রূপকথা ৯

সালামত খান ঘুম থেকে উঠেছেন সন্ধ্যার পর। শীতকাল পাঁচটার দিকেই সূর্য ডুবে যায়। হাত মুখ ধুয়ে বসার ঘরে এসে বসলেন। কুলসুম বেগম বললেন আমি আপনার জন্যে চা করে আনবো। তুমি যাবে কেন? এখানেতো চা কফি করার জন্যে  লোক আছে। আয়েশা,দেখতো মা বুয়াকে কফি বানাতে বল। আর কিছু খাবে না। একটু পরেইতো রাতের খাবার খাবো। তোরা এখানে ক’টার সময় রাতের খাবার খাস। তুমি যখন চাইবে তখনি খাবার দিবে। কিচেনের জন্যে এখানে ফুলটাইম লোক আছে। তোমার যখনি ইচ্ছা তখনি চা কফি নাশতা করতে পারবে। কাজের লোকদের তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো। এদের পাঠিয়েছেন আরসালানের মা। আমরা আস্তে আস্তে লোক নেবো। তোরাতো আজ আর বের হতে পারলিনা। তাতে কোন অসুবিধা নেই। তুমি যেতে চাইলে আমরা যাবো। খালা তুমি এখন যাবে। নিশ্চয়ই যাবো। ওদের সাথে আমার কথা হয়েছে। গেলেই মাপ নিয়ে নিবে। এক ঘন্টা সময় লাগতে পারে। আগে নমুনা দেখাবে। দুলাভাই নিজেই কাপড় পছন্দ করবেন। না না, আমি কিছুই পছন্দ করবোনা। ঠিক আছে খালা তুমি যাও। আমি এখানে মায়ের সাথে থাকি। আপু, তুই যাবি/ না ,আমিও মায়ের কাছে থাকবো। চলুন দুলাভাই। পাজামা পাঞ্জাবী আর পাম্পসু পরেন। মাথায় টুপি পরেন। গায়ে চাদর পরেন। মা আয়েশা, তুই কাল সকালে গাড়ির দোকানে যা। তুই সব পছন্দ করে নিয়ে আয়। তোর হাতে সাইন করা চেক বই দিয়ে দিবো। যা পছন্দ তাই কিনবি। টাকার জন্যে চিন্তা করিসনা। আমার সংসাড়ে আনন্দ ফিরে এসেছে এতো বছর পর। এখন আমি বাকি জীবন আনন্দে থাকতে চাই। তোরা কি বলিস? হ্যাঁ বাবা আমরাও আনন্দ চাই। মা হবেন তোমার জীবন সংগিনী, দাসী নয়। রাজীতো বাবা। রাজী মানে, হাজার বার রাজী। তোর মা হবেন প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আমার মেয়ে শরিফাও হবে একজন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আয়েশ যদি দেশে ফিরে আসে তাহলে সে হবে ওর মায়ের প্রধান সহকারী। কি বলিস মা। বাবা এখনকার দুনিয়ায় স্থান কোন বিষয় নয়। পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। যে কোন বিষয়ে আমাকে জানালে আমি অনলাইনে জানিয়ে দেবো। স্কাইপ বা হোয়াটসআপে তুমি আমাকে দেখতে পাবে কথা বলতে পারবে। আমি বাড়িতে  তোমার জন্যে একটা ট্যাব কিনে রাখবো। আপা চালাবে। তুমি আস্তে আস্তে শিখে নেবে। ঠিক আছে বাবা তুমি এখন টেইলারের কাছে যাও। খালা বাবাকে নিয়ে যাও। ফিরে আসলে কথা বলবো। চলুন দুলা ভাই। না হয় দেরী হয়ে যাবে।

আয়েশা আরসালানকে ফোন করে জানতে চায় কাল সকালের প্রোগ্রাম। বিকেলে তিনটার পর দুটো ক্লাস আছে। তাহলে আমি সকালে দশটার দিকে আসছি। বলো, কেন আসবে? বাবা টাকা দিয়েছেন গাড়ি কেনার জন্যে। এতো তাড়াহুড়া কিসের?  তা জানিনা। বাবা বলেছেন গাড়ি কিনতে। হয়তো তোমাকে দিবেন। আমাদের বাসায় দুটো গাড়ি,আরেকটা গাড়ি দিয়ে কি করবো। সেটাতো আমি জানিনা। মা কি কিছু বলেছেন। মাকে তুমি এতো দিনেও চিনতে পারোনি। আপনি কি রকম ছেলে। নিজের মাকে ভালো করে চিনতে পারেননি। অপেক্ষা করুন, আর দেখুন বাবা কি করেন। আর কি করবেন। তোমার বাবার কথা শুনলেই ভয় করে। কেন ভয় করেন। ভাবা একেবারেই নরম হয়ে গেছেন। আপনাকে বাবার সহকারী হতে হবে। সেটা আবার কি? দেখবেন সব আস্তে আস্তে। আল্লাহই জানেন আমার ভাগ্যে কি আছে। ভাগ্য দেখতে হলে আমাকে বিয়ে করতে হবে। বাদ ও দিতে পারেন। ভিসি স্যারকে জানিয়ে দেন আপনি আমাকে বিয়ে করবেন না। তুমি কি পাগল হয়েছো। তাহলে কি করবেন? না করার সাহস আমার নাই। মানে কি ? আমি তোমাকে বিয়ে করবো। ভাল না বেসেই বিয়ে করবেন। আপনার সাহসতো কম নয়। একটা মেয়েকে ভাল না বেসে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছেন। দেখো আয়েশা, সবতো করছেন মা। আপনার বুঝি ইচ্ছা নাই। তুমিতো দেখছি আমাকে পছন্দ করোনা। কেন এমন মনে হলো। তোমার কথায়। আমিতো কখনই এমন কথা বলিনি। আমি শুধু জানতে চাইছি কন্যাকে আপনি ভালবাসেন কিনা। কন্যা আবার কে? তুমিতো দেখছি আমাকে পাগল বানিয়ে দিবে। সেটাইতো আমার কাজ। কেন, আমি পাগল হলে তোমার কি লাভ? অনেক লাভ। সারা জীবন পাগল নিয়ে সংসার করবো। না না, এসব কি বলছো। আমি পাগল নাকি? আমি কি বলেছি আপনি পাগল। আপনিইতো বলেছেন। এখন বলো কাল কখন আসবে। আমার সাথে ব্রেকফাস্ট করো। তোমার গাড়ি আছেতো। বাবার মাইক্রোটা আছে। নতুন গাড়ির চাবি পেলে আপনি ড্রাইভ করে আনবেন। পরে আমাদের  ড্রাইভার চালাবে। ওকে আসো, সকালে কথা হবে।

ফারজানা আখতার ফেরদৌসের কাজ সেরে এপেক্সের শোরুমে যান সালামত খানকে নিয়ে। তিন জোড়া পাম্পসু কিনে রাত আটার দিকে বাসায় ফিরে। এর আগে আয়েশা শরিফা মায়ের সাথে জমিয়ে গল্প জুড়ে দেয়।দুই বোন দুই পাশে মাঝখানে মা কুলসুম বিবি। সালামত খান ডাকেন আকবরের মা বলে। বড় ছেলের নাম আকবর খান। ছোট ছেলে হুমায়ুন খান। মা, তোমার বাল্যকালের কথা বলো। কতকাল তোমাকে এভাবে পাইনি। বুকে ধরিনি। তুইতো মাত্র সেদিন ঢাকা চলে গেছিস। কিন্তু আমার এ মেয়েটা সাথে কত বছর কথা হয়নি। এখন মোবাইলের যুগ। জামাই কথা বলতে দিতোনা। কেন যে এমন ক্ষ্যাপে গিয়েছিল তা আজও জানিনা। জামাইটা খুবই ভালো ছিল। তোর বাপই ওকে বিগড়ে দিয়েছে। মা বহুবার আমি পায়ে ধরে মাফ চেয়েছি বাবার পক্ষে। বলেছি , বাবা মুরুব্বী মানুষ। তুমিতো ছেলের মতো। কই তিনিতো তোমাকে দেখতে একবারও আসেননি। তুমিতো কিছু করোনি। তোমার উপর কিসের রাগ। ছোট নাতি দুটো কি ক্ষতি করেছে। প্রায়ই বলতো মা নানুজী আসেনা কেন। আমি মুখ লুকিয়ে শুধু কাঁদতাম। মা ও আমাকে খুব ভালবাসতো। বাবার সাথে ঝগড়া হওয়ার পর থেকে খারাপ ব্যবহার শুরু করে। মা, এতোদিন আমার বুকের উপর একটা পাথর চেপে ছিল। এখন সেটা নেমেছে। মা তুমি আগের মতো পিঠা বানাতে পারো। পারবোনা কেন। তোরা সব কিছু জোগান দে। আমিতো চালের গুড়ি ও খেজুরের গুড় নিয়ে এসেছি। আম্বিয়া বুয়াকে জিগ্যেস করে দেখি উনি পারেন কিনা। আরে, আমিই বানাবো। শীতের সকালে তোদের বাবা প্রতিদিনই পিঠা খায়। বউরাই বানায়। এখন পিঠায় আগের মতো মজা হয়না। গ্যাসের চুলা। আমরা শীতের সময় আলাদা মাটির চুলা তৈরি করি। লাকড়ি ব্যবহার করি। আমার বূরা খুবই ভালো।  বেয়াই বেয়াইনও খুব ভালো। কিন্তু আমার ছেলে গুলো মনের মতো মানুষ হলোনা। মা তুমি ওসব চিন্তা করোনা। সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখো মা, ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাবাইতো চেয়েছেন ওরা গ্রামের মোড়ল মাতব্বর হোক। বাবা ওদের মোড়লী বিচার শিখিয়েছেন। ওরা গুন্ডামী করে বেড়ায় বাবা থানাকে টাকা দেয়। বাবা যদি বলতো তোদের এসব করা দরকার নেই। ঢাকা যা,পড়ালেখা কর। তা না করে বাবা ওদের মোড়ালী শিখিয়েছেন। অল্প বয়সে দুজনকেই বিয়ে করিয়েছেন। বাবা যেমন চেয়েছেন ওরা তেমন হয়েছে। এখন আর আফসোস করে কি লাভ। বাবাতো আমাকেও না পড়িয়ে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আজ রাতে আমরা দুই বোন তোমার সাথে শোবো মা। তোর বাবার বাতের ব্যারাম। সারা রাত ব্যাথা করে। আমি অষুধ মালিশ করে দিই। তুমি বুঝি বাবার পা টিপো। তা একটু টিপে দিই। উনিতো আমার মুরুব্বী। একটু খেদমততো করতেই হয়। আমার মা বলে দিয়েছিল জামাইর মন জুগিয়ে চলবি। সামান্য একটু পড়ালেখা করেছিস বলে বেয়াদবি করবিনা। শুনেছি, আগের জামানায় স্বামীরা বিবিদের পিটাতো। ওরা কাঁদতেও পারতোনা। বলতো খানদানী মেয়েরা আওয়াজ করে কাঁদতে পারতোনা। তোদের বাবা কোনদিনও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। আকবর হওয়ার আগে কুসুম বলে ডাকতেন। পরে আকবরের মা বলে ডাকতেন। আমার থাকতে আমার আদরের সীমা ছিলনা। তোদের বাবা আমার শ্বশুর বাবাকে খুব ভয় পেতেন।চোখ তুলে কথা বলতেন না। আমার বাপজান ও শ্বশুরবাবাকে বলে দিয়েছিলেন আমাকে আদর যত্ন করতে। নিজের মেয়ের মতো রাখতে।

ফারজানা এসে কুলসুম বিবির পাশে বসেন। খালা তুমি এতোক্ষণ কি করলে। টেইলারের ওখানেমতো। কাজ সেরতে এপেক্সে গিয়েছিলাম পাম্পসু কেনার জন্যে। তিন জোড়া সু, তিন সেট পাজামা শেরওয়ানী অর্ডার দিয়েছি। সাথে রয়েছে মোজা, গেঞ্জী রুমাল। কাল সন্ধ্যায় নিয়ে যাবো পার্লারে। দাড়ি মোচ ট্রিম করার জন্যে। খালা , বাবা তোমার কথা খুব শোনে।  বলতো ফারি, তোর দুলাভাইকে তুই কি করতে চাস। দেখো আপা, দুলা ভাই আমার বাপের মতো। বাবা মারা যাওয়ার পর উনিই আমার দায়িত্ব নিয়েছেন। পড়ালেখা করিয়েছেন। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে বিয়ে দিয়েছেন। আমার বরও খুব ভালো। দুলাভাইকে মান্যগন্য করে। ভালো চাকুরী করে।

কি হলো ফারি, এসেছিতো অনেক্ষণ হলো। চা কফি কিছু একটা দাও। বাবা, এখন সাড়ে আটটা। একটু পরেইতো ডিনার করবে। সেতো না হয় করবো। এখন এক কাপ কফি দে। আজ একটু দেরীতে ডিনার করি। তোদের সাথে চুটিয়ে আড্ডা মারবো। বাবা, তুমি আ্ডা দিতে জানো। আমি তোদের মতো আড্ডা দেইনা। আড্ডা মারি। দেওয়া আর মারা শব্দের ভিতর অনেক ফারাক। আড্ডা শব্দে জোর আছে। বাবা তুমি ভাষাও বোঝো। তোরা কি মনে করিস। আমি ম্যাট্রিক  মানে তোদের এসএসসি পরীক্ষায় বাংলায় লেটার পেয়েছিলাম। স্কুলের ম্যাগাজিনে নিয়মিত আর্টিকেল লিখতাম। আমার বাবা আমাকে আর পড়তে দেননি। আমাদের পেশা কৃষি ও ব্যবসা। তাই বাবা বলেছেন সংসারের হাল ধরো। তুমি আমার একমাত্র ছেলে। বাবা তুমিতো আমাদের এসব কথা কোনদিন বলোনি। বলবো কখন, বিরাট এক সংসারের দায়িত্ নিয়েছি বাইশ তেইশ বছরে। বিয়ে করেছি পঁচিশ বছর বয়সে। তারপরে আর সময় কই। শরীফার মা, তুমি মেয়েদের সব কথা বুঝিয়ে বলো। রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা কাজ করে বাবার সব সম্পদ রক্ষা করেছি। নিজে বাড়িয়েছি অনেক। আমার কৃষি জমি আছে একশ’ বিঘার উপরে। সম্পদ আছে বলেই লোকে সম্মান করে। আমার বাবাকেও লোকে সম্মান করতো। এখনতো সম্পদের সাথে বিদ্যার খুব প্রয়োজন। বিদ্যা ছাড়া সমাজে ইজ্জত থাকেনা। সেটা আমি দেরীতে বুঝতে পেরেছি। আমার শ্বশুর ও শালারা সবাই শিক্ষিত। আমার শ্বশুর বাড়ির সবাই বিদ্বান। তাঁদের পেশা ও সম্মান হলো বিদ্যা। এখন আমার মা বিন্দু শিক্ষার দুয়ার খুলে দিয়েছে। শরিফাকে আমি আবার পড়াবো। আমি চাই সে এমএ পাশ করুক। কলেজে শিক্ষতা করুক। জামাইকে আমার ব্যবসা শিখিয়ে দেবো। বাবা, ওর নিজেরোতো অনেক বড় ব্যবসা। দুটোই দেখবো। জামালপুর থেকে ওর এলাকার দুরুত্ব সত্তুর আশি কিলোমিটার হবে। আমি ওকে গাড়ি কিনে দেবো। যাতে সে সব ব্যবসা দেখতে পারে। তুমি যা ভালো মনে করো তাই করো। বাবা, তুমি ওর উপর মনে কষ্ট রেখোনা। আরে পাগলী , আমি সব ভুলে গেছি। ছেলেদেরও ব্যবসা ভাগ করে দেবো। সবাই আমার ব্যবসা দেখবে। নেট মুনাফা যা করবে পঁচিশ ভাগ পাবে। মাসে একটা ভাতা পাবে। ওরা চেম্বারের মেম্বার হবে। আস্তে আস্তে চেয়ারম্যান হবে। জেলার জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নিবে। সালামত খান ফাউন্ডেশন করে দেবো। জায়গা দিবো, বিল্ডিং করে দেবো। নেট মুনাফার দশ পার্সেন্ট ফাউন্ডেশনে যাবে। আয়েশা ও জামাই ফিরে আসে তাহলে ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব নিবে। বাবা তুমিতো আমার স্বপ্নের কথা বলছো। কাল সকালে গাড়ি কিনতে আরসালানকে সাথে নিয়ে যাবো। তুমি কি বলো? সেতো খুব ভালো কথা। রাজী হয়েছে তো?। কথা বলেছি, কাল সকালে যাবো। উনি গাড়ির দোকান ভালো চিনেন। কাকরাইলের ম্যানহাটন মটর্সে যাবো। ওখানে আনওয়ার সাহেব নামে ভদ্রলোক আছেন। খুবই ভালো মানুষ। আমাদের কবি সাহেব আমাকে ঠিকানা বলে দিয়েছেন। ইনি নামকরা কোন কবি নন। কবি হওয়ার জন্যে তিনি কারো দুয়ারে ধর্ণা দেন না। তিনি জগতের আধ্যাত্বিক কবিগুরু মাওলানা রুমীর ভক্ত। তিনি বলেন, রুমী  তাঁর মুর্শিদ। বাংলাদেশের কবি সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা রাজ আনুকুল্য পাওয়ার জন্যে দাসে পরিণত হয়েছেন। তাঁরা কবিতা লেখেন দরবারী কবি হিসাবে। রাজা রাণীর দয়ার শরীর। প্রশংসা করলে রাজকোষ খুলে দেন।

সকাল সাড়ে নয়টায় আয়েশা আরসালানের বাসায় গিয়ে পৌঁছায়। ভিতরে ঢুকেই আরসালানকে দেখতে পায়। সালাম স্যার। স্যার মাফ করবেন, আমি নাশতা করে এসেছি। মা শীতের পিঠা বানিয়েছেন। আপনার জন্যেও নিয়ে এসেছি। আপনার কেয়ারটেকারের হাতে দিয়েছি। তাড়াতাড়ি করুন স্যার। আমরা এক্ষুনি বের হবো। মা কই? মায়ের শরীরটা বোধ হয় তেমন ভালো নয়। তাই শুয়ে আছে। আমি বলেছি, তুমি আসবে। আয়েশা হন হন করে দোতলায় উঠে যায়। কি হয়েছে মা। আমায় ফোন করোনি কেন। কখন থেকে শরীর খারাপ করছে। চিন্তা করিসনা। এ বয়সে এমন হয়। শরীরে তেমন শক্তি থাকেনা। তুই এসেছিস এখন একটু ভাল লাগছে। উঠো মা নীচে চলো। আমার সাথে নাশতা করবে। পারবে যেতে? না এখানে নিয়ে আসবো। তুই ধর, আস্তে আস্তে নেমে যাবো। মা, বাসা থেকে তোমার জন্যে আমার মা তোমার বেয়াইন নাশতা বানিয়ে পাঠিয়েছেন। পারলে খাও। বেয়াইন সাহেবার নাশতা খাবোনা মানে। একশ’বার খাবো। কি হলো স্যার, আপনি রেডিতো। মাকে খাইয়ে আমরা বেরিয়ে যাবো। আরে বাবা, কফিটা শেষ করি। আমার দেরি হয়ে যাবে।  বাবা মাইক্রো নিয়ে বের হবেন। আমি ফিরে মাকে নিয়ে শপিংয়ে যাবো।  সবাই বের হবেন। খালা,  শরিফা আপা ও মা। দেখুন, গাড়ি কিনতে বেশি সময় দেয়া যাবেনা। আপনি গাড়ি পছন্দ করবেন,আমি চেক লিখে দেবো। তোমার কোন কালার চয়েস নাই। না, আপনার চয়েসই আমার চয়েস। সতেরার নবেম্বরের মডেল নিবেন। আনওয়ার সাহেবের সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি তিনচারটা গাড়ি সিলেক্ট করে রাখবেন। আমি তাঁকে চিনি। আমার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক। সিলেক্ট করা গাড়িটা রেখে আসবো। টাকা দিয়ে দিবো। ট্রায়াল বেসিসে আরেকটা গাড়ি নিয়ে আসবো। বলবো , আমাদের গাড়িটা কম্প্লিট রেডি করে খবর দিতে। লাখ দশেক টাকা আমাদের হাতে থাকবে।

কি খবর আনওয়ার ভাই কেমন আছেন? জ্বী ,খুব ভালো আছি। আপনিতো দেখছি আমাদের কবি সাহেবের মতো কথা বলেন। তিনি সকল অবস্থায় বলেন, খুব ভালো আছি। তিনি সদা হাস্য থাকেন। আপনি কি কবি সাহেবের কাছ থেকে শিখেছেন। বলতে পারেন। উনি আমার খুব প্রিয় মানুষ। এবার বলুন, কোন গাড়ি গুলো বাছাই করেছেন। এই চারটা। একই মডেলের গাড়ি। আপনারা শুধু কালার পছন্দ করুন। আরসালান বললো, আনওয়ার ভাই এখন পুরো টাকা দেবোনা। লাখ দশেক টাকা থাকবে। আমরা আরেকটা গাড়ি নিয়ে যাবো। না, যেটা সিলেক্ট করবেন সেটাই নিয়ে যান। ইতোমধ্যে আমরা রেজিস্ট্রেশনের কাজ শেষ করে ফেলবো। নাম্বার প্লেট লাগিয়ে দেবো। সিট কাভার ও বাম্পার গার্ড লাগাবো। অত আলাদা করে বলতে পারবো না। যা দরকার সব লাগিয়ে দিবেন। সব কিছু ঠিক ঠাক করে ফোন করবেন। আসুন অফিসে বসুন। কার নামে রেজিস্ট্রেশন হবে তার ডিটেইল বলুন। ছবি দিন। স্যার আপনার নামে করাবো। তুমি পাগল হলে। স্যার বাবাতো তাই বলেছেন। তোমার নামে রেজিস্ট্রেশন করো। তাহলে দুজনেরই হলো। আনওয়ার ভাই, এখন তিরিশ লাখ টাকার চেক দিচ্ছি। বাকিটা পেপার্স ডেলিভারীর সময় দেবো। আপনি ইন্সুরেন্স রেডি করে রাখবেন। এবার বলুন পেপার্স কখন দিবেন। পরশু বিকেলে আসুন। এই চাবি বুঝে নেন। স্যার আপনি চাবি হাতে নেন। মাইক্রোর ড্রাইভারকে তাহলে ছেড়ে দিচ্ছি। ভাই আপনি বাসায় চলে যান। বলবেন আমি নতুন গাড়িতে স্যারের সাথে আসছি। আয়েশা গাড়িতে উঠো। আমার পাশে বসো। আচ্ছা এখন বলো, তুমি আর কতোদিন স্যার বলে আপনি আপনি করবে। আমার একেবারেই ভাল লাগছেনা। এই মূহূর্ত থেকে তুমি বলবে। তাহলে বুঝি আপনার ভালো লাগবে। দেখো, মশকরা করোনা। ঠিক আছে, আর আপনি বলবোনা। এই কথা বলেই আয়েশা আরসালানের হাতে হাত রাখে। সামনের দিকে তাকাও। না হয় একসিডেন্ট করবে। আরও কাছে আসো ,একটা চুমো দিয়ে গাড়ির উদ্বোধন করবো। তুমিতো দেখছি ভারী দুষ্টু লোক। আমি মাকে বলে দেবো। বিয়ের আগেই এসব করতে চাও। তুমি করে বলেছি, তাতে হয়নি। এখন  বলছে একটা চুমো খাবো। সকালে যে নাশতা করেছো তাতে হয়নি। তুমি এতো নিষ্ঠুর কেনো। তোমার সাথে শুয়ে গেলে খুশী হতে তাইনা। তাহলে বুঝি খুব দয়ালু হতাম। এসব কিছুই হবেনা। এখন চলো। চলছি, কপালে একটা চুমো খাই। আয়েশা কপাল এগিয়ে দেয়। আরসালান ঠোটে চুমো দিয়ে দেয়। দেখো এক মাঘে শীত যায়না। এই দিনতো শেষ নয় ,আরো দিন আছে। দুজনেই কথা বলতে বলতে বারিধারা পৌঁছে যায়। রাস্তা খালি থাকায় খুব তাড়াতাড়ি এসে গেছি। আরও কিছুক্ষণ সময় গাড়িতে থাকলে ভালো হতো। কি বলো বিন্দু। ওহ মাই গড, তুমি আমার ডাক নামও জেনে গেছো। রাস্তায় আরও কিছুক্ষণ রাস্তায় থাকলে খুব বুঝি ভালো লাগতো। নিশ্চয়ই ভালো লাগতো। তুমিতো আমার হবে বউ। আমিতো তোমায় ভালবাসি। শেষ পর্যন্ত ভালবাসতে শুরু করেছো। সে নয়,প্রথম দেখাতেই ভালবেসে ফেলেছি। বলতে পারিনি। এখন বুঝি না বলে থাকতে পারলেনা। তোমাকে দেখলেই আমার মাথা গুলিয়ে যেতো। এছাড়া জীবনে কোন মেয়ের দিকে তাকাইনি। মেয়েরা ইংগিত করলেও ইগনোর করতাম। বহু মেয়ে মোবাইলে ভালবাসার কথা বলতো। আমি বলতাম, ক্লাশে দেখা হবে। তখন কথা হবে। বিন্দু হো হো করে হাসতে থাকে। তোমার মতো ছেলে যে ভালবাসতে পারে এটা আমিও ভাবিনি। ছেলেদের চোখ মেয়েরা পড়তে পারে। আমার চোখ দেখে তুমি বুঝতে না। আমি যে তোমাকে ভালবাসি তা ক্রস সাহেবও বুঝতে পেরে ভিসি স্যারকে বলেছেন। ভিসি স্যারকে বিয়ের উকিল ঠিক করেছেন। আর তুমি বুঝতে পারোনি। তুমিতো একটা গাধা। দেখো এখনি গালি দিতে শুরু করেছো। আমি এখনও তোমার স্যার। ছাত্রীর সাথে প্রেম করো কেন? এখন মাকে বলে দেবো কি তুমি আমাকে প্রেম নিবেদন করেছো। এসব প্রাইভেট ব্যাপারে মাকে জড়াচ্ছো কেন? ওহ, তুমি চুমো খাবে আমি বলতেও পারবোনা। উপরে ভাবতো হলো খুব সিরিয়াস শিক্ষক। ভিতরে ভিতরে চুরি করে কলা খাওয়া। চলো মাকে গাড়িটা দেখাই। মা নিচে আছে কিনা দেখো। মা দোতলার পূবের বারান্দায় রোদ পোহাচ্ছেন। মা গাড়ি এনেছি, স্যার কালার চয়েস করেছেন। তোর বুঝি চয়েস ছিলোনা। না মা, দেখলাম স্যারের অভিজ্ঞতা বেশী। আমিতো স্যারের নামে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে চেয়েছিলাম। বাবাও বলেছিলেম। পাগল নাকি? বেয়াই সাহেব জামাইকে বুঝি গাড়ি গিফট দিতে চান। বাবা বলেছেন, কি গিফট দিবেন সেদিন আপনারা দেখতে পাবেন। কাউকে বলেননি। আচ্ছা বিন্দু তুই এখনও আরসুকে স্যার স্যার করিস কেন? আপনি বলিস কেন? কি বলবো মা? তুমি করে বলবি। আমার যে শরম লাগে। গাড়িতে আসার সময় কোন কথা বলিস নি? বলেছি। স্যার বলেছেন তুমি করে বলতে। এটা বুঝি বলার বিষয় হলো। এখন থেকে তুমি করে বলবি। ঠিক আছে মা। এখন ওই বাসায় যাই। বাবাকে গাড়িটা দেখাই। তোরতো উচিত্‍ ছিলো আগে ওই বাসায় যাওয়া। আপনার ছেলে যেতে চায়নি। তা অবশ্য ঠিক করেছে। এখনি জামাইর দেখা দেওয়া ঠিক হবেনা। বেয়াই সাহেব যদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের বাসায় আসবেন সেদিনই দেখা হবে। তার আগে দেখা হোক আমিও চাইনা। তুমি কি বলিস। আমি আর কি বলবো। এটাতো মুরুব্বীদের ব্যাপার। তাহলে আমি যাই মা। ভালো থাক।

