সেখানে এক দেড় মাস থাকবি। ওখানে যদি স্কলারশীপ পেয়ে যাস তাহলেতো আর আসতে পারবিনা। তখন দেখা যাবে। আমি অনার্স কম্প্লিট না করে যাবোনা।

বল এবার তোরা প্রেম করছিস কেমন। সুরাইয়া বললো আরে না না। প্রেম কোথায়? একটু আড্ডা দেয়া। ক্যাম্পাসে ক্লাশের ফাঁকে  যা। এর বাইরে খুব কম। ছুটির দিন দুয়েকটা ছেলে ফোন করে। যাদের গাড়ি আছে তারা গাড়ি নিয়ে হাজির হয়। তখন বের হই। এদিক ওদিক ঘুরে ভালো রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করি। তারপর বাসায় ফিরে যাই। আমিতো বলেই রেখেছি আনিসকে দেখ দোস্ত এটাকে প্রেম ভাবিস না। এখন আমরা মাত্র সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল দেবো। এখনি প্রেম মানায় না। আমার মা বাবা একটু লিবারেল বলে বের হতে দেয়। এছাড়া বাবা তোকে চিনে। তাই রাজী হন। এর বেশী আর কিছু না। অন্য কিছু ভাববিনা।  তবে কিছু মেয়ে আছে ধনীর ছেলেদের নাকে রশি দিয়ে ঘুরায়। ছেলেদেরও টার্গেট মেয়ে পটিয়ে লটরপটর করা। কেউ কেউ ফঁসে যায়। অনেক মেয়ে মনে করে ফাঁসলেও অসুবিধা কোথায়। ধনীর দুলালকে বিয়ে করলে অসুবিধা কোথায়। পড়ালেখার কি দরকার। এক কোটি টাকার মোহর ধরে রাখবো। লটরপটর করলে তালাক দিয়ে মোহর আদায় করে নেবো। নারে বাবা আমার এসব কথা শুনতেই ভয় লাগছে। এখন বাসায় চলে যাবো। কাল সকালে চেয়ারম্যান স্যারের দেখা করতে হবে। স্যার খবর দিয়েছেন।

বাসায় ফিরে আয়েশা বাবার কাছে ফোন করে। হ্যালো বাবা, আয়েশা বলছি। তোমরা কেমন আছো। তোমাদের জন্যে শুধু মন কাঁদে। আসার আগে বুঝতে পারিনি মন এমন করে কাঁদবে। নারে মা, মন কাঁদলেতো হবেনা। সিরিয়াসলি পড়ালেখা করতে হবে। ফারজানা আর মাহমুদ তোর দেখাশুনা ভাল করে করছেতো। তুমি কি বাড়িতে আছো। নারে মা। বাইরে আছি। বাবা, আমি মায়ের সাথে কথা বলবো। মাকে কতদিন বুকে ধরিনি। আমাকে ফেলে মা কেমন আছে। কেমন আর আছে, লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। বলে, কি দরকার ছিলো ঢাকায় গিয়ে মা বাপেরে ফেলে পড়ালেখা করার। এতো দূরে যে, দেখা করবো তার ও উপায় নাই। দে মা, তোর খালুকে দে। কি খবর দুলা মিয়া। কেমন আছো। জ্বী, ভালো আছি দুলা ভাই। আপনারা সবাই কেমন আছেন। তোমার আপা দিনরাত মেয়ের জন্যে কান্নাকাটি করেন। বলো বিন্দু কেমন আছে। দুলা ভাই খুব ভালো। সেতাে সারা বিশ্ববিদ্যালয় কাঁপিয়ে এখন দেশ কাঁপাতে যাচ্ছে। আপনারা জানেন না। না ,আমরা তেমন কিছু জানিনা। জামালপুরে লোকমুখে শুনি। দুয়েক জন আমাকেও বলেছে। তারা নাকি টিভিতে আয়েশা মাকে দেখেছে। তার কলেজের শিক্ষকরা নাকি সব জানেন। কলেজে মিষ্টি বিতরন  হয়েছে। তাঁরাতো আমাকে জানাতে পারতো।  তাঁরাতো আপনাকে ভালো চোখে দেখেনা। আপনি মেয়েদের স্বাধীনতা বিরোধী। মেয়েদের পড়ালেখার বিরোধী। সুযোগ পেয়ে আমাকে এতো কথা শুনালে দুলা মিয়া। এখনতো আমি আর আগের মতো নাই। আমি আমার মেয়ের গৌরবে গর্বিত। যতোদূর পড়তে চায় পড়াবো।  আপনার মেয়ে দুনিয়া ব্যাপী নাম করবে। বাংলাদেশে চ্যাম্পিয়ন হলে আমেরিকা যাবে। স্যারেরা তাকে নিয়ে যাবে। সব খরচ দিবে ভার্সিটি। বিন্দু ও অনেক টাকা পাবে। কেন, দুলা মিয়া। আপনার বিন্দু ভার্সিটিতে বিতর্ক প্রতিযাগিতায় ফার্স্ট হয়েছে। এখন সবাই তাকে চিনে। এবার সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে। স্যারেরা তার খুব যত্ন নিচ্ছে। আমার শালীকে একটু দাও। ওর মুখে একটু শুনি। কিরে ফারি দুলামিয়া এসব কি বলছে। হাঁ দুলাভাই, যা শুনছেন তা সবই সত্য। শুধু আমরা বিন্দুর জন্যে গর্বিত নই । পুরো ঢাবি তার জন্যে গর্বিত। অপেক্ষা করুন আর কটা দিন।দেখবেন ,আপনার মেয়ে বাংলাদেশের গৌরব। জামালপুর জেলা তাকে মাথায় নিয়ে নাচবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আমার জীবনে মামলা