বেলা বারোটার দিকে আরসালানদের ড্রাইভার আয়েশাকে নিয়ে বাসায় যায়। গাড়ি রেখে আয়েশা ফ্ল্যাটে যায়। বাবা নিচে চলো, নতুন গাড়ি দেখবে। সবাই চলো। সালামত খান বলেন, আমি কি আর গাড়ি চিনি। দেখতে ভালো লাগলেই ভালো। জামাই কি বলেছে? উনিইতো সিলেক্ট করলেন। ড্রাইভ করে এনেছেন। কাগজপত্র রেডী হওয়ার আগে আমরা ট্রায়াল রান করছি। এতে বুঝা যাবে গাড়ির সবকিছু ঠিক আছে কিনা। কুসুম বেগম বললেন, তোর বাবাতো ঠিকই বলেছেন। আমরা কি গাড়ির কি বুঝি বা জানি। আমি খুবই খুশী আমার মেয়ে ঢাকা শহরে নিজের গাড়িতে ঘুরে বেড়াবে। মা আরসালাদের তিনটা গাড়ি। এমনিতেই পড়ে থাকে। ওদের কাজের লোকেরাও বাইরে গেলে গাড়ি নিয়ে যায়। বাবা তোমার শরীর কেমন লাগছে। কেনরে মা।বুড়া বয়সে শরীর কি জোয়ান বয়সের মতো থাকে। বল, আমাকে কি করতে হবে। আমরা মাকে নিয়ে শাড়ির দোকানে যাবো। সাথে আপু আর খালামনি যাবেন। আমি চাই তুমিও আমাদের সাথে থাকো। ভালো শাল দেখলে তোমার জন্যে একটা শাল কিনবো। আমি তোদের সাথে যেয়ে বিরক্ত হবোনাতো। আমি তোমার সাথে গল্প করবো। মা,খালা ও আপু শাড়ি পছন্দ করবেন। দুটো গাড়িই রাখো। বিখ্যাত শাড়ির দোকান বেশী দূরে নয়। এক দোকা থেকেই সব পছন্দ করবি। কি করবো বাবা হাতে সময়তো খুব ই কম। জামালপুর হলেতো আমি বললেই ওরা বাড়িতে শাড়ি নিয়ে আসতো।  বাবা বাজেট কতো। তোমার কাছে নগদ কতো টাকা আছে। তা লাখ পাঁচেক হবে। যথেষ্ট। এতেই হয়ে যাবে। তা না হলে আরসালানের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতাম। না না, তুই পাগল হলি নাকি। জামাইর কার্ড ব্যবহার করবি। তোর কোন আক্কেল নাই। চল, আগে আমি সাউথইষ্ট ব্যান্কে যাবো। ওখানেই আমার মূল একাউন্ট। গুলশান সাউথইস্টে চলো। ওখানে আমাদের কবি সাহেবের খুব ভালো সম্পর্ক। তাঁকে সাউথইস্ট ব্যান্ক খুবই সম্মান করে। তাঁকে অনুরোধ করবো ব্যান্কে থাকার জন্যে। উনার বাসা ব্যান্কের কাছেই। উনি তোমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন। শোন, আমার নাম শুনলে দেখবি সবাই আমাকে রিসিভ করবেন। জামালপুরে শাখা খোলার সময় আমার একাউন্ট নাম্বার ছিল এক। এখনো এক নাম্বারই আছে। ম্যানেজার সাহেবকে ফোন করলে আমার অফিসে চলে আসেন। তবুও কবি সাহেবকে আসতে বল। একজন কবির সাথে পরিচিত হই। জামালপুরের সাংবাদিকরাও আমাকে খুব সম্মান করেন। তাহলে চল< আগে ব্যান্কে যাই। তোর নামে একটা ক্রেডিড করে দিই। লিমিট থাকবে পাঁচ লাখ টাকা। বিয়ের পর জামাইর কার্ড ব্যবহার করবিনা। এতে তোর বাপের মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। বাবা ঠিকই বলেছো। দুটো  গাড়ি নিয়েই আমরা ব্যান্কে গেলাম। কবি সাহেব বাইরে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আসো বিন্দু, সবাইকে নিয়ে ভিতরে আসো। ম্যানেজার হামিদ সাহেবের সাথে বাবাকে পরিচয় করে দিলেন কবি সাহেব। সালামত খান, আপনাদের  জামালপুর ব্রাঞ্চের  এক নাম্বার একাউন্ট হোল্ডার। আর বলতে হবেনা খান সাহেবের নাম আমরা সবাই জানি। তিনি এক নাম্বার কাস্টমার। জামালপুর চেম্বারের সভাপতি ছিলেন। জামালপুরে সবাই তাঁকে চিনে ও সম্মান করেন। হামিদ ভাই, খান সাহেবের মেয়ে আয়েশাকে ভাল করে চিনে রাখুন। ও ঢাকা ভার্সিটির ডিবেট চ্যাম্পিয়ন। আশা করছি, দেশের চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। তারপর আমেরিকা যাবে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশীপের জন্যে। তাঁর ইন্টারভিউ টিভিতে দেখেছি। কাগজে অনেক রিপোর্ট হয়েছে। আয়েশার নামে একটা ক্রেডিট কার্ড করতে হবে। কিন্তু কার্ডতো আজ পাবেন না। তদবির করে আগামী কাল বিকেলের ভিতর পাওয়া যেতে পারে। টিক আছে আপনি চেষ্টা করেন।

Advertisements

রূপকথা ৮

শরিফার সাথে ফোনে আয়েশা কথা বলছে। কিরে আপু কতদিন তোর গলা শুনলাম। দুলা ভাই কই। জামাই শ্বশুরের মহব্বত হয়ে গেছে।  আমাদের পরিবারের উপর থেকে মেঘ কেটে গেছে। দেখি কেমন মেঘ কেটেছে। দুয়েকদিনের ভিতর বাবা আর মা ঢাকা আসবেন। তুইও মায়ের সাথে ঢাকা আয়। তাহলে বুঝবো মেঘ কেটে গেছে কিনা। দুলাভাইটা কি আমার বাবার মতো এখনও। দুইজনের বিরোধেইতো আমাদের পরিবারে কষ্ট নেমে এসেছো। দুলাভাইতো ষন্ডামার্কা বলদ। তোর মুখ বুঝি আর কোন দিন ঠিক হবেনা। তুইতো নাকি ঢাকায় খুব নাম করেছিস। তুইও নাম করতে পারতি। বাবার জন্যে পারিসনি। এটা হলো এক ধারণের গলা টিপে মেরে ফেলা। তোকেতো দুলাভাইও মেরেছে। সব পুরুষই এক রকম। তবে ওদের বুঝালে অনেকেই বুঝবে। তুই এতকথা জানিস কেমন করে। তোরও মেধা ছিল। এখনও সময় আছে। প্রাইভেট পরীক্ষা দেয়ার জন্যে নাম রেজিষ্টার কর। আমি ষন্ডা দুলাভাই রাজী করাবো। এখনি সময়। লোহা গরম আছে। পিটালেই নরম হয়ে যাবে। আর বাচ্চা নিবিনা। শোন, মায়ের সাথে ঢাকা আয়। বাবা বারিধারায় ফ্ল্যাট কিনবেন। এবার ঢাকা এসে গাড়ি কিনবেন। তোর দুলা ভাইকে দুই লাখ টাকা দিয়েছেন পোষাক কিনার জন্যে। বড় জামাইয়ের সাথে এখন খুব ভাব। বড় জামাইকে নিয়ে শহরে ব্যান্কের অফিসে যাবেন ইন্ডাস্ট্রী করার জন্যে।  বাবারতো দেখচি বিরাট পরিবর্তন হয়ে গেছে। কেমন করে হয়েছে জানিস। সব করেছেন ছোট খালা। আচ্ছা করে কষে  শক্ত করে বকাবকি করেছেন ঘন্টা খানেক ধরে। তারপরেই বাবা বদলে গেছেন। একেবারেই বদলে গেছেন। ওর পরেই বলেছেন দেখো ছোট গিন্নী এখন থেকে তোমার বড় আপা যা বলবেন আমি তাই শুনবো। খালা খালুকে টাকা দিয়েছেন পছন্দ মতো পোষাক কেনার জন্যে। বাবা কাছে থাকলে ফোনটা তাঁকে দাও। আছেন, কাছেই আছেন। বাবা,আয়েশা কথা বলবে। দে দে , কতদিন মায়ের সাথে কথা হয়না। ও নাকি সময় পায়না আমার সাথে বা তার মায়ের সাথে কথা বলার জন্যে। মারে তুইতো দেখছি নাম করে বাবা মাকে ভুলে গেছিস। কি যে বলো বাবা। তোমাদের কোন পাষন্ড ভুলবে। তোমারা আমাকে পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছো। তোমরা আমাকে লালন করছো। নারে মা, আমি তোদের সকলে প্রতি অবিচার করেছি। আমার দুটো মেয়ে ভাল ছাত্রী। বড়টাকে পড়ালে সেও তোর মতো হতে পারতো। কলেজে শিক্ষকতা করতে পারতো। অনেক বছর হয়ে গেলো তোর মাকে বন্দী করে রেখেছি। তোর ভাই দুটোতো মানুষ হয়নি। ওদের চিন্তায় আমি বেশীদিন বাঁচবোনা। এখনতো তোরা দুই বোন আমার শক্তি। আমি আপুকে বলেছি প্রাইভেট ডিগ্রী পরিক্ষা দিতে। বাবা তোমরা ঢাকা আসার সময় আপুকে নিয়ে এসো। তুমি আসার আগেই আমরা বারিধারায় ভাড়ায় ফ্ল্যাট পেয়ে যাবো। কম্প্লিট ফার্নিসড ফ্ল্যাট। আমরা যেকোন সময় উঠতে পারবো। দেখি বড় জামাই রাজী কিনা।রাজী মানে, একশ বার  রাজী হবে। কোথায় আপত্তি, কেন আপত্তি। দুলা ভাইকে ও ঢাকা নিয়ে এসো। এখন রাখি বাবা। রওয়ানা দেবার সময় ফোন করে জানিয়ে দিও। বাড়ি রেডী হয়ে গেলে সরাসরি ওখানে উঠবে। কি নিয়ে আসবে বাবা। একটা মাইক্রো। নতুন গাড়ি কেনার আগে মাইক্রোটা আমার কাছে থাকবে।খুব ভালো কাজ করেছো। এইতো তোমার বুদ্ধি খুলছে। আগে ছিলে গ্রামের ফালতু মোড়ল। এখন হবে রাজধানীর এলিট। নবাবদের বেয়াই সাহেব। হাতে সময় থাকলে তোমাকে নিয়ে প্রথমে যাবো ফেরদৌসে। দুদিনের ভিতর তোমার সব পোষাক রেডী করে ফেলবো। খালা তোমাকে ফেরদৌসে যাবে। আমি মাকে নিয়ে মেয়েদের পোষাকের দোকানে যাবো। সাথে আপুও থাকবে। খবরদার বাবা, আপুকে ছাড়া আসতে পারবেনা। জিপিএ ফাইভ পেয়ে যে মেয়েটা অনার্সে ভর্তি হতে পারতো সে এখন দাসীতে পরিণত হয়েছে। রাত হলে স্বামীর সংগ দেয়,সকাল হলে পুরো সংসারের দাসী। সবকিছুর জন্যে তুমি দায়ী বাবা। তুমি একমত কিনা বাবা। নিশ্চয়ই একমত। সেজন্যেইতো আমার ভুল স্বীকার করে সবার কাছে মাফ চেয়েছি। তোর মায়ের কাছেও মাফ চেয়েছি। বাবা, আর বলোনা। তুমি কি আমার কথায় রাগ করো। নারে মা, তোরা আমার অন্তর চক্ষু খুলে দিয়েছিস। আমার বাবারও অর্থবিত্ত ছিল। আমি ইচ্ছা করলে আরো পড়তে পারতাম। গ্রামে থেকে কলেজে পড়ার কথা ভাবিবি। আমার বাপ ফরিদ খাঁ ও কিছু পড়ালেখা করেছেন। তিনিই বেশ জমিজমা রেখে গেছেন। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান। এখন আমি বুঝতে পেরেছি বিদ্যার কি প্রয়োজন। আমার মা আয়েশা সবার চোখ খুলে দিয়েছে।এখন আমার ধন সম্পদ ও টাকার প্রতি মায়া নাই। চাই আমার সন্তানেরা আনন্দে থাকুক। আমার বংশধরেরা বিদ্যা বুদ্ধিতে জগত আলো করুক। লোকে বলুক সালামত খানের বংশধর সবচেয়ে সেরা পরিবার। আব্বু, আপুকে বিএ পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করো। আমার বিশ্বাস দুলাভাই রাজী হবেন। শোন, বারিধারার ফ্ল্যাট রেডী কর। আমি সোজা ওখানে উঠবো। ফারজানাকে বলে রাখিশ। সে যেনো বর সহ ওখানে থাকে। বাবা, তুমি ড্রাইভারকে বলে দিও আমেরিকান এ্যাম্বাসীর উত্তর দিকে পার্ক রোড। ওই রোডেই বারিধারা ক্লাব। তুই পরে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে নিস। আমি অত ডিরেকশন দিতে পারবোনা। আজ রাতে তোরা বারিধারার ফ্ল্যাটেই থাক। ফারজানাকে বলে দে। মা, ভালো থাক। আমি এখন ছাড়ি। অনেক কাজ,গোছগাছ করতে হবে। বাবা নগদ টাকা বেশী হাতে রেখোনা। সব কাজ চেকে করবে। তোমার ক্রেডিট কার্ডও দরকার।ঠিক আছে মা।

আয়েশা গুলশান বেগমকে ফোন করে। মা, আমি এখন বারিধারা পার্ক রোডে। যে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি তা সাজাতে হবে। এটা একটা ফার্নিসড ফ্ল্যাট। আর কে আছে সাথে। এখন কেউ নেই। একটা পরেই খালা আসবে। পাগলী মা আমার। আমি এক্ষুনি আসছি। সাথে লোকজন থাকবে। একজন বাবুর্চি, একজন বুয়া ও একজন সহকারী। বাইরের সিকিউরিটি ফোন করলেই পাঠিয়ে দেবে। তুমি  আমাকে বাড়ি নাম্বার বলো। তোমার কিছুই করতে হবেনা।  ঘরে গ্রোচারী সব আছেতো। ঠিক আছে বেটি। গ্রোচারীর জন্যে আমি লোক পাঠাচ্ছি। দশ পনের দিনের পুরো জিনিস নিয়ে আসবে। তুমি আজ ভার্সিটি যাবেনা? আরসু তোমার কথা জানতে চেয়েছিলো। স্যারের সাথে বেশ কয়েকদিন দেখা হয়নি। আমি ক্রস সাহেবের সাথে  কাজ করে বাসায় ফিরে যাই। ফোনেতো কথা বলতে পারো। আমার শরম লাগে। আগে করতাম,এখন করিনা। আচ্ছা ,আমি আরসুকে বলছি তোমাকে ফোন করার জন্যে। ঠিক আছে মা। দশ মিনিট পরেই আরসালানের ফোন আসে। হ্যালো আয়েশা, কেমন আছো। তোমার কোন খবর নেই। সরি, আমি মনে করেছিলাম আপনি ফোন করবেন। আবার ভাবলাম ক্লাশ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আপনিতো ক্লাশ আর বাসা ছাড়া আর কিছু বুঝেন না। এখনতো আপনাদের বাড়ির কাছে চলে এসেছি। সেখান থেকেই কথা বলছি। মার সাথেও কথা হয়েছে। মা লোকজন নিয়ে আসছেন। দুপুরে আমরা এখানে খাব। মাও বুঝি তোমার ওখানে খাবে? মনেতো হয়। বাবুর্চি বুয়া আয়া সব আপনাদের বাড়ি থেকে আসছে। আমার মা ও বাবা আগামী কাল সকালে আসবে। সাথে আমার বড় আপুও থাকবে। অন্য আত্মীয় স্বজনও থাকতে পারে। আমিও কি দুপুরে তোমার ওখানে চলে আসবো। কেন? যদি কোন কাজে লাগি। নিজের বাসায় কোন কাজ করেন? তা করিনা। নিজে কোনদিন গ্রোচারী করেছেন? না। তোমাদের সাথে থাকলাম। বাসা সাজাবার ব্যাপারে আইডিয়া দিলাম।  তোমাকে বড় একটা লাইব্রেরী সাজিয়ে দিতে পারি। সেটা অবশ্য আপনি ভালো পারবেন। আপনি এসেইতো বলবেন কফি দাও। এখনতো এখানে সে রকম কোন ব্যবস্থা নেই। তুমি চিন্তা করোনা। আমি ফ্লাস্কে করে কফি নিয়ে আসবে। এটা অবশ্য ভাল আইডিয়া। খালাকে বলেছি বাসা থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসতে। তিনি বারোটার ভিতর পৌঁছে যাবেন। কাল থেকে আপনারা কেউ এ বাসায় আসতে পারবেন না। কেন? নিয়ম নাই। এটা ট্রেডিশন। তিনদিন পর বাবা মা সহ আপনাদের বাড়ি আসবো। আমাকে দেখতে? হ্যাঁ, মেয়েদের দেখতে পারলে ছেলেদের দেখা যাবেনা। এভাবে আনুষ্ঠানিক বর দেখার কথা শুনিনি। তোমার বাবা কি আমাকে দেখবেন? বাবাইতো দেখবেন। শুনেছি তোমার বাবা খুবই রাগী। কাউকে তোয়াক্কা করেন না। ঠিকই শুনেছেন। আমাকে পছন্দ না হলে? তখন কি হবে? কি আর হবে, বিয়ে হবেনা।  তুমি আর আমি রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করতে পারিনা। কেন? এমনিতে।  আমরা কি প্রেম করি। আপনি কি আমাকে ভালবাসেন? মাতো বললো আমাদের বিয়ে হবে। তাহলে মাকেই জিগ্যেস করেন। মাতো বলেছেন আমার বিয়ের দায়িত্ব উনি নিয়েছেন। তাই আমি নিশ্চিন্ত। আমার মাতো তোমাকে পছন্দ করেছে। আমার মা পছন্দ করলেই হলো। আর আপনি আমাকে পছন্দ করলেই হলো। পছন্দ করেন কিনা তাই বলুন। মায়ের পছন্দই আমার পছন্দ। আমি আপনার ব্যক্তিগত মতা জানতে চেয়েছি। আপনি পছন্দ না করলে আমি বিয়ে করবোনা। আমি মাকে বলে দেবো আপনি আমাকে পছন্দ করেন না। আজ আপনার সামনেই বলবো। পছন্দ না করে বিয়ে করা ঠিক হবেনা। আয়েশা, আমি আসছি তোমার ফ্ল্যাটে। বিয়ে না হলে এখানে এসে কি করবেন। তুমি আমাকে কষ্ট দিচ্ছো কেন? কেন কষ্ট হবে। আপনিতো প্রেম করেন না। মার সাথে আলাপ করে আমাকে জানাবেন আপনি কি করবেন। আমি এখন রাখছি। আল্লাহ হাফেজ। আরসালান পার্ক রোডে আসার সময় কেএফসি থেকে খাবার নিয়ে আসে। ফারজানা বেগম ও খাবার নিয়ে এসেছেন। গুলশান বেগমের বাসা থেকেও খাবার আসছে।

তখন বেলা তিনটে। টেবিলে খাবার সাজাবার জন্যে ফারজানা আখতার বুয়াকে বলেছেন। আসুন বেয়াইন সাহেবা, সবাই টেবিলে আসুন। আরসালানকেও ডাকুন। আসো বাবা। মা, আমরা খেতে খেতে কথা বলি। খালা কিছু কথা বলবেন। আজ আপনাদের বাসায় যাওয়ার কথা আছে। বলো খালা। এখন  না, খাওয়ার  পর বলবো। তখন আরামে কথা বলা যাবে। ঠিক আছে বেয়াইন ,খাওয়ার পরেই শুনবো। বিকেল চারটার দিকে সবাই সোফায় বসে আরাম করছে। এমন সময় চা কফি এসেছে। ফারজানা কথা  শুরু করলেন। আজতো আপনাদের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। সেটা এখন এখানে সেরে ফেলতে চাই। আজতো আর সময় নেই। আয়েশার  বাবা মা  আগামী কাল ঢাকা এসে পৌঁছাবেন। এখানে দুপুরে খাবেন। একটু রেস্ট নেবেন। তারপর আমরা শপিংয়ে বের  হবো। আয়েশা তার মা আর  বোনকে  নিয়ে বের হবে। আমি দুলাভাইকে নিয়ে টেইলারের কাছে যাবো। আর দুলাভাই আজই গাড়ি কিনবেন। আমরা চাই যেদিন যাবো সেদিনই আকদ হয়ে যাক। আপনারা কাজী ও মাওলানা সাহেব রেডি রাখবেন। আয়েশার মামারা সবাই অনুষ্ঠানে থাকবেন। বড় জামাই ও আসবেন। সব মিলিয়ে পনেরো জন থাকবেন। এবার বলুন আপনি রাজী আছেনতো। আর মোহর কথা হবে বলুন। সেটা আপনাদের বিষয়। বেয়াই সাহেব যা বলবেন তাই হবে। মোহরের ব্যাপারে আমাদের কোন মত নেই। সবকিছুই আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম। বেয়াই সাহেব কখন আমাদের বাসায় আসবেন এখন জানাতে পারবেন। এ সপ্তাহেই জানাবো। শুধু টেইলারের ওখানে আমাদের দুইদিন সময় লাগবে। আয়েশার মা ও বোনের জন্যে দুই দিন লাগবে। তাহলে জানুয়ারীর পঁচিশ তারিখ করুন। দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলে মোহর ঠিক করবো। মেয়েকে আর জামাইকে আমরা সাজিয়ে দিবো। আপনাদের কিছুই করতে হবেনা। না বেয়াইন, রাজী হতে পারলাম না। আয়েশাকে সাজাবার দায়িত্ব আমাদের। আকদের পর ফেব্রুয়ারীর শেষে আমরা ওয়ালিমা করবো ওয়েস্টিনে। আপনাদের নিকট দূর সকল আত্মীয়কে দাওয়াত করবেন। আমাদেরতো ঢাকায় তেমন আত্মীয় নেই। ওয়ালিমা অনুষ্ঠানে আমার জামাই ও মেয়েরা আসবে। পাকিস্তান ও ভারত থেকেও আমার কিছু আত্মীয় আসবেন।

আচ্ছা, বেয়াইন সাহেবা, আপনারা তাড়াহুড়ো করে কেন গাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনছেন। আকদের আগে এসবের কি প্রয়োজন। এসব দুলাভাইয়ের ইচ্ছা। আমাদের কিছু বলার নেই। তিনি যা বলবেন তাই হবে। মাঝখানে হঠাত্‍ আরসালান বলে বসলো মা আয়েশার বাবাতো খুবই রাগী মানুষ। যদি আমাকে পছন্দ না করেন। সবাই হেসে উঠলো। কেন মা, তোমরা হাসছো কেন? বাবা, হাসছি তোর কথা শুনে। আয়েশা মুচকি হাসছে। বেটি তুমি বলো,তোমার বাবা আরসুকে পছন্দ না করে তাহলে কি হবে। মা, তখন আমি আপনার ছেলেকে বিয়ে করে আমাদের ফ্ল্যাটে এসে উঠবো। তাহলে হবেতো মা। কি বেটা তুমি কি তাহলে আয়েশার সাথে ওদের ফ্ল্যাটে গিয়েই উঠবে।  মা যেটা নিয়ম সেটাই হবে। তুমি কি নিয়ম কানুন কিছুই জানোনা। না মা, আমি আর কোন কথা শুনবোনা। আপনার ছেলেকে আমি বিয়ে করবোই। আমার বাবা পছন্দ না করলেও। কি বেটা, এবার ঠিক আছেতো। তুমি এসব নিয়ে একেবারেই চিন্তা করোনা। আয়েশা সবকিছু সামলে নেবে। আয়েশার বাবা এলে আমি কি সামনে যাবো? নিশ্চয়ই যাবে ,সালাম করবে। উনি কিছু প্রশ্ন করলে খুব বিনয়ে উত্তর দিবে। তুমি সবার মেহমানদারী করবে। সবার সাথে পরিচিত হবে। হাসিখুশী থাকবে। উনিতো তোমার বাবা। আমরা সবাই মিলে তাঁদের খেদমত করবো। সার্ভিস দেয়ার জন্যে ওয়েস্টিন থেকে তিনজন বেয়ারা নিয়ে আসবো। ওরাইতো খাবার সাপ্লাই করবে। বেটা আরসু তুমি কি ভার্সিটির কাউকে দাওয়াত করবে? নিশ্চয়ই করবো মা। ভিসি স্যার, আমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান স্যার ও ডক্টর উইলিয়াম ক্রস। ভিসি স্যার বলেছিলেন,তিনি আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আয়েশার বার কাছে যাবেন। এতো আমাদের জন্যে খুবই মর্যাদার বিষয়। উনি হবেন আমাদের উভয় পক্ষের উকিল। মা, আয়েশা সব জানে। কিরে মা কিছু বলিসনিতো। আমার বাবার কনফারমেশনের জন্যে আগে ভাগে কিছু বলিনি। বাবাকে জানিয়েছি। তিনিও খুব খুশী। বলেছেন, আমার মেয়ের বিয়ের উকিল হবেন ভিসি সাহেব,এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কি হতে পারে। আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শোকর।

আরসালান ডক্টর ক্রসকে ফোন করে জানালো যে সবাই রাজী। আয়েশার বাবা ঢাকা আসবেন আগামী কাল। তিনদিন পর আপনারা তিনজন আয়েশার বাবার কাছে যাবেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আমাদের দেশের রেওয়াজ ভিসি স্যার জানেন। তেইশে জানুয়ারী আপনারা আমাদের বাসা হয়ে আয়েশার বাবার কাছে যাবেন। ধরুন, আমাদের বাসায় আসলেন সকাল দশটায়। এগারোটায় আয়েশাদের বাসায় যাবেন। তাঁদেরকেও ঠিক মতো ব্রীফ করা আছে। আয়েশা আমার পাশেই আছে। ওর সাথে কথা বলবেন? ও কি লজ্জা পাচ্ছে? কথা বলে দেখেন। কি খবর আয়িশা, কেমন আছো? জ্বী স্যার খুব ভালো। শেষ পর্যন্ত আমরাই তোমার বিয়ের উকিল হয়ে গেলাম। সেতো আমার ও আমার পরিবারের জন্যে সৌভাগ্য। আমার বাবা মাও খুব খুশী হয়েছেন। আমার মামারাও খুশী। আমরাও সবাই খুব খুশী। তুমিতো   আমাদের প্রিয় ছাত্রী। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে সুনাম বয়ে আনবে। তবে স্যার বিয়েটা একটু আগে হয়ে যাচ্ছে। আমিতো এখনও গ্রাজুয়েশনই করিনি। ভাগ্যে কি আছে জানিনা। চিন্তা করোনা,তোমরা দুজনই বিদেশে পড়ালেখা করবে। ডক্টর আরসালান আরেকটা পিএইচডি করবেন। আমার ইচ্ছা তোমরা হার্ভার্ডে পড়ো। সরকার ও রাজনীতির বিষয়টা ওখানেই খুব ভালো পড়ানো হয়। জগতের সেরা শিক্ষকরা ওখানে পড়ান। তুমি যদি ডিবেটে প্রথম দশজনের ভিতর থাকো তাহলে হার্ভার্ডে পড়ালেখা ফ্রি হয়ে যাবে। এমনিতেই অনেক দেশ তোমাকে স্কলাশীপ দেবে বলেছে। খরচের বিষয়টা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবেনা। তোমরা দুজনই যদি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারো খুব ভালো। ডরমেটরিতে টিচারদের জন্যে ভালো একোমোডেশন আছে। তা না হলে আশে পাশে ভাল সার্ভিস ফ্ল্যাট আছে। সেখানেও থাকতে পারবে। অনেক গুলো দেশ তোমার পাশেই আছে। আরসালানের বিষয়টা ভিসি স্যার দেখবেন বলেছেন। আয়িশা গুডলাক ফর ইউ। তোমার কল্যাণ কামনা করছি। তোমরা সুখি দম্পতি হও। দোয়া করবেন স্যার। তাহলে আমি এখন রাখছি। ভিসি স্যারকে বিষয়টা জানাতে হবে। স্যার ফ্রি আছেন কিনা জানতে হবে। এমন কি মহা গুরুত্পূর্ণ কোন ভিভিআইপির সাথে এপয়েন্টমেন্ট থাকলে তা সেরে জরুরী ভিত্তিতে আয়েশার বিষয়টাকে প্রায়োরিটি দিতে হবে।

পরেরদিন সকাল এগারোটায় সালামত খান  বারিধারায় পৌঁছান। সাথে আয়েশার মা ও বোন ছিল। সবাই বাড়ির গেটেই অপেক্ষা করছিলো। আয়েশা বাবা মার পা ছুঁয়ে সালাম জানায়। শরিফাকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে থাকে। আপু শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেলি। আমি সীমাহীন আনন্দিত হয়েছি। আল্লাহপাকের কি কুদরত। আমার বিয়েকে কেন্দ্র করে সব বিবাদ দূর করে দিয়ে মহামিলন ঘটিয়েছেন। শরিফা বলে,বিন্দু তুই আমাদের পরিবারের ভাগ্য। আমরা কখনো ভাবিনি বাবা একদিন এমন নরম হয়ে যাবেন। এতো উদার হয়ে যাবেন। আচ্ছা বিন্দু বলতো তুই কেমন করে এতো  বিখ্যাত হয়ে গেলি। কি এমন মিরাকল জানিস তুই। আপা আমি নিজেও জানিনা। কি রে তোরা বোনে বোনে এত কি কথা বলছিস। চল আগে ফ্ল্যাটে যাই। হাত মুখ ধুই। সরি বাবা ভুল হয়ে গেছে। আপাকে কত বছর পর দেখলাম। তাই আবেগ সামলাতে পারিনি। চলো চলো, লিফটের থার্ড ফ্লোর ডি ফোর। মা তুমিতো কখন ঢাকা আসোনি। আপা এসেছিলো এইচএসসি পাশ করে  ঢাকায় ভর্তি হতে। কিন্তু বাবার কারণে পারেনি। বাবার টাকা পয়সা বা সম্পদের অভাব ছিলনা। শুধু অভাব ছিল একটা ভালো মনের। জানিনা বাবা কেন এমন ছিলেন। অহংকার আর গোঁয়ার্তুমি বাবাকে অমানুষ করে ফেলেছিল। যাক শেষ পর্যন্ত  বাবা বদলে গেছেন। তুমি কিছু মনে করোনা। বার বার তোমার অতীতের কথা ফিরে আসছে। তোরা এখন বকলে আমি কিছু মনে করিনা। আমি শুধরে গেছি এটাই আমার আনন্দ। আজ আমার হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার খুলে গেছে। আমার মেয়ের ভাগ্যে আমি আজ সম্মানিত। মেধাবী মেয়ে, নবাব পরিবারের সাথে সম্বন্ধ হচ্ছে। আমার কারণেই আমার বড় মেয়েটা এতদিন কষ্ট পেয়েছে। মা, তোরা সবাই আমাকে মাফ করে দে। বাবা তুমি ওয়াদা করো আপাকে অনার্সে ভর্তি করে দেবে। আপা এখন থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে। দুলাভাই মাঝে মধ্যে এখানে আসবেন থাকবেন।  আপার ছেলে দুটো এখানে থাকবে। তুমি কি বলো আপু। আমি রাজী। তোর দুলাভাইও রাজী।  তাহলেতো আর কোন সমস্যা থাকলোনা। বাবা, আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়বো। প্রথমে যাবো গাড়ির দোকানে। সতেরো মডেলের একটা প্রিমিও কিনবো। পঁয়ত্রিশ লাখের ভিতর হয়ে যাবে। কি বলো বাবা। ঠিক আছে। তোর যেমন ইচ্ছা তেমন কিনবি। টাকা নিয়ে ভাববিনা। এসব সম্পদতো তোদেরই। আমি শুধু এতোদিন রক্ষা করেছি। এখন দেখছি আমার দুই ছেলে সব ধ্বংস করে ফেলবে। ওদের আমি মানুষ করতে পারিনি। আমি সব সময় ভেবেছি ওরা আমার মতো হবে। মাতব্বরি করবে।হায়রে কপাল। সালামত খানের ছেলেরা হয়েছে মাতাল ও জুয়াড়ি। এই যে, ওদের সাথে করে আনিনি আমার খুব খারাপ লাগছে। ওরা কেউ আসতেও চায়নি। ওরা নিজেরাই বুঝে ওরা এখন আর ভদ্র সমাজের উপযুক্ত নয়। বাবা, তুমি ওসব নিয়ে এখন চিন্তা করোনা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আমেরিকা যাওয়ার আগে ওদের ঢাকা নিয়ে আসবো। এখানে ভিন্ন পরিবেশে থেকে ওরা পরিবর্তন হতে বাধ্য। ওদের বউরাওতো পড়ালেখা জানা। শ্বশুর শ্বাশুড়ী শালারা সবাই শিক্ষিত ভদ্রলোক। ওদের অনেকেই ঢাকা থাকেন। বড় দুলা ভাই কখন আসবেন। বলেছে, আরসালানদের বাসায় যদিন যাবো সেদিন সকালেই এসে পৌঁছাবে। ওকে একটি মাইক্রো ভাড়া করে আসতে বলেছি। আপা, উলাভাইয়ের ভাল কাপড় চোপড় আছেতো? আছে আছে অনেক কাপড়। গ্রামের সওদাগরতো পোষাক নিয়ে তেমন ভাবেনা। তাছাড়া বসেতো আড়তে। চেম্বার বা ব্যান্কে যেদিন যায় সেদিন খুব পরিপাটি হয়ে যায়। গ্রামে পোষাক নিয়ে তেমন কেউ ভাবেনা। ভাবো অর্থবিত্ত আছে কিনা। আমার শ্বশুরের অনেক সম্পদ। সেতো একমাত্র ছেলে। সে সব পেয়েছে। বোনদের কিছু দিয়েছে। বিয়ের পরতো ভালই ছিল। বাবার সাথে কি নিয়ে বিরোধ হয়ে বিগড়ে গেছে। তখন থেকেই বাবার সাথে বেয়াদপী করতো। আমাকে বন্দী করে রাখতো। আমার শ্বাশুড়ী বহুবার বলেছেন বাবার সাথে মিটমাট করে ফেলতে। বলতেন, যা উনি তোর মুরুব্বী। পিতার সমান। ওঁর সাথে এমন জিদ করিসনা। বদ দোয়া লাগবে। বূটাকে বাপের বাড়ি যেতে দিসনা। নাতিরা নানার বাড়ি যেতে পারেনা। এমন জিদ কিসের। আল্লাহ এসব পছন্দ করেন না। তোর বাপতো খুবই নরম ঠান্ডা মানুষ ছিলেন। উনি থাকলে এমন করতে পারতিস না। উনি জানতেন সালামত খান একটু ওরকম টাইপের মানুষ। নিজে বড় তেমন একটা ভাব আছে। তবুও তোর বাপ বলতো আমার বেয়াই সালামত খানকে এক ডাকেই সবাই। জামালপুরে যদি বলতাম আমি সালামত খানের বেয়াই সবাই চেয়ার এগিয়ে দিতো। তোর বাপ থাকতে উনি আমাদের বাড়িতে বহুবার এসেছেন। তোর সাথে কিসের বিরোধ আমি বুঝিনা। আপন ছেলে হলে তুই এমন করতে পারতিস।

আসলে বাবার কারণেই লোকটা এ রকম হয়ে গেছে। মেয়ের বাপকে একটু বুঝে শুনে চলতে হয়। আমার প্রতি বাবার কোন মায়া ছিলনা। তাই পাষানের মতো ব্যবহার করে। শ্বশুর বাড়িতে আমি এতিমের মতো ছিলাম। মনে হতো এ জগতে আমার কেউ নেই। শরীফা এসে বাপের কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বাবা মাফ করে দিও। বাঘের মতো মানুষ সালামত খানও হু হু করে কাঁদতে থাকেন। শরীফার কথায় বুক ভেংগে যায়। আয়েশার মা কাছে এসে বসেন। চলেন, একটু বিশ্রাম নিবেন। ওদের কথায় কান দিবেন না। এই কদিন ওরা কম কথা শুনায়নি। না শরীফার মা, ওদের বলতে দাও। আমার মেয়ে শরীফা মাটির মানুষ। ওর প্রতি এ কয় বছর অনেক অন্যায় করেছি। তোমার প্রতিও অন্যায় করেছি। তোমরা সবাই আমাকে মাফ করে দাও। আমার মা শরীফা এখন থেকে আমার বাড়িতে থাকবে। জামাই বলবো আমার ব্যবসা দেখা শুনা করতে। আমি ওকে শেয়ার দিয়ে দেবো। দুপুরের খাবার খেয়ে সালামত খান ও কুলসুম বেগম এক বিছানায়  বিশ্রাম নিতে যান। বহুদিন তাঁরা দুজন দিনের বেলা এতো কাছাকাছি হননি। কুলসুম বেগম সালামত খানের মাথা হাত পা টিপে দেন। ঘুম এসে যায়। কুলসুম বেগম বেরিয়ে আসেন মেয়েদের কাছে। তোর বাবা ঘুমিয়ে গেছেন। মনে হলো বহুদিনের ক্লান্তি। দিনের বেলা কখনই ঘুমান না। আমার মনে হয় শরীর নরম হয়ে গেছে। তোরা আর জ্বালাস না। আজ আর বের হতে পারবে বলে মনে হয়না। মা আয়েশা তুই কি বলিস। টিকই বলেছো মা।  বাবার বয়স কত হবে মা? মনে হয় ষাটের উপরে সত্তুরের নিচে। আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর। আঠার বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়েছে। আমার বাপজান বলতেন আমার কুসুম ভাগ্যবতী। রাজরাণী হয়ে থাকবে। ছেলেটা দেখেছিস। একেবারে রাজপুত্রের মতো। আমার শ্বশুর সাহেব ও এ রকম ছিলেন। এরা খুবই পুরাণো পরিবার। পাঁচ পুরুষের সম্পদ আছে। তোদের বাবার নাম ডাক হয়েছে বেশী। কেন যেন সবাই ভয় পেতো। আমার সাথে কখনও মন্দ কথা বলেননি। দিনের বেলা তেমন কথা হতোনা। রাতে দুজনে এক সাথে থাকতাম। খুব ভোরে আজানের সাথে উঠে যেতেন। আমি একটু আলসে ছিলাম। ফজরের নামাজ পড়তামনা। আমার শ্বশুর বলতেন, ও আমার মেয়ে। কদিন হেসে খেলা দিন কাটাক। আমায় কাছে নিয়ে বসাতেন। জিগ্যেস করতেন আমি গাছে উঠতে জানি কিনা। পুকুরে সাঁতার কাটি কিনা। একদিন ডেকে জানতে চাইলেন আমি সালোয়ার কামিজ পড়তে পছন্দ করি কিনা। একদিন তোর বাবাকে ডেকে বললেন মিয়া সালামত বউয়ের মন বুঝো। কেন বাবা, কি হয়েছে? কোন অসুবিধা? না না অসুবিধা হবে কেন। ভাল করে খেয়াল রাখবি। ও আমার মেয়ে। অনেক কষ্ট করে আমি ওকে এ বাড়িতে এনেছি। বেয়াই সাহেব এমএ পাশ ছেলে পেয়েছিলেন। আমি আমার শ্বশুর সাহেবকে আব্বাজান বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে লম্বা করে কুসুম মা বলে ডাকতেন। তোদের বাবার মন খারাপ থাকে ছেলেদের কারণে। শরীফার জামাইর সাথেও সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি দেখি এখন মানুষটা মোমের মতো হয়ে গেছে।

 

রূপকথা ৭

কি খবর আয়িশা কেমন আছো? কদিন হলো তোমার সাথে দেখা হয়না। তাই আরসালান সাহেবকে বললাম তোমাকে নিয়ে এখানে আসতে। জ্বী স্যার আপনার খবর পেয়েই ছুটে এলাম। ধন্যবাদ। ডক্টর আরসালান আপনিও এখানে এটেন্ড করতে পারেন। আয়িশার সাথে এখন প্রতিদিনই বিদেশী দূতের প্রতিনিধিরা দেখা করতে আসবেন। সপ্তাহে তিনি চারদিন মেহমানেরা আসবেন আয়েশার সাথে আলাপ করবেন। আরসালান আপনি থাকলে খুব ভালো হবে। আপনিতো আয়েশার শিক্ষক। আপনি তার সম্পর্কে ভালো জানেন। আগত অতিথিদের প্রয়োজনীয় ব্রীফ করতে পারবেন। একেবারেই ইনফরমাল আলোচনা। কোন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা নেই। দুইতিনজন কূটনীতিক এক সাথেও আসতে পারেন। তারা আয়েশার সাথে খোশ গল্প করবেন বিশ্বে চলমান হালহকিকত নিয়ে। দেখবেন চলমান বিশ্বের খবর আয়েশা কতটুকু জানে। এ সপ্তাহ এভাবেই যাবে। পরের সপ্তাহে আমরা দুজন থাকবো না আয়েশার সাথে। সে একাই মেহমানদের অভ্যর্থনা জানাবে। আমরা পাশের রুমে আয়েশার পারফরমেন্স দেখবো। কি বলেন, ডক্টর আরসালান। খুবই চমত্‍কার। আফটার অল আপনার প্লানিং। আমি বুঝতে পারছি আপনি আয়েশার জন্যে খুবই কনসার্ন্ড। কেন হবোননা বলুন। আপনারা সবাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। সারা বাংলাদেশের আস্থা আমার উপর। তবে আমি ভেবে অবাক হচ্ছি যে ,গ্রাম থেকে এসে একটি মেয়ে  এতোদূর এগিয়ে যেতে পারে।  আপনাদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে মেয়েটার ভিতর আগুন আছে। আমরা শুধু সে আগুনকে জ্বালিয়ে রাখছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো মেয়েটার এডাপটিবিলিটি পাওয়ার। এটা সাধারনত গ্রামের মেয়েদের ভিতর থাকেনা। এর উপরে রয়েছে মেয়েটার রূপ ও সৌন্দর্য। শহরের মেয়েরা ঘসে মেজেও এতো সুন্দর হতে পারেনা। ওকে দেখে মনে হয় ইরাণী মেয়ে। আপনার কি মনে হয়? আমি ওভাবে ভাবিনি ও দেখিনি। এক কাজ করুন, মেয়েটাকে আপনি বিয়ে করে ফেলুন। খুব ভাল মানাবে। আপনি নিজেও শরীফ ঘরাণার মানুষ। আপনার সাথে মানাবে ভালো। আমি কিন্তু আয়েশার ফ্যামিলী ব্যাকগ্রাউন্ড জানিনা। শুনেছি ঢাকায় খালার বাসায় থাকে। বাপের অবস্থা ভালো। খবর আপনিতো দেখছি সব খবর রাখেন। শুনেছি,  নিজে থেকে আমি কোন খবর নিইনি।  এটাও শুনেছি, ঢাবির ছেলে মেয়েরা আয়েশা আর আপনাকে নিয়ে নানান গল্প করে। ওটা ঢাবির কালচার। বানানো গল্প নিয়ে গসিপ করা। আমি তাই আয়েশাকে দূরে থাকতে বলেছি। আপনি কি আয়েশার মন জেনেছেন। না আমাদের সোসাইটিতে সরাসরি এসব কথা বলার  রেওয়াজ নেই। অভিভাবকরা কথা বলেন। আমি কি ভিসি স্যারকে বলবো বিষয়টা। এখনি বলবেন , না ফাইনালের পর বলবেন। আপনি রাজী আছেন কিনা? ভিসি স্যারের কাছে জানতে চাইবো আপনাদের দুজনের বিয়ে হলে কেমন হয়। তখন তিনি বিষয়টা চিন্তা করতে পারবেন। কদিন গেলে তিনি নিজেই জানাবেন। দূতাবাসের বন্ধুরা এসে গেছেন। আলোচনা শুরু করা যাক। দেড়টার দিকে আমরা লাঞ্চ করবো। আয়েশা এঁরা দুজনই সুইডেন ও ডেনমার্ক দূতাবাস থেকে এসেছেন তোমার সাথে আলাপ করতে। স্যার, মিট মিস আয়েশা।  হ্যালো, আপনার সাথে কথা বলতে পেরে খুবই আনন্দিত। আপনি এখন কি পড়ছেন? রাজনীতিতে অনার্স করছি। এখন ব্যস্ত আছি ডিবেট নিয়ে। আশা করছি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপে অংশ নিতে পারবো। আমরা শুনেছি আপনি খুব ভালো লেকচার দেন। আমার স্যারেরা শিখিয়েছেন। এখনও ট্রেনিং দিচ্ছেন। তারই অংশ হিসাবে আজ আপনারা সাথে কথা বলতে এসেছেন। আমরা শুনেছি বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে আপনি উচ্চ শিক্ষা নিতে চান। জ্বী ,আমার আমার তেমন ইচ্ছা আছে। আপনাদের সহযোগিতা পেলে নিশ্চয়ই পড়বো। বাকি সব আল্লাহর ইচ্ছা। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে আমার খুব আগ্রহ। তাই সরকার ও রাজনীতি নিয়ে পড়তে চাই। এ বিষয়ে পিএইচডি করবো। পরে সুযোগ পেলে আইন পড়বো। পড়া শেষ করে কি দেশে ফিরবেন। জ্বী, ইচ্ছা আছে। তবে শুরুতে আমেরিকায় থাকতে চাই। বিশ্ব রাজনীতির ফোকাল পয়েন্ট হলো আমেরিকা। সেখানে থেকেই কথা বলতে চাই। আমাদের দেশ গুলো আপনার কেমন স্টাডি আছে। কিছু আছে। আপনার জন্যে কিছু বই নিয়ে এসেছি। আমেরিকায় ডিবেট শেষ হলে আপনি আমাদের দেশ গুলো সফর করতে পারেন। আমরা আপনাকে এখনি মৌখিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমাদের দুজনের কার্ড দিচ্ছি। আপনি সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন। আপনারা ডক্টর ক্রসের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন।

আপনি কি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবেন? ভাবি, এখানে রাজনীতিতে কোন নিয়ম কানুন নেই।জনগণের আকাংখা মোতাবেক নির্বাচন হয়না। ছাত্র ও যুবশক্তির দেশপ্রেমের কোন দর্শণ নেই। তারা দলের কাজ করে। তারা শক্তিতে বিশ্বাস করে,যুক্তিতে নয়। রাজনৈতিক দলগুলোতে  আভ্যন্তরীন ডেমোক্রেসী নেই। একজন লোক তিরিশ চল্লিশ বছর সভাপতি থাকে। তিনিই সব ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর চিন্তাই দলের চিন্তা। নির্বাচন কমিশন সরকারকে ভয় করে। অনেকেই চাকুরী রক্ষার জন্যে কথা বলে। সরকার নিজেও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন চান না। একবার ক্ষমতায় গেলে আর নামতে চায়না। পৃথিবীতে অনেক ডেমোক্রটিক ডিক্টেটর আছেন। যারা তিরিশ বছর ক্ষমতায় আছেন। বাংলাদেশে দুর্ণীতি একটা আদর্শে পরিণত হয়েছে। এমন একজন রাজনীতিক নেই যিনি স্বচ্ছ ও আদর্শবান। আমি যদি যুক্তিতর্কের খাতিরেও এসব কথা বলি তাহলে আমার বিরুদ্ধে মামলা দেবে। এখানে নিম্ন আদালত গুলো একশ ভাগ সরকারের কথা মতো চলে। এখন সমাজে গুম শব্দটি বহুল প্রচারিত। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন বিশ্বের জন্যে একটা মডেল। নির্বাচন না করেও সরকার গঠণ করা যায়। ভোটার না থাকলেও সরকারী কর্মচারীরা বাক্সে ব্যালট ভরে দেয়। আপনারা নিশ্চয়ই এসব জানেন। আপনাদের আবার কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা আছে। কূটনৈতিক জগতে ন্যায় আচার বিচার এখন জেলখানায় আছে। আবার ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে সকল অবৈধ যৌনচারকে আইনী অনুমোদন দেন। আপনারা ধর্মকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। আপনারা  নবী ঈসা(আ)কে নিয়ে তামাশা করেন। অথচ আপনারা নিজেদের নিয়ে গৌরব বোধ করেন। দেখুন, সত্য ও ন্যায় সারা বিশ্বে এক। ধনীদের সত্য আর গরীবের সত্য বলে আলাদা কিছু নেই। আমেরিকার আইন দেশের মানুষের জন্যে একরকম ভিন দেশের জন্যে আরেক রকম। অথচ আমেরিকা বিশ্বের মুরুব্বী মনে করে। আমেরিকার নির্বাচনও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে বিশ্ব এখন এক অসহায় সময়ের ভিতর দিতে পার হচ্ছে। বিশ্বে ক্ষমতার লড়াই চলছে। কে বড় আর কে ছোট।সব মানুষ সমান। খোদা মানুষ সৃষ্ট করেছেন কতগুলো মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে। সরকার গুলো এখন মানুষের খোদা হয়ে গেছে। এখন দলীয় আনুগত্য দেখে বিচারপতি,রাস্ট্রপতি সেনাপতি বিদ্যাপতি নিয়োগ দেয়া হয়। গণতন্ত্র এখন রাজনীতিকদের দাসে পরিণত হয়েছে। তাই আমি বিশ্ব ব্যবস্থার উপর পড়ালেখা করতে চাই। বিশ্বের জ্ঞানী ও দার্শনিকদের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশে কথার বলার তেমন স্বাধীনতা নেই। এখানে সমাজের নব্বই ভাগ অবহেলিত। এমন সময় ডক্টর ক্রস বললেন, আসুন সবাই আমাদের মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় হয়ে গেছে। টেবিল সাজানো হয়ে গেছে। বলুন, আপনাদের মুক্ত আলোচনা কেমন হয়েছে। মিস্টার রচেস্টার বললেন, মিস আয়েশা খুব ভালো কথা বলেছেন। আমরা তাঁর উজ্জল ভবিষ্যত কামনা করি। আমরা তাঁকে সকল সহযোগিতা দিতে রাজী আছি। ডক্টর ক্রস যখন দরকার হবে আমাদের জানাবেন। নিশ্চয়ই জানাবো। আসুন, আমরা খেতে খেতে কথা বলবো। মিস,আয়েশা আপনি কি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারবেন? আমি আশা করছি। তবে মনে রাখবেন,এটাতো বিশ্ব প্রতিযোগিতা।আমার চেয়ে ভাল প্রতিযোগী আছে। আমেরিকা থেকে অনেক বেশী প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছে। ভারত পাকিস্তান থেকেও আছে। চীন থেকেও আছে। ক্রস বললেন, মিস্টার রচেস্টার আমি আয়িশার ব্যাপারে খুবই আশবাদী। ওকে আমরা যে ভাবে তৈরি করছি তা আর কোন দেশ করছে বলে মনে হয়না। ঢাবিও এ বিষয়কে সিরিয়াসলি নিয়েছে। বৃটিশ কাউন্সিলকে পার্টনার করেছে। আমি পুরো সময় দিচ্ছি। এছাড়া আমেরিকাতেও আমরা এক মাস সময় পাবো। এটা আমাদের জন্যে একটা চ্যালেজ্ঞ। এখানে ফান্ডের কোন সমস্যা নেই। ভিসি সাহেব একশ’ভাগ সাপোর্ট দিচ্ছেন। পুরো বৃটিশ কাউন্সিল সাপোর্ট দিচ্ছে। আমেরিকাতে আমাদের প্রথম রাত হচ্ছে প্রতিযোগীদের পরিচিতি ডিনার। পরেরদিন পরিচিতি সভা। পঞ্চাশ দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নিচ্ছে। আয়েশাকে বলেছি একদম ফ্রি থাকতে। কোন ধরণের জড়তা নয়। নিজেকে একজন নারী বা নর মনে করার দরকার নেই। নিজেকে শুধুই মানুষ ভাববে। মেধাবী কিন্তু একটু বেয়াড়া ধরণের ছেলেও থাকতে পারে। সেটা আমরা কমিটির সাথে আলাপ করে নেবো। আমরা সব প্রতিযোগীর সিভি চেক করবো। আমার ধারণা আয়িশা প্রতিযোগীদের ভিতর সর্ব কণিষ্ঠ।

ফারজানা আখতার আয়েশার বাবার সাথে কথা বলার জন্যে গ্রামে গেছেন কয়েকদিন হলো। এখনও ফিরে আসছেন না। আয়েশা চিন্তায় পড়ে গেছে তার বাবা খালার সাথে কেমন ব্যবহার করছে এ নিয়ে। বাসায় গিয়ে খালুর সাথে কথা বলে জানতে পেরেছে সব কিছু ঠিক আছে। তোমার খালা দুয়েক দিনের ভিতর ফিরে আসবে। তোমার খাছালত অনুযায়ী শুরুতে ক্ষ্যাপে উঠেছিলেন। ভেবেছিলেন মেয়ে প্রেমে পড়েছে। এরপরেই কিছুক্ষণ বকবক করেছেন। চিত্‍কার করেছেন। বলেছেন এজন্যেই তিনি মেয়েকে ঢাকা পাঠাতে চাননি। তিনি শুনেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে মেয়েরা বেয়াড়া হয়ে যায়। ফারজানা বলেছেন, দুলাভাই, হাজার বছরেও আমরা এত বড় পরিবারে আত্মীয়তা করতে পারবোনা। এটা আয়েশার ভাগ্য। আয়েশা এখন সারা দেশের আলোচিত ব্যক্তিত্ব। কদিন পরে বিদেশ যাবে ডিবেটে অংশ নেয়ার জন্যে। আপনার এ মেয়েটি একশ ছেলের চেয়ে বেশী। জামাই শ্বশুর শ্বাশুড়িকে মান্য গণ্য করবে কি না। ওরা অনেক প্রাচীন ভদ্রলোক ও খানদান। আয়েশার শ্বাশুড়ী একজন নবাবের মেয়ে। তাঁর স্বামী একজন সাবেক সচীব। বারিধারায় এক বিঘার উপর বাড়ি। পাঁচ কাঠার উপর একটি তিনতলা বাড়ি।  বাকি জায়গা পুরোটাই ফুলের বাগান। দুজন মানুষের জন্যে পনেরো জন স্টাফ।আপনারতো ঢাকায় কোন বাড়ি ফ্ল্যাট বা জমি নেই। জামাইকে কি দিবেন। নিজের ছেলেদের শিক্ষিত করেননি। তারা গ্রামে মাতব্বরী করে বেড়ায়। মানুষ চুপ করে থাকে আপনার কারণে। আপনিতো আবার গ্রামের মোড়ল। এক রোখা মানুষ। নিজেকে ছাড়া আর কাউকে সম্মান করেন না।  আপনার মোড়লীপনাতো এই গ্রাম ও ইউনিয়নে। ভাগ্য ভালো আয়েশা ঢাকায় গিয়েছিলো পড়তে। তাই ওর বিশ্ব দুয়ার খুলে গেছে। সে নাম করেছে। এখন আপনি মেয়েকে দেখলে চিনতে পারবেন না। সে এখন বাংলাদেশের সেরা মেয়ে। একটা মেয়েকে নিজের প্রভাবে রাখার জন্যে কাছেই বিয়ে দিয়েছেন। এখন সে বরের দাসী। এতো বড় শিক্ষিত মেয়ের কোন স্বাধীনতা নেই। আপনি বরকে বলে দিয়েছেন মেয়েকে পুরো পরাধীন করে রাখার জন্যে। যেমন আপনি আমার বড় আপাকে রেখেছেন। তিনিওতো পড়ালেখা জানা ভদ্রলোকের মেয়ে। আমার বাবা গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। সমাজ সেবার জন্যেই গ্রামে পড়েছিলেন। তাঁর ছেলেরা আজ দেশে বিদেশের বিখ্যাত মানুষ। আপনিতো কখনই আমার বাবা ও ভাইদের সম্মান করেননি। অতি আবেগেই আজ এই সত্য ও কঠোর কথা গুলো বললাম। মাফ করে দিবেন। আজ আমি তোদের কাঠগড়ার আসামী। বল,যতো ইচ্ছা বল। আমার বড়বোন জীবনে কোনদিন মুখ খুলতে পারেনি। তিনি আপনার দাসীমাত্র। জীবনে তাঁকে কখনও সম্মান করেননি। আপনিতো স্ত্রীকে সম্মান করতেই শিখেননি। আমার মা মেয়েদের অতি যত্নে আদর করে মানুষ করেছেন। আমার মাও শিক্ষিত ছিলেন। আমার মা বাবা তাই কোনদিন আপনার বাড়িতে বেড়াতে আসেননি। আপনি তাঁদের দাওয়াত করেননি। আপনার কোন অনুতাপও নেই। আর কি বলবো দুলাভাই। জামাই গ্রামে এলে কোথায় থাকতে দিবেন। গ্রামেতো একটা সুন্দর বাড়িও করেননি। মানুষকে অবহেলা করা আপনার ধর্মে পরিণত হয়েছে। এখন বলুন কখন যাবেন ঢাকা। ডক্টর আরসালান মানে আপনার জামাইকে দোয়া করতে। আগে আমার বাসায় উঠুন। সেখানে বসে আমরা প্ল্যান করবো। আয়েশাতো এখন গ্রামের বাড়ি আসতে পারবেনা। ওর ডিবেট ফাইনাল ফেব্রুয়ারীর একুশ তারিখে। আমেরিকা যাওয়ার আগে বাড়ি আসবে। ঢাকায় গিয়ে প্রথমেই আপনার কাজ হবে ড্রেস তৈরি করা। একটা খুব দামী শেরওয়ানী, আলীগড়ি পায়জামা,খুব দামী দুই জোড়া পাম্প সু ও ইন্দোনেশিয়ান টুপি। দাঁড়ি গুলোকে একটু ড্রেসআপ করতে হবে। সেটা একটা পুরুষ পার্লারে নিয়ে ঠিক করতে হবে। দুলাভাই আপনিতো এমনিতে খুবই সুন্দর পুরুষ। রাজপুত্রের মতো চেহারা। ভাল করে সাজাতে পারলে একজন নবাবের মতো হবে। মুখ গোমরা করে রাখবেনা। সব সময় হাসিখুশী থাকবেন। ঢায় বারিধারায় একটা ফ্ল্যাট কিনুন। ওখানে মেয়ে আর জামাইকে তুলে বাসর সাজাবো। একটা গাড়ি থাকবে। এতে আপনার খুশী হবে। আপনি আমাদের সাথেই ঢাকা যেতে পারেন। আপাকেও সাথে নিয়ে চলেন।  তাঁর জন্যেও ভাল কিছু পোষাক কিনতে হবে। না আমি তোদের সাথে যেতে পারবোনা। টাকার ব্যবস্থা করতে হবে। হাতে অত নগদ টাকা নেই। পাঁচ কোটি টাকার ব্যবস্থা করবো। কি বলিস হবেতো? কিছু জামালপুরের শহরের জমি বেচতে হবে। একটা ছোট মার্কেট বেচলেই হবে। ্যাক, চিন্তা করিসনা। আয়েশার খুশীর জন্যে আমি সব করবো। দুলাভাই আকদের সময় আমার ভাই ও মামাদের দাওয়াত দিবেন। আমার মাকেও ঢাকা নিয়ে যাবেন। আমার ভাইদের শ্বশুররাও খুব খানদানী মানুষ। প্রায় সবাই ঢাকায় থাকেন। আমি সবার ঠিকানা জানি। আজ থেকে সব সিদ্ধান্ত তোর আর মাহমুদের। তোরা যা বলবি আমি তাই করবো। তাহলে দুলাভাই আমরা আজই চলে যাই। ঢাকা যেয়ে সব ব্যবস্থা করতে হবে। আরসালানের মা আমাদের বাসায় আসার সময় এক লাখ টাকার কাপড় চোপড় নিয়ে এসেছেন।আমি যাওয়ার সময় কি নিয়ে যাবো ভাবছি। আমি তোকে দুই লাখ টাকা দিচ্ছি এখন। এখন থেকে বিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোর বাসার সব খরচ আমার। আয়েশার সাথে আলাপ করে গিফট কিনে নিয়ে যাবি। অথবা নগদ টাকা জামাইর হাতে দিয়ে বলবি বাবা, তোমার পছন্দ মতো জিনি কিনে নিও। আমার মাকে বলিস, ও জামাইকে বুঝিয়ে দিবে। ঠিক আছে এখন তোরা যা। দুই লাখ টাকা নিয়ে যা। আমি আর তোর আপা দুই তিনদিন পরে আসবো।

ফারজানা আয়েশাকে ফোন করে সুসংবাদ দিয়েছে। আমরা এখনি রওয়ানা হয়ে যাবো। তুই বাসায় থাকিস। তোর সাথে অনেক কথা আছে। এতো অল্প সময়ে কোম করে সব আয়োজন করবো। তোর মাও ঢাকা আসবেন। বেলা চারটার দিকে ফারজানা ও মাহমুদ ঢাকা পৌঁছে। দুজনেই আগে ওয়াশরুমে যেয়ে চেঞ্জ করে আসে। বিকেলের চায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শোন, সোফায় বসে জমিয়ে চা খাবো আর কথা বলবো। সুযোগ পেয়ে সারা জীবনের জীবনের সব ক্ষোভ ঝেড়েছি তোর বাপের উপর। টু শব্দও করেননি। সত্যি করে বলছি, যে দুলা ভাইকে বাঘের মতো ভয় করতাম তাকে এ রকম ঝাড়ি দিতে পারবো জীবনে ভাবতেও পারিনি। যা বলেছি তাই শুনেছেন। সব রাজী হয়েছেন। শুরুতে একটু রাগ দেখিয়েছেন। বলেছেন, মেয়ে আমাকে না জানিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। তাহলে আমাকে জানাচ্ছো কেন। আমি যখন সারা জীবনের ক্ষোভ বলতে শুরু করেছি তখন একেবারে চুপ। একটি কথাও বলেননি। দুলা ভাইকে এতো নরম জীবনে দেখিনি। আপা দেখলাম,দুলা ভাইয়ের পক্ষে ওকালতি করছেন। আপাকেও ঝাড়ি দিয়েছি। দেখো খালা, ওটা মায়ের মুখের কথা অন্তরের নয়। মাকে আমি বহুদিন নীরবে কাঁদতে দেখেছি। মা সেই জামানার শিক্ষিত মেয়ে। পুরো বংশের মানুষ শিক্ষিত। সেই নারী এ বাড়িতে এসে দাসী হয়ে গেছে। এ যেন বাঘের মুখে হরিণ। একবার ভেবে দেখো আমি ঢাকা না আসতাম তাহলে অন্ধকারেই পড়ে থাকতাম। শোন, দুলাভাই বারিধারায় ফ্ল্যাট কিনবেন। গাড়ি কিনবেন। জামাইকে উপহার দিবেন। ওই ফ্ল্যাটেই তোদের বাসর হব । দুলা ভাইয়ের পোষাকের জন্যে দুই লাখ টাকা খরচ করবো। তোর মাকে তুই শপিং মলে নিয়ে যাবি। পার্লারে নিয়ে মহারাণীর মতো সাজাবি। আত্মীয় স্বজন সবাইকে কাপড় দিবো। তোর আকদ হবে ওয়েস্টিনে। একটা রাজকীয় অনুষ্ঠান হবে। কি বলিস বিন্দু। খালা, আমার কাছে সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে। তুমি কেমন করে বাবার মন জয় করলে। না কোন ম্যাজিক করিনি। বেশ কঠোর ভাবে বকাবকি করেছি। মনে হয়েছে অষুধ কাজে লেগেছে। তোর ভাইরা পুরো সময় ধরে বিরোধিতা করেছে। তোর বড়বোনকেতো তোর বাপ কিছুই দেয়নি। এখন মনে হচ্ছে তাকেও তার হক বুঝিয়ে দিবে। তোর ভাইরা সম্পদ উড়িয়ে দিবে কয়েক বছরেই। তোর বড় বোনটা বড়ই দু;খি। বিয়ের পর সহজে বাপের বাড়ি আসতে পারেনা। মেয়েটা ভালো ছাত্রী ছিল। এইচএসসি পাশ করার আর পড়ায়নি। অনেক কান্নাকাটি করেছে। তবুও তোর বাপের মন গলেনি। তোর মাও অঝোরে কেঁদেছে। এখন তাঁর বিস্ময়কর পরিবর্তন হয়েছে। তোর বিয়ের জন্যে শহরের একটি শপিং মল বিক্রি করে দেবে। তোর মনের কোন আশাই অপূর্ণ রাখবেন না।