আমার সাংবাদিকতা বা ছাত্র জীবন তেমন মসৃন ছিলনা। আমার মনও হয়ত প্রাকৃতিক ভাবেও শান্ত বা মসৃন নয়। ফলে সব সময় পুলিশ ও প্রশাসনের সাথে আমার দিন গুলি ভালও  যায়নি। তবে তখনকার অফিসারেরা এখনকার চেয়ে অনেক ভাল ছিল। আমার অন্তার জগতে মানবতা ছিল সদা জাগ্রত। মানুষের কষ্ট আমাকে খুবই বিব্রত করতো এখনও করে। আমি যে দেশ ও সমাজ কল্পনা করেছি আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। চিন্তার জগতে ছিল প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ।

সমাজে অন্যায় অবিচার তখনও ছিল ,এখনও আছে। তবে তখন ছিল ষাট ভাগ,এখন নব্বই ভাগ। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একশ’ভাগ দুর্ণীতিতে জড়তি। প্রশাসন ও সরকার তাদের অনুগত হয়ে থাকে। ক্ষমতার রাজনীতিতে দেশের চেয়ে দল বড়। সরকার মানে দল। কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সবাই দলদাস। স্বধীন বাংলাদেশ আজ সব কিছুতেই খন্ডিত। সাপ্তাহিক ফসল প্রকাশের পর প্রথম উকিল নোটিশ পাই নোয়াখালী সোনাপুরের সিনেমা হলের মালিকের কাছ থেকে। চিঠিপত্র কলামে ছাপা হয়েছিল হলের সিটে ছারপোকা আর পুরো হলে মশার জ্বালাতন। আমি নোটিশ পেয়ে সোনাপুর গিয়ে সিনেমা হলের মালিকের সাথে দেখা করে সুরাহা করি।

 

পিতা পুত্রীকে

তোমাকে আমি পেয়েছি সে খোদারই ইচ্ছা বা দয়া। এ এক বিস্ময় আমার জীবনে। আমি ভেবে পাইনা কেমন করে এমন হলো। আমাদের সম্পর্কে পুর্ণতা দেবার আশায় এ চিঠি লিখতে শুরু করলাম।

শুনেছি

এক

তখন আমি কোলে ছিলাম। বয়স হয়ত ছমাস। বড় বাড়ি বড় উঠান। জেঠাত বোনের কোলে ছিলাম। ঊঠানে পিচ্ছিল  খেয়ে তিনি পড়ে গেলে আমার উরুর হাড় ভেংগে যায়। প্রথম ছেলে অনেকদিন পর। আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। আর আমি জন্মেছি ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে। বিলম্বে সন্তান হওয়ার কারণে আমার মাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। বাবা তখন রেংগুনে থাকতেন। ভাংগা পায়ের কারণে আমি অনেক বিলম্বে হেটেছি। আমার বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার কারণে আমি কিছুদিন আমার জেঠিআম্মার বুকের দুধ খেয়েছি। ইনি আমার জেঠা ফজলে আলী সাহেবের বিবি। আমার জেঠিআম্মা ছিলেন খুব মিষ্টি মানুষ।। আমার মা মারা যাওয়ার কারণে জেঠিআম্মা আমাদের অনেক আদর করতেন।

 

রক্তের নদী

মা এ নদীটা লাল কেন
নদীর জল কি মা কখনও লাল হয়
লাল নদী সাঁতরে আমরা কোথায় যাচ্ছি
কেন যাচ্ছি নিজেদের ঘর বাড়ি ছেড়ে।
যারা আগুন দিচ্ছে তারা কারা
কেন বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে
কেন সব কিছু ধ্বংস করছে
ওরা কি মানুষ নয় মা
ওদের তো দুই পা দুই চোখ
চেহারা আমাদের মতোই
দেশটা কি আমদের নয়
ওখানেইতো দাদা দাদীর কবর
মা আব্বাকে দেখছিনা কেন
আমাদের সাথেইতো ছিল
মা জুলেখা শুধু প্রাণ নিয়ে দৌড়ায়
আর বলে কথা বলিস না
শব্দ হলে বাঁচবিনা
তুই না থাকলে আমি শূণ্য হয়ে যাব
পুরো জগতটাই আমার
হাওয়া হয়ে যাবে
নদীটা লাল আমাদের রক্ত লাল
নদী মানুষের জন্য কেঁদে কেঁদে
লাল হয়ে গেছে।
ওই আকাশটা দেখ
লালে লাল মানুষের রক্ত মিশে
তোর বাপের রক্ত
তোর বোনের রক্ত
লাখো মানুষের রক্ত
কান্নার আওয়াজ শুনতে পাস বাপ
ওই শোন, নদী কাঁদছে আঁকাশ কাঁদছে
কাঁদছে বন জংগল পশু পাখি
প্রকৃতির কান্নায় কান্নায়
কাঁদছে পাখ পাখালি
কান্দেনা শুধু সুচির মন
কান্দেনা জেনারেল আর
জাতি সংঘের মন।
চল বাপজান হন হন করে চল
থামলে চলবোনা
এই জানটা সুচি রাক্ষসী খাবো
চল বাজান হন হন করে চল
কোথায় যামু মারক্তের নদী
বাপ জানি না
খোলা আছে আল্লাহ্ র দুনিয়া।

  • দিনপন্জী

    • ডিসেম্বর 2017
      সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
      « নভে.    
       123
      45678910
      11121314151617
      18192021222324
      25262728293031
  • খোঁজ করুন