দুলাভাই কাল অথবা পরশূ ঢাকায় এসে পৌঁছাবেন। সাথে আপাও থাকবেন। আমি তোর খালু যাবো ফেরদৌসে তোর বাবার ড্রেস তৈরি করার জন্যে। ইমারজেন্সী চার্জ দিয়ে দুদিনের ভিতর তৈরি করাবো। দুটো নবাবী শেরওয়ানী, দুটো চোস্ত পাজামা, দুটো আলীগড়ি পাজামা, আদ্দির পাঞ্জাবী, দুটো নাগরা ও দুটো পাম্প স্যু, ইন্দোনেশিয়ান টুপি। লুংগী পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুলাভাইকে পার্লারেও নিয়ে যাবো।পঁচিশ জনের জন্যে ড্রেস তৈরি করা হবে। তুই আপাকে নিয়ে শপিং মলে যাবি। আপার মনে যা চায় তাই কিনবি। হাতের জন্যে একটি দামী ঘড়ি কিনবি।  দুলাভাই আর আপার ড্রেস হয়ে গেলে গুলশান বেগমের বাসায় যাওয়ার প্রোগ্রাম করবো। আমরা দশ জন যাবো। তোর মামারাও থাকবেন। আরসালানের হাতে পাঁচ লাখ টাকা দিবো ড্রেস তৈরি করার জন্যে। বারিধারায় ফ্ল্যাট কেনার বিজ্ঞাপন দিবো ডেইলী স্টারে। তবে জরুরী ভিত্তিতে একটা বড় প্ল্যাট ভাড়া নেবো। একজন বাবুর্চি ও একজন আয়া নিয়োগ করতে হবে। এ ব্যাপারে তোর হবু শ্বাশুড়ী গুলশান বেগমের সহযোগিতা চাইতে পারবি। একটা নতুন গাড়ী কিনতে হবে। তুই আর আমি আজ বিকেলেই আরসালাদের বাসায় যাবো। ফোনে এখনি জানিয়ে দে। হ্যালো মা আমি আয়েশা বলছি। আজ বিকেলে আমি ও খালা আপনার বাসায় আসবো। আপনি স্যারকে জানিয়ে দিবেন। আমি কেন বেটি, তুমি জানিয়ে দাও। বেটা আরসু খুশী হবে। এখন থেকে তুমি আর আরসুকে স্যার বলতে পারবেনা। মা এখনি পারবোনা।  আমার বাবা কাল অথবা পরশু সকালে ঢাকা আসবেন। আমার মাও সাথে থাকবেন। আমার মামারাও থাকবেন ফাইনাল কথা বা আকদের দিন। আজ তোমরা ক’জন থাকবেন। শুধু আমি আর খালা। রাতে খাবে নাকি। জ্বী না। বিকেলের চা হলেই চলবে। সে খথা বললে কি হবে? তোমার খালাতো প্রথমবার আসবেন। আগে বলে খুব ভালো করেছো। তুমিতো আমার মেয়ে। তুমিতো যখন তখন আসতে পারো। ও নিয়ে আপনি ব্যস্ত হবেন না। তোমার খালুজানকেও সাথে নিয়ে এসো। তিনি তখন অফিসে থাকবেন। এখনি বলে দাও তিনি যেন আজ বিকেলে আর অফিসে না যান। আমি কি তোমার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবো? জ্বী মা, ফ্রি থাকলে পাঠিয়ে দিন। বাবা ঢাকা এসে প্রথমেই গাড়ী কিনবেন। বারিধারায় ফ্ল্যাট কিনবেন। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এ বিয়েতে বাবা পাঁচ কোটি টাকা খরচ করবেন। তাহলে মা এখন ছাড়ি। ওকে বেটি। তোমরা ঠিক সময় এসে যেও। তোমার খালুও যেন আসেন। আমাকে তাঁর ফোন নাম্বারটা দাও। আমি ফোন করে দাওয়াত দিবো।হ্যালো বেয়াই সাহেব,আসসালামু আলাইকুম। আমি ডক্টর আরসালানের মা বলছি। কেমন আছেন। জ্বী খুব ভালো আছি। শোকর আহামদুলিল্লাহ। আপনিতো শুনেছেন বোধ হয়, আজ বিকেলে আপনার বেগম সাহেবা ও আয়েশা মা আমাদের বাসায় আসবেন। আপনিও আসবেন। আমি খুব খুশী হবো। নিশ্চয়ই আসবো।একদম ঠিক সময়ে এসে যাবো। আপনি চিন্তা করবেন না।

আয়েশার বড় বোন শরিফার জামাইকে ফোন করেছে আয়েশার মা। বাবা, আমি তোমার শ্বাশুড়ী বলছি। শরিফার মা। তোমরা কেমন আছো? আমার নাতিরা কেমন আছে? জ্বী আম্মা সবাই ভালো আছে। শরিফাকে নিয়ে তোমরা যদি আসো তাহলে খুব খুশী হতাম। আম্মা আমিতো ব্যবসা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকি। আমার হাতে সময় নেই শ্বশুর বাড়ি বেড়াবার মতো। দেখো বাবা তুমি আমাদের একমাত্র জামাই। ছোট মেয়েটাও এখন কাছে নেই। ঢাকায় থাকে। মাসে একবারও দেখা হয়না। সেতো শুনি এখন জগত বিখ্যাত হয়ে গেছে। টিভি রেডিও আর কাগজে তার নাম ও ছবি ছাপা হয়। সেতো তোমাদের জন্যেও খুশীর খবর। কতদিন শরীফার মুখ দেখিনি। মেয়েটাকে নিয়ে তুমি আসো বাবা। বেশী কাজ থাকলে পরের দিন চলে যেও। বলো বাবা কখন আসবে। আসবো আম্মা,দুয়েকদিনের ভিতর আসবো। তোমার শ্বশুরও ফোন করবেন। তিনি এখন আর বাঘের মতো নেই। একেবারে মাটি হয়ে গেছেন। তুমি হাজার অপমান করো টু শব্দও করবেন না। বাঘ বুড়া হলে এমনিতেই নরম হয়ে যায় মা। এখনওতো মানুষের গোস্ত খান। দেখুন মা, আমার বাবা নেই।  আশা ছিল উনি  আমার বাবা হবেন । আমি কাউকে বাবা ডাকতে পারিনা। আমি সেজন্যে তোমার কাছে মাফ চাইছি। এখন থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার শ্বশুরকেও মাফ করে দাও।

পরেরদিনই শরিফা তার স্বামী আফজালকে নিয়ে ভাটারা আসে। বাড়িতে কি কান্নার রোল মা মেয়েতে মিলে। দুজনের কান্না দেখে নাতিরাও কাঁদতে থেকে। এমন সময় জামালপুর শহর থেকে আসেন সালামত খান। আফজাল শ্বশুরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম পেশ করে। না বাবা তুমি আমার বুকে আসে। জামাইকে বুকে নিয়ে সালামত খান কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন ,বাবা এই বুড়া বাপটাকে মাফ করে দাও। না বাবা, আমাকে মাফ করে দেন। আমি অনেক বেয়াদবি করেছি। আমার বাবা থাকলে তিনি আমাকে শাসন করে আদবে রাখতে পারতেন। তুমিতো আমার বড় ছেলে। ভিতর থেকে শরিফা বেরিয়ে এসে বাপ জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। মারে তোর বুড়া বাপটাকে চিরদিনের মতো মাফ করে দে। আমারি ভুলে আমার ছেলে বাপের সাথে রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আয়রে মা আবার আমার বুকে আয়। তোর মুখটা দেখি। কত মাস দেখিনি। যারে মা, জামাইকে নিয়ে কিছু খেতে দে। আমার সংসার আবার জেগে উঠলো। চারিদিকে সূর্যের আলো ঝকমক করছে। বাবা আফজাল তুমি শরিফাকে নিয়ে জামালপুর যাও কিছু ভাল শীতের কাপড় কিনো। আমার নাতিদের রাজপুত্রের মতো সাজাও। কই গেলে শরিফার মা। এইযে, জামাই বাবাকে দুই লাখ টাকা বের করে দাও। ওরা জামালপুর কাপড় কিনতে নাতিদের নিয়ে। এতো টাকা ইয়ে কি করবো বাবা। আরে বেটা সাজো জামাইয়ের মতো সাজো। আজ আমার আনন্দের দিন। আব্বাজান, ভাইজনরা কই? ওদের কথা আর জানতে চেওনা। ওরা প্রতিদিন আমার মথা কাটে। সমাজের কাছে মাফ চেয়ে সে মাথা জোড়া লাগাই। সালামত খানের বেটা বলে মানুষ ওদের মাফ করে। দুটা ছেলেই বিএ পাশ করে শহরের মাস্তান হয়েছে। বাড়িতে এসে বউদের সাথে মাস্তানী করে। আমি বউদের মুখ দেখাতে পারিনা। বেয়াইদের সাথে কথা বলতে পারিনি। একটা পোলাও এক পয়সা কামাই করেনা। আমার কপাল এমন খারাপ হবে আমি কোনদিন ভাবতে পারিনা। ওদের ঢায় রেখে পড়ালেখা করালে এমন হতোনা। দেখোনা, আমার মেয়ে আয়েশা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রী। সবাই তাকে চিনে। ইন্টার ভার্সিটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সে আমেরিকা যাবে। সেই আয়েশার ভাইয়েরা জামালপুরে গুন্ডামী করে। বাবা আফজাল তুমি ওদের একটু বুঝাও। বাবা আমিতো তাঁদের ছোট।  তাতে কি হলো? আকল বাপেরও বড়। আমি ওদের জন্যে সব করবো। ওরা ভালো একটা ইন্ডাস্ট্রি করুক। আমি টাকা দিবো। আমি কাল সকালে তোমাকে নিয়ে শিল্প ব্যান্কে যাবো। ম্যানেজারের সাথে আলাপ করবো। ঠিক আছে বাবা। আপনি এখন বিশ্রাম নিন।

রূপকথা ৬

রুপ,হে আমার প্রাণ। তুমি যেন কি বলতে চেয়েছিলে। আজ আমি তোমার কথা শুনতে রাজী। বলো, মন ও প্রাণের কথা খুলে বলো। হে আমার প্রাণের কবি, তোমার কি কখনও ইচ্ছে হয়না আমাকে মানবী হিসাবে দেখতে। না, মাঝে মাঝে খুবই ক্ষুদ্র ইচ্ছে মনে জাগে তোমাকে মানবী হিসাবে দেখতে। আমাকে ধরে দেখতে। তুমিতো পুরুষ। তোমার পুরুষী মন কি জেগে উঠেনা। না, এখনোতো তুমি আর আমি অদৃশ্য অন্তরে বাস করি। আমরা এখনও নিরাকার,যেমন আমাদের প্রভু। তিনিতো আমাদের কল্পনা থেকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু জগতে পাঠাননি। আমার অন্তরে তুমি, তোমার অন্তরে আমি। মনে রেখো, আমার দেহ কিন্তু কবি নয়।  তোমার চিন্তাকে মানুষের মতো করোনা। যারা মানুষ তাদের জগতে যেতেই হবে। সেখানকার পরিবেশে বাস করতে হবে। জগতের প্রথম প্রধান কর্ম হলো প্রজনন। সমস্ত সৃষ্টি প্রজননে ব্যস্ত। যা আমাদের নেই। আমরা মহা পবিত্র। আমাদের মাইর নেশা নেই। তোমাকে দেখে আমি সুন্দরের সাধনা করি। আমার দর্শন সত্যম শিবম সুন্দরম। সত্য হচ্ছে খোদা,খোদাই সুন্দর। আমরা এখনও খোদার প্রতিবেশী। কবি হিসাবে আমি কাল্পনিক। আমার সবকিছুই কাল্পনিক। আমি কোন বস্তু সৃষ্টি করতে পারিনা। খোদার ইচ্ছাতেই সব সৃষ্টি হয়।

যদি তুমি মানুষ হতে তাহলে কেমন হতে তা আমাকে বলেছো। জগতে তোমার রূপ হলো আয়েশা ও জরিফা। কবি হিসাবে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছো কাগজে কলমে এই দুই চরিত্রকে সাজাতে । আমি তোমার কল্পনার জাগতিক রূপ দিচ্ছি। তোমাকে আগেই বলেছি মাটির নেশার চেয়ে আর কোন নেশ জগতে নেই। তুমি যদি মানুষ হতে চাও তাহলে আমাকে ত্যাগ করতে হবে। খোদা মানুষ সৃষ্টি করেছেন প্রেমে পড়ে। সাথে দিয়েছেন অবাধ্য এক সৃষ্টকে। যাকে শয়তান নামে ডাকা হয়। তার প্রধান কাজই হলো অপবিত্রতা। মন্দ কাজে মানুষকে উত্‍সাহিত করা। সুপথ ত্যাগ করিয়ে কুপথে পরিচালনা করা। খোদা বার বার বলেছেন, তোমরা শয়তানের ব্যাপারে সাবধান থাকো। কিন্তু মানুষ খোদার কথা না শুনে শয়তানের কথা শুনে। তাই জগতে এখন সত্য সুন্দর পবিত্রতা লুকিয়ে আছে। মানুষের মনে দেহে ও অন্তরে কোন পবিত্রতা নেই। মানুষকে বলেছেন তোমরা অহংকার করোনা। মানুষের অহংকার করা শোভা পায়না। কারণ, মানুষ সৃষ্টি। জগতের সব শাসক ও ক্ষমতাবানরা অহংকারী হয়ে গেছে। তাঁরা অহংকারী ও মিথ্যাবাদী। যে দেশের শাসক খারাপ,মিথ্যাবাদী ও অত্যাচারী সেদেশের মানুষও খারাপ।

আমিতো আমার কথা বলেছি। এবার তোমার ভাবনা চিন্তার কথা বলো। না কবি, তোমার ভাবনাইতো আমার ভাবনা।  শুধু মাঝে মাঝে মাঝে মানুষ হলে কেমন হতো তাই ভাবি। মানুষ কি ভাবে সংগম করে তা দেখতে ইচ্ছা হয়। তুমি জগতের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে গভীর ভাবে দেখো। পরতে পরতে প্রজনন ক্রিয়া চলছে। একই ভাবেই মানুষ সংগম করে। এটা সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আছে। সংগমের প্রয়োজনেই খোদা আদমের পরে হাওয়াকে সৃষ্ট করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন নরের সাথে নারীর প্রয়োজন। মা বাপ ছাড়া তিনি আদম হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন। হে কবি, তোমার ভিতর কি মানুষের গুণ আছে। একজন পবিত্র মানুষের সকল গুণই আমার ভিতর আছে শুধু সংগমের গুণ ছাড়া। আমি ইচ্ছা করলে সরাসরি জগতে যেতে পারি। কিন্তু আমার পবিত্রতা থাকবেনা। তুমি কিন্তু সরাসরি যেতে পারবেনা। তোমাকে কোন পুরুষের মাধ্যমে কোন নারীর গর্ভে আশ্রয় নিতে হবে। তারপর জগতে আসবে । তারপর যুবতী হবে, বিয়ে করবে,সংগম করবে আনন্দের জন্যে। আমি তুমি দুজনই এক সাথে জগতে যেতে পারিনা। না পারোনা। জগতে চলে গেলে তখন তুমি আর আমাকে চিনবেনা। এ জগত আর সে জগত এক নয়।তুমিতো জান আমাদের খোদা নিজে সংগম করেন না, সংসার করেন নি, তিনি কাউকে জন্ম দেন নি, তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি। তাঁর কুদরত হলো, তিনি মা বাপ সৃষ্টি করেছেন, বাপ ছাড়া মরিয়মের গর্ভে ঈসাকে জন্ম দিয়েছেন।

হে রূপ, আমাদের দুজনের প্রথম কিভাবে সম্পর্ক হয়েছে তা কি তোমার মনে আছে। তেমন বিস্তারিত মনে নেই। আমিই তোমাকে বলেছিলাম আমাদের দুজনের কখনই দেখা হবেনা। হে কবি আমি তোমাকে সীমাহীন ভালবাসি। সংগমের নেশায় মাঝে মাঝে মনে হয়েছে সব রকম নিয়ম কানুন ভেংগে আমরা মিলিত হই। আমিই তোমাকে বলেছিলাম,সেটা সম্ভব নয়। মিলতে হলে আমাদের মাটির কাছে যেতে হবে।। মাটিই মানুষের ভিতর সংগমের নেশ জাগায়। তোমার যদি খুব ইচ্ছা হয় তাহলে জগতে যেতে হবে। তোমাকে অবশ্যই আমা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। আর কখনও দেখা হবেনা। আমি আমার প্রভুকে বলবো তোমাকে যেন জগতে পাঠানো হয়। ভালো করে ভেবে দেখো তুমি কি করবে। আমি একাকী হয়ে যাবো। আমার একাকীত্বের কষ্ট আমি একাকীই সহ্য করবো। নিশ্চয়ই প্রভু আমার জন্যে কিছু করবেন। রূপ, এখন এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিওনা। ভাবো, খুব বেশী করে ভাবো। আদম হাওয়া যতদিন জান্নাতের বাগানে ছিলেন ততদিন সংগমবিহীন ছিলেন। এরপর প্রভু তাঁদের জগতে পাঠিয়ে দিলেন দু:খ কষ্ট ভোগ করার জন্যে। তোমাকেও সেই দু:খ কষ্ট ভোগ করতে হবে। জগতের জীবন হলো দু:খ কষ্টের জন্যে। পৃথিবীতে আসার সময় মায়ের সীমাহীন কষ্ট। দারিদ্রের কষ্ট। ন্যায় অন্যায়ের কষ্ট। শত্রু মিত্রের কষ্ট। জয় পরাজয়ের কষ্ট। এ রকম আরও হাজারো কষ্ট। সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো শয়তানের সাথে লড়াই। জগতে কোন মানুষই ষোলআনা পবিত্র থাকতে পারেনা। অথচ আল্লাহ পবিত্রতা ভালবাসেন এরপরেও তুমি যদি জগতে যেতে চাও যেতে পারো আমার কোন অসুবিধা নাই

তুমি কি জরিফাও আয়েশার খবর রাখো। না, তোমার কাছ থেকে যা খবর পাই তাই। আয়েশা কি তোমার কল্পনার মতো বিকশিত হচ্ছে। হচ্ছে, খুব ভালোই হচ্ছে। সেতো এখন ঢাবির সেলিব্রেিটি। কদিন পরেইতো বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। আমার বন্ধু ফাহমিদা কিন্তু জীবনের কাছে পরাজিত। একটা শিক্ষিতা মেয়ে ও তার কোন স্বাধীনতা নাই। তবুও সে মনে করে খুব ভালো আছে। না চাইতেই তার বর তাকে সব কিছু কিনে দেয়।অপর দিকে জরিফা এখন মুক্তির পথে। এখন তার মন খুব ভালো। একটা কোচিং সেন্টার খুলেছে। এখন বারো জনের মতো ছাত্রী। এতে জরিফা মাসে বিশ হাজার টাকা আয় করে। ব্যান্কে একাউন্ট খুলেছে। জরিফার বর খলিল পুরো সাপোর্ট দিচ্ছে। যা সে এতোদিন করেনি। জরিফা খুবই সুন্দরী,বাইরে গেলে যদি কারো নজর পড়ে যায়। বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের চোখ ভালো না। একবার নজর পড়লে সে ছাড়বেনা। এলাকার বদমায়েশ লোকেরা তার সাথে হাত মিলিয়েছে। থানার ওসিতো এলাকার ত্রাসে পরিণত হয়েছে। কদিন আগে এলাকার নবম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। ইজ্জতের ভয়ে পরিবারের লোকজন মুখ বন্ধ করে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত জরিফার আবদারের কাছে খলিল মাথা নত করে। এখন জরিফা ও খলিল সুখী দম্পতি। এলাকার সব অভিভাবক জরিফাকে সম্মান করে। কদিন আগেও জরিফা ছিল একজন অপরিচিত নারী। এখন সে এলাকার খুবই সম্মানিত নারী। সবাই তাকে চিনে। এলাকার সম্মানিত নারী হিসাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জরিফাকে অতিথি হিসাবে ডাকছে। জরিফা নারী স্বাধীনতার কথাই বলছে। পরিবার স্বামী স্বজনকে বলছি আপনার মেয়েদের স্বাধীন করে দিন। মা বাবাকে বলছি  মেয়েদের স্বাধীন করে দিন।  দেখবেন, সমাজ খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের উন্নতি হবে। যারা গরীব,বস্তিতে বাস করে, ইট ভাংগে তারা স্বামী স্ত্রী দুজনেই রোজগার করে। আর গ্রামে শিক্ষিত মেয়েরা ঘরের অলংকার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে।সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত। আট বছর আগে আগে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি গৃহবন্ধী ছিলাম। আমার স্বামী এখন মুক্ত করে দিয়েছেন। তাই আমি এখন  আপনাদের জন্যে কিছু করতে চাই। আমার কোন রাজনৈতিক আকাংখা নেই। রাজনীতিকরা ক্ষমতায় গিয়ে দেশের জন্যে কাজ করেন ফাঁকে ফাঁকে। মূল কাজ করেন নিজের জন্যে। একবার এমপি হলে সারাজীবন আর কিছু করতে হয়না। আমি সমাজ কর্মী। রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া যতদিন কাজ করা যায় ততদিন করবো। আপনারা আমার সাথে থাকলে সব কাজই সম্ভব হবে। মনে রাখবেন, রাজনীতি করতে পড়ালেখা  লাগেনা। শুধু দলের প্রতি আনুগত্য রাখবেন। এলাকায় শক্তি দিয়ে প্রভাব বিস্তার করলেই হবে। জনগণের ভালবাসা কখনই দরকার নেই। মানুষকে ভয়ের ভিতর রাখা হচ্ছে মূলমন্ত্র। গণতন্ত্র হচ্ছে মুখোশ। এটা না হলে রাজনীতিক হওয়া যায়না। এখন বিশ্ব ব্যাপী এ নীতি চলছে। এখন মেধাবী লোকেরা রাজনীতিতে আসেনা। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, মন্ত্রী বা এমপি হতে এখন আর বিদ্যা লাগেনা। এমনও দিন আসতে পারে বিচারপতি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে আর পড়ালেখা লাগবেনা।এক সাংবাদিক  নেতা বলেন, মানুষ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যাই হোক তার অন্ধ নেতৃ ভক্তি থাকতে হবে।অন্ধ ভক্তি সৃষ্টি করাই নেতার কাজ । আমরা সে কাজটা খুব যোগ্যতার সাথে করি। আমাদের  হাতের পাঁচ থাাকে মাত্র চার পাঁচ জন লোক । এরা সবাইকে  নাকে  রশি দিয়ে ঘোরায়। দলবাজিতে  বেশীর ভাগ লোক থাকে গাধা।দলের নেতারা যা  বলে তারা বিনা  প্রশ্নে সে কাজ করে। এমন কি  খুনও করে।

হে রূপ, তুমি কি আমার কথা গুলো  মনোযোগ দিয়ে শুনেছো? শুনেছি, সবইতো নেগেটিভ কথা বলেছো। মানুষ নেগেটিভ  কাজ  করে  বেশী। পজিটিভ কাজ  খুব  কম করে। নেগেটিভের  দিকে তার  আকর্ষণ বেশী। এখন তুমি মানবী হওয়ার নেশায় মগ্ন আছো। তোমার সবচে  বড় আকর্ষণ কোনটি। সংগম। ঠিক বলেছো। এটাই মানব মানবীকে পাগল করেছে।  এ  নেশা আদমকে বেহেশত ত্যাগ  করতে বাধ্য করেছে। হে কবি,তুমিতো আমারি মতো। দেখো আমি কবি। আমার  কোন লিংগ হয়না। আমি মানব মানবী নই। কবিরা আল্লাহর ছাত্র। দেহগত ভাবে তারা নানা অপবিত্রতায় ডুবে গেছে। মনোজগতে চব্বিশ ঘন্টা শয়তানী মন তাদের দেহে কাজ করে। কিন্তু তাদের কবি মন খুবই পবিত্র। তারা আল্লাহর কথা লেখে। তোমার অন্তরে জগত,বাইরে এ পবিত্র স্থান। তাই এখানে তোমার তেমন ভাল লাগেনা। এখানে পবিত্রতা তোমায় মুড়িয়ে রাখে। জগতে অপবিত্রতা তোমাকে ঢাকে রাখবে। পবিত্রতা অর্জনের হাজার চেষ্টা করেও তোমার তেমন সাফল্য আসবেনা। তুমি প্রেম ও ভালবাসনার কারণেই আমার সাথে আছো। তোমার শরীরে যে উপাদান আছে তাতে তুমি কাল্পনিক সংগমে নিুোজিত থাকো। আমার মতো ইচ্ছা করলেই তুমি জগতে যেতে পারোনা। তোমাকে মানব জনমের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্যকোন পথ খোলা নেই। মা বাপকে বাহন করেই তোমাকে জগতে যেতে হবে। খোদা তোমাকে কল্পণা থেকে বস্তুতে রূপান্তরিত করেছেন। আমি তা পারিনা। আমি আমার কলম দ্বারা তোমার রূপকে বর্ণনায় রূপান্তরিত করতে পারি। আমার কোন সহকারী নেই। খোদার কোটি কোটি ফেরেশতা আছে। তিনি ভাবলেই  তাঁর চিন্তা রূপ নেয়। কবি তা পারেনা। কবির ভিতরে ভাবনা তৈরি করেন খোদা। বিনা কালি কলমে কবি শুধু শব্দ বলে কবিতা রচনা করতে পারেন। যেমন লালান লিখতে পারতেননা। উনি বলতেন ,তাঁর ভক্তরা সংগে সংগে লিখে রাখতেন।

হে রূপ, আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি আমার কল্পনা থেকে। কবিতা লেখার প্রেরণা হিসবে তোমাকে সৃষ্ট করেছি। এর আগেও বহু বার বলেছি তুমি আমার কাব্যলক্ষী। আমার ভিতরে বসে তুমি আমাকে কবিতা লেখার প্রেরণা জোগাবে। তাই আমরা দুজন এক সাথেই থাকি। আমরা বিচ্ছিন্ন হবো কোন দিন ভাবিনি। এখন তুমি বাস্তবে রূপান্তরিত হতে চাও। ঠিক আছে, তুমি ভাবো। তুমি যদি বাস্তব হতে তাহলে কেমন হতে তার রূপতো আমি লিখছি। তুমি আয়েশার মতো হতে চেয়েছিলে। আয়েশার মাধ্যমেই নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করতে চাও। তাই আয়েশাকে আমি সৃষ্টি করেছি। আয়েশা একজন পূর্ণাংগ নারী হিসাবে বিকশিত হচ্ছে। সে একদিন জগতের শ্রেষ্ঠতম নারী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তুমি হয়তো এতো ভাবতে পারোনি। তোমার চিন্তারও উর্ধে উঠে যাচ্ছে আয়েশা। এখন তুমি অন্তরে বাস করো বলে ঈর্ষা করছোনা। যদি জগতে থাকতে তাহলে ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মারা যেতে। ঈর্ষা বা হিংসা করা মানব চরিত্রের প্রধান গুণ।

জানুয়ারীর মাঝামাঝি সময়ে আরসালানের মা শ্যামলীতে আসেন আয়েশার খালার সাথে আলাপ করতে। সাথে দুই গাড়ি উপহার নিয়ে আসেন। আত্মীয় স্বজন নিকট দূর সবার জন্যে উপহার বা গিফট। আয়েশার জন্যে বিশেষ গিফট। আসুন, আপা আসুন। এতো গরীবের বাড়িতে আপনার মতো মানুষ । আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। কেন খালা , আমিতো তাঁকে মা বলে ডাকি। মা মেয়ের বাড়িতে আসতে পারেনা? নিশ্চয়ই পারেন। হাজার বার পারেন। আমিতো মা’র বাড়িতে নিয়মিত যাই। মাতো বলেছেন ওই বাড়িতে থাকতে। আমিতো বাবার ভয়ে থাকিনা। তোমরা বলবে বিয়ের আগে কেউ শ্বশুর বাড়িতে থাকে? বসুন আপা, কোথায় বসাবো। আপনারা একশ হলে আমরা একও নই। আপনাদের কাছে এক লাখ আছে। হীরার টুকরো আছে। আমাদের কাছে এর কিছুই নাই। আপনা ,এতো সব গিফট নিয়ে এসেছেন, আমরা এসবের যোগ্য নই। আপনার ছেলেকে নিয়ে আসতে পারতেন। আমি বলেছিলাম। সে রাজী হলোনা। সে এমনিতেই একটু লাজুক মানুষ। কথা কম বলে। আমার বেটা আরসু আমার মা আয়েশা বেটিকে ভালবাসে। কিন্তু মুখ ফুটে কখনই বলেনি। আমি আকারে ইংগিতে আন্দাজ করতে পেরেছি। হয়ত আয়েশা বেটিও বুঝতে  পেরেছে। এখন মেয়েরা কাউকে ভালবাসলে এক সাথে চলাফেরা করে, আড্ডা মারে।  এরা দুজন কখনই তা করেনি আমি আয়েশার আচার ব্যবহারে মুগ্ধ।  তাই ওকে মা বলে ডাকি।  এখন আপনারা রাজী হলেই আমি ওকে নিয়ে যেতে পারি। এতোক্ষণ আয়েশাে এখানেই ছিল। এখন ভিতরের রূমে গিয়ে বসে আছে। এবার ড্রয়িং রূমে এলেন আয়েশার খালু। আসসালামু আলাইকুম,আপা। কেমন আছেন? জ্বী, খোদার রহমতে খুব ভালো। এমন সময় একজন ড্রাইভার এসে বললো গাড়ি রাখতে দিচ্ছেনা। সরি আবুল। আমার মনে ছিলনা। নিয়ে যাও, ভাল জায়গা  দেখে পার্ক করো। পুলিশের দিকে খেয়াল রেখো। গাড়ি ছেড়ে যেওনা। জ্বী,বেগম সাহেবা। জিনিসপত্র সব বাসায় এনেছোতো। জ্বী বেগম সাহেবা। ভাইসাব, আয়েশা বেটিকে একটু ডাকুন। ও দূরে দূরে কেন? বেট আয়েশা এখানে আসো।  কি হলো বেটি? তুমি ভিতরে কেন? এ জামানায় মেয়েরা বিয়ের ব্যাপারে মত দেয়।লজ্জার কি আছে। হাত দাও, আমি তোমাকে একটা আংটি দেবো। এর পরে আরসু তোমাকে আংটি পরিয়ে দিবে। আমাদের পরিবার আত্মীয় স্বজন সবাই এ বিয়ের ব্যাপারে রাজী। আপনারা মুরুব্বীরা রাজী হলেই কাজ সামনের দিকে এগোতে পারে। তুমি কি বলো বেটি। মা এ ব্যাপারে আমার বাবাই ফাইনাল। খালারা এখন বাবা মাকে জানাবেন। দরকার হলে খালা খালু বাড়ি যাবেন, আত্মীয় স্বজন সবাই ডাকবেন। আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিবেন। তবে বাবা রাজী হলেই সব রাজী । বাবা গ্রামের মোড়ল। কথাবার্তা মোড়লী ভাবের। শহুরে আদব কায়দা তেমন মানেন না। আপনাদের ভাষায় একটু গোঁয়ার প্রকৃতির। আমার কারণে আস্তে আস্তে  নরম হয়েছেন।  এখন অনেক বিনীত। বাবা ঢাকা আসলেই আপনাদের বাসায় যাবেন। আমিই বাবাকে নিয়ে আপনাদের বাসায় যাবো। সাথে খালা খালু ও আমার মামা মামী থাকতে পারেন। আমার আদব ও ব্যবহারে আপনার দোষ ধরবেন না। উনি একটু ওই রকম। তোমার মাকে অবশ্যই আনবে। আমাদের পরিবারে মেয়েদের গুরুত্ব বেশী। মেয়েরাই মেজর সিদ্ধান্ত নেয়। পুরুষরা সাপোর্ট দেয়। যখন আমি থাকবো না তখন আমার এ বেটি হবে পরিবারের কর্ত্রী।  সেই হবে এ সংসারের প্রধান। আমার আরসু একেবারেই মোমের মতো। আমার বেটি আয়েশাকে আমি ওর দায়িত্ব তুলে দিতে চাই। মনে রাখবি মা তুই হবে জগতের মণি। কিন্তু সংসারে স্বামীর পার্টনার।অতি আপন জন। ভুল বুঝাবুঝির কারণে সংসার অনেক  কখনই  সংসারকে অবহেলা বা ইগনোর করবিনা। আমি দেখতে পাচ্ছি তুই আরসুর অনেক উপরে উঠে যাবি। সংসার হলো মায়া মমতা ভালবাসার জায়গা। সামান্য ভুল বুঝাবুঝির কারণে এ মহাপবিত্র প্রতিষ্ঠান ভেংগে যায়। আলকোরআনে সমঝোতার কথা বলা হয়েছে। আমি লক্ষ্য করেছি তোরা দুজনই খুবই শান্ত। আধুনিক যুগে স্ত্রী স্বামীর দাসী নয়। ইসলামে স্ত্রীকে কখনই দাসী বলা হয়নি। আলকোরআনই  জগতে প্রথম বিয়েকে চুক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। এর আগে সমাজ মেয়েদের যেমন ইচ্ছা ব্যবহার করতো। বেটি আমি চাই তুমি আমেরিকা যাওয়ার আগে বিয়ের কাজ সেরে ফেলো। এর মানে শুভ কাজটা মার্চের ভিতর শেষ করো।  জ্বী মা আমার কোন আপত্তি নেই। খালা খালু ,মামারা ও বাবা মা ঠিক করবেন। আপা দুপুরে খেয়ে যাবেন। আপনার জন্যে কোন ব্যবস্থাই করতে পারলাম না। আমাকে শুধু মেয়েটা দিলেই হবে। জানেনতো আপা সবই আল্লাহর ইচ্ছা। তিনিই সিদ্ধান্ত নিবেন । আমরা শুধুই উছিলা। আল্লাহই সব পাকা করে দিবেন। আমরা শুধু ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারি। তবুও আমরা দোয়া করি আল্লাহ যেন বিয়েটা শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাধা করে দেন। তাহলে এখন আমি আসি।। আপনি এবং আপনার সাহেব আমাদের বাসায় আসুন যে কোন দিন। আয়েশা তোমার দায়িত্ব ওনাদের নিয়ে আমাদের বাসায় আসার। পারবেতো? পারবো মা। ওদের রাজী করিয়ে যান। খালুকে আবার অনুমতি নিতে হবে। খালা তুমি কখন জামালপুর যাবে বাবার সাথে কথা বলতে। যাবো এ কদিনের ভিতর। আশা করি এক সপ্তাহের ভিতর আপনাকে জানাতে পারবো। আপনারতো এসব ঝামেলা নেই। আছে আছে আপা। মেয়ে এবং মেয়ের জামাইদের জানাতে হয়েছে। ওরা অনুমতি দিয়েছে। ঢাকায় তেমন কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নেই। মেয়েরা আয়েশাকে দেখার জন্যে উতলা হয়ে আছে। আপনি বোধ হয় জানেন আয়েশা বাংলাদেশে চ্যাম্পিয়ন হলে আমেরিকা যাবে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্যে। সেখানে হোটেলে থাকবে। তার সাথে থাকবে তার প্রধান গাইড ডক্টর ক্রস ও ডক্টর আরসালান। আরসালানের খরচ ও বহন করবে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব ডিবেটস। সারা বিশ্বের পঞ্চাশ জন প্রতিযোগী অংশ গ্রহণ করবে। জ্বী আপা, আমরা শুনেছি আয়েশার কাছে। সেখানে আয়েশা যদি ভাল করে তাহলে সেখানে ফ্রি পড়ার সুযোগ পাবে। তাহলে আমি যাই। খোদা হাফেজ। সবাই ভাল থাকুন। আপা গাড়ীর জন্যে ফোন করে দিন। ওহ, ভুলে গিয়েছিলাম। আয়েশা বেটি কাল সকালে দশটার দিকে ফোন করে আরসুর কথা বলে নিও। কি যেন বলতে চেয়েছিলো সে। ঠিক আছে মা। আল্লাহ হাফেজ মা। ভালো থাকুন।

পরেরদিন সকাল নয়টা আরসালান আয়েশাকে ফোন করে জানায় দশটার দিকে তাদের বাসায় আসতে। এক সাথে বৃটিশ কাউন্সিলে যাবে। ক্রস সাহেবের সাথে মিটিং আছে। এখন থেকে ফাইনাল পর্যন্ত তোমাকে প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে দুইটা পর্যন্ত ক্রস সাহেবের সাথে থাকবে। ক্রস সাহেব তোমাকে ট্রান্সপোর্ট প্রোভাইড করবেন বৃটিশ কাউন্সিল থেকে। বৃটিশ কাউন্সিল আমাদের এ প্রজেক্টের পার্টনার। প্রজেক্টের নাম আইসডি বাংলাদেশ। বৃটিশ কাউন্সিল প্রজেক্টের জন্যে অর্ধেক অর্থ বরাদ্দ করেছে। ঢাবি করেছে অর্ধেক।বাকি সব খরচ করবে আইসডি। তোমাকে চ্যাম্পিয়ন হিসাবে দেখা বৃটিশ কাউন্সিলেরও স্বপ্ন ও ইচ্ছা। কাউন্সিলের গাড়ি তোমাকে বাসা থেকে নিয়ে আসবে ও বাসায় পৌঁছে দেবে। দুপুরে লাঞ্চ করবে কাউন্সিলে ডক্টর ক্রসের সাথে। বলে তাহলে কি স্যার, আমি এখন আপনাদের বাসায় আসবো। নিশ্চয়ই আসবে। আমার দায়িত্ব তোমাকে ক্রস সাহেবের কাছে নিয়ে যাওয়া। তোমার ব্যাপারে আমাকে নিয়মিত ভিসি স্যারের কাছে রিপোর্ট করতে হয়। তোমার জন্যে লাখ লাখ টাকা খরচ করা হচ্ছে শুধু তোমাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার জন্যে। কথা না বলে এক্ষুনি রওয়ানা দাও। সিএনজিতে উঠেই আপনাকে কল দিবো। ওকে, তাহলে ফোন রাখি। আল্লাহ হাফেজ। খালা আমাকে এক্ষুনি বৃটিশ কাউন্সিল যেতে হবে। কিছু মুখে দিয়ে যা। না খালা একদম সময় নেই। তুমিতো ঢাকার জ্যাম। এখানে সময়ের কোন দাম নেই। প্রতিটি যাত্রার জন্যে একদুই ঘন্টা সময় হাতে রাখতে হয়। দশটা পনেরো মিনিটে আয়েশা আরসালানের বাসায় পৌঁছে। আয়েশা হুড়মুড় খেয়ে ভিতরে যায়। স্যার আমি এসে গেছি। পনেরো মিনিট দেরি হয়ে গেছে। আরসালানের মা বললেন, আয় বেটি টেবিলে বস। আমি জানি তুমি নাশতা করোনি। কোম করে জানলে মা। তোমার খালাজান বলেছেন। বসো, খুব আরাম করে নাশতা করো। তারপরে বৃটিশ কাউন্সিল যাবে। দেখো, টেবিলে তোমার পছন্দমতো সব নাশতা রাখা আছে। তুমি নিয়ে খাও। গরম পাটিসাফটা পিঠাও আছে। তুমি এটা খুব পছন্দ। দেখো মা, আমাকে বউ বউ ভাবলে আমি কিন্তু আর আসবোনা। আমাকে মেয়ে মনে করলে এতো কিছু করছো কেন। টেবিলে থাকলেও আরসু চুপ চাপ করে নাশতা করছে। কোন দিকে নজর দিচ্ছে না। দেখো মা, উনিতো এখনও আমার স্যার। খুব বেশী হলে বড় ভাই। এছাড়া উনি একজন শিক্ষক মানুষ। একটু গম্ভীর থাকা দরকার। কি হলো স্যার আপনি কি বাসায়ও স্যার। মার সাথে সারাদিনে কটা কথা বলেন? দরকার না হলে কি কথা বলবো। বাসায় থাকলে মাতো সারাক্ষণ কতা বলে। বিনা কারণেই বলে আরসু কই গেলিরে। আম্বিয়া কই গেলি। মা’তো কথার মেশিন। আয়েশা বেটি তুমিই বলো,বাসায় আমি কার সাথে কথা বলবো। এতো বড় বাড়িতে কথা বলার কোন মানুষ নেই। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। এতো স্টাফ তবুও কথা বলার লোক নেই। মারে আমিতো সাথী হারা হয়ে গেছি অনেক বছর। আমার একাকীত্ব আর শেষ হয়না। ছেলে বিদেশে চলে গেছে,আমি একা হয়ে গেছি। এখন তুমি আসবে। আবার দুজনেই বিদেশ চলে যাবে। আমি একেবারেই একা হয়ে যাবো। জানিনা, দাফনের সময় তোমাদের কেউ থাকবে কিনা। একথা বলেই গুলশান বেগম অঝোরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। আয়েশা কাছে এসে জড়িয়ে ধরে গুলশান বেগমকে আর চোখ মুছিয়ে দেয়। ঠিক আছে মা, আপনি না চাইলে আমি বিদেশে থাকবো না। সেটা কি আর হয় মা। তোমার ক্যারিয়ারের জন্যই বিদেশে যেতে হবে। তোমার ক্যারিয়ারের কোন ক্ষতি করতে পারিনা। ঠিক আছে মা। চোখ মোছো। আরসালান উঠে এসে মাকে একটু আদর করে । চলো আয়েশা, আমরা এখন রওয়ানা দেবো।

গাড়ি চলছে বৃটিশ কাউন্সিলের দিকে। রাস্তার অবস্থা মোটামুটি ভাল। মনে হয় জ্যাম হবেনা। ইউনিভার্সিটির দিকে ভালো হলেই হলো। আয়েশা জানতে চাইলো সে যদি আমেরিকায় পড়ার সুযোগ পায় তাহলে আরসালানও কি কোথাও ভর্তি হবে। ভাবছি । আগে দেখা যাক তুমি কোথায় ভর্তি হও। তাহলে আমরা দুজনই একই ভার্সিটিতে পড়ার চেষ্টা করবো। আমার অপশন আছে। তুমিতো যেখানে স্কলারশীপ পাবে সেখানেই ভর্তি হবে। তুমিতো নিজে কিছু ডিসাইড করবেনা। হয়ত তোমার কাছে জানতে চাইবে তোমার চয়েস কি। তাহলে কি বলবে। তাহলে কি বলবো আপনি বলুন। তোমার চিন্তা আছে কিছু। না। তাহলে তুমি বলবে হার্ভার্ড। তাহলে আমিও সেখানে ভর্তি হবো আরেকটা মাস্টার্স করার জন্যে। আমিও সরকার বিষয়ে পড়বো। তুমি পড়বে। আন্ডারগ্রেডে। সবাই তোমাকে তিন চার সেমিস্টার এগিয়ে ভর্তি করার চেষ্টা করবে। আপনি কি কনফিডেন্ট আমি কোয়ালিফাই করবো। ডক্টর ক্রস মনে করছেন তুমি দশর ভিতর থাকবে। তাহলেই তুমি স্কলারশীপ পেয়ে যাবে। শুনেছি আমেরিকান দূতাবাস তোমার রিকমেন্ড করেছে। বর্তমান রাষ্ট্রদূত তোমার প্রেজেন্টেশন শুনেছেন। তুমি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়ে রাষ্ট্রদূত একটি ডিনার থ্রো করবেন। ক্রস সাহেব এখন ফুলটাইম তোমাকে নিয়ে ভাবছেন ও কাজ করছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকানরা ভালো কিছু অফার না করলে তিনি তোমার জন্যে অক্সফোর্ডে ব্যবস্থা করবেন ফুল স্কলারশীপ। এ ব্যাপারে চিন্তা করোনা। আমি চাই তুমি আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে কাজ করো। পিএইচডি করে  ল’ পড়ো। সুযোগ পেলে ওবামার সহকারী হিসাবে কাজ করো। এসবতো আপনার স্বপ্ন। নিজের মানুষকে নিয়ে অমন স্বপ্ন দেখতে ভাল লাগে। আপনি কি জানেন, আমার একজন কল্পলোকের মানুষ আছে। আরসালান মনে মনে বলেন, হে খোদা  একী শুনি। এ আবার কি কথা। সে কে? আমার সিনিয়র ফ্রেন্ড। কি করে? কিছু করেনা। আমার মনের ভিতর ঢুকে কথা বলে। আমাকে উত্‍সাহিত করে। বলে, আয়েশা আমি যা পারিনি তুই তাই কর। বড় হ। এমন বড় হবি সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিবি। চট করে আবার বিয়ে করে ফেলিস না। তুমি কি বললে? বলেছিলাম পড়ালেখা শেষ করে বিয়ে করবো। সে বলেছিলো দাসী হবিনা। সংগমের মেশিন হবিনা। এখন দেখছি পড়ালেখা শেষ না করেই বিয়ে করতে হচ্ছে। আমি বন্ধুর কথা রাখতে পারলাম না। আপনিও আর মেয়ে পেলেন না। ভার্সিটির একজন শিক্ষক বিয়ে করতে পারতেন। আমাদের ডিপার্টমেন্টে বহু সুন্দরী আছেন। তাঁরা আপনাকে লুফে নিতেন। আপনার বুঝি কচি মেয়ে ভাল লাগে। না না আমি তেমন কখনই ভাবিনি। কচি পাকা কি তাও জানিনা। আপনি আমাকে পছন্দ করেন তা বুঝি মাকে বলেছেন। না, তেমন করে কিছু বলিনি। মা’ইতো নিজে থেকে উদ্যোগ নিলেন। মা’র নাকি তোমাকে খুবই পছন্দ। কেন জানিনা। দেখোনা, তোমাকে কাছে পেলে কেমন হয়ে যায়।হ্যাঁ, লক্ষ্য করেছি। মা’র আবেগের কাছে আমি সারেন্ডার করেছি। আমি সত্যিই অন্তর থেকেই তাঁকে মা ডাকি। আপনার সাথে কথা না বলেই কি মা এ পথে এগিয়েছেন। না, জানতে চেয়েছিলেন। আমি শুধু মুচকি হেসেছি। আপনিতো শুধু মুচকি হাসেন। এতে মেয়েরা ভুল বোঝে। তুমি কি আমাকে দেখে কিছু ভেবেছিলে। দুদিন বাসায় ডাকার পর আন্দাজ করেছি। আপনাদের বাসার স্টাফদের ব্যবহারেও কিছু আঁচ করেছি। সবাই খুব স্পেশাল ব্যবহার করছে। যেন ওরা সব জেনে গেছে। মা’ই বোধ হয় ওদের ব্রীফ করেছেন। তোমাকে প্রথম দিন দেখেই মা মনস্থির করেছেন। তোমার চেহারায় কি যেন আছে। কথা শেষ না হতেই গাড়ি বৃটিশ কাউন্সিলে এসে থামে।

 

 

 

রূপকথা ৫

আয়েশা, ক্রস সাহেবের সাথে দেখা করে সময় পেলে আমাদের বাসায় এসো। মা তোমাকে খবর দিতে বলেছ। নিজেও ফোন করতে পারেন। না না, ফোন করার দরকার নেই। আমি আসবো। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও আসবো। তোমার ট্রান্সপোর্ট আছেতো। জ্বী আছে,ক্রস সাহেব দিয়েছেন। বৃটিশ কাউন্সিলের গাড়ি। আমি ডিপার্টমেন্টে থাকবো। ফ্রি হলে তুমি সেখানেও আসতে পারো। না স্যার, ওখানে গেলে ছেলে মেয়েরা তামাশা করবে। আরও বেশী করে গল্প বানাবে। স্যার আমি পড়ালেখা নিয়ে খুব চিন্তিত।শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে পারবোতো। এ বিষয়ে তোমার চিন্তা করার কিছু নেই। আমি দেখবো বিষয়টা। সময় মতো তোমাকে সব জানানো হবে। দুপুরে কোথায় খাবে। এখনও জানিনা ।দেখি ক্রস সাহেব কি ব্যবস্থা করেন।  আমারতো মনে ওনার কাছে থাকলে তিনিই লাঞ্চের ব্যবস্থা করবেন। এ পর্যন্ত তিনি ব্যবস্থা করেছেন। বৃটিশ কাউন্সিল এ ব্যবস্থা করে। আমার ব্যাপারে তারা খুবই আন্তরিক। স্টাফরাও আমাকে খুব সম্মান করেন। আমি যদি ফ্রি হই তাহলে আপনাকে ফোন করবো। ঠিক আছে স্যার আমি এখন  বৃটিশ কাউন্সিলের যাচ্ছি। রাস্তায় বেশ জ্যাম ছিল। শ্যামলী থেকে প্রায় দেড় ঘন্টা লেগে গেছে। ক্রস সাহেবের চেম্বারে গিয়ে আয়েশা বিলম্বের জন্যে দু:খ প্রকাশ করলো। না না , দু:খ প্রকাশ করার কিছু নেই। আমি জানি ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা।কোথাও হয়ত রাজনৈতিক দলের সভা হচ্ছে। না হয় মানব বন্ধন হচ্ছে। কোথাও ছাত্ররা ব্যারিকেড দিয়েছে। সরকারী দল যেকোন সময় যেকোন জায়গায় সভা করতে পারে। এমন কি সরকার সমর্থকরাও পারে। ভিআইপিদের জন্যেও রাস্তায় ডাইভারশন চলে।  এসবতো রাজধানীর নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার। আমি জানি যদি তা না হতো তুমি একেবারে ঠিক সময় পৌঁছে যেতে। যা হোক এ নিয়ে ভাববার কিছু নেই। এখন বলো তুমি কেমন আছো। জ্বী স্যার খুব ভালো। আপনাদের সাথে থেকে আমি ভালো থাকা শিখে ফেলেছি। আপনিতো সদা হাসিখুশী। মিস্টার আরসালান তোমাকে ব্রিফ করেছেনতো। জ্বী করেছেন। আরসালান খুবই একজন ভালো মানুষ । তার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ও খুবই স্ট্রং। তিনি তোমার রাইট গাইড। তোমার কি মনে হয়। আপনি একশ ভাগ সত্য বলেছেন। তাঁকে এখানে ডাকবো। কিছু বিদেশী আসবেন তোমার সাথে কথা বলার জন্যে। একটা ইনফরমাল মিট। কোন সিরিয়াসনেসের দরকার নেই। একেবারেই ফ্রি থাকবে। সবাই সোফায় বসবেন। তুমি একটি সোফায় একা বসবে। না জানলে সোজা বলে দিবে জানিনা। ভাবনার কোন দরকার নেই। কোন অসুবিধা নেই স্যার। আমার উপর আস্থা রাখুন। তবে যা বলবে তা খুবই বিনয়ের সাথে মানে পোলাইটলি বলবে। মনে রাখবে বিনয় খুবই মুল্যবান ম্যানার্স। শুনেছি ইসলামে আদবের খুব গুরুত্ব দেয়। যদিও বাংলাদেশে বিনয়ের চর্চা খুব একটা আছে বলে মনে হয়না। এখানে মানুষ উচ্চ কন্ঠে কথা বলতে ভালবাসে। রাজনীতিবিদদের মূল সম্পদ গলা বা কথার আওয়াজ। বেশীর ভাগ রাজনীতিক চিত্‍কার করে কথা বলেন। কিছু বলার নেই,এটাই হয়তো এ দেশের কালচার। অশিক্ষিত লোকদের গলার আওয়াজ আরও বেশী। হয়ত তারা ভাবে জোরে বা চিত্‍কার করে কথা বললে কথার গুরুত্ব বাড়ে। কথায় কথায় আমি অন্য প্রসংগে চলে এসেছি। দু:খিত। ঠিক বলেছেন স্যার। আমিও তাই মনে করি। এদেশে টেবিলটকেও হাত নেড়ে জোরে কথা বলে। এমন কি ভার্সিটি ক্যান্টিনেও টেবিল চাপড়িয়ে হাত পা নেড়ে চিত্‍কার করে কথা বলে ছাত্ররা। আগে শিক্ষিত নেতাদের ভিতর নাকি এ কালচার ছিলনা।  এখন প্রায় সকল নেতাই চিত্‍কার করে কথা বলেন। এমন কি সংসদকেও তারা মাঠের বক্তৃতা মনে করেন।

প্রায় একটায় মেহমানরা আসেন। দেরী না করে তাঁরা আলোচনায় বসেন। মিস্টার ক্রস মেহমানদের সাথে আয়েশাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। বেশীক্ষণ নয় মাত্র তিরিশ মিনিট কথা বলেন তাঁরা। আসলে কথা বলার চাইতে পরিচিত হওয়ার জন্যেই এসেছেন তাঁরা। বললেন, মিস আয়িশা আপনি ডিবেটে ফার্স্ট হলে কি আমেরিকায় থেকে পড়ালেখা করবেন। জ্বী, তেমন ইচ্ছা আছে যদি ভালো স্কলারশীপ পাই। কি পড়বেন? ইচ্ছা আছে রাজনীতি ও রাস্ট্র নিয়ে পড়ালেখা করার আছে। পরে ল’পড়ার ইচ্ছা আছে। দেশে ফিরে আসবেন? ভালো সুযোগ পেলে বিদেশেও থাকতে পারি। শিক্ষকতা করবো,না ল’প্র্যাকটিস করবো। আপনিতো এখনও গ্রাজুয়েশন শেষ করতে পারেন নি। না, আমার বয়স এখন উনিশ। আমি গ্রাম থেকে বারো ক্লাশ শেষ করে ঢাকায় এসে পল সায়েন্সে ভর্তি হয়েছি। ভার্সিটি ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আমার নাম জানাজানি হয়েছে। এখন আমি ইন্টার ভার্সিটি ডিবেটের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরাতো শুনেছি আপনি ওখানেও চ্যাম্পিয়ন হবেন। স্যারেরা তো চেষ্টা করছেন আমি যেন ইন্টার ভার্সিটিতে চ্যাম্পিয়ন হতে পারি। আমরা ও মনে করি আপনি পারবেন। আপনি খুবই সুন্দরী স্মার্ট। কথা বলেন খুব সুন্দর। আপনার চলাফেরাও সুন্দর। মিস্টার ডানকান ক্রস সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন আয়েশা সম্পর্কে তাঁর কি ধারনা কি। আমিতো মনে করি আয়েশা খুব ভালো করবে। সে ভাবে আমরা তাকে গড়ে তুলছি। আমি আয়েশার আন্তর্জাতিক গাইড। যদি বাংলাদেশে চ্যাম্পিয়ন হয় তার সাথে আমি আমেরিকা যাবো। একটু পরেই ডক্টর আরসালান আসলেন। তিনিও আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন। মিস্টার স্টুয়ার্ড আরসালানের কাছে জানতে চাইলেন আয়েশার অবস্থা কেমন।  আমরাতো আশা করছি আয়েশা বাংলাদেশে চ্যাম্পিয়ন হবে। সে সকল দিক থেকে বেস্ট। ভিসি স্যার ব্যাক্তিগত ভাবে আয়েশার খোঁজ খবর রাখেন। তিনি এজন্যে ভালো ফান্ড বরাদ্দ করেছেন।  সোনারগাঁয়ের প্রোগ্রামের পর ভিসি স্যার আয়েশার পড়ালেখার খরচ ফ্রি করে দিয়েছেন। আপনারা কি আয়েশার জন্যে কিছু করতে চান বা কিছু করার তেমন সুযোগ আছে কিনা। বলুন দেখি শুনি। আমরা আর কি করবো। আয়েশাতো আমেরিকাতে ভালো স্কলারশীপ পাবে। তাহলে পড়ার কোন অসুবিধা হবেনা। সারা ইউরোপ ঘোরার জন্যে আমরা ব্যবস্থা করতে পারি। যখন সময় ও সুযোগ পাবে তখন এ প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে। এর সময় জনিত কোন সীমাবদ্ধতা নেই। যে কোন সময়ে আয়েশা দেশ গুলোতে সফর করতে পারবেন। আমেরিকা থেকেও যেতে পারবেন। কি বলেন আয়েশা আপনি। এতো খুবই উত্তম প্রস্তাব। দেশ ভ্রমণ মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করে। আমি রাজী।

দুপুরের খাবার গ্রহণ শেষ হতে তিনটা বেজে যায়। তারপরে আরো কিছুক্ষণ খোশগল্প। ক্রস সাহেব জানালেন চারটার দিকে তার প্রোগ্রাম আছে। মিস্টার ডানকান বললেন,মিস আয়েশা যখনি প্রয়োজন হবে ফোন করবেন। আপনি ম্যাসেজ দিলে আমি নিজেকে ফ্রি করে নিবো। একুশ তারিখের ফাইনালের পর যোগাযোগ করবো। এছাড়া আমি এখন এই দুই স্যারের অধীনে আছি। এই দুই স্যার আমার সময় নিয়ন্ত্রণ করেন। আপনারা ক্রস সাহেবের যোগাযোগ করলেও হবে। ওকে নো প্রবলেম। আরসালান জানতে চাইলেন আয়েশা কি তার সাথে বারিধারা যেতে পারবে। জ্বী স্যার পারবোনা কেন। নিশ্চয়ই পারবো। তাহলে তুমি আমার গাড়িতেই যেতে পারবে। আপত্তি নেইতো। কি যে বলেন স্যার। আপত্তি থাকবে কেন। তুমিতো আমার সাথে চলতে দ্বিধা করো। না স্যার আপনি ভুল  বুঝেছেন। ভার্সিটি থেকে এক সাথে বের হতে চাইনা। সেটা আপনার সম্মানের কথা ভেবে। ভার্সিটির ছেলে মেয়ে গুলোতো একেবারে বেয়াড়া। মুখরোচক গল্প বানিয়ে আপনাকে বিব্রত করবে। তাই আমি একটু দূরে থাকি। আপনি কি ব্যাপারটা বুঝতে পারেন না। পরে বাজে ছেলে মেয়েরা আপনাকে ও আমাকে স্ক্যান্ডল তৈরি করবে। ভিসি স্যারকে বিভ্রান্ত করে একটা অকোয়ার্ড পজিশনে ফেলে দিবে। মাঝখানে আমার ক্যারিয়ারটা নষ্ট হয়ে যাবে। সরি আয়েশা আমি ওভাবে চিন্তা করিনি। আমি দু:খিত। ঠিক আছে স্যার এখন চলুন। সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আপনি জানেনতো আপনার মা আমাকে মেয়ে ডেকেছেন। আমিও তাঁকে মা ডাকি। আপনার সাথে আমার কোন দুরুত্ব নাই। আয়েশা গাড়িতে উঠে বসে। আরসালান তার পাশেই বসে। গফুর ভাই চলুন বাসায় । স্যার আমি বাসায় ফোন করে জানাই  বারিধারা যাচ্ছি। নিশ্চয়ই জানাবে। তা না হলে তোমার খালা খালু চিন্তা করবেন।

রাস্তায় জ্যাম না থাকায় চল্লিশ মিনিটে বাসায় পৌঁছে গাড়ি। আরসালান আগেই জানিয়েছে আয়েশার কথা। বাসার স্টাফরা সবাই এসে গেটে অপেক্ষা করছে। আয়েশা গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে আম্বিয়া বু হাত বাড়িয়ে আয়েশাকে রিসিভ করে। কি খবর আপু,কেমন আছেন। খালাম্মা কেমন আছেন। তিনি আপনার অপেক্ষায় ড্রয়িং রুমে অপেক্ষা করছেন। ভিতরে পৌঁছার পর গুলশান বেগম আয়েশাকে বুকে জড়িয়ে ধরে খোশ আমদেদ জানায়। কি বেটি এতদিন পর মাকে মনে পড়লো।খালাম্মা আপনার কথা সব সময় মনে পড়ে।এখানে আমাকে এতো আদর আর কেউ করেনা। আপনি আমার মা। ঠিকই বলেছিস বেটি। আমারতো কোন মেয়ে কাছে নেই। বেটা আরসু, তুমি পোষাক চেঞ্জ করে আসো। এক সাথে বিকেলের নাস্তা করবো। বসো মা আয়েশা। তোমার মা বাবা কেমন আছেন। জ্বী, ভালো আছেন। তোমার বাবা কি ঢাকা আসেন? জ্বী না। তবে এবার আসবেন বলেছেন। তোমার খালা খালুকে নিয়ে একদিন আমাদের বাসায় আসো।  ওনাদের বলবো। মা তুমি কি ওয়াশ রুমে যাবে? জ্বী যাবো। চলো আমার রুমে চলো। আজ রাতে আমার সাথে থাকো। থাকবো নিশ্চয়ই। তবে আজ না। আরেকদিন এসে থাকবো। সকালে আসবে,সারাদিন থাকবে,রাতে থাকবে। ঠিক আছে জ্বী। তোমার জন্যে আমি কিছু ড্রেস তৈরি করতে চাই। যেটা তুমি ডিবেটের ফাইনালে পরবে। কোন আপত্তি আছে? এতো টাকা খরচ করার কি দরকার খালাম্মা। আরে বেটি এই বাড়িটাই তোমাকে দিয়ে দিবো। তুমিতো আমারই মেয়ে। আমার ওয়ারিশ হবে। আয়েশা ভাবছে ওয়ারিশ হবে কেমন করে। এমন সময় আরসালান নিচে নেমে আসে। কি লিখে দিয়ে দিচ্ছো মা। আয়েশা বেটিকে এ বাড়িটা লিখে দিয়ে দিবো। কী আশ্চর্য মা! চেনা নাই জানা নাই,কোত্থেকে কাকে ডেকে এনে বাড়ি দিয়ে দিচ্ছো। বেটা আরশু এটা আমার বাড়ি। আমি কি দিতে পারিনা। তা পারো মা। কিন্তু আমার কথা ভাববেনা। আমার ও তোমার বাবার যা আছে সব তুমি নিয়ে যাও। কিন্তু মা আয়েশাকে এ বাড়িটা দিয়ে দেবো। কখন দিবে মা। কদিন পরেইতো মা আমার ঘরে চলে আসবে। আম্বিয়া টেবিল সাজাও। আমি আয়েশা নিয়ে একটু উপরে যাচ্ছি। বেটি ওয়াশরুমে যাবে। বেটা আরসু তুমি নাস্তার এন্তেজাম করো। আমরা দশ মিনিটের ভিতর নিচে নেমে আসবো। ডিনারেরও ব্যবস্থা করতে হবে। আয়েশাকে রাতে থাকতে বলেছিলাম। ও বললো পরে একদিন এসে থাকবে। বেটা আরসু, আয়েশার জন্যে কটা ড্রেস বানাতে হবে। তুমি আমাদের দর্জিকে বাসায় আসতে বলো। আয়েশা নিজে তার ড্রেস ডিজাইন করবে। মা তুমি কিছু ড্রেস সিলেক্ট করে রাখো। দর্জি যেদিন আসবে সেদিন তোমাকে খবর দেবো। ছুটির দিন হলে ভালো হবে। খালাম্মা আমার অনেক ড্রেস আছে। ফাইনালের জন্যে আমি বেশ কিছু ড্রেস বানিয়ে রেখেছি। মা আমি তোমাকে রাজকন্যার মতো দেখতে চাই। খালাম্মা আমি অতি সাধারন ঘরের কন্যা। রাজকন্যা কেন বানাবেন। বিদ্যা শেষেতো আমি শিক্ষকতা করবো দেশে অথবা বিদেশে। তবুও আপনার হুকুম শিরোধার্য। আপনি দর্জিকে খবর দিন। আপনার কথা অমান্য করতে পারবোনা। আরসু দর্জিকে এখুনি ফোন করো। তাড়াতাড়ি যেন আসে। আমার কথা বলবে।

খালাম্মা আমি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে চাই।  নিশ্চয়ই ফিরবে। আমার কি অধিকার আছে তোমাকে এখানে রাখার। ওই খালার বাসা আর এই খালার বাসার মধ্যে ফারাক কি বলো। শ্যামলীতে আপন খালা আছে সেটাতো জানি। আপন না হলেওতো আমি খালা। ছি ছি, অমন করে বলবেন না মা। এরপর থেকে শুধু মা বলবে। রাজীতো বলো। জ্বী মা। আগেইতো বলেছি আমার দুটো মা। একটা শহরে, আরেকটা গ্রামে। গুলশান বেগম আয়েশাকে বুকে টেনে নেয়। বলেন, আজীবন মা ডাকবি। পারবিতো। জ্বী পারবো। ঠিক আছে, শোন মা ,কটার সময় ডিনার করবি। জ্বী ,ঠিক নটায়। তাহলে আমি দশটায় বাসায় ফিরে যেতে পারবো। ঠিক সময় তোমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়া হবে। সাথে একজন সিকিউরিটির লোকও থাকবে। তুমি আর কিছু খাবে? না মা। বিকেলে আমি মুড়ি আর চা খাই। তোমার জন্যা মুড়ি আনিয়ে রাখবো। তোমার যা যা পছন্দ তা এখানে থাকবে। চলো,এখন আমি তোমার সাথে গল্প করবো। চলুন মা। বেটা আরসু তুমি কি আমার ঘরে যাবে। না মা, আমি একটু পড়ালেখা করবো। কাল ক্লাশ আছে। ঠিক আছে তুমি তোমার রুমে যাও। চলো মা। রুমে ফিরে গুলশান বেগম আয়েশাকে নিয়ে বিছানায় বসেন। মা আপনি আমার কোলে মাথা রেখে শোন। আমি চুলে বিলি কেটে দেবো। আপনার ভালো লাগবে। নারে মা আমি ঘুমিয়ে পড়বো। না আমরাতো কথা বলবো। তবুও আমি ঘুমিয়ে পড়তে পারি। ঠিক আছে তুই বলছিস যখন। আপনার মাথায় এমনিতে কেউ বিলি কেটে দেয় মা। না,কাজের বুয়াদের দিয়ে আমি এসব করাইনা। আচ্ছা বেটি,আমি একটা কথা বলতে চাই। বলুন মা,কোন অসুবিধা নেই। আমি যদি তোকে এ বাড়িতে নিয়ে আসি স্থায়ী ভাবে তোর কোন আপত্তি আছে। না মা, আমি মত দিলাম। আপনি আমার খালার বাসায় একদিন আসুন। আমি বলে রাখবো। আপনি যেকোন দিন আসতে পারেন বিকেলের দিকে। আপনি ফরমাল প্রস্তাব দিন। খালা আমার বাবাকে জানাবেন। তিনি রাজী হলে আর কোন অসুবিধা নেই। বাবাকে রাজী করানোর দায়িত্ব খালা খালুর। আমিতো ফাইনালের আগে বাড়ি যেতে পারছিনা। আল্লাহর রহমতে যদি চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাই তাহলেতো আমেরিকা যেতে হবে। সে প্রস্তুতি নিতে বেশ সময় লেগে যাবে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপের ডিবেট হবে জুন মাসে। আমেরিকা যাওয়ার আগে আমরা কাজটা সেরে ফেলতে চাই। আরসু রাজী আছে। প্রয়োজনে সে তোমার সাথে যাবে। আমার বড়মেয়ে আফরিনের বাড়ি ওয়াশিংটনে। আরসু আফরিনের ওখানে থাকবে। মা আমিতো হোটেলে থাকবো। এটা ফাইনালিস্টদের জন্যে বাধ্যতামূলক। মিস্টার ক্রস ও স্যার আমেরিকা যাবেন আমার গাইড হিসাবে। তাঁরা দুজনই আমার সাথে হোটেলে থাকবেন। তখন আমার চব্বিশ ঘন্টার ট্রেনিং চলবে। শুরুতেই সবদেশের নিয়ে একটি সভা হবে। বলা যেতে পারে পরিচিতি সভা। প্রত্যেক দেশের শিক্ষকরাও থাকবেন। একই হোটেলে দুশো রুম বুক করা হয়েছে। প্রতিযোগী মাত্র পঞ্চাশ জন। বাকি সব শিক্ষক ও গাইড। আমার গাইড দুইজন। আমার রুমের পাশেই স্যারেরা থাকবেন। আমাদের ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান ও ভিসি স্যার ও যেতে পারেন। আমেরিকাতেও আমাকে নিরাপত্তা সুপারভিশনে রাখা হবে। আমি যেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারি সেজন্যে ভার্সিটি বহু টকা খরচ করছে। তাই ভালো করার প্রধান দায়িত্ব আমার। একজন আমেরিকান গাইডও নিযুক্ত হতে পারেন। ক্রস সাহেব একজন বৃটিশ। আমেরিকার ডিবেট সিস্টেমও শিখানো হবে। প্রথমে সবাই এক সাথে প্রতিযোগিতায় অংশ নিবে। সময় পাঁচ মিনিট করে। শুরু হবে বাছাই পর্ব। প্রথম তিন দিনে কাউকে বাদ দেয়া হবেনা। এরপরে বাদের পালা শুরু হবে।  এভাবেই ফাইনালে যাবে দশজন। আশা করি আমি ওই দশ জনের থাকতে পারবো। ক্রস সাহেব বলেছেন ফার্স্ট হওয়ার যোগ্যতা আছে। গুলশান বেগম আয়েশাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিয়ে কপালে চুমো খান। আম্বিয়া বু’কে ডক দিয়ে বললেন, ডিনার টাইম হয়ে গেছে। আরসুকে নিচে নামতে বলো। আমরাও নামছি। জ্বী আম্মা। খাবার টেবিলে সাজিয়ে ভাইয়াকে ডাকবো। তাহলে কথা রইলো আমি তোমার খালার বাসায় যাবো। মা, গাড়িতো বাসা পর্যন্ত যায়না। দুই তিন মিনিট হাঁটতে হয়। অথবা আমার সিএনজিতে উঠবেন। আগে দেখো হাঁটতে পারি কিনা। তা না হলে সিএনজিতো আছেই।

জরিফার বরের সাথে এখন খুব মধুর সম্পর্ক। জরিফার শ্বাশুড়ীও খুব খুশী বউয়ের হাসি খুশী ভাব দেখে। খলিলকে এখন আনন্দময় দেখায়। জরিফা দিন দিন স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দশ বারো জন বসতে পারে এমন আরেকটি রুম তৈরি করা হয়েছে। এখন জরিফার ছাত্রী সংখ্যা বারো জন। ঠাসাঠাসি করে আরও পাঁচ জন বসতে পারবো। কোচিং ক্লাসের এক বছর পুর্তিতে জরিফা ও খলিল বাসায় ছোট্ট একটা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছে। অভিভাবকরা বিশজনের মতো এসেছেন। প্রত্যেকেই জরিফার জন্যে গিফট নিয়ে এসেছেন। মহা আনন্দময় একটা অনুষ্ঠান। জরিফা তার শ্বাশুড়ী ছেলে ও স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সবাই বললেন আমরা খলিল সাহেবকে চিনি। তিনি একজন খুব ভালো মানুষ। গ্রামীন ব্যান্কের কারণে তিনি এলাকাবাসীর খুবই পরিচিত। তবে জরিফা ম্যাডামকে ঘরে বসিয়ে রেখে তিনি ভুল করেছেন। এমন একজন বিদ্বান মানুষকে বিদ্যার বাইরে লুকিয়ে রেখে তিনি একেবারেই ভাল করেননি। খলিল দাঁড়িয়ে সবার কাছে নিজের ভুল স্বীকার করলেন। একজন অভিভাবক বললেন, ম্যাডাম জরিফা যদি বড় কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাহলে আমরা সহযোগিতা করবো। তিনি খুব কম টাকায় মেয়েদের পড়ান। এছাড়া আমাদের এখানে মেয়ে কোচিং টিচার নেই। পুরুষ কোচিং টিচারগণ বেশী ফিস চার্জ করেন। এজন্যে অনেকেই জরিফা ম্যাডামের উপর অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায়না। আমরা সবাই আপনাদের সাথে আছি।

একজন অভিভাবক বললেন আমরা এবার জরিফা ম্যাডামের কাছ থেকে কিছু শুনতে চাই। সবাই হাত তালি দিয়ে জরিফাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানায়। আসসালামু আলায়কুম,প্রিয় অভিভাবক ও ছাত্রী গণ। আমি প্রায় দশ বছর আগে পলিটিক্যাল সায়েন্সে ফার্স্ট ক্লাশ পেয়ে পাশ করেছি। এর কিছুদিন পরেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। বিগত আট বছর আমি গৃহবধু হিসাবে সময় কাটিয়েছি। এখন আমি আমার বর খলিল সাহেব ও শ্বশুড়ীর সহযোগিতায় এই কোচিং ক্লাশ চালু করেছি। আমি এখন জীবিত হয়েছি। এতোদিন আধমরা ছিলাম। কোচিং সাফল্যের কথা আপনারা বলেছেন। মেয়েদের পড়াতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। টাকা রোজগার করা আমার লক্ষ্য নয়। ওটা একটা বাড়তি পাওনা। আমি গরীব কয়েকটা মেয়ের পড়ার খরচ চালাই। আপনারা দোয়া করলে এই কোচিং সেন্টার পূর্ণাংগ স্কুলে পরিণত হবে। এরপর একজন ছাত্রী কিছু বলার জন্যে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলো। আমাদের ম্যাডামের মতো এমন ভালো মানুষ এ অঞ্চলে নেই। তিনি একজন অতি আধুনিক মানুষ। মনটা মোমের মতো নরম। প্রতিদিন আমাদের নাশতা করান। কখনও রাগ করেন না, মুখ কালো করেন না। নে হয় তিনি আমাদের মায়ের মতো বড়বোন। তিনি যে এতো বড় একজন শিক্ষিত মানুষ আমরা জানতাম না। একজন অভিভাবক বললেন, ম্যাডাম আপনি নাশতার জন্যে কিছু চার্জ করুন। জ্বী না, আমি আমার শ্বাশুড়ীর উত্‍সাহে ওদের নাশতা করাই। একজন বুয়া রেখেছি নাশতা তৈরি করার জন্যে। ওরা এখন আমাদের ভিতরের  টয়লেট ব্যবহার করে। নতুন টয়লেট খুব শীগগীরই তৈরি হবে।

রাতে জুলেখা বরকে বুকে নিয়ে শুয়ে আছে। খলিলকে বলছে। তুমি কিছু বলছোনা কেন বন্ধু। ভাবছি, কি বলে তোমার প্রশংসা করবো। আমার মন প্রাণ দেহ আনন্দে উল্লসিত আজ। তাই ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা কি বলে তোমার প্রশংসা করবো। তুমি মায়ের প্রশংসা করো। পুরোণো দিনের মানুষ তোমার চেয়ে অনেক আধুনিক। মায়ের অন্তর আলোকিত। বিদ্যা তোমাকে মানুষ করতে পারেনি। কারণ তুমি অন্তরে অন্ধ। আমিতো ধরে নিয়েছিলাম আজীবন তোমার দাসী হয়ে থাকবো। তাই আমি আমার বিদ্যার সব অধিকার ত্যাগ করেছি। আনপড় একটা গ্রাম্য মেয়ের মতো জীবন কাটিয়ে দেবো। তোমাকে আমি তেমন দোষ দিবোনা। সবচেয়ে বড় দোষী আমার বাবা। আমি বুঝতে পারছিনা তিনি কেন আমাকে এমএ পাশ করিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই জানতেন তুমি একজন অন্ধ সার্টিফিকেট ধারী মানুষ স্ত্রী মানে সংগমের বাধ্য সাথী। ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামী দেবতাকে সন্তুষ্ট  করতে হবে। তাইতো আট বছর করে আসছি। আমার মন ছাড়া বাকি সব কিছুতেই তোমার অবদান আছে। না চাইতেই তোমার ইচ্ছা মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনো। এর মানে তুমি দামী দামী জিনিস কিনে আনো তোমার আনন্দের জন্যে। কোনদিন জানতে চাওনি আমার মন কি চায়। দিন হলে আমাকে সাজাও নিজে দেখার জন্যে। রাত হলে পোষাক খোল। আমার ছেলেটা কত বছর হয়ে গেছে মায়ের সাথে থাকেনা। মায়ের উষ্ণ ছোঁয়া না পেলে সন্তানেরা বথ হলে কঠোর হয়ে যায়। তুমিতো চাইল্ড সাইকোলজি পড়োনি। তুমিতো আমার বিদ্যাকে এক টুকরো কাগজ মনে করো। তুমিতো মহাযোগ্য স্বামী। ব্যান্কে চাকুরী করো। রাজধানী বা বড় কোন শহরে থাকলে বুঝতে তোমার বেতন কতো কম। আমার ছেলেকেও তোমার মতো বানাতে চাও। কিন্তু আমি তা হতে দেবোনা। ছেলেকে রাজধানীতে রেখে পড়াবো। তুমি দেখোনা আয়েশা শহরে গিয়ে কি বিপ্লব ঘটিয়েছে। টিভি খবরের কাগজে আয়েশার সাফল্যের কথা পড়োনা? সেতো আমাদের এলাকারই মেয়ে। ভাগ্য আমার ভালো যে মেয়ে হয়নি। তাহলেতো তুমি তাকে ষোল বছর বয়সে তিরিশ বছরের ছেলের কাছে বিয়ে দিয়ে দিতে।  এতোক্ষণ খলিল একেবারেই চুপ ছিলো। কেনো তুমি এখনো ক্ষমা করোনি আমাকে। হাজার করেছি বন্ধু। তোমার সহযোগিতা না পেলে কি আজিনিস আমি কিনে দেবো।জকের অনুষ্ঠানটি করতে পারতাম। একেবারেই পারতামনা। আসে তোমাকে হাজারটা চুমো দিই। পুরো শরীরে চুমো দিবো। সারা রাত চুমো দিবো। তোমার বিরুদ্ধে আমার আর এক বিন্দুও অভিযোগ নেই। এখন আমি আমার নিজের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করি। তোমার জীবনের অনেক গুলো আনন্দময় সময় নষ্ট করে দিয়েছি। জানিনা, কেন এমন হয়েছে। কি ধারণায় এমন করেছি। এখন তুমি এক হাজার বার স্বাধীন। যা তোমার মন চায় তাই করবে। আমি সহযোগিতা করবো। তোমার হাত খরচের জন্যে মাসে যা প্রয়োজন তাই খরচ করবে। নিজের সময় মতো বাজারে যেয়ে নিজের জিনিস কিনবে। এখনতো আমার কাছেই টাকা আছে। মা’র সমস্ত জিনিস আমিই কিনে দেবো। সাথে মাকে নিয়ে যাবো। মনে রেখো, তোমার জরি কখনই তোমার আস্থা ও বিশ্বাসের অবমাননা করবেনা। আসো এখন বুকে আসো। তোমার ইচ্ছা পুরণ করি। আজ তুমি তোমার প্রেমিকা স্ত্রীর কাছে আসবে। এতোদিন এসেছো এক রক্তমাংসের রোবটের কাছে। কাপড় তুলেছো আর নিজের চাহিদা পূরণ করেছো । আজ এটা একটা আনন্দ মিলন। যাতে প্রাণ আছে। দেখি আজ কতো পারো।

এখন অফিসে আদালতে খলিল খুবই আনন্দময় থাকে। অফিস স্টাফরা ভাবে স্যার এতো খুশী কেনো। এতোদিনতো ছিলো খটখটে গোমরামুখো। সহজে হাসতে পারতেন না। এখন কথায় কথায় হাসেন। অফিসের পরিবেশ ফুলের হাসিতে ভরপুর। স্যার, আপনি এতো খুশী কেন? তোমাদের মিষ্টি খাওয়াবো বলে। যাও বাজার থেকে সেরা মিষ্টি নিয়ে আসো। তারপরে খুশীর কথাটা বলবো। দুপুরের খাবারের সময় সবার মাঝে মিষ্টি বিতরন করা হয়। আসুন সবাই আমার চেম্বারে বা মিটিং রুমে। খলিল খুব হাসি আনন্দে জানান যে, তার স্ত্রীর কোচিং সেন্টারের এক বছর পুর্তি হয়েছে। কাল অভিভাবকরা আমাদের বাসায় এসেছিলেন। জরিকে সবাই দামী দামী গিফট দিয়েছেন। তাতেই স্যার আপনি এতো খুশী? খুশী আরও রহস্য আছে। তা খুবই গোপন বিষয়। একজন মেয়ে কলিগ বললো, বুঝতে পেরেছি। আমি এখন নিজেকে একজন সফল স্বামী ও বন্ধু মনে করি। আপনারা সবাই এখন আমার বাসায় যেতে পারেন জরির সাথে কথা বলতে। কেন স্যার আপনিতে বলেছিলেন আপনার স্ত্রী একজন পর্দানশীন মেয়ে। জন সমক্ষে যান না। আবার এখতাও বলেছেন তিনি এমএ পাশ করেও জনসমক্ষে যেতে চাননা। তিনি শুধুই একজনগৃহবধু। এতোদিন আমি মিথ্যা কতা বলেছি। আমি জরিকে জোর করে বন্দী করে রেখেছিলাম। আমার মনটা খুবই কালো ছিল। আজে বাজে চিন্তা করতাম। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। তিনি এখন মুক্ত স্বাধীন। একজন কলিগ ম্যানেজার সাহেবকে ফুলের মালা দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। জরির স্বপ্ন একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। আমি তাকে একশ ভাগ সাপোর্ট দেবো। এলাকার অভিভাবকরাও বলেছেন তারা সকল প্রকার সাহায্য সহ্যোগিতা করবেন। উপজেলা শহরে আমাদের পরিবারের একটা জমি আছে তা স্কুলের জন্যে দান করে দেবো। কিন্তু বলছে সে নিজের টাকায় জমি কিনবো। আপনারা সবাই ছুটির দিনে আমাদের বাসায় লাঞ্চ করুন। জরির সাথে আলাপ করুন ও খুবই খুশী হবে। জরির খুশীর জন্যে আমি এখন সব করতে পারি।

 

 

 

রূপকথা ৪

এক সপ্তাহ সোনারগাঁ থেকে আয়েশা বাসায় ফিরে আসে। সাথে বেশ কিছু কাটলারিজ ও টেবিল ন্যাপকিন নিয়ে এসেছে। এসব বাসায় ব্যবহার করবে। খালাকে বললো এখন থেকে সে বাসায় এসব ব্যবহার করবে। খালুকে ইংরেজীতে বললো সে এখন থেকে ইংরেজীতে কথা বলা প্রাকটিস করতে চায়। আমেরিকা গেলে সব সময় সবখানে ইংরেজী বলতে হবে। তাই এই প্রাকটিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খালু বললো আমার কোন অসুবিধা নেই। আমি চালিয়ে নিতে পারবো। তোর খালার অবস্থা কি হবে জানিনা। খালা ফারজানা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। আমি একটা শিক্ষিতা মেয়ে। আমার সম্পর্কে এসব বলছো। বলতে পারো প্রাকটিস নেই। বাইরের দুনিয়ার সাথে কোন যোগাযোগ নেই তাই। তুই বল । আমি চেষ্টা করবো। বরং এই ফাঁকে আমারও একটু চর্চা হবে। একটা স্পিকিং ইংলিশের বই নিয়ে আসবো।। দেখবি কোন অসুবিধা হবেনা। খালা ব্র্যাকফাস্ট টেবিল এভাবে সাজাবে। ন্যাপকিন গুলো এভাবে রাখবে। কোন অসুবিধা হবেনাতো। আরে না, কোন অসুবিধা হবেনা। চিন্তা করবিনা। সব ঠিক ঠাক চলবে। এবার তোর সোনারগাঁর কথা বল। ওখানে যারা তারাতো সবাই বিদেশী। যারা সার্ভিস দেয় তারাও ইংরেজীতে কথা বলে। হোটেলে লোকাল গেষ্ট কম। ফলে ওখানে কেউ বাংলা বলার চেষ্টা করেনা। আমার গাইড ক্রস সাহেব ব্রিটিশ এক্সেন্টে কথা বলেন। বুঝতে খুব অসুবিধা হয়। তিনি আমার সাথে আমেরিকাতেও থাকবেন। তিনি আমার লোকাল ও ওভারসীজ গাইড। তাঁর খরচ বহন করবেন বৃটিশ কাউন্সিল। আমি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হলে আমার খরচ বহণ করবে আমেরিকান ডিবেট সোসাইটি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের এ প্রোগ্রামটা এই সোসাইটি অর্গেনাইজ করেছে। সারা বিশ্ব থেকে পঞ্চাশ জন প্রতিযোগী থাকবে। আশা করছি বাংলাদেশ থেকে আমি থাকতে পারবো।

হ্যালো আয়েশা আমি আরসালান বলছি।জ্বী স্যার বুঝতে পেরেছি। আপনার নাম্বার আমার মোবাইলে সেভ করা আছে। সোনারগাঁয়ে অবস্থান করে কিছু শিখতে পারলে। জ্বী স্যার নিশ্চয়ই। এর আগেতো কোনদিন  পাঁচতারা হোটেল দেখিনি। থাকার কথাতো স্বপ্ন। তাছাড়া এতো স্পেশাল কেয়ার। ডক্টর ক্রসের সহযোগিতার কথা কোনদিনও ভুলতে পারবোনা। তিনি একজন পিতার মতো মানুষ। স্নেহ মমতা ও ভালবাসার কোন ঘাটতি নাই। স্যার ইংলিশ এক্সেন্ট শিখতে বেশ সময় লাগবে। এটা নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা। এক্সেন্ট একদেশের একরকম। আমেরিকানদের  এক্সেন্ট আরেক রকম। আমিতো বহু বছর বিলেত ও আমেরিকায় ছিলাম। ফোনেটিক্স আরেকটি নতুন বিষয়। যাকে বলে উচ্চারন বিধি। তোমাকে দেখতে পরিস্কার সুস্পষ্ট ভাষায় সুন্দর সাবলীল বলতে পারছো কিনা। আমরা বাংগালীরা যে ভাবে কথা বলি সেভাবে যেন না হয়। তোমার বলার ভংগী দেখে সবাই যেন খুশী হন ও আনন্দলাভ করেন। স্টেজ ম্যানার্স গুলোও তোমাকে একশ ভাগ রপ্ত করতে হবে। প্রথমে দেখবে তোমার ড্রেস এন্ট্রি ও মুভমেন্ট। সবশেষে ডেরিভারী ও কনটেন্টস। মোট নাম্বার একশ। এর ভিতর কনটেন্টসের জন্যে পঞ্চাশ। ম্যানার্স একাউন্টে তুমি সহজেই পঞ্চাশ পেতে পারো। তুমি নিজে কি মনে করো। তোমার কনফিডেন্স কি রকম। আশা করি ভালো করতে পারবো। আমরা চাই তুমি ফার্স্ট হও। এসব ব্যাপারে আমেরিকান ছেলেরা তেমন ভাল করেনা। তাদের ভালো ছাত্ররা গবেষণায় বেশী সময় দেয়। এজন্যে তারা নোবেল পায় বেশী। যারা ডিবেটে ভাল করে তারা রাজনীতি করে। এদের বেশী ভাগই আইন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে। তুমি রাস্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে পারো, গবেষণা করতে পারো। পৃথিবীতে বহু দার্শনিক ছিলেন যারা চলমান রাস্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন না। কার্ল মার্কস ও পুরোণো এ রাস্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন না। তিনি নতুন সমাজ ব্যবস্থার কথা বলে গেছেন। যেখানে রাস্ট্র রাজা বা সম্রাট হবে আর নাগরিকরা নিপীড়িত ও অত্যাচারিত।জার্মান দার্শনিক নীটসে রাস্ট্র ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন না। তোমাকেও রাজনীতি ও রাস্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। অন্তরে বিশ্বাস করো তুমি হবে জগত বিখ্যাত একজন দার্শনিক। স্যার আমিতো এখন মাত্র অনার্সে পড়ি। আপনারা আমাকে উত্‍সাহ দিয়ে ,পালন করে এগিয়ে নিচ্ছেন। জানিনা আমার অন্তরে তেমন ক্ষমতা আছে কিনা। আমিতো একেবারেই অজ পাড়াগাঁর মেয়ে। এই প্রথম ঢাকা এসেছি। এসেই আপনাদের নজরে পড়েছি। ওভাবে চিন্তা করোনা। ভাবো তুমি বিশ্ব নাগরিক। এখানকার পরিবেশে কে কি বলে তাকে একেবারেই পাত্তা দিয়োনা। সাধারন মানসিকতার মেয়েরা অতি সাধারন চিন্তাকে অতিক্রম করতে পারেনা। বেশীর ভাগ ধনীর ছেলে মেয়েরা বিত্তের বাইরে চিন্তা করতে পারেনা। সেদিক থেকে তারা মানসিক ভাবে পংগু।

এানো আয়েশা, তোমার লেকচারের তারিখ ঠিক হয়েছে। ২৯শে ডিসেম্বর বিকেল তিনটায় সোনারগাঁ হোটেলের বলরুমে। শুধু ঢাবির ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সবাইকে আইডি দেখিয়ে প্রবেশ করতে হবে। ঢাবির শিক্ষকরাও থাকবেন। প্রত্যেক ডিপার্টমেন্ট থেকে বিশ জন ছাত্রছাত্রী উপস্থিত থাকতে পারবে। ভিসি স্যার ও ডক্টর ক্রস মঞ্চে থাকবেন। মিস্টার ক্রস প্রোগ্রামটা পরিচালনা করবেন। মনে আছেতো তোমাকে ইংরেজীতে লেকচার ডেলিভারী করতে হবে। নো ফিয়ার, নো সাইনেস। সেদিন খুব ভালো ড্রেস পরবে।  যদি মনে করো পার্লারে যেতে হবে তাহলে আগেই সেরে নিও। এক কাজ করো, তুমি আমি ও ক্রস সাহেব এক সাথে সোনারগাঁয়ে লাঞ্চ করি। দুটোর দিকে সোনারগাঁয়ের পার্লারে মেকআপ ও ড্রেসআপের কাজ সেরে নিও।আমার প্রস্তাব তোমার কেমন লাগলো। খুব ভালো স্যার। তুমি বাসা থেকে সোজা সোনারগাঁয়ে চলে এসো। আমি ক্রস সাহেব লাউঞ্জে  তোমার জন্যে অপেক্ষা করবো। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার  প্রতিনিধিদের দাওয়াত করা হয়েছে। তোমার ব্যাপারে ইতোমধ্যেই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মিডিয়া হুজোগে চলে।একবার কাউকে পছন্দ করলে তাকে অকারণে প্রমোট করতে থাকে। আবার অপছন্দ হলে অকারণে একেবারে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে। ভাবটা হলো, আমরা চোরকে দরবেশ বানাই। কারো কিছু বলার আছে ? ঠিক বারোটার দিকে আয়েশা হোটেল লাউঞ্জে প্রবেশ করে। ডক্টর ক্রস ও আরসালানের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। তারপর পার্লারের দিকে যায়। সেখানে প্রায় এক ঘন্টা লাগে। একজন রূপবতী নারী হিসাবে বেরিয়ে আসে আয়েশা। ডক্টর ক্রস এবং আরসালান আয়েশাকে দেখে অবাক। এতো দেখি রূপকথার নায়িকা। কি হলো তোমাকেতো চেনা যাচ্ছেনা। স্যার এতো আসল আয়েশা নয়। দেখো, দুনিয়ার মঞ্চটাইতো নকল। এখানে আমরা সবাই অভিনয় করে যাচ্ছি। আমরা চাচ্ছি সবাই তোমাকে পছন্দ করুক।  আমেরিকার অনুষ্ঠানের পর তুমি আসল আয়েশায় পরিণত হবে। তখন তুমি তোমার ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিকশিত হবে। তখন তুমি হয়ত হার্ভাডে পড়বে। চলো এবার আমরা লাঞ্চ সেরে ফেলি। আয়েশা বললো, আমি শুধুই স্যুপ আর ব্রেড খাবো। আমি বেশী খেতে পারিনা। ক্রস বললো, দেখো আয়েশা, তোমার যা ভাল লাগে তাই খেয়ো। পছন্দ মতো খাবে। আমরা সবাই ব্যুফে কোর্স খাবো। অনেক আইটেম থাকে।

বেলা তিনটার দিকে হল ভর্তি হয়ে গেছে। প্রায় ছয়শো ছাত্রছাত্রী। দুইশো শিক্ষক। ভিসি স্যার যখন হলে ঢুকলেন তখন সবাই দাঁড়িয়ে  তাকে সম্মান জানালো। তিনি সামনের প্রধান সোফায় বসলেন। তাঁর পাশেই প্রোভিসি স্যার। ভিসি স্যার ডক্টর ক্রস ও আরসালানের কাছে জানতে চাইলেন সব ঠিক আছে কিনা। স্যার এক বিন্দুও চিন্তা করবেন না। প্রোভিসি স্যারের পাশেই বসলেন পলসায়েন্সের চেয়ারম্যান ডক্টর নওশাদ। ভিসি স্যার বললেন, নওশাদ সাহেব আজতো আপনি হিরো। আপনারই দিন। স্যার সবই আপনার দয়া। আপনার সাহায্য না পেলে এতদূর এগোনো যেতো না। স্যার ক্রস সাহেবেরও অনেক অবদান। স্যার আপনি একেবারেই চিন্তা করবেন না। আমরা আপনার মুখ উজ্জল করবো। আপনার আয়েশা ঢাবির নাম জগতে ছড়িয়ে দিবে। আয়েশার আজকের পারফরমেন্স দেখেই আপনি আস্থাবান হয়ে উঠবেন। আয়েশা কোথায় মিস্টার ক্রস। আপনারা এখন দেখবেন না। সারপ্রাইজ থাকলো। সে সরাসরি মঞ্চে আসবে ডাক পড়লে। স্যার মঞ্চে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটু আলো আধারী থাকবে। ক্রস সাহেব ভিসি স্যার আর নওশাদ স্যারকে মঞ্চে গেলেন। হলে হাততালি চলছে। হাত তালি শেষ হতেই পাঁচ মিনিট লাগলো। তিনটা বিশ মিনিটে আয়েশার ডাক পড়লো। আয়েশা ঢুকতেই ক্রস সাহেব দাঁড়িয়ে হাত তালি দিতে লাগলেন। এরপর দাঁড়িয়ে গেলেন। ছাত্রছাত্রীদের হাত তালি আর থামছেনা। এরপর ভিসি স্যার হাত তুলে সবাইকে বসতে বললেন। হলে লাইট নিভলো। সব লাইটের ফোকাস মঞ্চের দিকে।  এমন সময় আয়েশা খুব ধীর লয়ে মঞ্চে প্রবেশ করলো। ছাত্রছাত্রীদের হাত তালি আরও বেড়ে গেলো। আলো আধারীতে রূপবতী আয়েশাকে অপরূপ দেখাচ্ছিল। বন্ধুরা অবাক বিস্ময়ে অপলক নয়নে আয়েশাকে দেখছে। ভাবছে এ কদিনে আয়েশা কেমন করে এমন হয়ে গেলো। সত্যিই কি এমন সম্ভব। আয়েশা তার লেকচার শুরু করলো। পিন পতনেরও শব্দ নেই।

আয়েশার লেকচার শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ভিসি স্যার চেয়ার থেকে উঠে আয়েশাকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগে তাঁর চোখ ভিজে গেলো। মা তুই জগত বিখ্যাত হবি। কারো শক্তি নাই তোকে থামিয়ে দিতে পারে,ইনশাল্লাহ। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তোর পড়ার খরচ চালাবে। তোর পথ চলাকে আমরা চিন্তামুক্ত করবো। এবার ভিসি স্যার দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাদের আয়েশাকে তোমরা কেমন দেখলে। তার লেকচার তোমাদের কেমন লাগলো। সবাই এক সাথে বলে উঠলো সি ইজ দা বেস্ট। শ্লোগান চলতে লাগলো সি ইজ দা বেস্ট। বাইরে স্ন্যাকসের ব্যবস্থা ছিল।  ছাত্রছাত্রীরা বাইরে এসে অপেক্ষা করছে আয়েশার জন্যে। কিন্তু আয়েশা সেখানে আসেনি। মিস্টার ক্রস ও আরসালান আয়েশাকে নিয়ে একটা রুমে গেলো। সেখানেই তাঁরা স্ন্যাক্স নিলেন। এরপর আয়েশাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। তুমি বাসায় যাও। রেস্ট নাও। এখন ক্লাসে আসার দরকার নেই। তুমি একুশ তারিখের জন্যে প্রস্তুতি নাও। যদি বের হও তাহলে গাড়ি নিয়ে বের হও তাহলে গাড়ি নিয়ে বের হয়ো, আরসালান বললো। আমাদের বাসায় কয়েকটা গাড়ি আছে। তুমি একটা ইউজ করতে পারো। ক্রস বললেন, ইয়েস আরসালান ঈক বলেছেন। তোমাকে এখন নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। যেখানে সেখানে যেওনা। এখন তুমি একজন সেলিবরেটি। আয়েশা বাসায় ফিরে গেলে খালা খালু চিনতেই পারছেনা। একি! এ কোন আয়েশা? আরে খালা, অবাক হয়ে কি দেখছো। আমি তোমার আয়েশা। আগে ভিতরে আসতে দাও পরে ভালো করে দেখো। বলরে মা তোর লেকচার কেমন হয়েছে। তা আমি কি করে বলবো। স্যারেরা বলবেন। ভিসি স্যার বলেছেন, আমার পড়ার সব খরচ বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে। আচ্ছা খালা বলতো আমেরিকা গেলে যদি স্কলারশীপ পেয়ে যাই তাহলে কি করবো। তাহলে সেখানে ভর্তি হয়ে যাবি। বাবা কি বলবে। সেটা আমরা দেখবো। তোর বাবা মেয়েদের শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। এখনতো পক্ষে। তাই  বলে কি বিদেশে পড়াতে রাজী হবে। শোন, আরসালান যদি তোকে বিয়ে করতে রাজী হয় তাহলে আমেরিকায় ভর্তি হওয়ার আগে বিয়ের কাজ সেরে ফেল। দেখো খালা ওরা প্রস্তাব না দিলে আমরা আগ বাড়িয়ে কিছু বলা ঠিক হবেনা। ওরা আমাদের চেয়ে হাজার গুণ উপরের পরিবার। আমার মা নরম, কিন্তু বাবার ব্যবহার কর্কশ। বাবা গ্রামের দাপুটে লোক, কিন্তু দেশব্যাপী নয়। বাবাকে গ্রাম্য বলা যায়। আমার ভাইয়েরাও তেমন আলোকিত মানুষ নয়। অতি সাধারন আত্মার মানুষ। রাজধানীতে একটা বাড়ি থাকলে আমাদের নিকট আত্মীয় স্বজন সবাই পড়ালেখা করতে পারতো। জ্ঞান লাভ করা ইসলামে কর্তব্য বাধ্যতামূলক ফরজ। নামাজ পড়া যেমন ফরজ তেমনি বিদ্যা অর্জন করাও ফরজ।সেটা আজও মুসলমানেরা তেমন মানেনা। এক সময় মুসলমানেরা সারা বিশ্ব কাঁপিয়েছে। এখন সারা বিশ্বে অপমানিত,লাঞ্চিত। এর একমাত্র কারণ জ্ঞানহীনতা,মুর্খতা। মুসলমান দেশ গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। তারা কি নিয়ে ব্যস্ত। তারা কেউ ইসলাম মানেনা। ইসলামের নামে মানুষকে ধোকা দেয়। এর ভিতর সউদী বাদশাহ সবচেয়ে খারাপ লোক। মারে, তুইতো সুযোগ পেয়ে লেকচার দিতে শুরু করেছিস। নারে খালা , মনের দু:খে এসব কথা বলছি। দুই হাজার সতেরো সালে এসেও আমরা মেয়েদের শিক্ষার কথা বলছি। এটা খুবই মর্মান্তিক একটি সংবাদ।

আমাদের বাংলাদেশের দিকে তাকাও। বলা হয় পনেরো কোটি মুসলমানের দেশ। বেশীর ভাগ নারী পুরুষ অশিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত। সবকিছুর ভুল ব্যাখ্যা করে। বিশেষ করে গ্রামের মাতব্বর, স্বচ্ছল অশিক্ষিত ও সামান্য আরবী শিক্ষিত হুজুর এরা নারী পুরুষের অশিক্ষার কারণে অত্যাচার চালায় গরীব মানুষের উপর। বিশেষ করে নারীদের উপর। এরা কেউই ইসলাম জানেনা। রাস্ট্র বা নেতারা এসব বর্বরদের পৃষ্ঠপোষক। পাকিস্তানের তেইশ বছর আর বাংলাদেশের সাতচল্লিশ যোগ সত্তুর বছর। কোটি কোটি মানুষ নিরক্ষর। সত্তুর বছরেও একটা জাতি শিক্ষিত হতে পারেনি। বলো খালা কে দায়ী? নেতাদের ছেলে মেয়েরা বিদেশে পড়ালেখা করে দেশে এসে নেতা হয়। আমি চেষ্টা তদবীর ও ফাসাদ করে ঢাকা এসেছি উচ্চ শিক্ষির জন্যে। তুমিই বলো আমি ঢাকা । বানা এলে আমার মেধার বিকাশ হতো। না হতোনা। বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দিতো গ্রামের বিত্তশালী বিএ/এমএ পাশ কোন ছেলের সাথে। এতোদিনে আমি মা হয়ে যেতাম। আর স্বামী দেবতার পায়ের নীচে বেহেশত খুঁজতাম। পশ্চিমারা বিদ্যার কারণেই শক্তিশালী। মুসলমানেরা যখন দেশ শাসন করে তখন পশ্চিমারা ভালো করে পোষাক পরতে জানতো না। তবে একথাও সত্য যে পশ্চিমা ছেলে মেয়েরা একটু উচ্ছৃংখল হয়ে গেছে। এর কারণ তারা ধর্ম ত্যাগ করেছে। তারা তাদের নবীজীকে অপমান করে। নানা রকম বদনাম করে। বেশ কিছু উচ্চ শিক্ষিত বাংলাদেশী মেয়ে উচ্ছৃংখল হয়ে গেছে। তারাতো আর সমাজের চিত্র নয়। তারা রাজধানী ভিত্তিক।আবেগের বশে অনেক কথা বলে ফেলেছি। আমার অপরাধ নিওনা। হয়ত আমার মুখে এসব শোভা পায়না। বাবার দাপটের সামনে এসব কথা একেবারেই অসম্ভব। এখন দোয়া করো খালা। ফেব্রুয়ারী মাসের একুশ তারিখে আমাদের ডিবেটের ফাইনাল। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হলেই আমি বিদেশে যেতে পারবো। এ কদিন আমাকে ক্রস সাহেব ও আরসালান সাহেবের অধীনে কাজ করতে হবে। ঠিক আছে মা। যা করবি বাসায় থেকেই করবি। হোটেলে আর যাবার দরকার নাই। না খালা হোটেলে যাওয়ার কোন প্রোগ্রাম এখনও দেখছিনা। প্রোগ্রাম হলেও রাজী হবিনা। দুলাভাই একেবারেই রাজী নাই । ওরা ভয় পায়, যদি মেয়ের কিছু হয়। না খালা, ও রকম কিছুই হবেনা। আমি এখন যে পরিবেশে আছি তাতে এ রকম কিছু হবেনা। ঠিক আছে কালা রাতের খাবার সার্ভ করো। আমি টেবিল সাজাচ্ছি।

ডিনার শেষ করে বিছানায় যাওয়ার আগে আরসালান ফোন করে আয়েশাকে। হ্যালো আয়েশা,আরসালান বলছি। ডিনার শেষ করেছো। জ্বী স্যার। এইতো এইমাত্র শেষ করলাম। একটু কথা বলা যাবে। নিশ্চয়ই বলা যাবে। স্যার আপনি এ রকম ফরমালিটিজ করছেন কেন। আফটার অল ইট ইজ ইউর প্রাইভেট টাইম। না স্যার, আমার সব টাইম এখন আপনাদের নিয়ন্ত্রনে। ক্রস সাহেব তোমাকে ফোন করেছেন। না স্যার এখনও করেননি। রাত দেখে হয়তো করেন নি। এটা ব্রিটন। সব কিছু মেপে চলে। ভেবেছে এতো রাতে ফোন করবে কিনা। হয়ত কাল সকালে করবে। তুমি কাল সকাল দশটায় ক্রস সাহেবের সাথে দেখা করো। সকাল আটটায় ফোনও করতে পারো কনফার্ম করার জন্যে। ঠিক আছে স্যার। নো প্রবলেম। আমি সকাল আটটায় ফোন করবো। ভালো ভাবে ড্রেস করে যেও। হয়তো কিছু বিদেশী তোমার সাথে কথা বলতে আসবে। কোন সমস্যা হবেনা। দেখো, তারা তোমার স্থির করা বিষয়ে কথা না বলে অন্য বিষয়েও কথা বলতে পারে। তোমার অসুবিধা হবে? না স্যার, আমি যে কোন বিষয়ে ইংরেজীতে কথা বলতে পারবো।

জরিফার সাথে তার স্বামীর সমঝোতা দিন দিন উন্নত হচ্ছে। তার কোচিং সেন্টারে ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আয়ও বাড়ছে। এখন তার মাসিক আয় তিরিশ হাজারের মতো। প্রায় পুরো টাকাই বেঁচে যায়। সে টাকা সে নিজের ব্যান্ক একাউন্টে জমা দেয়। প্রয়োজনে এক সমঞ সংসারের কাজে লাগাবে। তার স্বামীও খুশী। ভাবছে বাড়িতে একটি নতুন ঘর তৈরি করে ছাত্রী সংখ্যা বাড়াবে। বরকে বলেছে তার চিন্তার কথা। বর এক কথায়ই রাজী।  জরিফা খুশীতে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে চুমো খায়। তুমি খুশী নও আমার ছাত্রী সংখ্যা বাড়ছে দেখে। কি বলো, আমি সবচে বেশী খুশী হয়েছি। তোমার খুশীই আমার খুশী। মাও খুব খুশী। তুমিতো মাকে এটা ওটা কিনে দাও। সত্যিই জরি আমি এতোদিন খুবই অন্যায় করেছি। বুঝতে পারিনি তুমি কিসে খুশী হবে।   দেখো,আমি আরও অনেক কিছু করতে পারবো তোমার চিন্তার সহযোগিতা পেলে। তুমি জানো আমাদের এলাকার আয়েশা  জগত বিখ্যাত হতে চলেছে। ঢাবির ডিবেট চ্যাম্পিয়ন হয়ে নাম করে ফেলেছে। ঢাবির সকল ছাত্র ছাত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে এক নামে চিনে। সবাই তাকে আদর করে। একমাত্র কারণ সে সাহস করে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছে। পলসায়েন্সে ভাল রেজাল্ট করে তোমার কিচেনে ঝিয়ের কাজ করছি। তোমার মনে হয় আমার আর কোন যোগ্যতা নেই। রাত হলে তোমার বুকে থাকা। ভোর হলে উনুনে আগুন দেয়া। এতে আমার বাবা খুশী। মারতো মত প্রকাশের কোন অধিকারই নেই। বাবার ন্যায় অন্যায় সব মাকে মেনে নিতে হয়। দেখো জরি, আমাকে মাফ করে দাও। আমি একেবারেই বদলে গেছি। মনে করো তুমি এখন একশ ভাগ স্বাধীন। এখন থেকে নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। আয়েশার কথা আরও বলো। টিভিতে খবর শুনি। তুমিতো বাসায় কাগজ রাখোনা। খবর জেনে আমি নাকি নষ্ট হয়ে যাবো। এতো গ্রাম্যতা আমি জীবনে ভাবতেও পারিনি। তুমি ভেবেছিলে আমি স্বাধীন হলে তোমার উপরে চলে যাবো। শিক্ষিত মানুষতো স্ত্রীর গৌরবে ও সুনামে আনন্দিত হয়। তোমাকে দেখেছি ভিন্ন রকম। যাক তবুও ভালো এতো বছর পর তোমার হুঁশ হয়েছে। বললামতো আমি বদলে গেছি। আমাকে আর লজ্জা দিওনা। না প্রাণ সখি,লজ্জা পেওনা। তুমিইতো আমার সবকিছু। আমি খুবই আনন্দিত একটু স্বাধীন হতে পেরে। তাও নিজের অধিকারে নয়। তুমি স্বাধীনত দিয়েছো। আমার শ্বাশুড়ী মা তোমার চেয়ে অনেক বেশী মুক্ত মনের মানুষ। তোমার ভয়ে কিছু বলতেন না। আমাকে অনেক দিন বলেছেন, বৌমা তুমি এতো শিক্ষিত হয়েও ঘরে বন্দী হয়ে আছো। কি করবে মা, এদেশে মেয়েদের কোন স্বাধীনতা নেই। পুরুষেরা শিক্ষিত হয়েও মানুষ হতে পারেনি। আয়েশা নাকি ইন্টার ভার্সিটি ডিবেট প্রতিযোগিতায় নাকি চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। তাহলে সে আমেরিকা যাবে। আন্তর্জাতিক ডিবেটে যদি ভালো রেজাল্ট করতে পারে তাহলে সেখানে পড়ার স্কলারশীপ পাবে। শুধু গ্রামের কলেজ ছেড়ে সে ঢাকায় গেছে তাতেই এতো বিরাট পরিবর্তন। আর আমি এমএ পাশ করেও এতো দিন কোন মর্যাদা পাইনি। আমার বাপ বলতো মারে সব সময় জামাইর কথা মেনে চলবি। এতেই সংসারে শান্তি। প্রথম এক বছরতো তুমি আমাকে প্রতি রাতে জ্বালিয়েছো। আমি সারা বছর অসুস্থ ছিলাম। তুমি ডাক্তারের কথাও শুনতে না। এক সময় আমার মনে হয়েছিল বেশ্যা হলেই ভাল ছিল। তোমার মতো পুরুষদের কারণেই তসলিমা ও রকম এগ্রেসিভ হয়ে গিয়েছে। সে লিখতে পারে বলেই লিখে অন্তরের জ্বালা মিটিয়েছে। লোকলজ্জায় আমরা এসব সহ্য করে যাচ্ছি। আল্লাহপাকের হাজার শোকর যে দেরীতে হলেও তুমি বুঝতে পেরেছো। দেখো, এখন তুমি আর আমি আগের চেয়ে কত বেশী কাছালাছি। রাত্রের কাজও কতো আনন্দে করি। আগেতো আমি ছিলাম রক্ত মাংশের একটি পুতুল। এখন বন্ধু। কি বলো ঠিক বলছি কিনা। রাতে তোমাকে কিছুই বলতে হবেনা। আমিই বলবো আমাকে গ্রহণ করো। দুই আনন্দময় মানুষের মিলনমেলা।আচ্ছা বলোতো বন্ধু, এতোদিন তুমি আমায় কি ভাবতে। মন খুলে হৃদয় থেকে বলো। বলেছিতো জরি, আমি একেবারেই বদলে গেছি। তুমিই আমায় বদলে দিয়েছো। আমি এখন তোমাকে বন্ধু ভাবি। আমরা দুজনই সমান। আমরা এক যুগল। আগে কি ভাবতে। তুমি আমার যৌন সংগী। যখন দরকার তখনি মিলিত হবো।  মেয়েদের আর কি কাজ। বাপ দাদারা যা করেছেন আমিও তাই করি। মেয়েদের আবার কি অধিকার।উনুন দেখবে, সংসার পরিপাটি রাখবে। ছেলেপুলে হলে মানুষ করবে। এটাইতো শুনেছি বংশ পরম্পরায়। তাহলে আমি যে পড়লেখা করেছি তার কি হবে। সে সবতো মেয়েদের ফ্যাশন। অলংকারের মতো। আমার বউ,এমএ পাশ। সমাজে বলতে পারি। মেয়েরা পুরুযের অধীনে থাকবে। এর বেশী আর কিছু ভাবতে পারিনি।লেখাপড়া করে তুমি কি শিখেছো। চাকুরীর জন্যে পড়ালেখা করেছি। চাকুরী করছি,ভালো বেতন পাই। তোমাকে খুশী রাখার চেষ্টা করি। সবাইতো এ রকমই করে। আমাকে নিয়েতো তুমি কখনই বের হওনা। দেখো ওসব আমার ভালো লাগেনা। যাক ওসব পুরানো দিনের কথা বাদ দাও। এখনতো তুমি স্বাধীন। দেখি আগামী দিন গুলো কেমন আসে।

দেখো রূপ,তোমার বুঝি মানুষ হতে খুব ইচ্ছা করে। খোদা ভালবেসেই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির ভিতরেই তিনি তাঁকে দেখেন। তিনি যদি বস্তু হতেন তাহলে কেমন হতেন। তিনি যেমন ইচ্ছা তেমন সৃষ্টি করতে পারেন। আমি কবি,তুমি আমার কল্পনা। আমার অন্তরে বাস করো। আমিই তোমাকে অন্তরে রেখেছি। কবিও কল্পনা জগতের অধিবাসী। আমরা দেহধারী মানুষ নই। যেমন ফেরেশতারা আছেন। আমরা তাদের দেখতে পাইনা। তারা সংসার করেন না। তারা নারী পুরুষ নন। শুধু খোদার নির্দেশ পালন করেন। আমরা মানুষ,তবে অদৃশ্য। আমরা দুজন নারী পুরুষ। তবে সাধারন মানুষের মতো নই। আমি জানি তোমার একটা মানবী মন আছে। তোমার সংগমের তৃষ্ণা আছে। তাইতো তোমার ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্যই আমি আয়েশা আর জরিফাকে সৃষ্টি করেছি। ওরা সংগম করে তুমি আনন্দ পাও। তুমি মা হতে চেয়েছিলে তাই জরিফা মা হয়েছে। তোমারই ইচ্ছায় জরিফা আস্তে আস্তে স্বাধীন হচ্ছে। সংগম সৃষ্টির মূল রহস্য। খোদা নিজে সংগম করেন না। কিন্তু সৃষ্টির সংগমে তিনি আনন্দিত হন। আমি কবি। খোদার গোলাম ও বন্ধু। দুজন খুব কাছাকাছি। হুকুম তামিল করাই কবির কাজ। লোকে মনে করে কবি লেখে। আসলে কবি নিজেও জানেনা কে লেখে। কবির অন্তরে কে ভাবনা জাগায়। ভাবনা সৃষ্টি করাই খোদার কাজ। তাই কবি ও জ্ঞানীরা ভাবতে পারে। নবী রাসুলগণ ভাবেননা। তাঁরা আল্লাহর মনোনীত ও বাছাই করা। সবাইকে নবী রাসুল করা হয়না। তাঁরা কবিও নন। কবিরা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। যেমন মাওলানা রুমী ও হাল্লাজ। একজন খোদা ও আদমের রহস্য ভেদ করেননি। আরেকজন করে জীবন দিয়েছেন। খোদার প্রেমিকরা রক্ত দিয়ে নামাজের অজু করেন। শাসকরা স্বাধীন মানুষকে হত্যা করে। খোদা তাদের মুক্তি দেয়। খোদা বলেন ,যারা আমাকে ভালবাসবে,আমার সাথে প্রেম করবে আমি তাদের প্রাণ গ্রহণ করি।  যেমন হাল্লাজ,  ঈসা, সক্রেটিস আবু হানিফার গ্রহণ করেছি। তুমিই বলো রূপ ওদের কি অপরাধ ছিল। কোন অপরাধ ছিলনা। তারা খোদাকে ভালবাসতো, সত্যকে ভালবাসতো।  খোদা তোমাকে আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমরাতো চাইলেই মানুষ হতে পারি। জগতে কি এখন মানুষ আছে। যে মানুষ খোদার ছায়া, প্রতিবিম্ব। যে মানুষ আল্লাহর নুরে আলোকিত। সে মানুষ কই। আমাদের ভুগোলের কথাই ভাবো। কি হওয়ার কথা ছিল কি হয়েছে। এখানে কোন আলোকিত মানুষ নেই। মানুষের মন ও হৃদয়ে শয়তান আসন গ্রহণ করেছে। এখানে কোথাও প্রেম ভালবাসা নেই। এদেশে যে কোন অপরাধ করা সম্ভব যদি তুমি রাজার ভাগিনা হও। সারা পৃথিবী অন্যায় অবিচারে ডুবে যাচ্ছে। শক্তিমান দূর্বলে উপর হামলা করছে। বিচার বলে কিছুই কোথাও। রোহিংগাদের কথা ভাবো। কি তাদের অপরাধ। মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠি দুনিয়াকে তোয়াক্কা করেনা। তারা জানে বাংলাদেশ একটু দূর্বল রাস্ট্র। তাই তারা লাখ লাখ মানুষকে সেদেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। হত্যা করেছে। নারীদের ধর্ষণ করেছে। আমাদের প্রাণপ্রিয় বন্ধু ভারত আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। চীন সরাসরি মায়ানমারের অত্যাচারকে সমর্থন করেছে। আমেরিকা পৃথিবী ব্যাপী গর্জণ করে চলেছে। তাকে থামাবার মতো কেউ নেই। পৃথিবী নিয়ে ভাবছি,কারণ এ জগতটা আমাদের প্রভুর সৃষ্টি। তিনি তাঁর প্রিয়তম মানুষকে এখানে পাঠিয়েছেন। আসো, আমরা শয়তানের চ্যালাদের ঘৃণা করি উচ্চকণ্ঠে। প্রভু নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করো। সদোম নগরীর মতো অত্যাচারীদের নির্মূল করো।

 

রূপকথা ( উপন্যাস ) ৩

আয়েশা বিকেলের নাশতা করে পাঁচটার দিকে বাসায় ফিরে। কিরে বিন্দু আজতো সারাদিন বারিধারায় কাটিয়ে দিলি। ডক্টর আরসালানের মায়ের সাথে গল্প। দুপুরের লাঞ্চ। মা বেটা দুজনেই গল্প জুড়ে দিয়েছে। স্যারের মা তো আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতে শুরু করেছেন। সারা বাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন। বাগানের গোলাপ দেখলাম। বুঝলেন খালা,ওরা এতো বড় যে ওদের সাথে কোন সম্পর্কের কথা ভাবতে খুব হয়। আমিতো আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি স্যারের মা কি চান। তিনি নিজের মেয়ের মতো একটা বউ চান। সেটাতো আমি হতে পারবোনা। আমি আমার জীবনটা জগতের মানুষের জন্যে দান করতে চাই আমি গ্রামের শিক্ষিত মেয়েদের অবস্থা দেখছি। এম এ পাশ করা মেয়ে গ্রামের বাড়িতে পড়ে। উপজেলা শহরের স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করতে পারে। কিন্তু স্বামী শ্বাশুড়ীকে খুশী করার জন্যে সারাদিন কিচেনে পড়ে থাকে। অবসর সময়ে বই পারেনা।টিউশনী করে সংসারের জন্যে দুটো পয়সা আয় করতে পারে। না তাও দিবেনা। বিদ্যাটা একটা অলংকার। সবাইকে বলার জন্যে। বুক ফুলাইয়া বলে আমাদের অমুকের বঊ এমএ পাশ। এছাড়া বিদ্যার আর কোন কাজও নেই। এমন কি মা বাপ ও মেয়ের সুরক্ষা বা স্বাধীনতা চায়না। মনে করে  মেয়েদের বিয়ে এবং সংসারই বড় কথা।

আল্লাহ যদি আমার প্রতি দয়াবান হন আমি ইন্টার ভার্সিটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিদেশে প্রতিযাোগিতা করতে পারবো। ওয়াশিংটনের ডিবেটে যদি ভাল করতে পারি তাহলে হয়ত স্কলারশীপ পেয়ে যাবো। ওখানেও দেড় দুই মাস ট্রেনিং হবে। এছাড়া এখন আমার বয়স মাত্র কুড়ি। স্যারের বয়স তিরিশ। দশ বছরের ফারাক। শরীরটাই শুধু নারী হয়ে উঠছে। বাকি সব বিষয়ে আমি এখনও শিশু। আমাদের দেশে এখনও বাল্য বিবাহ হয়। মেয়েরা কিছু জানেনা। কচি মেয়েটার একমাত্র কাজ সংগম যা স্বামী জোর করে মিলিত হয়। এ সমাজ আর কখন বদলাবে। স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে। স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় তার কিছুই হয়নি। কিছুলোক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সীমাহীন ধনী হয়ে গেছে। এখন সরকারকে বলতে হবে সবাই দুর্ণীতি করো। সরকারকে শুধু ট্যাক্স দিলেই হবে। যদি কেউ ট্যাক্স না দেয় তাহলে যাবজ্জীবন।তুই এতো কথা কোথায় জানলি বিন্দু। চোখ কান খোলা রাখি। চোখ কান খোলা রাখা সকল সজাগ নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের নিরানব্বই জন দুর্ণীতিবাজ হয়ে গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁশ হওয়া জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ছাত্র শিক্ষক সবাই জানে টাকা আর মাস্তানী থাকলে একদিন এমপি মন্ত্রী হওয়া যাবে। শিক্ষিত ভদ্রলোক নমিনেশনের জন্যে গেলে পার্টি বলে, আপনি ভদ্রলোক এ কাজ আপনার জন্যে নয়। আপনাকে মানুষ ভোট দিবেনা। আমরা উপযুক্ত লোক চাই,যে জিততে পারবে। যার কাছে কয়েকটা জীপ আছে, কয়েকটা আত্মরক্ষা মূলক অস্ত্র আছে। মাস্তান মার্কা দুইশ কর্মী আছে। নগদ দুই কোটি টাকা পার্টি ফান্ডে জমা দিতে  পারবে। আপনিতো এসবের কিছুই পারবেন না। মাঝ খানে পার্টির একটা সিট নষ্ট হবে। আপনি একজন ডেডিকেটেড মানুষ। পার্টির গৌরব। পার্টি জিতলে আপনাকে সম্মানিত করা হবে। যান পার্টির প্রার্থীর জন্যে কাজ করুন। মনে রাখবেন, জীবনের বড় আদর্শ হলো পার্টি ক্ষমতায় থাকা। তাহলেই দেশের উন্নতি হবে। পার্টির উন্নতি হলে আপনারও উন্নতি হবে। যে নমিনেশন পাবে সে আপনাকে পাঁচ লাখ টাকা দিবে।

দেখো খালা দেশের রাজনীতির এসব হলো চিত্র। ছাত্র নেতারা হলের মেয়ে কর্মীদের পাঠায় বড় নেতাদের বাগানবাড়িতে। এসব মেয়েরা হলের লীডার হয়। কালক্রমে রাজনৈতিক নেতা ও এমপি মন্ত্রী মনোনীত হয়। এমন অবস্থার পরিবর্তন হবে কি। সবাই হতাশ হয়ে গেছে। মন্ত্রী সাহেব বলেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্যে সরকার দায়ী নয়। বিরোধী দলের চক্রান্ত আছে। খালা আমি ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন হলেতো দেশের কিছু আসে যায়না। এমন কি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও পরিবর্তনের জন্যে আমি কিছুই করতে পারবোনা। দেশের ইজ্জ্বত নোবেল বিজয়ী ডক্টর ইউনুসের অবস্থা দেখুন। সারা বিশ্ব ইউনুসকে সম্মান করে। শুধু বাংলাদেশ করেনা। এমন কি প্রয়োজনও মনে করেনা।এমতাবস্থায় আমি বিদেশে পড়ালেখার গুরুত্ব দিচ্ছি। সূযোগ পেলে চলে যাবো। বাবাকে রাজী করানোর দায়িত্ব তোমাদের। এখন প্রশ্ন হলো বিয়েটা কখন করবো।  খালা তোমার কি মত। আমি কি আর বলবো। তোর বুদ্ধি আমার চেয়ে অনেক বেশী। ঠিক আছে, সময় সুযোগ মতো বারিধারার খালাম্মার সাথে কথা বললে কেমন হয়। দেখি উনি কি ভাবছেন।

যা হাত মুখ ধুয়ে নে। তোর খালুও এসে গেছেন। এখন চা দেবো। আমি আর কিছু খেতে পারবো না ।শুধু চা খাবো। এমন সময় কালু এসে টেবিলে বসলেন। খালা চা বিস্কুট দিলেন। তুমি আর কিছু খাবে নাকি। না, একটু পরেইতো ডিনার দেবে। এই ফাঁকে বিন্দুর সাথে জমিয়ে আড্ডা মারি। কি বলিসরে বিন্দু। ঠিক আছে খালু। তোর বাবার সাথে ফোনে কথা হয়। জ্বী খালু নিয়মিত কথা হয়। বাবার এক কথা ভালো করে পড়ালেখা কর। অন্যদিকে মন দিবিনা। ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হবিনা। কোন মেয়ে গ্রুপের সাথে আটকে যাস  না। ওরা তোর সর্বনাশ করবে। আমি সব খবর রাখি। খালা খালুর কথা মতো চলবি। ওদের ভরসায় তোকে ঢাকা পাঠিয়েছি। ফারজানার সাথেও আমার কথা হয়। ও বললো ভার্সিটিতে তোর অনেক নাম ডাক। শুনে খুব ভালো লাগলো। কিন্তু পড়ালেখার কি হবে। তুমি চিন্তা করোনা বাবা। ডিবেটের চেয়ে পড়ালেখার গুরুত্ব অনেক বেশী।শুধু ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন হলে কি হবে, সেটা আমি বুঝি।

বাবা, ডিবেটের জন্যে আমাকে আমেরিকা যেতে হতে পারে। ডিবেট ভালো করলে আমি বিদেশে পড়ার জন্যে স্কলারশীপ পেতে পারি। নারে মা অত পড়ে কি করবি। মেয়ে মানুষ বিয়েটাই আসল কাজ। ফারজানা বললো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক নাকি তোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। হ্যাঁ বাবা। তবে সুস্পষ্ট কিছু না। ফারজানাতো বললোতো ছেলেটা খুব ভালো। খুবই খানদানী পরিবারের ছেলে। তাহলেতো কথা বললেই হয়। , না বাবা, এখন না। সময় বুঝে বলতে হবে। যদি বলিস আমি ডাকা এসে কথা শুরু করতে পারি। অথবা আগে তোর খালা খালু কথা শুরু করতে পারে। এখন না। আমি জানাবো তোমাকে। আগে আমি বিষয়টা বুঝে নিই। আরও কয়েক মাস যাক। তুমি বিষয়টা নিয়ে আর কারও সাথে এখন কথা বলোনা। ইতোমধ্যে আমি স্যারের বাসায় দুবার গিয়েছি। হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে তাদের আগ্রহ আছে। নানাভাবে আমাকে বুঝিয়েছে আমি তাদের মেয়ে।  স্যারের ইংগিতেই তাঁর মা গুলশান বেগম আমাকে অনেক আদর করছেন। দেখ মা আমরা গ্রামে থাকি বলে অতো নাম ধাম হয়নি। আমরাও খুবই খানদানী মানুষ অনেক জেনারেশন ধরে। শহরে থাকলে,ভাল বাড়ি থাকলে আর বিদ্যা থাকলে মানুষ খানদান হয়। দরকার হলে আমি তোর জন্যে রাজধানীতে বাড়ি কিনবো। জামাইকে উপহার দিবো। তুই এসব নিয়ে মোটেই ভাববিনা। আমি একটু পুরাণপন্থি তাই তোরা আমায় দেখতে পারিসনা।  আমি মনে করি আমরা কোন অংশেই কম নই। নগদ তেমন বেশী টাকা নেই। কিন্তু সম্পদের কি কমতি আছে। আমি মানছি বিদ্যার ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ কম ছিল। সেটা ভুল হয়েছে। আমরা জমি জিরাত নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। পড়ালেখা করলে বৃটিশের চাকুরী করে নাম করা যেতো। আমাদের এলাকার চৌধুরীরা ইংরেজী শিখে বৃটিশের তাবেদারী করেছে। তাতেই নাম আক হয়েছে। আমাদের খাস জমি বেশী। ওদের তালুকদারী জমি বেশী। আমার দাদাজান আমজাদ মিয়া তালুকদারী কিনে চৌধুরী হতে পারতেন। দাদাজান ইংরেজের  তাবেদারী পছন্দ করতেন না। একদিন তোকে সব লিখে দেবো। দশ গেরামের মানুষকে জিগ্যেস করে দেখিস লোকে কি বলে। যাক, সুযোগ পেয়ে মা তোকে আজ অনেক কথা বললাম। তোর মাতো আমাদের চেয়েও বড় খানদান। চেহারা দেখে বুঝতে পারিস না। দুধে আলতায় তাঁর গায়ের রং। আমি একটু রাগী কড়া মানুষ। তাই সবাই একটু ভয় পায়। এখন ছাড়িরে মা। আজ তোর সাথে অনেক্ষণ কথা বললাম। মনটা আমার ভাল হয়ে গেছে। আমার মেয়ে বংশের নাম উজ্জ্বল করবে যা আমার ছেলেরা পারেনি। নারী শিক্ষাকে অবহেলা করে আমি অন্যায় করেছি। আমার ভুল হয়েছে। বাবা মা কেমন আছে? মাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। অনেকদিন দেখিনি। ইন্টার ভার্সিটি ডিবেটের পর আসতে পারবো। চ্যাম্পয়ন হলে আর সময় তেমন থাকবেনা। আমেরিকা চলে যেতে হবে। বাড়ি এলে  এক সপ্তাহ থাকবো। সবার সাথে দেখা করবো। আমার কলেজের স্যারদের সাথেও দেখা করবো। আশে পাশের আত্মীয় স্বজন সবার সাথে দেখা করবো। আমি গাড়িতে আসবো। আবার গাড়িতেই ফিরবো। কোথাও কোন প্রোগ্রামে জয়েন করবোনা। তোমার কাছে কেউ এ ব্যাপারে এলে না করে দিও। আমার আসার কথা কাউকেই জানাবেনা।

কিরে বিন্দু দুলাভাই একজন কঠোর লোক তোর সাথে এতো কি কথা বললো। প্রায় এক ঘন্টা। না খালা, বাবা এখন আর আগের মতো নাই। মনে হচ্ছে, অনেক নরম হয়ে গেছে। এখন থেকে নারী শিক্ষার জন্যে কাজ করবে। আমার বিদেশ যাওয়াতেও বাবার কোন আপত্তি নেই। বাড়ির কাছেই একটা বালিকা বিদ্যালয় করার জন্যে বলেছি। বাবা রাজী হয়েছে। বাবা নিজের বংশ গৌরবের কথা বললেন। আজ বাবা অনেক কথা বললেন। এক বছরেও এতো কথা বলেননি। মেয়েদের ব্যাপারে বাবার ইতিবাচক চিন্তা সমাজের অনেক উপকার করবে। আমারও স্বপ্ন বিদেশ থেকে ফিরে দেশের শিক্ষা উন্নয়নে কাজ করবো। বাকি সব আল্লাহর মর্জি। খালা আমার একজন কবি বন্ধু আছে। এমন বৃদ্ধ বয়সে এমন যুবক আর দেখিনি। সম্প্রতি রূপকথা নামে তার একটি কবিতার বই বেরিয়েছে একুশে মেলার জন্যে। আমার বন্ধু রূপকথাকে ডেডিকেট করেছে। এখনও বাজারে আসেনি। আমাকে এক কপি উহার  দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারী মাসে মেলায় যাবে। তাঁর অনেক গুলো বই আছে। বিদেশ থেকে এওয়ার্ড পেয়েছেন দুই হাজার দুই সালে। এই কবি মেয়েদের একশ ভাগ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। তাঁর উপন্যাস গুলোতে নারীই প্রধান বিষয়। এই কবি ফেসবুকে আমার প্রিয়তম বন্ধু। ডিভাইনিটিতে বিশ্বাস করেন। খোদাকে বলেন মাশুক। ইতি রুমী হাল্লাজ খৈয়াম হাফিজ সাদী গালিব ও আল্লামা ইকবালের ভক্ত। তবে রুমী ও হাল্লাজকে মুর্শিদ বলেন।ফেসবুকে তাঁর খুব সুন্দর ছবি আছে। একদিন তোমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। তোমার সাথে দেখা হয়। না এখনও হয়নি।তিনি বলেছেন, দেখা হবে। সোনারগাঁ লাউঞ্জে কফির দাওয়াত দিয়েছেন। ফোন নাম্বার দিয়েছেন। কখনও কল করিনি,উনিও করেননি। রূপকথা কি ভাবে চিনে। ফেসবুকেই পরিচয় হয়েছে। গরীব মেয়েদের প্রচুর সাহায্য করেন।

ডক্টর আরসালান ফোন করে জানালেন,ভার্সিটিতে যেতে হবে। জরুরী কাজ আছে। কখন আসবো স্যার। বেলা এগারোটার দিকে আসো। আমি সাড়ে দশটার দিকে ডিপার্টমেন্টে পৌঁছালাম। বন্ধুদের দেখা হলো। কিরে আয়েশা তুইতো সেলিব্রটি হয়ে গেলি। স্যারেরাতো ক্লাসে শুধু তোর কথাই বলে। বলেন গত পঞ্চাশ বছরে নাকি এতো চৌকশ ছাত্র ভার্সিটিতে আসেনি। তুই নাকি পুরো ভার্সিটিতে ফার্স্ট হয়ে যাবি। কর্তৃপক্ষ তোকে নিয়ে বেশী করছে। যা নস তাই বানাচ্ছে। সব হচ্ছে ডক্টর আরসালানের কারণে। তিনিই সব কিছু ঘটাচ্ছেন। তার তালে সবাই নাচছেন। আমরা জানি তিনি মেধাবী ছাত্র, নামজাদা খানদানী পরিবারের ছেলে। দেখতেও রাজপুত্রের মতো। শুনেছি তোরতো নাকি ক্লাশ মওকুফ করা হয়েছে ডিবেটের প্রিপারেশন নেয়ার জন্যে। আজ কেন এসেছিস। স্যার খবর দিয়েছেন। ওহ, তাই বল। চেম্বারে যাবি নাকি। জানিনা, না ডাকলে যাবোনা। তোরা সবাই বুঝি আমাকে নিয়ে মজা করিস। তুইতো মজার জিনিষ। গ্রাম থেকে এসেই একেবারে সেলিব্রেটি হয়ে গেলি। শুধু ডিবেটের মেধা নয়। ওরতো আরও অনেক গুণ আছে। খুবই সুন্দরী, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। আমরাতো বড় বড় শিল্পপতির মেয়ে। আমরা অনেক ইন্টেলিজেন্ট, হ্যান্ডসাম। স্যারের আমাদের দিকে নজর পড়েনা। দেখ,তোরা সবাই আমার চেয়ে অনেক গুণী। তোদের সামাজিক মর্যাদা আমার চেয়ে হাজার গুণ বেশী।আমিতো গ্রামের একটি সাধারন মেয়ে। খুব সাধারন  ড্রেস করি। জীবনে কোনদিন পার্লারে যাইনি। আমার কোন ব্যান্ক একাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড নেই। তোদের সাথে আমি কোন ভাবেই ম্যাচ করিনা।  আমার দামী গাড়ি নেই। সিএনজিতে চলাফেরা করি। থাক ওসব কথা ছাড়। থাকবে কেন। তুইতো পরীক্ষা না দিলেও ফার্স্ট হয়ে যাবি।

এমন সময়ে ডক্টর আরসালানের পিয়ন এসে আয়েশাকে খবর দেয়। স্যার ডাকছে আপনাকে। যান আমি আসছি। আরে আরে যা যা। তোর বন্ধু ডাকছে। যাইরে। ফিরে এসে তোদের জানাবো। মিষ্টি মধুর কথাগুলো কেমন করে বলবি। রুমে একা পেয়ে চুমো খাসনা আবার।  স্যার, ম্যা আই কামিং ? ওহ সিওর। ইউ আর ওয়েলকাম। বলো কেমন আছো। জ্বী স্যার, খুব ভালো। তোমার বাড়ির সবাই কেমন আছে। সবাই ভালো। আমার বাবাকে আপনার কথা বলেছি। কি বলেছো জানিতো। স্যার কেমন করে। জানিতো তুমি কি বলতে পারো। বলেছো আমরা খুব খানদানি মানুষ। খুব শরীফ ঘরাণার লোক। আমার মা খুব ভালো মানুষ। তোমাকে খুব আদর করে। আমার কথা কিছু বলোনি। সব বলেছি। আপনি খুব মেধাবী। বিনীত ভদ্রলোক। খুব মিষ্ট ভাষী। স্যারের এতো প্রশংসা করায় তোমার বাবা কি বললো। বাবা আগের চেয়ে অনেক নরম হয়ে গেছেন মনের দিক থেকে। ঢাকা আসলে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবে। নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো উনি যেতে চাইলে। আমরাই তাঁকে দাওয়াত দিবো। তাহলে তিনি নিশ্চয়ই আসবেন। কি বলো। জ্বী স্যার।

এবার বলো, তোমার প্রিপারেশন কেমন। আমারতো মনে হয় ভালো। বৃটিশ কাউন্সিলের লেকচার প্রোগ্রামে তুমি নব্বই পেয়েছো। ম্যানার্স এটিকেট ও প্রোনান্সিয়েশন আরও ইম্প্রুভ করতে হবে। আমেরিকার বিখ্যাত সব ভার্সিটির বাছাই করা ছাত্ররা অংশ নিবে। ইউরোপের ও এশিয়ার সেরা ছাত্র ছাত্রী অংশ নিবে। আমেরিকায় ল্যান্ড করার পর আর কোন বাংলা কথা নয়। বৃটিশ কাউন্সিলের ক্রস সেখানেও তোমার গাইড থাকবেন। তুমি তাঁর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখো। এখন কি কথা হয়। জ্বী স্যার। মাঝে মাঝে কথা হয়। না প্রতিদিন কথা বলো। আমার শরম লাগে। উনি যদি বিরক্ত হন। বৃটিশরাতো এমনিতেই একটু ভারিক্কী চালের। এখন থেকে সবাই তোমাকে ওয়াচ করবে। নতুন আয়েশাকে সবাই দেখতে চায়। সব সময় মাথা ঠান্ডা রাখবে। কে কি বললো সেদিকে খোয়াল করোনা। ছেলে মেয়েরা তামাকে নিয়ে গল্প বানাবে। এটা ভার্সিটির মেয়েদের খাসালত। এসব কথাকে একেবারেই পাত্তা দিওনা। চেয়ারম্যান স্যার যে কোন সময় তোমার টেস্টের ব্যবস্থা করতে পারেন কোন নোটিশ ছাড়াই। মনে রেখো। পুরো রেডি থেকো। এমন কি এক ঘন্টার নোটিশে তোমাকে লেকচারে অংশ গ্রহণ করতে হতে পারে। বৃটিশ কাউন্সিলের লেকচারের কথা মনে রেখো। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির হলে ফাইনাল হবে একুশে ফেব্রুয়ারী দুই হাজার আঠার সালে।  কারোই যেন মনে না হয় তুমি মুখস্ত বলছো। না স্যার তেমন কিছুই হবেনা। তোমাকে এলার্ট করছি স্যার যে কোন সময় এক ঘন্টার নোটিশে তোমাকে ডাকতে পারেন। আগামী এক সপ্তাহ তুমি আয়নার সামনে লেকচার প্র্যাকটিস করো। এ কদিন তুমি ক্রস সাহেবের তত্বাবধানে থাকো । দরকার হলে তুমি একটা ফাইভ স্টার হোটেলে থাকো। হোটেলের একজন স্টাফকে বলা হবে তোমাকে যেন সকল ধরনের ম্যানার্স শিখানো হয়। ঠিক আছে স্যার, আমার আপত্তি নাই। তুমি ডিপার্টমেন্টেই থাকো। আমি চেয়ারম্যান স্যারের সাথে কথা বলে তোমাকে জানাচ্ছি। ওকে স্যার আমি মেয়েদের যাচ্ছি। আমি মেয়েদের কমনরুমে যাচ্ছি। মেয়েদের ক্যান্টিনেও থাকতে পারি। আয়েশা ক্যান্টিনে ঢুকতেই বন্ধুরা মৌমাছিত মতো ধরলো। গল্প বানানোর জন্যে। বল আয়েশা, স্যার কিভাবে প্রেম নিবেদন করলেন। হাত ধরে হাটু গেড়ে বললেন, আই লাভ ইউ ডারলিং। তুই কি বললি। মি টু ডার্লিং। কিরে কিছু বল। আমি বললেতো গল্প বানানো হবেনা। তোরা ভাল করে উপন্যাস লিখে যা।উপন্যাসের নাম দিবি আয়েশা নামা।মজাদার উপন্যাস হবে। ভার্সিটির ছেলে মেয়েরা কিনে শেষ করবে। আমি  গ্রামের মেয়ে এখনও শিখে উঠিনি। তোরা লিখ আমার কোন আপত্তি নেই। প্রয়োজনে তোরা ডক্টর আরসালানের সাথেও কথা বলতে পারিস।

আয়েশার কাছে একটি কল এসেছে। দেখলো ডক্টর আরসালানের কল। একটু বাইরে এসে বললো, জ্বী স্যার বলুন। আমি আপনার কলের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। চেয়ারম্যান সাহেব  ভিসি স্যারের সাথে কথা বলে অনুমতি নিয়েছেন। তুমি ও মিস্টার ক্রস এক সপ্তাহের জন্যে সোনার গাঁ হোটেলে থাকবে শুধুমাত্র ম্যানার্স ও এটিকেট শিখার জন্যে। এ কদিনে তুমি শিখে নেবে টেবিল ম্যানার্সের সব কিছু। বিদেশে গিয়ে যেন কোন রকম এ্যাম্বেরাসিং সিচুয়েশনে না পড়। ইন্টারন্যাশনাল এ ডিবেটে মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিশ্বমানের ব্যক্তিত্ব তৈরি করা। ঢাবি চায় এবার বাংলাদেশ যেন একটা ভাল পজিশনে থাকে। ওই ডিবেটের মাধ্যমে তুমি সারা বিশ্বে পরিচিত হবে। এমন কি বিভিন্ন দেশ থেকে তোমার দাওয়াত আসতে পারে। তুমিও মানসিক ভাবে তৈরি হও। ভিসি স্যার তোমার এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেক টাকার ফান্ড দিয়েছেন। আমেরিকার খরচটা ফার্ড ফাউন্ডেশন দেবে। আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এতে অংশ নিবে। সোনার গাঁয়ের বিল দেবে বৃৃৃটিশ কাউন্সিল। ডক্টর উইলিয়াম ক্রস থাকাতে আমরা এ সুযোগ পেয়েছি। এখন বাসায় যাও। কাল সকালে সোনারগাঁয়ে উঠবে। তুমি  ঠিক দশটায় হোটেল লাউঞ্জে থাকবে। হোটেল থেকে কোন কাজে বের হতে হলে ক্রসের গাড়িতে বের হবে। ক্রস কে পিতার মতো সম্মান করবে। লাঞ্চ ডিনার ও ব্রেকফাস্ট তার সাথেই করবে। রাত দশটায় ঘুমোতে যাবে। ভোরে উঠে ইংরেজী কাগজে চোখ বুলাবে। কয়েক সেট ভাল ড্রেস নিয়ে যাবে। কয়েক জোড়া জুতা রাখবে। ভালো মেকআপ কিট সাথে রাখবে। আমি প্রধান গাইড হিসাবে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবো। নিজেকে কখনই একা মনে করোনা।  আমি সব সময় তোমার সাথে আছি। শেষ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমার ছুটি নাই। চেয়ারম্যান স্যার অনেক আশা করে আমায় দায়িত্ব দিয়েছেন। তোমার সাফল্যের জন্যে আমি  সকল ধরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখবো। আমি জানি সেকথা। আমি না থাকলে আমি এতোদূর এগোতে পারতাম না। এটা তোমার ভাগ্য। ভার্সিটির সেরা ছাত্ররা বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। অনেকে খুব হালকা ভাবে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। তুমি অবশ্য কলেজে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলে। সেটা কাজে লেগেছে। ড্রেসের জন্যে টাকা পয়সা লাগলে আমাকে জানিয়ো। আমাদের বাজেট থেকেই সে টাকা দিবো। স্যার আমার বাবা মফস্বলের একজন স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত। তিনি খুবই প্রভাবশালী মানুষ। নগদ টাকার চেয়ে আমাদের সম্পদ বেশী। বাবা বলেছেন,আমার প্রয়োজনীয় সব টাকা দিবেন। আমাদের বাজেট একেবারেই কম না।ভিসি স্যার বলেছেন যতো টাকা লাগে তিনি দিবেন। ফাইনাল তারিখে তোমার কলেজের স্যারেরা আসবেন। আমরা দাওয়াত করেছি। তোমার বাবা ও খালুকে আসতে বলবো। তুমিও বলে রেখো।জ্বী স্যার বলবো। তবে আপনারা দাওয়াত করলে বাবা খুশী হবেন।

আয়েশা বিকেলে বাসায় ফিরে খালাকে সব জানায়। কাল সকালেই আমি হোটেল সোনার গাঁয়ে যাবো। ওদের গাড়ি আসবে। আমি নটার সময় রেডী হয়ে যাবো। তুমি আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিও। নতুন কাপড় গুলো দিয়ে দিও। সাত সেট দিও। সাথে মেকআপ কিটটা দিও। হোটে যাওয়ার সময় তুমি আমাকে সাজিয়ে দিও। ওখানে লাউঞ্জে ক্রস সাহেব থাকবেন। আমাকে নিতে তাঁর গাড়িই আসবে। আমেরিকায় ক্রস সাহেব যাবেন আমার ইন্টারন্যাশনাল গাইড হিসাবে। এই বিন্দু তুই হোটেলে যাচ্ছিস কেন? না খালা, এক সপ্তাহ হোটেলেই থাকতে হবে। তুমি কিছুই চিন্তা করোনা। এরপরেই শুরু হবে ডিবেট ।ফাইনাল একুশে ফেব্রুয়ারি । শিক্ষামন্ত্রী প্রধান অতিথি থাকবেন। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি  সাহেবরাও থাকবেন । সে অনুষ্ঠানে আমার বাবা মা আত্মীয় স্বজন থাকতে পারবেন। পুরো ঢাকা ভার্সিটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে তাদের আশা পূরণ করতে হবে। খালা আমিও খুব একসাইটেড।  বুকটা দুরু দুরু করছে। স্যারেরাতো সিওর আমি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবো।তোমাদের কি ধারণা খালা, আমি কি পারবো। তোর স্যারেরা সবাই যখন বলছে নিশ্চয়ই পারবি। খালু আপনি কি বলেন। তোর উপরে আমার আস্থা আছে। তুই ঢাকায় এসে যে এতো ভালো করবি তা কেউ কল্পনা করেনি। কেন খালু আমিতো জামালপুরেও কলেজের চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সেখানে শুধু যুক্তি তর্কের বিষয় ছিলো।  এখন সারা বাংলাদেশের ভার্সিটির চ্যাম্পিয়ন দের নিয়ে প্রতিযোগিতা। অন্যান্য প্রতিযোগিদের  যুক্তি তর্ক আমি শুনেছি। তাই আশা করছি আমি পারবো। তোমরা দোয়া করো। বাবা মাকেও দোয়া করতে বলো।

পরদিন সকাল সাড়ে নটায় ক্রস সাহেবের গাড়ী এসে হাজির। খালাকে বললাম আমাকে ভালো করে সাজিয়ে দিতে। খালা বললো আমি অতো ভালো করে সাজাতে পারবো। খালু সেদিন একটু বিলম্বে অফিসে যাচ্ছেন। দুজনে এক সাথে বিদায় দিলেন। কোন যেন মন খারাপ করছিলো বুঝতে পারলাম না। গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি এমন সময় বাবা ফোন করেছেন। কিরে মা বিন্দু ,হোটেলে থাকার কি দরকার ছিলো। ওই হোটে আমার বিশ্ব নাই। কি যা বলেন বাবা। এসব হোটেলে বিদেশী মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী থাকেন। বড় বড় কোম্পানীর এমডিরা থাকেন। খুব শক্তিশালী সিকিউরিটি। ওসব নিয়ে আপনার চিন্তা করার কোন দরকার নাই। এরপরতো আমেরিকা যেতে হতে হবে। বিন্দু তোর মা’র সাথে কথা বল। ফোন ধরেই আম্বিয়া বেগম কাঁদতে শুরু করলেন। মারে ,শুনেছি বাজে রাতে হোটেলে থাকে। শেষ পর্যন্ত আমার কপালে এই ছিলো। হোটেলের কথা শুনলে কেউ বিয়ে করবেনা। আরে মা এটা কোন সাধারন হোটেল না। তুমি এখনও সেকেলে রয়ে গেছে। বাবার এখন বেশ পরিবর্তন হয়েছে। আমি এখন গাড়িতে, হোটেলের দিকে যাচ্ছি। তুমি আমার জন্যে দোয়া করো। এক বিন্দুও চিন্তা করবেনা। দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ চলে যাবে। তোমার আনন্দ হচ্ছেনা তোমার মেয়ে সারা দেশের ভিতর চ্যাম্পিয়ন হবে। হচ্ছে আনন্দ। বিয়ে হলে এসব দিয়ে কি করবি। বরের খেদমত করাই মেয়েদের কাজ। ছেলে মেয়ে ্লে ওদের মানুষ করা মায়ের কাজ। মা ও রকম ভাবনা এখন আর নেই। মেয়েরা মন্ত্রী হয়, সচীব হয়। আমিও হবো।  বেশী উপরে উঠে গেলে কেউ বিয়ে করতে চায়না। চৌধুরী সাহেবদের মেয়েটা ঢাকায় থেকে অনেক পড়ালেখা করেছে। শেষে নিজে পছন্দ করে এক ছেলেকে বিয়ে করেছিল। সে বিয়ে টিকেনি। মেয়ে  ছেলের উপরে উঠে গেলে বিয়ে টিকে না। না মা এখন সে রকম নয়। তবে মেয়েরা আর ছেলেদের দাসী নয়। বন্ধু সাথি ও পার্টনার। সমান অধিকার। পুরাণো সনাতন ধর্মে স্বামীকে দেবতা বলা হয়। স্বামীর পা ধোয়া জল খায়। তুমি যেমন বাবার ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকতে। তুমিতো কতো উঁচু পরিবারের পড়ালেখা জানা মেয়ে। ইচ্ছা হলেও কখনো একটা বই পড়তে পারোনি। দাদার সম্পদ দেখে তোমাকে বিয়ে দিয়েছে বাবার সাথে। আম্বিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর বলে দেখ বিন্দু আমার মা বাপ বলেছেন শ্বশুর বাড়ির মুরুব্বীদের খেদমত করবে। ছোটদের আদর করবে। বরের মন খুশী রাখবে। শ্বাশুড়ির মুখে মুখে কখনই কথা বলবেনা। তুমি তাঁর মেয়ের মতো। শ্বাশুড়ি অবুঝ হলেও মানিয়ে নিবে। ঠিক আছে আমি এখন ছাড়ি। হোটেলে এসে গেছি। একটু দেরী হয়ে গেছে।

হাসিমুখে ডক্টর ক্রস বললেন, ওয়েলকাম মিস আয়িশা। ইউ উইল নাও স্টার্ট এ নিউ লাইফ। আসো আমাকে ফলো করো। রিসেপশন কাউন্টার থেকে একজন তাদের নিয়ে গেলো নাইন্থ ফ্লোরে। দুটো রুম পাশাপাশি। নয়শ এক ও নয়শ দুই।  ক্রস সাহেব একে ও আয়েশা দুইয়ে। আয়েশা রুমের ভিতরে গেলে ক্রস সাহেব আয়েশার হাতে সাতদিনের একটা রুটিন দিলেন। সকালে কটায় উঠবে আর কটায় শুতে যাবে। সারাদিন কি করবে। টেবিল ম্যানার্স কি তারও বিশদ বিবরন আছে। ক্রস সাহেব আয়েশাকে জানালেন, এখন থেকে তুমি নিয়মিত ইংরাজী ভাষা ব্যবহার করবে। কিছুতেই বাংলা বলতে  পারবে না।বাংলা নিষিদ্ধ করা হলো আগামী দুই মাসের জন্যে।

 

 

 

 

 

  • দিনপন্জী

    • জানুয়ারি 2018
      সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
      « ডিসে.    
      1234567
      891011121314
      15161718192021
      22232425262728
      293031  
  • খোঁজ করুন